শিরোনামঃ-


» অগ্রণী ব্যাংক আবার অগ্রণী ভূমিকায়

প্রকাশিত: ২২. জুলাই. ২০২০ | বুধবার

শরিফুল ইসলাম শরিফ

অগ্রণী ব্যাংককে আবার অগ্রণী ভূমিকায় ফিরিয়ে এনেছেন মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম । ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট অগ্রণী ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকটির খোলনলচে পাল্টে দিয়েছেন তিনি । মাত্র ৪ বছরে খেলাপি ঋণ নামিয়ে এনেছেন অর্ধেকে। রেমিট্যান্স আহরণে সব ব্যাংকের মধ্যে এখন দ্বিতীয় অবস্থানে এসেছে অগ্রণী ব্যাংক ।
ব্যাংকটির সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে শামস-উল ইসলাম রেডটাইমসকে বলেন, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছু কৌশল আমাদের নিতে হয়েছে। কারণ এখন খুবই প্রতিযোগিতার বাজার, টিকে থাকতে হলে নতুন নতুন পলিসি নিতে হবে। ঋণের সুদ আয় কমে যাওয়ায় ব্যাংক খাত বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ সময় সুদহার কমে যাওয়ায় চেষ্টা করেছি ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে। আয়ের সব খাতে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। এ সময় সুদবহির্ভূত খাত যেমন ফরেন এক্সচেঞ্জ, এলসি, ট্রেজারি, সিন্ডিকেশন, তহবিল ব্যবস্থাপনা, রেমিট্যান্স, আমদানি-রপ্তানি ইত্যাদি ব্যবসায় জোর দিয়েছি। এই কঠিন সময়ে এসব ক্ষেত্র আমাদের সাফল্য এনে দিয়েছে। এ ছাড়া আমরা ব্যয় কমিয়েছি, লিকেজগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করেছি। ফলে ব্যয় কমিয়েও আয় বাড়ানোর চেষ্টা করেছি।

চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ভালো ব্যবসা করেছি। কিন্তু পরের প্রান্তিকে করোনার কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হলেও সার্বিকভাবে অর্ধবার্ষিকীতে ভালো ফল পেয়েছি। চলতি অর্ধবার্ষিকীতে আমাদের পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৫৮২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩১৯ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮২ শতাংশ, যা সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরিতে সহায়তা করেছে।

প্রবাসে থাকাকালে দেখেছি, প্রবাসীরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দেশে টাকা পাঠান। ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান হয়ে ঢাকায় আসার পর তখনই আমি রেমিট্যান্সের বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দিই। দায়িত্ব নেওয়ার এক বছরের মধ্যে আমরা রেমিট্যান্স আয়ে জনতা ব্যাংককে অতিক্রম করি। আর ২০১২ সালে সোনালী ব্যাংককে ছাড়িয়ে যাই। এরপর থেকেই সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে নম্বর ওয়ান।

আমি জিএম হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রবাসীদের অর্থ সহজে দেশে আনতে বিভিন্ন মানি ট্রান্সফার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছিলাম, যার ফল এখন আমরা পাচ্ছি। এ ছাড়া প্রবাসীদের জন্য আলাদা প্রণোদনা দিচ্ছি। প্রবাসীদের জন্য সরকার ঘোষিত ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনার সঙ্গে অগ্রণী ব্যাংক আরও ১ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে। অর্থাৎ প্রবাসীরা আমাদের ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠালে প্রতি ১০০ টাকায় ৩ টাকা নগদ প্রণোদনা পাবেন, যা আগামী ঈদ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী স্মরণীয় করে রাখতে গত মার্চে সিঙ্গাপুরের প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য একটি অ্যাপ চালু করেছিলাম। এটা তাদের টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে ভীষণভাবে সহযোগিতা করেছে। করোনার সময়ে তারা ঘরে বসেই টাকা পাঠাতে পারছেন। এই অ্যাপ প্রচলনের টাইমিংটা এতটাই চমৎকার ছিল যে অনেকেই জাহাজে আইসোলেশনে থেকেই টাকা পাঠাতে পেরেছেন। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা আমাদের অবকাঠামো, লজিস্টিক ইত্যাদির উন্নয়ন করছি। এসব কারণেই আমাদের ব্যাংকের প্রতি আস্থা বেড়েছে প্রবাসীদের।

করোনার কারণে ব্যাংকিং সেবার ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রত্যাশায় পরিবর্তন এসেছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বাধ্যবাধকতার কারণে গ্রাহকরা এখন ঘরে বসেই ব্যাংকিং সুবিধা চাইছেন। গ্রাহক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার উন্নয়নে বড় আকারে ডিজিটাইজেশনের উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের কোর ব্যাংকিং সল্যুশনে লেটেস্ট ভার্সন যুক্ত করা হচ্ছে। এ ছাড়া গ্রাহকদের সেবা বাড়াতে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে অন্যান্য সফটওয়্যার আপগ্রেডেশন করা হচ্ছে।

বিশ্ব ব্যাংক মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী দেশীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরির যে চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন তাতে অগ্রণী ব্যাংক সহযোগিতা করেছে। আমরা সে সময় প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলাম, সেতু তৈরিতে যত বিদেশি মুদ্রা প্রয়োজন হবে, অগ্রণী ব্যাংক একাই তা সরবরাহ করতে পারবে। পদ্মা সেতুতে অর্থায়নে ডলারের চাহিদা মেটাতে আমাদের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সমঝোতা চুক্তি হয়। এর অধীনে পদ্মা সেতুতে যত ডলার প্রয়োজন হবে তা বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের সরবরাহ করবে। কিন্তু আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে এক ডলারও নিইনি। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় থেকে এখন পর্যন্ত পদ্মা সেতুতে ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার সরবরাহ করেছি। সরকারের প্রথম পিপিই প্রজেক্ট মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারেও অর্থায়ন করেছি। ফলে ওই রাস্তায় জনদুর্ভোগ কমেছে। এর বাইরে ১১টি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে আমাদের অর্থায়ন রয়েছে, যেখান থেকে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। এভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে সরকারি ব্যাংক হিসেবে অবদান রেখে জাতির পিতার রেখে যাওয়া নামের গুরুত্ব ধরে রাখার চেষ্টা করছি।

রপ্তানিমুখী শিল্পের শ্রমিকদের বেতন-ভাতায় সরকার ৫ হাজার কোটি টাকার সহায়তা ঘোষণা করেছে। এর উল্লেখযোগ্য অংশ অগ্রণী ব্যাংক সরবরাহ করেছে। এ ছাড়া শিল্প ঋণের ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা সহায়তার মধ্যে আমরা ৯১৪ কোটি টাকার ঋণ দিতে পারব। ইতিমধ্যেই ৩০০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন হয়েছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বাকি ঋণও আমরা শিগগিরই বিতরণ করব। এ ছাড়া সিএমএসএমই ঋণ বিতরণে আমাদের যে বরাদ্দ রয়েছে, তা নিয়েও কাজ চলছে। আমরা আশা করছি, প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণ সম্পন্ন হলে অর্থনীতিতে গতি ফিরে আসবে।

২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি আমি জিএম হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে প্রধান কার্যালয়ে আসি। সে সময় আমাকে ব্যাংকের আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান করা হয়। একই সঙ্গে সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। সিলেট যাওয়ার পর মনে হলো, দেশ স্বাধীন না হলে আমি জিএম হতে পারতাম না। হয়তো হাবিব ব্যাংকের এসপিও পদ পর্যন্ত যেতে পারতাম। দেশ স্বাধীন হয়েছে, আমি জিএম হতে পারলাম, তাই বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কিছু করতে ইচ্ছে হলো। তখন করপোরেট আবহের কোনো একটি জায়গায় বঙ্গবন্ধুর ওপর কর্নার করার কথা ভাবলাম, যেখানে শুধু বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত বই থাকবে। এই কর্নার করার পর অনেক সমালোচনা শুনেছি। পরে যখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে ত্রাণ দিতে গেলাম, তখন আনসার-ভিডিপি ব্যাংক এবং অগ্রণী ব্যাংকের বঙ্গবন্ধুর কর্নারের দুটি ছবি নিয়ে গিয়েছিলাম। সেই ছবি দেখে তিনি খুশি হলেন। পরে সরকারি নির্দেশনা এলো সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরিতে বঙ্গবন্ধুর কর্নার করতে হবে। এখন তো বিদেশের বিভিন্ন দূতাবাস ও হাইকমিশনেও বঙ্গবন্ধু কর্নার হচ্ছে। পরে অগ্রণী পরিবার ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নামে ৯০০ পৃষ্ঠার একটি বই বের করেছি। এটাও একটি উদ্ভাবনী কাজ, যা অন্য কোনো করপোরেটে নেই।
যখন এমডি হিসেবে যোগদান করি, তখন খেলাপি ঋণের হার ছিল ২৯ শতাংশ, যা এখন ১৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। গত বছর আমাদের ১ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা রিকভারি হয়েছে, এর মধ্যে ৪৫০ কোটি টাকা নগদ আদায় হয়েছে। তবে এখন করোনার কারণে কিস্তি আদায়ে শিথিলতার কারণে খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম কিছুটা ধীরগতিতে চলছে। কভিড-পরবর্তী সময়ে খেলাপি ঋণ আদায়ে জোরদার পদক্ষেপ নেওয়া হবে। করোনার মধ্যে আমাদের প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার সরকারি আমানত চলে গিয়েছিল। তার পরও আমাদের সম্মিলিত চেষ্টায় এখন আমানত আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি রয়েছে। অগ্রণী ব্যাংকে এখন কোনো তারল্য সংকট নেই; বরং উল্টো ধার দিচ্ছি।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১০৭৫ বার

Share Button