» অধরা ও শরৎ

প্রকাশিত: ২৬. সেপ্টেম্বর. ২০১৯ | বৃহস্পতিবার


মীরা মেহেরুন

মাথাটা কিছুক্ষণের মধ্যে মনে হয় ফেটে যাবে যন্ত্রনায়। ভোরের অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে। দাঁতে দাঁত চেপে বারান্দার গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে আছে অধরা । অন্য কোনো ভাবনা ভেবে যন্ত্রনাটা উপশমের চেষ্টা করছে। প্রকৃতি মানুষের ক্ষমতা এত সীমিত করে দিয়েছেন,যে সে চাইলেই মাথা যন্ত্রণা কমাতে পারে না, মন চাইলে যখন যেখানে খুশি উড়ে যেতে পারে না, পছন্দের কোনো মানুষকে বলতে পারে না “ভালোবাসি” অথবা পৃথিবীর সবচেয়ে অপছন্দের মানুষটি তার চোখের সামনে ঘুরলেও যাচ্ছে তাই বলতে পারে না। অথচ এই মানুষই না কি শ্রেষ্ঠ জীব! যার কোনো ক্ষমতাই নেই সে কেমন করে শ্রেষ্ঠ হয়!

যন্ত্রনাটা আরো বেড়ে যাচ্ছে। সামনের দেয়ালঘেরা জমিটায় এখনও তেমন বাড়িঘর ওঠে নি, একজন কেয়ারটকার পাহারা দেয় বাড়িটা। গাছগাছালি আর সবুজে ঘেরা দু’ তিন বিঘার মতো জায়গা হবে। বিশলাকারের দু’টি আম গাছ, জামরুল , জাম, নানান গাছে ভরা, মনে হয় গ্রামের কোনো বাড়ি। ঢাকা শহরের ভেতরে এমন একটা জায়গার কথা ভাবাই যায় না। চারিদিকে কেমন ধবধবে ভাব, মৃদুমন্দ বাতাস ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে শরীরময়। অধরা বুকভরে শ্বাস টেনে নেয়ার চেষ্টা করে, বাতাসে শিউলি- বকুল মাখা এক মিশ্র গন্ধ ওর সমস্ত ভাবনাগুলোকে এলোমেলো করে দিলো মুহূর্তে। আপনমনেই বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো- আহ্! কার যেন এক চেনা গন্ধ! এলেই যদি, তবে এত দেরিতে! ভুলেই গেছিলে আমাকে! কত স্মৃতি তোমাকে ঘিরে! চোখের কোনে টলমল করে ওঠে অভিমান।

– কেন অধরা এ অভিমান! আমি সেবার বিদায় বেলা বলেই গিয়েছিলাম আগামী বছর ঠিক এ সময় আবার দেখা হবে! কাঁদছো কেন অধরা! আমি তো আমার কথা রেখেছি! আমি তো তোমাদের মতো নই যে, কথা দিয়ে কথা রাখি না! মিথ্যে বলি না , চিটিং করি না ! আমার মাঝে যে দানের অফরতযোগ্য ভালোবাসা সেটুকুও তোমরা নিতে পারো না! কিসের মানুষ তোমরা! তোমরা আমাকে ভালো না বাসলে, বরণ না করে নিলে আমার কিচ্ছুটি এসে যায় না, রবি আমায় বরণ করেছে বারবার, তুমি আমায় ভালোবেসেছো, দ্যাটস এনাফ! প্রতিবছর এ সময় এসে তোমার স্মৃতিগুলো খুড়ে আমরা আমাদের বন্ধুত্ববার্ষিকী করি ! ভাদ্রের কালো মেঘ , গোমরা আবহাওয়া ,চটচটে গরম , রুক্ষতা তোমার সহ্য হয় না তাই দ্যাখো ওকে বিদায় করে কেমন তড়িঘড়ি তোমার কাছে এসে পড়েছি! এই দ্যাখো, আমি ঠিক তেমনই আছি , একটুও বদলাই নি। অধরা ভেজা চোখে শরতকে খুব গভীরভাবে দ্যাখে আর শরত ওর চোখে- মুখে-চুলে আলতো পরশ বুলিয়ে যায়! শিহরণে সব বেদনা ম্লান হয়ে আসে অধরার । শরত বলে, এই দ্যাখো আমি তোমার জন্যে কত কি এনেছি, শিউলি- বকুল-বিলের শাপলা-শালুক- কাশফুল- এক আকাশভরা আলো এবং জ্যেৎস্না আর নির্মল হাওয়া। আমার এসব সম্পদ তোমাকে কতবার দিতে চেয়েছি, মায়ের বকুনি ভয়ে কিছুই নাও নি।তোমার বারান্দা বরাবর যেটুকু ধবধবে জ্যেৎস্না যেতো সেটুকু দিয়ে তোমার মন ধুয়ে দিয়েছি কতবার ,তাইতো তুমি আজও এত নির্মল,এত স্নিগ্ধ ! আহা তুমি কি গো! এককোচড় শিউলি আর একচিলতে জ্যোৎস্না-এত অল্পতে তুষ্ট তুমি, তোমাকে নিয়ে পারা গেল না! এই দ্যাখো একপৃথিবী সম্পদ নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি তোমার অপেক্ষায়! এখন নেবে! না- কি কারো বকুনির ভয় আজো! অধরা তোমার মনে আছে, আমি তোমার ফ্রকের কোচড়ভর্তি করে শিউলি আর অমল হাওয়া দিয়েছি বুক ভরে। ফুলগুলি নিয়ে তোমার ঘরের বারান্দায় বসে অনেক বড় এক মালা গেঁথে ভাঁজ করে ঝুলিয়ে রাখতে তোমার পড়ার টেবিলের সামনে , সুবাসিত ঘরময় তবু একটু পর পর পড়তে আবার গন্ধ নিতে। এভাবে স্কুলে যাবার সময় হয়ে যেত, ফিরে এসে ম্লান হয়ে যাওয়া মালাটি ভিজিয়ে তাজা রাখার চেষ্টা দেখে আমি মিটিমিটি হাসতাম।

পরদিন অপেক্ষায় থাকতে এককোচড় ভর্তি তাজা শিউলির ম ম সুবাসিত ভোরের। এভাবে চলতো আমাদের কী গোপন অনুভূতি বিনিময়ের খেলা! কি ভালোলাগালাগি ! তুমি আমাকে অনেক ভালোবাসতে ! শিউলি ফুরিয়ে আসতো আর তোমার মন খারাপ হতো, আমি বুঝতাম কিন্তু আমাকে যে যেতে হবে, এ এক অমোঘ নিয়তি! অধরা, তুমি যতদিন থাকবে, ততদিন ফিরে ফিরে আসবো তোমার খুব কাছে- একান্তে! তোমায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাবো ঠিক আমার ভাষায়! যে ভাষা স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ! অধরার হাতের পশমগুলো আলতো ছুঁয়ে যাচ্ছে শরৎ, মাথার যন্ত্রনাগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ঠাকুরের এক গানের সুরের ভাঁজে ভাঁজে–

আজি শরততপনে প্রভাতস্বপনে
কী জানি পরান কী যে চায়।
ওই শেফালির শাখে কী বলিয়া ডাকে
বিহগ বিহগী কী যে গায় গো।।
আজি মধুর বাতাসে হৃদয় উদাসে,
রহে না আবাসে মন হায়–
কোন্ কুসুমের আশে কোন্ ফুলবাসে
সুনীল আকাশে মন ধায় গো।।
আজি কে যেন গো নাই, এ প্রভাতে তাই
জীবন বিফল হয় গো–
তাই চারিদিকে চায়, মন কেঁদে গায়
‘ এ নহে, এ নহে, নয় গো’।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৪০৭ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031