» অনন্য নজির স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত: ৩১. মে. ২০২০ | রবিবার

ডা. মামুন আল মাহতাব

অনন্য নজির স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী । দেশে কোভিড-১৯-এর ধাক্কাটা আনুষ্ঠানিকভাবে এসে লেগেছিল মার্চের ৮ তারিখে। এদিন প্রথমবারের মতো ৩ জন বাংলাদেশীর শরীরে সার্স-কোভ-২ ভাইরাসটি শনাক্ত হয়। আমাদের কিছুটা সৌভাগ্য যে আমরা একেবারে শুরুর দিকটাতেই কোভিডে আক্রান্ত হইনি। বাংলাদেশে হানা দেয়ার ৬৫ দিন আগে সার্স-কোভ-২ আঘাত হেনেছিল চীনে আর এদেশে আসার আগে তার উত্তাপের আঁচ পেয়েছিল পৃথিবীর আরো ১০৪টি রাষ্ট্র কিংবা অঞ্চল। পৃথিবীর উন্নততম রাষ্ট্রগুলোর গর্ব করার মতো যে স্বাস্থ্য অবকাঠামোগুলো, কোভিড-১৯-এর তাণ্ডবে সেগুলো অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে একের পর এক। স্পেনে যখন ওয়ার্ড উপচে হাসপাতালের করিডরে ফেলা হয়েছে কোভিড-১৯ রোগীর শয্যা, তখন প্রাগের হাসপাতালে কোভিড-১৯ রোগীর শয্যাগুলো হাসপাতালের মূলভবন ছাপিয়ে জায়গা করে নিয়েছিল এমনকি সামনের রাস্তায়ও। কফিনের অভাবে ইতালির হাসপাতালে যখন দেখা দিয়েছিল লাশ-জট, নিউইয়র্ক সিটি প্রশাসনের তখন ব্যস্ত সময় কেটেছে আগেভাগেই গণকবর খুড়ে রাখার কাজে।

কোভিডের এই যে ধাক্কা, তা থেকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা রেহাই পাননি বাংলাদেশেসহ সারাবিশ্বেই। তবে পৃথিবীর কোথাও-ই আমরা যেমন এই সম্মুখসারির লোকগুলোকে জায়গা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে দেখিনি, দেখিনি তেমনি বাংলাদেশেও। নাই পিপিই, নাই গ্লাভস আর মাস্ক – এমনি শত ‘নাই-নাই’-এর মাঝেও রোগীর সেবায় সাধ্যমতো নিয়োজিত থেকেছেন তারা বাংলাদেশে এবং দেশে-দেশে। আক্রান্ত হয়েছেন এবং সুস্থ্য হয়ে আবারো ফিরে এসেছেন সেবার আঙ্গিনায়। ইন্টারনেট ঘেটে যদ্দুর জানা যাচ্ছে মে মাসের ২৪ তারিখ পর্যন্ত এদেশে কোভিড-১৯ আক্রান্ত মোট চিকিৎসকের সংখ্যা ছিল ৮১২ জন। একই সময়ে এদের মধ্যে সুস্থ হয়ে কাজে ফিরেছেন ৩১৬ জন। দেশে-দেশে ‘কাদম্বিনীরা মরিয়া প্রমাণ করেছেন যে তারা মরেন নাই’। গতমাসের শেষের দিকে ইতালিতে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সংখ্যা ছাড়িয়েছিল ছয় হাজার, আর আরো উন্নত স্পেনে তা উন্নীত হয়েছিল বারো হাজারে।

কারো কারো প্রতি অবশ্য ভাগ্যদেবী একবারেই প্রসন্ন ছিলেন না। কোভিডের কাছে পরাজিত হয়ে পেশা, পরিবার আর আমাদের চিরতরে একে-এক বিদায় জানিয়েছেন ডা. মো. মঈন উদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক কর্ণেল (অব.) ডা. মনিরুজ্জামান, ডা. সৈয়দ জাফর হোসাইন রুমী, অধ্যাপক মেজর (অব.) ডা. আবুল মোকারিম মো. মহসিন উদ্দিন, ডা. আমেনা খান, ডা. আব্দুর রহমান ও অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর। তবুও কোথায় যেন অস্বস্তিটা একটুখানি কম। আমরা যখন ছ’বার কেঁদেছি অকালে আমাদের সহকর্মীদের হারানোর বেদনায়, তখন এ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইরানে আমাদের সহকর্মীরা কেদেছেন ১২৬ বার, আর রাশিয়ায় ১৮৬ বার, কোভিড-১৯-এ সহকর্মীদের হারানোর বেদনায়। আর ইউরোপের অত যে উন্নত ইতালি কিংবা ইউকে, বিশ্বের উন্নততম ৮টি দেশের তালিকায় যাদের গর্বিত অবস্থান, এমনকি সেসব দেশেও কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে অকালে পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় দেড় মাস আগে ছিল যথাক্রমে ১০০ আর ৩০ জন। রণেভঙ্গ দেননি তবু কেউ-ই। রণে যেমন ভঙ্গ দেননি পাকিস্তানের ছাব্বিশ বছরের ডা. রাবিয়া, তেমনি মাঠ ছেড়ে যাননি আমাদের দেশের সত্তরোর্ধ অধ্যাপক অধ্যাপক মেজর (অব.) ডা. মোকারিমও। কোভিড-১৯-এ ভুগে সুস্থ্য হয়ে আবারো কাজে যোগ দিতে আসা ৫০ জন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীকে বরণ করতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকের কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ক’দিন আগের যে অনাড়ম্বর আয়োজন, দেশের চ্যানেলে-চ্যানেলে প্রচারিত সেই দৃশ্য তাই একই সাথে গর্বিত এবং শ্রদ্ধাবনত করেছে গোটা জাতিকে।

কোভিড সম্বন্ধে মানুষকে প্রথম যিনি জানাবার চেষ্টা করেছিলেন তিনি চীনা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. লী ওয়েন লিয়াং। চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানে কাজ করতেন এই চিকিৎসক। কোভিডের সূচনাও যে এই উহানেই, একথা জানা এখন বিশ্ব জোড়া। এই উহান শহরেই চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে গিয়ে ডা. লী ওয়েন লিয়াং-এর নজরে আসে কিছু এটিপিক্যাল নিউমোনিয়ার রোগী। তাদের ব্যাপারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সচেতন করার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। তার এই হুইসেল ব্লোয়িং-এর ফলাফলটা আর যাই হোক অন্তত ডা. লী ওয়েন লিয়াং-এর জন্য একেবারেই সুখকর ছিল না। গুজব ছড়ানোর অভিযোগে তাকে সরকারিভাবে হেনস্থা করা হয়েছিল। তবে তার হুইসেলের শব্দ ক’টি মাস না ঘুরতেই ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর প্রান্ত থেকে প্রান্তে। পৃথিবী এখনো কোভিড মুক্ত না হলেও, প্রায় মুক্ত চীন আর সবচেয়ে বড় কথা মুক্ত এখন ডা. লী ওয়েন লিয়াং-এর প্রিয় উহান শহর। মুক্তি পেয়েছেন ডা. লী ওয়েন লিয়াং-ও। পৃথিবীর দেশে-দেশে কোভিডের কাছে পরাজিত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের যে ক্রমবর্ধমান তালিকা তাতে সবার ওপরে জ্বলজ্বল করছে তার নামটি।

তবে কোভিডের বিরুদ্ধে এই লড়াইটা চিকিৎসক এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের জন্য নানা কারণেই সুখকর ছিল না। একে তো অদৃশ্য দানবের বিরুদ্ধে অসম লড়াই, পাশাপাশি ছিল এবং হয়তো এখনো আছেও, অশ্রদ্ধা আর সামাজিকভাবে হেনস্থা হওয়ার অনাকাঙ্খিত সব অভিজ্ঞতা। এদেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা এই অসম লড়াইয়ে দেশের মানুষের পাশে কতটা আন্তরিকতা নিয়ে দাঁড়াবেন, শুরুর দিকে তা নিয়ে সংশয় ছিল অনেকেরই। সেই সংশয়টা এখন আর নেই বললেই চলে। কিন্তু এখনও কোভিড হাসপাতালের কাজ করার ‘অপরাধে’ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীকে অ্যাপার্টমেন্টে আর পাড়ায় যে বাঁকা চোখে দেখা হয় না কিংবা মাসের শুরুতে ঠিক-ঠিক ভাড়া গুণে পাওয়া বাড়িওয়ালাও যে তার ডাক্তার ভাড়াটিয়া অ্যাপার্টমেন্টটি ছেড়ে গেলে একটু স্বস্তি পাবেন না এমন কথা বলার মতো জায়গায় সম্ভবত এই সমাজ এখনও পৌঁছাতে পারেনি। একটা সময় গেছে যখন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের হেনস্থা করলে বিদ্যুতের লাইন কেটে দেয়ার ধমকও দিতে হয়েছে মাননীয় বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীকে। দুদকের চেয়ারম্যান মহোদয় তো বাড়ী বানাবার অর্থের উৎস খোজার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির চিকিৎসা সহায়ক কমিটির পক্ষ থেকে এমন আচরণের প্রতিবাদে এমনকি বিবৃতিও দেয়া হয়েছিল। আজকের পরিস্থিতি সেই তুলনায় অনেক ভালো সন্দেহ নেই, প্রত্যাশা শুধু আরো একটু ভালোর।

অবশ্য চিকিৎসাসেবা প্রদানকারীদের এমনি প্রতিকুলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে দেশে-দেশে। চাইনিজ তো চাইনিজ, এশীয় বংশোদ্ভুত চিকিৎসক-নার্স মানেই কোভিডের বাহক, এই অপবাদে খোদ মার্কিন মুলুকেই অপদস্ত হয়েছেন কত এশিয়ান ডাক্তার, নার্স আর স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী তার অসংখ্য-অজস্র বয়ান ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ইন্টারনেটের অলিতে-গলিতে।

যতই দিন গড়িয়েছে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় দেশে-দেশে সরকারগুলোর সক্ষমতা বেড়েছে বহুগুণ। বেড়েছে বাংলাদেশেও। ফলে শুরুতে ‘ঢাল-তলোয়ার ছাড়া নিধিরাম সর্দার’ বেশে আমাদের চিকিৎসকদের যেমন কোভিড-১৯-এর মুখোমুখি হতে হয়েছিল এখন পরিস্থিতি তার চেয়ে বহুগুণ ভালো। মনে আছে একটি জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারের জন্য টিভিসি তৈরি করতে গিয়ে পিপিই পরা দেশীয় চিকিৎসকের ছবি কোথাও খুঁজে না পেয়ে চ্যানেলটির একজন শীর্ষকর্তা আমার শরণাপন্ন হয়েছিলেন। ঘটনাটি প্রায় মাস তিনেক আগের। সেখান থেকে আমরা আমাদের অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে পেরেছি দ্রুতই এবং সেটাও এমন পর্যায়ের যে, এই দুর্দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পয়ষট্টি লক্ষ পিপিই রপ্তানীর নজির স্থাপণ করতে পেরেছে আজকের বাংলাদেশ। আমাদের ব্রিটিশ সহকর্মীদের মতো শরীরে বিন ব্যাগ জড়িয়ে যেমন আমাদের কোভিড রোগীদের সেবা প্রদান করতে হয়নি, তেমনি পিপিই-র দাবিতে ওয়াশিংটনের নার্সদের যখন হোয়াইট হাউজের সামনে মিছিল করতে হয়েছে, আমাদের বঙ্গভবনের সামনে তেমন করে দাঁড়াতে হয়নি।

এর একটি বড় কারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি তত্ত্বাবধান এবং প্রয়োজনে সরাসরি হস্তক্ষেপ। মাস্ক বিতর্কের সময় তাকে আমরা দেখেছি জাতীয় প্রচার মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারিত ভিডিও কনফারেন্সে এ ব্যাপারে তদন্তের নির্দেশ দিতে। একইভাবে নারায়নগঞ্জে পিসিআর মেশিন নেই জেনে তাকে উদ্বিগ্ন হতে দেখেছি, দেখেছি এ ব্যাপারে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দিতে এবং তাও ঐ সরাসরি সম্প্রচারিত ভিডিও কনফারেন্সেই।

সম্প্রতি কোভিড-১৯ মোকাবেলায় স্বাস্থ্যখাতের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে একটি অনন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বাংলাদেশে। একসাথে, একযোগে নিয়োগ দেয়া হয়েছে পাচ সহস্রাধিক চিকিৎসক আর দুই সহস্রাধিক নার্সকে। না, এতে অবশ্য নতুন কোনো গিনেজ রেকর্ড তৈরি হয়নি। একদিনে স্বাস্থ্য ক্যাডারে দশ সহস্রাধিক চিকিৎসককে নিয়োগ দিয়ে অনেক আগেই সেই রেকর্ডটি নিজেদের করে নিয়েছে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার।

তবে এর মাধ্যমে যে ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে তার উচ্চতা অন্য মাত্রার। সেদিনের এগারো হাজার চিকিৎসকের ক্যাডার সার্ভিসে যোগদান আর আজকের এই পাঁচ হাজার নবীন চিকিৎসকের নিয়োগ প্রদান এবং তাদের চাকুরিতে যোগদানের প্রেক্ষাপট পুরোপুরি ভিন্ন। একজন দায়িত্বশীল প্রধানমন্ত্রী তার নাগরিকদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে পাচ সহস্রাধিক চিকিৎক নিয়োগ দেয়ার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তার দ্বিতীয় কোনো উদাহরণ কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত গোটা পৃথিবীতে নেই। একইভাবে এতগুলো সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত নবীন চিকিৎসক, পেশায় যাদের পেশাগত অভিজ্ঞতা সামান্যই, কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় প্রথমদিন থেকেই নিয়োজিত থাকতে হবে জেনেও, যেভাবে তারা স্বাগ্রহে স্ব-স্ব কর্মক্ষেত্রে যোগদান করেছেন তার দ্বিতীয় কোনো উদাহরণও আমার জানা নেই।

পেশায় আমি যেহেতু চিকিৎসক, কোভিড-১৯ প্যানডেমিকের এই সময়টায় বিভিন্ন অনলাইন আয়োজনে আর টিভি চ্যানেলের আলোচনায় যোগ দিতে হচ্ছে মাঝেমধ্যেই। এসব আয়োজনে আমকে প্রায়শই একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, আর তা হলো নবীন চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে আমার বলার কিছু আছে কিনা। আমার বলার কিছুই থাকে না, শুধু প্রশ্নটা শুনলে প্রচণ্ড প্রশান্তিতে মনটা ভরে আসে। কারণ যে পেশায় আমার রয়েছে শত-সহস্র অমন অনুজ, আর মাস শেষে যে সরকারের দেয়া বেতন ঠিকঠিক ঢুকে যায় আমার অ্যাকাউন্টে, সেই সরকারের দায়িত্বে যখন অমন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন প্রধানমন্ত্রী তখন আমার চেয়ে এই কোভিড-১৯ প্যানডেমিকে জর্জরিত পৃথিবীতে আর বেশি স্বস্তিতে থাকতে পারে কে?

লেখক : অধ্যাপক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও উপদেষ্টা রেডটাইমস ডটকমডটবিডি

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩৫৯ বার

Share Button

Calendar

November 2020
S M T W T F S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930