» অনলাইন গণমাধ্যম ও সামাজিক দায়

প্রকাশিত: ১২. মার্চ. ২০১৮ | সোমবার

সৈয়দ মহসিন আলী :

সাংবাদিকতায় তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারে নতুন এক মাত্রা সৃষ্টি করেছে অনলাইন সাংবাদিকতা। অন্যান্য দেশের মত এদেশেও অনলাইন গণমাধ্যম জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মুদ্রণমাধ্যমসহ সবধরণের গণমাধ্যমেরই এখন অনলাইন সংস্করণ আছে। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহারে পার্থক্য থাকলেও অন্য গণমাধ্যমে সাংবাদিকতার সংগে অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকতায় কোন পার্থক্য নেই। নৈতিকতার দিক থেকে তারা এক । বস্তুনিষ্ঠতার শর্ত সব গণমাধ্যমকেই মেনে নিতে হয়। সামাজিক দায় উপেক্ষা করতে পারেন না কোন সাংবাদিক।

আমি মনে করি সাংবাদিকতা পেশা সকলের জন্য উম্মুক্ত থাকা উচিৎ। এদেশে সিটিজেন জার্নালিজম কনসেপ্ট আসার আগে থেকেই আমরা গণমুখি সাংবাদিকতার পক্ষে ছিলাম। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতি বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতাকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে একটি ইংরেজি দৈনিকের সংগে যুক্ত হয়েছিলাম। কিন্তু সেটা নিয়মিত করতে পারিনি। আমি এখন বিশ্বাস করি একজন সাংবাদিককে অবশ্যই শিক্ষিত, মার্জিত, যুক্তিবাদি, পরিশ্রমি ও সৎ হতে হয়। কিন্তু কেন যেন আমাদের চার পাশে এরকম গুণাবলি সম্পন্ন সাংবাদিকের বড় অভাব দেখি।

তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আবু জাফর শামসুদ্দিন, রণেশ দাশ গুপ্ত, সন্তোষ গুপ্ত, ফয়েজ আহমেদ, মোনাজাত উদ্দিন এদের মত সাংবাদিকরা সামাজিক দায়কে মাথায় রেখে কাজ করে গেছেন। হয়েছেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ।
অনলাইন সাংবাদিকতায়ও যুক্ত হয়েছেন অনেক গুণী সাংবাদিক । কালে কালে আরো অনেকে আসবেন। এদেশে যারা অনলাইন গণমাধ্যমকে জনপ্রিয় করতে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন তাদের মধ্যে আছেন মোস্তফা জব্বার, আলমগীর হোসেন, তৌফিক ইমরোজ খালেদী, সৌমিত্র দেবসহ অনেকেই। আমি লক্ষ্য করেছি , তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো সংবাদ পরিবেশনে একটা মান বজায় রাখে। কিন্তু সম্প্রতি অনলাইন গণমাধ্যমের জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করে যে কেউ একটা করে অনলাইন গণমাধ্যমের প্রতিষ্ঠান খুলে বসছেন। এতে করে বটবৃক্ষের পরিবর্তে আগাছার সৃষ্টি হচ্ছে।

উদ্বেগের সঙ্গে আমি লক্ষ করেছি বেশির ভাগ অনলাইন চলে যাচ্ছে আগাছাদের হাতে, অসাংবাদিকদের হাতে। এ কারণেই সরকার অনলাইন নীতিমালা প্রণয়নে হাত দিয়েছেন। এটা একটা ভাল উদ্যোগ। সম্প্রতি বাংলাদেশ অনলাইন মিডিয়া এসোসিয়েশনের একটি প্রতিনিধি দল আমার মিন্টু রোডের বাসভবনে এসে মতবিনিময় করে গেছে। তারাও বলেছেন, অনলাইন গণমাধ্যমের মান উন্নয়নে এই নীতিমালা ভালো ভূমিকা রাখবে।

অনলাইন সাংবাদিকতা বিষয়ে এত কথা বলার পেছনে আমার সাম্প্রতিক কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা কাজ করেছে। কায়সার হামিদ একজন খ্যাতিমান ফুটবলার। আশির দশকের শুরুতে সে বহুবার আমার ক্লাবের হয়ে খেলেছে। তখনও কায়সার হামিদ জাতীয়ভাবে এতটা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আমার ভাতিজা আবাহনীর ইউসুফ (সে আর বেঁচে নেই) ও কায়সার হামিদকে নিয়ে টাউন ক্লাবের পক্ষে খেলে আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। এমনকি এম এ খান গোল্ড কাপ খেলেও আমরা চ্যাম্পিয়ন হই। সেই সূত্রে কায়সার হামিদ আমার স্নেহভাজন ও আপনজন।

কয়েকদিন আগে সে আমার বাসায় এসেছিল, তার সঙ্গে ছিল কয়েকজন বন্ধু বান্ধব। এদের মধ্যে ছিল এশিয়ার ১ম ম্যারাথনিস্ট জান্নাতুল মাওয়া (রুমা) সহ কয়েকজন কৃতি নারী ও পুরুষ। আমি কায়সারের অনুরোধে তাদেরকে গান গেয়ে শোনাই।

এদের মধ্যে কায়সার হামিদ তার মোবাইল দিয়ে সেলফি ভিডিও ধারন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছেড়ে দেয়। অনেকে না জেনে না বুঝে সেই ভিডিওতে কিছু কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন। আর এসবের ভিত্তিতে কিছু অনলাইন গণমাধ্যম ভূয়া সংবাদ তৈরি করে সাংবাদিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

গণমাধ্যম আর বিকল্প গণমাধ্যমে যোজন যোজন ফারাক। আমি গবেষক নই কিন্তু সাধারণ জ্ঞানে বুঝতে পারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত কমেন্টের কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা থাকেনা। এর মধ্যে দিয়ে কোন তথ্য প্রকাশিত হলেও সেটা গণমাধ্যমে প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। এটা কোনও সংবাদ নয়। বড় জোর একে সংবাদসূত্র বলা যায়। কিন্তু অনলাইন গণমাধ্যম এখন স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশ সরকারই বিশ্বে প্রথম অনলাইন গণমাধ্যমের জন্য নীতিমালা তৈরি করেছে। তাই অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিককে তার সামাজিক দায়ের কথা মাথায় রাখতে হয়। সূত্রকে সংবাদ বানাতে চাইলেও তাকে সততার সঙ্গে কিছু পরিশ্রমও করতে হবে। ওই ভিডিও প্রকাশ করলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার এবং ভিডিও যিনি আপলোড করলেন তাদের পরিচয় দিতে হবে। তিনি কেন এই কাজ করলেন এব্যপারে তার বক্তব্য থাকতেই হবে। যার ছবি আপলোড করলেন তারও একটা বক্তব্য থাকতে হবে। সেটা না হলে সংবাদ হবে না। হবে চরিত্র হননের অপচেষ্টা। কারো চরিত্র হননের অপচেষ্টা করলে সংক্ষুদ্ধ ব্যক্তি প্রচলিত আইনেই মামলা করতে পারেন। এরপরে আছে তথ্য প্রযুক্তি আইন। কতিপয় সাংবাদিক নামধারী অপরাধী ও অসাংবাদিকের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নেয়া নিশ্চয়ই অন্যায় কোন পদক্ষেপ নয়। এটা প্রকৃত সাংবাদিকদের সুনাম রক্ষায় বরং ভালো ভূমিকা রাখবে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন খুব জনপ্রিয়। একে উপেক্ষার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু এই বিকল্প গণমাধ্যমটিকে সতর্কভাবে ব্যবহার না করলে অনেক বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। আমি লক্ষ করেছি অনেকে খুব চিন্তা ভাবনা না করে তার ব্যক্তিগত অনেক ছবি ও তথ্য সেখানে তুলে ধরেন। কিন্তু তাদের সরল মনে আপলোড করা এসব ছবি ও তথ্য যখন অপরিচিত মানুষের কাছে চলে যায় তখনই তাকে অনেক বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হয়। অনেকে না জেনে না শুনে যে কোন ছবি বা তথ্যে ঢালাও ভাবে লাইক দেন ও মন্তব্য করে বসেন। এটা ঠিক না। কারও বাবার মৃত্যুর সংবাদে লাইক দেয়াটা অমানবিক। আবার বাবা মেয়ের অন্তরঙ্গ ছবিতে কেউ যদি রোমান্টিক মন্তব্য করেন সেটাও বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে।

এমন কি মন্তব্য মাত্রা ছাড়ালে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সাংবাদিক হলেও আপনি সামাজিক দায় এড়াতে পারেন না। এসব সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় সরকার কঠোর আইন তৈরি করছে। কিন্তু আপনি কেন শুধু শুধু অপরাধি হয়ে এ বিকল্প মাধ্যমটিকে কলংকিত করবেন। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি মত প্রকাশের স্বাধীনতা বন্ধ করার জন্য নয়। আমরা জানি তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা নিয়ে বিতর্ক চলছে। ৫৭ ধারার যৌক্তিকতা আমরাও খতিয়ে দেখছি।

পাশাপাশি এটাও তো দেখতে হবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কারা মত প্রকাশের স্বাধীনতার অপব্যবহার করছেন। স্থান কাল পাত্র বুঝে ভেবে চিন্তে মন্তব্য করলে দেখবেন সেটা সমাজের জন্য মঙ্গল জনক হবে। সাংবাদিক বলেই আপনি সামাজিক দায় এড়াতে পারেন না।

প্রয়াত সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর মৃত্যু বরণ করেন । মারা যাবার দু মাস আগে এই লেখাটি রেডটাইমসে প্রকাশ করেছিলেন । বিষয়বস্তুর গুরুত্ব বিবেচনা করে লেখাটি পুনর্মুদ্রিত হল ।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৭৭ বার

Share Button

Calendar

September 2018
S M T W T F S
« Aug    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30