» অনেকদিন ধরে একটা ছেলেকে খুঁজছি

প্রকাশিত: ২১. নভেম্বর. ২০১৭ | মঙ্গলবার

জেসমিন চৌধুরী

অনেকদিন ধরে একটা ছেলেকে খুঁজছি, ডাক নাম তাপস, আসল নাম ভুলে গেছি।

যখন তাকে চিনতাম তখন তার বয়স ছিল দেড়/দুই বছর, এখন তিরিশের উপর হবে। মা-বাবার সাথে সিলেটে আমাদের বাড়ির একটা ভাড়া-ঘরে থাকত পিচ্চিটা। বাবা ফরেস্ট অফিসে কাজ করতেন, আমরা তাকে ডাকতাম ফরেস্টার ভাই, তার বৌকে ভাবি। ফরেস্টার ভাইয়ের বাড়ি ছিল বগুড়া, তার বৌ’র বাড়ি কুষ্টিয়া। এছাড়া আর কিছুই মনে নেই তাদের সম্পর্কে, কিন্তু চেহারাগুলো এখনো জ্বলজ্বল করে মনের ভেতর, সেইসাথে তাদের সাথে কাটানো অন্তরঙ্গ দুপুর আর সন্ধ্যাগুলো।

আমি তখন একটা কিশোরী মেয়ে, তাপস আমার কোল ছাড়তে চাইত না। তাকে কোলে নিয়ে সব্জি কোটা, রান্নাবাড়া সহ সব কাজ করতাম। অনেক সময় তাকে গোসল করিয়ে, তেল মাখিয়ে, ভাত খাইয়ে দিতাম। ভাই, ভাবি আমার ডাকনাম রোজী বলেই আমাকে ডাকতেন, ভীষণ স্নেহ করতেন।

তাপসের একমাত্র চাচা আর ফুফু প্রায়ই বেড়াতে আসতেন সিলেটে, তাদের সাথেও খুব খাতির হয়েছিল আমার। তার চাচার মুখে প্রথম পিকাসোর নাম শুনেছিলাম আমি । এই পরিবারটির সাথে মেলামেশা আমার জন্য ছিল সিলেটি সংস্কৃতির বাইরের জগতের সাথে ফার্স্ট-হ্যান্ড পরিচিতির প্রথম জানালা। ফরেস্টার ভাই আমাদের সামনেই বৌয়ের প্রতি তার প্রেম-প্রীতি প্রকাশ করতেন। এটা আমি আগে কখনো দেখিনি। স্বামী-স্ত্রীরা প্রকাশ্যে শুধু ঝগড়া করে বলেই জানতাম, মান-অভিমান ভাব-ভালবাসা প্রথম এই দু’জনের মধ্যে দেখেছিলাম।

একসময় ফরেস্টার ভাই বদলী হয়ে গেলেন, আমার আদরের তাপসকে নিয়ে চলে গেলেন সিলেট ছেড়ে। যাবার সময় আমার ডায়েরীতে লিখে দিয়ে গেলেন,
‘অচল শিখর ছোটো নদীটীরে চিরদিন রাখে স্মরণে,
যতদূর যায় স্নেহধারা তার সাথে যায় দ্রুত চরণে ।
তেমনি তুমিও থাকো নাই থাকো মনে কোরো মনে কোরো না,
পিছে পিছে তব চলিবে ঝরিয়া আমার আশিস ঝরনা |’
-আলখেল্লাওয়ালা বুড়ো।

আমার হাতে আব্বার জন্য একটা কাগজও গুঁজে দিয়েছিলেন যাতে লেখা ছিল ‘আপনার সাথে পরিচয় না হলে আমার মনের আকাশে একটা উজ্জ্বল নক্ষত্রের জন্ম কখনোই হতো না।’

ভাবি কী লিখে দিয়েছিলেন তা ঠিক মনে নেই, সেই ডায়রীটাও বারবার দেশান্তর আর ঘর-বদলের চক্করে হারিয়ে গেছে। তবু আজো তাদেরকে ভুলিনি। মাঝে মাঝে ভাবি, তারা কি আমাকে মনে রেখেছেন, তাদের আশিস ঝরনা কি আমার জন্যে এখনো ঝরে?

তাপস নামটা দিয়ে ফেসবুকে সার্চ করে কিছু পাইনি। ফেসবুক যে খুব শক্তিশালী যোগাযোগ মাধ্যম তা ইতিমধ্যে বুঝে গেছি। তাই আশা করছি আমার সাথে যারা আছেন, যারা আমাকে ফলো করেন তাদের মধ্যে কেউ হয়ত তাপস নামের বত্রিশ/তেত্রিশ বছরের কোন ভদ্রলোককে চিনবেন যার মা’র বাড়ি কুষ্টিয়া, বাবার বাড়ি বগুড়া, যার বাবা বনবিভাগে কাজ করতেন বা করেন। যদি এমনটা হয়, যদি তাকে আবার খুঁজে পাই শুধু এইটুকু জানতে চাইব সে একজন ভাল মানুষ হয়েছে, ভাল আছে, শৈশবের মত এখনো মানুষকে এতোটাই আপন করে নিতে পারে যে দীর্ঘ তিরিশ বছর পরও তারা সব তথ্য ভুলে গেলেও তার ভালবাসা ভুলতে পারে না।

তাপসের কথা ভেবে আদরে, ভালবাসায় আমার বুকটা টনটন করে এখনো। আমার এই অনুসন্ধান হয়তো খুব গুরুত্বপূর্ন নয়, কিন্তু যদি অনেকে এই পোস্ট শেয়ার করেন, যদি ছড়িয়ে যেতে যেতে এটা কখনো তাপসের চোখে পড়ে যায়, সে কি খুব অবাক হয়ে যাবে না? একটা কিশোরী মেয়ে বুড়া হতে হতেও তিরিশ বছরের বেশি সময় ধরে তার সাথে কাটানো একটি বছরের স্মৃতিকে লালন করে যাচ্ছে?

(এইটুকু লিখতে লিখতেই মনে পড়ে গেল, ফরেস্টার ভাইয়ের ডাক নাম ছিল পান্না, তার ছোটভাইয়ের নাম মান্না, আর বোনটির নাম সম্ভবত লাকি। ভাবিকে ভাবি বলেই ডাকতাম তাই নামটা মনে আসছে না। নারীর আত্মপরিচয় জনিত সেই পুরোনা সমস্যা। তারপরও আবছাভাবে মনে পড়ে, সম্ভবত নামটা ছিল বীণা।)

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৮৯৫ বার

Share Button

Calendar

October 2018
S M T W T F S
« Sep    
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031