» অনেক নাটকীয়তার পর নিজের জেলা রংপুরেই সমাহিত এরশাদ

প্রকাশিত: ১৭. জুলাই. ২০১৯ | বুধবার

অনেক নাটকীয়তার পর নিজের জেলা রংপুরেই সমাহিত করা হয়েছে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে।

মঙ্গলবার বিকাল পৌনে ৬টায় রংপুর জেলা শহরে এরশাদের বাড়ি পল্লীনিবাসের লিচুবাগানে বাবার কবরের পাশে শায়িত করা হয় তাকে।

তার আগে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয় সাবেক এই সেনাপ্রধানকে । কফিনে দেওয়া হয় ফুল।

এসময় ভাই জি এম কাদের, ছেলে শাদ এরশাদসহ আত্মীয়-স্বজন এবং জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁসহ দলের অন্যান্য নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের শেষ জানাজা ও দাফনে মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক উপস্থিত ছিলেন।

গণঅভ্যুত্থানে পতিত সামরিক শাসক এরশাদ ৯০ বছর বয়সে গত রোববার মারা যাওয়ার পর তাকে ঢাকার বনানীতে সেনা কবরস্থানে দাফনের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল দলের পক্ষ থেকে।

কিন্তু শুরু থেকেই রংপুরে দাফনের দাবি জানাচ্ছিলেন জাতীয় পার্টির জেলার নেতারা। মঙ্গলবার দুপুরে লাশ জানাজার জন্য রংপুরে নেওয়ার পর দলীয় সিদ্ধান্তে বাদ সাধেন তারা।

নাটকীয়তার পর দুপুরে রংপুর শহরের কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে এরশাদের কফিন আর ঢাকায় ফিরিয়ে না এনে নিয়ে যাওয়া হয় এরশাদের বাড়ি পল্লীনিবাসে।

জাতীয় পার্টির প্রেস উইং থেকে এক বিবৃতিতে তখন বলা হয়, রংপুরের গণমানুষের আবেগ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতাবোধে শ্রদ্ধা জানিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে রংপুরেই দাফন করতে অনুমতি দিয়েছেন বেগম রওশন এরশাদ এমপি। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কবরের পাশে বেগম রওশন এরশাদের জন্য কবরের জন্য জায়গা রাখতেও অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

এরশাদের স্ত্রী রওশন জাতীয় পার্টির জ্যেষ্ঠ কো চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন, সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতাও তিনি।

মারা যাওয়ার পর সোমবার এরশাদের জানাজা হয়েছিল সেনানিবাসে; পরদিন সোমবার সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ ও বায়তুল মোকাররমে হয় আরও দুটি জানাজা, দলের কার্যালয়ে হয় শ্রদ্ধা নিবেদন। এরপর মরদেহ রাখা হয়েছিল সিএমএইচের হিমঘরে।

মঙ্গলবার সকালে জানাজার জন্য এরশাদের কফিন নিয়ে রংপুরে রওনা দেওয়ার আগে তার ভাই জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের সেনা কবরস্থানে দাফনের কথাই জানিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, “ শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী বনানীতে সেনাবাহিনীর কবরস্থানেই তাকে সমাহিত করা হবে। এই কবরস্থান ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় হলেও যে কোনো সময় যে কেউ সেখানে যেতে পারে।

ঢাকা সিএমএইচ থেকে এরশাদের কফিন নিয়ে বেলা পৌনে ১২টার দিকে রংপুর ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছায় বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার। ততক্ষণে রংপুর শহরের কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠ ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে জেলা পুলিশ।

এরশাদের কফিন দুপুরে ঈদগাহ মাঠে নেওয়ার পর জানাজার আগে বক্তৃতায় রংপুরের মেয়র ও জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা যুক্তি দেন, বনানীর সেনা কবরস্থানে এরশাদকে দাফন করা হলে পরে দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা সহজে সেখানে যেতে পারবেন না, শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারবেন না।

এরশাদ নিজেই রংপুরে শায়িত হতে চেয়েছিলেন- এমন দাবি করে সোমবারই পল্লী নিবাসের পাশে লিচুবাগারে কবর খুঁড়ে রাখেন রংপুরের নেতাকর্মীরা।

মেয়র মোস্তফা তাদের নেতাকে রংপুরে দাফন করার দাবি আবারও তুলে ধরেন।

এরপর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের বক্তব্য দিতে শুরু করলে মাঠে উপস্থিত হাজার হাজার নেতাকর্মী হট্টগাল শুরু করেন। এরশাদকে রংপুরে দাফন করার দাবিতে তারা স্লোগান দিতে থাকেন।

রংপুর শহরের কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে মঙ্গলবার দুপুরে অনুষ্ঠিত হয় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শেষ জানাজা।
মিনিট বিশেক এই পরিস্থিতি চলার পর বেলা ২টা ২৫মিনিটে জানাজা শুরু হয়। জানাজায় ইমামতি করেন রংপুর করিমিয়া উলুম মাদরাসার খতিব মুফতি মাওলানা মুহম্মদ ইদ্রিস আলী।

জি এম কাদের বলেন, রংপুরের মানুষের ভালোবাসায় একজন পেয়ারা থেকে এরশাদ রাষ্ট্রপতি হয়ে উঠেছিলেন। রংপুরের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত এরশাদ।

শাদ এরশাদ বলেন, আমার বাবার কোনো ভুলত্রুটি থাকলে আপনারা ক্ষমা করে দেবেন।

জানাজার পরপরই রংপুরের নেতাকর্মীরা এরশাদের মরদেহবাহী গাড়ি ঘিরে ফেলেন এবং রংপুরে দাফনের দাবিতে স্লোগান ধরেন।

এসময় এরশাদের লাশবাহী গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নেন রংপুর সিটি মেয়র মোস্তফা ও জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব এস এম ইয়াসির। মাইকে লাশবাহী গাড়িকে ব্যারিকেড দেওয়ার আহ্বানও জানান মোস্তফা।

এক পর্যায়ে মেয়র মোস্তফা ওই গাড়িতে উঠে পড়েন এবং বেলা ৩টার দিকে এরশাদের মরদেহ নিয়ে ওই গাড়ি তার বাড়ি পল্লীনিবাসের দিকে রওনা হয়।

এই পরিস্থিতিতে জি এম কাদের ও রাঙ্গাঁ দুজনেই সিদ্ধান্ত বদলের কথা জানিয়ে বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের দাফন রংপুরেই হবে।

প্রায় একই সময় জাতীয় পার্টির প্রেস উইং থেকে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, রংপুরের গণমানুষের ভালোবাসা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। তাদের আবেগ ও অনুরাগেই রংপুরে পল্লীবন্ধুকে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

রংপুরে নিজ বাড়ি পল্লীনিবাসের লিচুবাগানে কবরের পাশে রাখা হয়েছে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কফিন। বাবার পাশেই দাফন করা হয় তাকে।
এই সিদ্ধান্তের পর সেনাবাহিনীর একটি দল পল্লীনিবাসের পাশে এরশাদের বাবার নামে গড়া মকবুল হোসেন জেনারেল অ্যান্ড ডায়াবেটিক হাসপাতাল সংলগ্ন লিচুবাগানে কবরের স্থানটি পরিদর্শন করেন।

ঈদগাহ থেকে এরশাদের বাড়ির দূরত্ব প্রায় ৪ কিলোমিটার হলেও সড়কের দুপাশে জনতার ঢল ঠেলে এই পথ যেতে সময় লাগে দুই ঘণ্টা ২০ মিনিট।

পল্লী নিবাসে পৌঁছার পর এরশাদের দাফন প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ নেয় সেনাবাহিনী। রংপুর সেনানিবাসের লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাকারিয়ার নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি দল প্রথমে গার্ড অব অনার দেয়। এরপর সেনাবাহিনীর ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম সাবেক সেনাপ্রধানের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকাল পৌনে ৬টায় এরশাদকে শুইয়ে দেওয়া হয় কবরে।

দাফনের আগে সাবেক সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে দেওয়া হয় গার্ড অব অনার।
এরশাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রংপুরের দোকান মালিক সমিতি সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত নগরীর সমস্ত দোকান পাট বন্ধ রেখেছিলেন এদিন।

এরশাদকে রংপুরে দাফনে সন্তোষ জানিয়ে নীলফামারী জেলা জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদুল ইসলাম শহীদ বলেন, “এটাই ভালো সিদ্ধান্ত হয়েছে। রংপুরে কবর হওয়ায় স্যারের আত্মা শান্তি পাবে।”

গাজীপুর মহানগর জাতীয় পার্টির সহ সভাপতি তসলিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, “রংপুরে স্যারকে কবর দেওয়ার সিদ্ধান্তই সঠিক হয়েছে। তিনি সারা বাংলাদেশের নেতা হলেও আসলে তো তিনি রংপুরের সন্তান। আমরা চেয়েছিলাম উন্মুক্ত স্থানে কবর হোক। রংপুর অনেক দূরে। তবুও তো আমরা যখন খুশি যেতে পারব।”

জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ফারুক শেঠ বলেন, “আমাদের প্রিয় নেতাকে রংপুরে দাফনের সিদ্ধান্ত যথাযথ হয়েছে।”

কুলখানি বুধবার

এরশাদের কুলখানি আগামী বুধবার অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে জাতীয় পার্টি।

জাতীয় পার্টির প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে, বুধবার বাদ আছর গুলশানের আজাদ মসজিদে কুলখানি অনুষ্ঠিত হবে।

এইচ এম এরশাদ (১৯৩০-২০১৯) এইচ এম এরশাদ (১৯৩০-২০১৯)
এরশাদের মৃত্যুর পর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় অফিস ও বনানীতে এরশাদের রাজনৈতিক কার্যালয়ে শোক বই খুলেছিল জাতীয় পার্টি।

বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও দূতাবাসের প্রতিনিধিরা বনানীতে এসে শোকসন্তপ্ত নেতাদের পাশে দাঁড়ান বলে জানিয়েছে জাতীয় পার্টি।

মঙ্গলবার বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বনানী অফিসে এসে শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেন তুরস্ক, সুইডেন, মালদ্বীপ, ভ্যাটিক্যান সিটির রাষ্ট্রদূত।

এছাড়াও মালয়েশিয়ার ভারপ্রাপ্ত হাই কমিশনার, ওমানের শার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স, জাপানের শার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স, রাশিয়ার প্রথম সচিব, থাইল্যান্ডের শার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স, আরব আমিরাত দূতাবাসের প্রতিনিধি, সৌদি আরব দূতাবাসের প্রতিনিধি, নেপাল দূতাবাসের প্রতিনিধিরা শোক বইয়ে সই করেন।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৮৩ বার

Share Button

Calendar

August 2019
S M T W T F S
« Jul    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031