অমৃতে গরল: সাহিত্যিক অসততার উদাহরণ

প্রকাশিত: ১০:০৫ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২, ২০২০

অমৃতে গরল: সাহিত্যিক অসততার উদাহরণ

আনিসুর রহমান অপু

‘কালের অমৃতধারা!’ অসম্ভব সুন্দর একটি নাম! যেমন সুন্দর এর নাম তেমনি মনোহর শিল্পী মোস্তাফিজ কারিগরের আঁকা বইটির প্রচ্ছদ! বইটি সম্পাদনা করেছেন, ফারুক ফয়সল আর এটি এ বছরই (২০২০) বের করেছে ‘অনন্যা’! বইটি হাতে নিতেই চমৎকার একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়লো বুকের ভেতর! ফ্ল্যাপের লেখায়ও বর্ণাঢ্য সেই আয়োজনেরই ইঙ্গিত!
হাজার বছর আগের চর্যাপদ বা চর্যাগীতিকা- যা বাংলা কবিতার আদিরূপ- সেই থেকে পথ চলতে চলতে নিশ্চয়ই ধারাবাহিক ভাবে চলে আসবে আমাদের যাপিত বর্তমান অব্দি! এই আশা নিয়ে পাতা উল্টাচ্ছি-
এছাড়াও মাত্রই গত সপ্তাহে নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাঙালী পত্রিকায় এই বইটি নিয়েই জনাব আবেদীন কাদের এর অন্তর নিংড়ানো একটি অসাধারণ আলোচনা, (কালের অমৃতধারা: ‘মেঘমুক্ত ঘননীল অম্বরের মাঝে’) পড়েও শিহরিত ছিলাম অনেক! মনে আশা, বইটি নিশ্চয়ই ভালো হবে! করোনা কালের এই পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনার ছুটিটাও নিশ্চয়ই ভালো কাটবে! কিন্তু, ‘ যতোই গভীরে যাই মধু, যতোই উপরে যাই নীল, ‘ হুমায়ূন আজাদ এর এই প্রবাদ সম পংক্তিটি আমাকে এক জাতীয় হতাশই করতে থাকে! কারণ যতোই গভীরে যাই মধু’র বদলে এর নাম-ধাম, প্রচ্ছদ আর মনোজ্ঞ আলোচনা ছাপিয়ে বইটির সম্পাদনার দুর্বলতার দিকটিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে শুরু করে! বের হতে থাকে গরল!
প্রথমেই আসে ভূমিকার কথা,
এতো নামী-দামী একটা সংকলনে ব্যাখ্যাবহুল একটি ভূমিকা আশা করাই যায়, না কি? কেন, তার ব্যাখ্যায় পড়ে আসছি!
কিন্তু না, নেই! নেই এমনও না, আছে তো! ‘বর্ধিত নতুন সংস্করণ প্রসঙ্গে’ আধপাতার একটা কষ্টকর প্রয়াস চোখে পড়েছে! বাংলা কাব্য সাহিত্য অমিত সম্ভাবনার ধারক।এই আধপাতাতেই তিনি তাঁর ঋদ্ধ পঠন-পাঠনের জ্ঞান ঢেলে দিতে পারলেন! পেরে থাকলে তো ভালোই ছিল, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে যে, শুধু কি ভিন্ন! মনে হচ্ছে একশ আশি ডিগ্রী বৈপরীত্যে অবস্থান নিয়ে যেন গুবলেট করে দিয়েছে সব কিছু! যাইহোক, ঠিক তার পরের পৃষ্ঠায়ই: ‘ঋণ ও কৃতজ্ঞতা’ শিরোনামে সংকলনে যেসব কবির কবিতা ছাপিয়েছেন বা সাজানো হয়েছে তাঁদের সবার প্রতি ঋণ ও ভালোবাসার কথা স্বীকার করেছেন- ভালো উদ্যোগ! নাই মামার চেয়ে কানা মামা থাকাও মন্দ না অন্তত!
বেশ, চলুন পাঠক পরের পাতায় যাই-
ঋণ স্বীকার ও কৃতজ্ঞতা শিরোনামে, এখানে যা লেখা আছে তুলে দিচ্ছি তার সবটুকুই, ‘’এই বইয়ের কবিতার পাঠ নিরূপনে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ বাংলা কবিতার বিশেষ সহায়তা নেয়া হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পূর্ব আলোচনায় বসিয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁর কথাই। মুহম্মদ আবদুল হাই ও আনোয়ার পাশার চর্যাগীতিকা পদগুলির আধুনিক বাংলা রূপান্তর যথাযথ মনে হওয়ায় হুবহু অনুসরন করা হয়েছে। প্রাগুক্ত সকলের কাছে কৃতজ্ঞতা ও ঋণ স্বীকার করছি!’’ মাশা আল্লাহ! কারো কাছ থেকে কিছু নিলে বিনিময়ে আর কিছু না হোক কৃতজ্ঞতা বা ভালোবাসা দিলেও অন্তত চলে! সেক্ষেত্রে সম্পাদক আমাদের বঞ্চিত করেননি! আমরা নাখোশও না তাঁর প্রতি! কিন্তু সবার বেলায় এই সত্যটি যদি প্রয়োগ হতো, তাহলে কী ভালোই না হতো! আমরা অন্তত একজন কবি এবং সংকলককে চিনি যিনি ভীষণভাবে বঞ্চিত, এমনকী প্রতারিতও বোধ করছেন কালের এই অমৃতধারা হাতে নিয়ে! কেমন অদ্ভুত শোনাচ্ছে না! ‘অমৃতধারা’ সেটাই কিনা বঞ্চনায় ভরিয়ে দিয়েছে, গরল ঢেলে দিয়েছে আরেকজন কবি-সংকলকের মনে- এ কেমন কথা!

(দুই)
এর উত্তর জানতে হলে আমাদেরকে অন্য আরেকটি কবিতা সংকলন সম্পর্কেও কিছু জানতে হবে-
আমাদের হাতে আছে আরও একটি বাংলা কবিতা সংকলন, ‘বিশ শতকের বাংলা কবিতা’ দুই মলাটের মাঝে কবিতার একটি উজ্জ্বল অধ্যায়! যার সম্পাদনা করেছেন, নব্বই দশকের একজন প্রতিভাবান কবি ‘হাসানআল আব্দুল্লাহ’! ধ্রুব এষ এর প্রচ্ছদে মাওলা ব্রাদার্স ৫২০ পৃষ্ঠার এই ঢাউস সংকলনটি প্রকাশ করেছে ২০১৫’র অমর একুশে বইমেলায়! এই সংকলনটি যখন তৈরী করা হয় কবি হাসানআলের সাথে ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের সূত্রে এর নানা অধ্যায়ে এই লেখকও কম বেশি জড়িত ছিল! প্রায় এক দশকের অমানসিক পরিশ্রমের ফসল এই গ্রন্থ! এবং খুব কাছ থেকে দেখেছে দিনরাত একাকার করে কী কী করেছেন এতো এতো নামী দামী কবিদের অমর সৃষ্টিকে দুই মলাটে বন্দি করার প্রক্রিয়ায়! বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে নব্বই দশক অব্দি ৯৮ জন কবির এক বা একাধিক কবিতা লিপিবদ্ধ করতে তাঁকে একটা লম্বা জার্নির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে! জীবিত প্রায় সব কবির কাছ থেকে শুধু লেখা সংগ্রহই নয়, যথাসাধ্য তাঁদের লিখিত অনুমতিও সংগ্রহ করে ফাইল বন্দি করেছেন কবি হাসানআল আব্দুল্লাহ! এখানে আরও একটা ব্যাপার উল্লেখ্য এই যে, দিনে দিনে আমাদের কাছে প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন বেড়েই চলছে, সংকলন শুরুর দিকে কিন্তু ততোটা সহজ লভ্য ছিল না সবকিছু! অনেক বইয়ের বোঁচকা কবিকে কাঁধে করে বইতেও দেখেছি! ইশ তখন যদি কপি-পেস্ট, স্ক্যান এর মতো সহজ সুবিধাগুলো এখনকার মতো হাতের নাগালে থাকতো তাহলে কি বেচারা কবিকে এমন গাধার খাটুনি খেটে, নানা ঘাটের জল ঘেঁটে বই বানাতে হয়!


কিন্তু কেন এই বিষয়ের অবতারনা? অবতারনা এইজন্য যে , ফারুক ফয়সল এর ‘কালের অমৃতধারা’য় কবি আব্দুল্লাহর সংকলনের ৫১টি কবিতার উপস্থিতি! হ্যাঁ, ভুল পড়েননি পাঠক! ৫১টি! তাঁর বইয়ের প্রায় অর্ধেকই হাসানের সংকলন থেকে নেওয়া! কেমন করে তা সম্ভব? আমাদেরও তো সেই একই প্রশ্ন, কেমন করে, কীভাবে তা সম্ভব? এ কি নিছক কাকতালীয়? নাকি হাসানআল যেভাবে লেখা সংগ্রহ করেছেন ফারুক সাহেবও ওই একই পথে হেঁটেছেন? যদি হ্যাঁ বলেন, তাহলে কিন্তু আরও অনেক ‘কিন্তু’ এসে পথ আটকাবে! হাসানের বইতে যে যে কবিতা, (ওই ৫১টির) দাড়ি-কমা-সেমিকোলন, ডট সহ প্রায় সব একই ভাবে আছে ফারুক ফয়সলের বইতেও! এমনকী হাসান বিশেষ কারণে কিছু কবির কবিতার অংশ বিশেষ লিপিবদ্ধ করেছেন, আমাদের দ্বিতীয় কবিও ওই একই তরীকা ধরেছেন, ওই একই কবিতায়! মনে হয়, দুজন যেন একই পীরের মুরিদ!
আচ্ছা এটাও নাহয় বাদ দিলাম, আরেকটা উদাহরণ দিই, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিশুতীর্থ’ নামক দীর্ঘ কবিতাটির অংশ বিশেষ নিয়েছেন হাসানআল, যেমন ১,২,৩, ৮, ৯! আমাদের আলোচিত সংকলকেরও ওই একই নাম্বারগুলো এক, দুই, তিন, আট এবং নয় পছন্দ হয়েছে! মজার না, ব্যাপারটা?
মজার কাণ্ড আরও আছে, হাসানআলের সম্পাদিত পত্রিকা ‘শব্দগুচ্ছ’ অন্যান্য অনেক ছোট কাগজের মতো এরও নিজস্ব একটা লেখক গোষ্ঠী তৈরী হয়েছে! তার মধ্যে বেশ কিছু কবি আছেন কোলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের, এঁদের কেউ কেউ শব্দগুচ্ছ পুরস্কারও পেয়েছেন- এঁদের লেখা সাধারণত এখানে বা দেশের পত্রপত্রিকায় দেখা যায় না খুব একটা! হাসান যথারীতি সেইসব কবির কবিতাকে স্থান দিয়েছেন তাঁর সংকলনে! ফয়সল সাহেবও তাই-ই করেছেন, কিন্তু ওই বিশেষ শ্রেনীর লেখাগুলো পেলেন কোথায় তিনি?
না, সব ক্ষেত্রে মাছি মারা কেরানীর মতো অন্ধ অনুকরণ করেননি তিনি অবশ্য, দুই একটা ব্যতিক্রমও আছে—শুনবেন কী সে ব্যাতিক্রম? হাসানআল কিছু কবির কবিতার শিরোনাম খুঁজে না পাওয়ায় উঁনি নিজে সেই কটি কবিতার নাম ঠিক করে নামটি উদ্ধৃতি( ‘’ ‘’) চিহ্ন দিয়ে আটকে দিয়েছেন! ফয়সল সাহেব এখানে ওই নামটিই রেখে এই উদ্ধৃতিগুলো উঠিয়ে দিয়ে বিরাট একটি ব্যতিক্রমী কাজ করেছেন!
এই, এতোসব কাণ্ড কি সবই কাকতাল মাত্র? আপনাদেরও কি তাই মনে হয়, পাঠক? যদি তাই মনে হয়, তাহলে আমাদের আর কোনও কথা নেই! আর যদি দ্বিমত থাকে তাহলে তো কিছু কথা উঠবেই!
আসলে সম্পাদনা বিষয়টা কি এতোই সহজ কর্ম! না বোধহয়! লেখালেখির সাথে তিনি নাকি যুক্ত আছেন প্রায় তিন দশক এবং পাঠাভ্যাসের পরিমণ্ডলটিও নাকি বেশ বড় – এমনকী এক্ষেত্রে তিনি নাকি একেবারেই আগ্রাসী। এই কি তার নমুনা?
জনাব ফারুক ফয়সল এতো সব করেছেন, অথচ কোথাও কিন্তু তার উল্লেখযোগ্য স্বীকারাক্তি বা অনুমতির তোয়াক্কা করেননি! যদি না একেবারে শেষ পৃষ্ঠায় সহায়ক গ্রন্থের তালিকায় আরও অনেক-অনেকের সাথে, বিশ শতকের বাংলা কবিতা, সম্পাদনা: হাসানআল আব্দুল্লাহ’র বিষয়টি আলাদা ভাবে ধরি! একত্রে যাঁর এতোগুলো লেখা নিয়ে নিলেন তাঁর সাথে তো আপনার বিরাট দহরম-মহরম থাকারই কথা! কোনো অনুমতি-টতি কিছু নেওয়ার কথাটা কি মনে আসেনি আপনার! কেন ভাই? সাহিত্যের সততা বলেও তো একটা কথা আছে, সেটাও কি আপনাকে মনে করিয়ে দেয়নি আপনার বিবেক?
শুরুতে বলেছিলাম বড়সড়ো একটা ভূমিকার কথা! হ্যাঁ, ভূমিকায় লেখক বা সংকলকের নিজের কথা বা কৈফিয়ত কিছু থাকলে তা উপস্থাপন করা যায়, তুলে ধরা যায় তাঁর কাব্য আদর্শ, সাহিত্য বিচারের ধরণ, ঘরানা বা কোনো বিশেষ পছন্দ-অপছন্দের কথাও! ভূমিকা—এই একটি জায়গায়ই সংকলক কেবল তাঁর মনের কথাগুলো কিংবা মনোবিশ্লেষণ সমূহ অকপটে বলে দিতে পারেন! বইটির শেষে যেহেতু রেফারেন্স বই হিসেবে অনেক নক্ষত্র কবি-লেখক এবং তাঁদের অমর সৃষ্টির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেহেতু তাঁদের বইগুলো তো অন্তত উল্টে-পাল্টে দেখার কথা! বলা যায়, প্রায় প্রত্যেকটি বইয়ের সংকলক এখানে তাঁদের নিজস্ব লেখনি সত্তাটা মেলে ধরেছেন। কিন্তু ফয়সল সাহেব এক্ষেত্রে আমাদেরকে চরম হতাশ করেছেন।
যেহেতু এতোগুলো লেখা তিনি হাসানের বই থেকে সংগ্রহ করেছেন নিশ্চয়ই সেটা বিশেষ এক ভালো লাগা থেকে কিংবা তাঁর সাহিত্য বিচার বোধের উপরে ব্যাপক আস্থা থেকেই- কিন্তু সেই কথাগুলো কি এতো বড় বইটির কোথাও আলাদা করে তুলে ধরা যেতো না! খুবই কি কঠিন হতো এই ব্যাপারটি?
এ প্রসঙ্গে আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা একটু বলি, ধান ভানতে শিবের গীতের মতো শোনাবে বলে খুবই সংক্ষেপে বলছি তা! আমার গ্রামের (ঝালকাঠি জেলার, বাসণ্ডা) বাড়ি থেকে কবি কামিনী রায়ের বাড়ি বা জন্মস্থান হেঁটে গেলে মাত্র দশ মিনিট আর অটো বা রিক্সায় গেলে চার-পাঁচ মিনিট! তাঁর কবিতা আমাদের পাঠ্যও ছিল- ওই যে,
‘’করিতে পারি না কাজ, সদা ভয় সদা লাজ,
সংশয়ে সংকল্প সদা টলে, পাছে লোকে কিছু বলে!
আড়ালে আড়ালে থাকি, নীরবে আপনা ঢাকি,
সম্মুখে চরণ নাহি চলে- পাছে লোকে কিছু বলে!’’
তাঁর পরিবারের কেউ এখন আর নেই এদেশে! দেশ বিভাগের অনেক আগেই ভারতে চলে গেছেন তাঁরা সবাই! ওখানে যোগাযোগ করেও ভরসা করার মতো কাউকে পাইনি, যিনি সাহায্য করতে পারেন এ ব্যাপারে!
সেই ছাত্রজীবন থেকেই আমার খুব ইচ্ছা, এই মহিয়ষী কবির জীবন—কৃতিত্ব, বেড়ে ওঠা, লেখাপড়া, লেখালেখি ইত্যাদি নিয়ে একটা শুদ্ধ সংকলন বের করি! কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও যথেষ্ট তথ্য উপাদান সংগ্রহ করতে পারিনি! নেটেও মেলেনি তেমন কিছু— যখন কলেজে পড়তাম তখন একটা ম্যাগাজিন পেয়েছিলাম—খুব সম্ভবত কোলকাতা থেকেই বের করা হয়েছিল সংকলনটি! বেশ কিছু মূল্যবান তথ্য ছিল ওটায়, কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার বইটি হারিয়ে গেছে! অনেক খুঁজেও কোন হদিস পাচ্ছি না তার!
একজনের একটা বই পাওয়া গেছে, কিন্তু সেটা মোটেই নির্ভরযোগ্য কিছু না! আর যেমন-তেমন করে কিছু একটা গোছাবো যে সেটাও মন সায় দিচ্ছে না!
শুধুমাত্র যথাযথ তথ্যের অভাবে তাই আমার মনের নিভৃত চাওয়াটা অধরাই রয়ে গেছে আজও! ভাবছি, সম্পাদনা ব্যাপারটা যদি অমৃতধারার মতো এমন সহজ হতো, কারো বই থেকে হুবহু ছেপে দিলাম নির্দিষ্ট কয়েকটি ফর্মা, আর পরের দিন থেকে বনে গেলাম বইয়ের সম্পাদক, তাহলে আর অধরা থাকতো না আমার ইচ্ছের সোনার হরিণ- আমিও অনেকগুলো বইয়ের সম্পাদক বা সংকলক হয়ে যেতাম রাতারাতি!

(তিন)
এখানে একটি প্রশ্ন, জনাব ফারুক ফয়সল কেন করলেন এই গর্হিত কাজটি! হ্যাঁ, তার পক্ষেও কিছু যুক্তি হয়তো থাকবে, তিনি বলতে পারেন আজকাল লেখা পাওয়া কি এতোই জটিল? নেটে সার্চ দিলেই তো কতো কতো লেখা বেরিয়ে যায়! তাছাড়া বইয়ের শেষে সহায়ক গ্রন্থের তো আরও আরও নাম নেওয়া হয়েছে, সেখান থেকেও তো লেখা সংগ্রহ করা হয়ে থাকতে পারে! হ্যাঁ পারে, কিন্তু সেটা কি ওই ভাবে? একজনের সম্পাদিত একটা গ্রন্থের বিরাট একটা অংশ দাড়ি-কমা, সেমিকোলন, এমনকী ডটসমেত আস্ত গিলে ফেলা—যার উদাহরণ আমরা শুরুতেই দিয়েছি?
জনাব ফারুক ফয়সল, আমাদের শত্রু শ্রেনীর কেউ নন, যে তাঁর বদনাম গেয়ে বিশেষ ফায়দা আছে কিছু! কিন্তু কাজটা কেমন হলো, সেটা নিয়েই তো মাথায় চক্কর দিচ্ছে! এতো ফাঁপা, অন্তঃসারশূন্য কাঠামোর উপর বাস করছি আমরা!
এখন তো আরও প্রশ্ন জাগছে, তিনি যে বইয়ের শুরুতে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ বাংলা কবিতা এবং মুহম্মদ আবদুল হাই ও আনোয়ার পাশার চর্যাগীতিকার নাম উল্লেখ করেছেন তাদের থেকে কতোটা কী নিয়েছেন সেটাও ভেবে দেখার বিষয়। যদিও বই দুটি হাতের কাছে নেই আমার! থাকলে অন্তত মিলিয়ে দেখতে পারতাম তাঁর কাজের ধরণ! চৌদ্দ ফর্মার একটা বইয়ের কতটুকু মৌলিক আর কতটা জাস্ট চোখ বুজে কপি করে নেয়া! মাছি মারা কেরানীর গল্পটি কেন যে, চলে আসছে বার বার!
এখানে আরও একটা ব্যাপার বলি, যে দেশে আমাদের জন্ম অর্থাৎ বাংলাদেশে এই কাজটি কিন্তু অনেকেই করেন, বিশেষ করে নীলক্ষেত কেন্দ্রীক ভূঁইফোড় প্রকাশনাগুলো, আইনের ফাঁক-ফোঁকড় গলে কেমন কেমন করে যেন পার পেয়েও যান! কারণ আইনের প্রয়োগ বা বাস্তবায়ন দীর্ঘমেয়াদী এবং দুরূহ একটা ব্যাপার সেখানে! তারপরও কম-বেশি কিছু উদাহরণ কিন্তু আছে, যেখানে অভিযুক্ত এবং পরে দোষী সাব্যস্ত ব্যাক্তি শাস্তি পেয়েছেন! এই তো মাস দুয়েক আগেও সেবা প্রকাশনীর কাজী আনোয়ার হোসেন বনাম শেখ আব্দুল হাকিম এর মামলাটি নিয়ে বেশ তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেলো! সত্যের মোটামুটি জয়ই হয়েছে সে মামলায়! কিন্তু এখন আমরা যেখানে থাকি, সেখানে তো এ ব্যাপারটাকে ছাড় দেওয়া হয় না আদৌ! হয় কি? ভাবা যায় ব্যাপারটা কোর্টে গড়ালে কী পরিমান কাদা ছোঁড়াছুড়ি হবে দুই পক্ষে? আশা করি, ততো দূর পর্যন্ত সম্ভবত গড়াবে না ব্যাপারটি! জনাব ফয়সল সংকলিত কালের অমৃতধারারই প্রথম দিকের একটা কবিতার কয়েকটি লাইন এখানে প্রযোজ্য, তুলে দিচ্ছি তার আধুনিক বাংলা রূপান্তরসহ—
‘’দুহিল দুধু কি বেন্টে সামাই।
বলদ বিআএল গবিআ বাঁঝে
পীঢ়া দুহিঅই এ তীনি সাঝে।
জো সো বুধী সোহি সাধী।’’
(টেন্ডনপাদানাম্ )
পদ – ৩৩
__________________________________
আধুনিক বাংলায় রূপান্তর
‘’দোয়ানো দুধ কি বাঁটে প্রবেশ করে?
বলদ প্রসব করলো গাই বন্ধ্যা,
পাত্র (ভরে তাকে) দোয়ানো হলো তিন সন্ধ্যা।
যে বুদ্ধিমান, সেই নির্বোধ, যে চোর সেই সাধু!’’
যা ঘটেছে ঘটেছে, দোয়ানো দুধ আর বাঁটে প্রবেশ করানো যাবে না ঠিক, এ নিয়ে বেশী জল ঘোলা করাও বোধহয় সমীচীন হবে না! সেজন্যই আশা করছি, বিভেদের বৈদিক আগুন দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ার আগেই সংশ্লিষ্ট পক্ষের বোধোদয় হবে! এমনতর মহৎ একটা কাজ করতে গিয়ে যে পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে সেটা শুভবোধের পরিচয় নয় মোটেই! সেই শুভবোধটি যতো দ্রুত সম্ভব সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে ফিরে আসে ততোই কল্যাণ আমাদের সবার জন্য!