» অর্থনীতির নয়া উদ্বেগ

প্রকাশিত: ০৩. জানুয়ারি. ২০২০ | শুক্রবার

নুসরাত হোসেন

অর্থনীতির জন্য নতুন এক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা ।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কে নেমে এসেছে । ।ব্যাংক ঋণের সুদের হার এক অঙ্কে আসার আগেই ঘটেছে এ ঘটনা ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী দেখা গেছে , নভেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। অক্টোবর শেষে তা ছিল ১০ দশমিক ০৪ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতিতে এই খাতে ঋণের যে লক্ষ্য ধরেছে, বর্তমান অঙ্ক তার থেকে প্রায় ৫ শতাংশ পয়েন্ট কম।

আর এটাকেই ‘এই মুহূর্তে’ বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখছেন অর্থনীতির বিশ্লেষক এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ও আহসান এইচ মনসুর।

২০০৭-০৮ মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করা মির্জ্জা আজিজ বলেন, এটা খুবই উদ্বেগের । বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে । এটা মুদ্রানীতির লক্ষ্যের চেয়ে অনেক কম।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর একে ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ আখ্যায়িত করেন।

তিনি বলেন, এমনিতেই বিনিয়োগের অবস্থা খারাপ। বেশ কিছুদিন ধরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কম। তার উপর ব্যাংক থেকে সরকার প্রচুর ঋণ নেওয়ায় এই প্রবাহে আরও টান পড়েছে।

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ খরা কাটাতে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাংক ঋণের সুদহার কমিয়ে এক অঙ্কে (১০ শতাংশের কম) আনার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংক মালিকরাও দেড় বছর ধরে এমন ঘোষণা দিয়ে নানা সুবিধা নিয়ে আসছেন, তবে সুদহার কমেনি।

সর্বশেষ গত ২৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় ব্যাংক ঋণের সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর এই সুদ হার হবে ৯ শতাংশ।

নতুন বছরের প্রথম দিন থেকে উৎপাদন খাতে অর্থাৎ শিল্প খাতে ৯ শতাংশ সুদে ব্যাংকগুলোকে ঋণ বিতরণের নির্দেশনা সংক্রান্ত সার্কুলার জারি করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল বোর্ড সভায়।

কিন্তু এক সপ্তাহ না যেতেই ৩১ ডিসেম্বর ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) এবং ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ঘোষণা দেন, ১ জানুয়ারি নয়, ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে ৯ শতাংশ সুদহার।

বর্তমানে ব্যাংক ভেদে উৎপাদন খাতে সুদহার ১১ থেকে ১৪ শতাংশ।

গত ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ। এই মন্থর গতির কারণে গত ৩১ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৯-২০ অর্থবছরের যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করে, তাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কমিয়ে ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ ধরা হয়।

মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় গভর্নর ফজলে কবির বলেছিলেন, আগের মুদ্রানীতিতে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হলেও অর্জিত হয়েছে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। তা থেকে বাড়িয়ে এবার ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আশা করা হচ্ছে।

বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অস্থিরতা নেই; নেই জ্বালাও-পোড়াও, হরতাল-অবরোধ। বিদ্যুৎ-গ্যাস সমস্যারও উন্নতি হয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজটও নেই।

কিন্তু এ সবের কোনো প্রভাব অর্থনীতির প্রধান সূচক বিনিয়োগে পড়েনি। যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই আটকে আছে বেসরকারি বিনিয়োগ।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়ার এটা একটি কারণ উল্লেখ করে মির্জ্জা আজিজ বলেন, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা রয়েছে। এর মানে, বিনিয়োগ হচ্ছে না। অন্যদিকে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি আছে। এর মানে হচ্ছে শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহৃত হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে কলকারখানা স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানি কমেছে ১০ শতাংশ। শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে ২০ শতাংশের মতো।

এ প্রসঙ্গে আহসান মনসুর বলেন, ঋণ প্রবাহ এবং ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি কমা মানে দেশে বিনিয়োগ কম হচ্ছে। ব্যাংকগুলো বিনিয়োগে এগিয়ে আসছে না।

ব্যাংক থেকে সরকারের লাগামহীন ঋণ নেওয়ার কারণে বেরসকারি খাত বঞ্চিত হচ্ছে মন্তব্য করে ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান মনসুর বলেন, বাজেটে সরকার পুরোবছরের জন্য যে ঋণ নিতে চেয়েছিল তা প্রায় ৫ মাসেই নিয়ে ফেলেছে।

একটা বিষয় সবাইকে মনে রাখতে হবে, বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে না। আর কর্মসংস্থান বাড়ানোই এখন আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের ৫ মাস ৯ দিনে (১ জুলাই থেকে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত) ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৪৭ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা নিয়ে ফেলেছে সরকার। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নিয়েছে ৯ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। আর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিয়েছে ৩৭ হাজার ২৬১ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরেছে সরকার। অর্থাৎ ১২ মাসে ব্যাংক থেকে সরকারের যে টাকা ধার করার কথা ছিল, তার পুরোটাই ৫ মাসে নিয়ে ফেলেছে। এখন বাকি ৭ মাস কিভাবে চলবে সেটা নিয়েই তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগের ।

নুসরাত হোসেন ঃ সিনিয়র এভিপি ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৩৮ বার

Share Button

Calendar

February 2020
S M T W T F S
« Jan    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829