অসমাপ্ত থাকুক

প্রকাশিত: ৩:৩২ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৩, ২০১৭

অসমাপ্ত থাকুক

শবনম চৌধুরী

আপনি…. মানে তুমি ?
— ফেস্টের শুরু থেকেই আড়চোখে দেখছিলে !
— কথা বলার মাধ্যম খুঁজে পাচ্ছিলাম না !
— এখনো সেই মাধ্যমেই পড়ে আছো ? সাহিত্য সম্মেলনে তুখোড় বক্তার বক্তৃতার প্রশংসা সকলের মুখে মুখে…. সে খুঁজছে মাধ্যম ?
— আসলে ঠিক তা নয় ! দ্বিধা, সংকোচ…
— আর ?
— আর….
— অনুশোচনা ?
— এটাই বোধহয় বলা উচিৎ…
— চশমার কাঁচের পাওয়ার বেড়েছে !
— বেলা তো কম গড়ায়নি !
— তখন আমি ছিলাম কুড়ি, তুমি পঁচিশ । মাঝে গেলো আরো কুড়ি…
— কুড়ির যোগে তুমি পূর্বের চেয়েও দুই কমে অষ্টাদশী ! আমিই বুড়িয়ে গেছি
— চুলে রঙ দিলেই পারতে. ..
— তাতে ? জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া রঙ ফিরে আসবে ? ধূসর জীবন রঙিন হবে ?
— সমস্ত রঙ নিয়ে পালিয়ে গেলে ! তবু বলছো ধূসর জীবন ?
— নিতে পারলাম কই ? রংধনুর সাতরঙ পেছনে ফেলে রঙ ভেবে ভুল করে মরীচিকার পেছন ছুটেছিলাম !
— সে যাক । বিখ্যাত কথাশিল্পীর কি এখনো কবিতা লিখার অভ্যাস আছে ?
— তখন প্রাণের গহীনের সুধাগুলো কাব্যে কাব্যে মহুয়ার নেশা ধরাতো ! বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর জোর করে চেষ্টা করেছিলাম । সেসবে কোনরকমে গ্রন্থও বের হলো । আশাতীত পাঠকপ্রিয়তা পেলো, কিন্তু অতৃপ্ত হৃদয়ে আর তৃপ্তি জুটেনি । কষ্ট, ব্যর্থতা, কাপুরুষের মতো পালিয়ে যাওয়ার অনুশোচনা, গ্লানি, ভুলের পর ভুলের মাশুলে হৃদয়ের রক্তক্ষরণের ফোঁটাগুলো মলাটবন্দী হলে পাঠক বুভুক্ষের মতো লুফে নিলো উপন্যাসগুলো । হাহ ! যাক। অভিনন্দন তোমাকে । সাহিত্যে নতুন নক্ষত্রের আবির্ভাবে বিস্মিত হলেও আনন্দের মাত্রাটা ঢের । খুব স্বল্পসময়ে নাম যশও পেয়ে গেলে !
— মনে পড়ে ? নবীণ বরণে মঞ্চে ওঠা একজন নবীণের মুখে তোমার লেখা কবিতার আবৃত্তি শুনে চমকে গেলে, বিস্মিত হলে, মুগ্ধতা চেপে না রেখে কবিতাকে মাধ্যম করে পরিচিত হতে এলে । আমার প্রিয় তরুণ কবি একই বিভাগে সবে স্নাতক উত্তীর্ণ ছাত্র জেনে নিজেও আপ্লুত হলাম । কবিতাটা তোমার প্রথম কাব্যগ্রন্থে ছিল । আর আমি ছিলাম তোমার কবিত্বের প্রথম আবৃত্তিকার । সেই থেকে বিভাগের সকলের কাছে হলে শ্রদ্ধাভাজন । নতুন করে সবাই আবিস্কার করলো জাঁদরেল তরূণ কবিকে । যদিও গ্রন্থের ব্যাপারে তেমন আমল না দিলেও কমবেশি জানা ছিলো সবার । আমাদের বরণের পর বিভাগীয় রত্ন হয়ে উঠলে তুমি । হয়ে উঠলে সম্পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্ব । মুখে মুখে ছড়ালো জয় জয়কার । দিন গড়ালো । একান্তে আমাদের কথা হতো ছন্দে ছন্দে, কবিতায় কবিতায় । তোমার ছন্দে হলো আমার ছন্দের হাতেখড়ি । তোমার ছন্দে ছন্দ মেলানোয় চেষ্টার কোনো ঘাটতি ছিলো না তখন । কথায় কথায় কবিতা, তোমার কাব্যিক চিঠির উত্তরেও কবিতা ! কাব্যে কাব্যে কাব্যময় দুরন্ত সময়ে তোমার হাত ধরেই আমার ভালোবাসারও হাতেখড়ি । গুরু বটে ! স্নাতকোত্তরের পর পালিয়ে গেলে ! কাব্যের সকল রঙ রস নিংড়ে নিয়ে গেলেও আমার হৃদয়ের পিরামিডে মমি হয়ে থাকা ছন্দগুলোতে নীরবে চলতে থাকলো গবেষণাকাজ । যদিও তখন স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে ছিলাম।
— আর… আমার হলো ছন্দপতন ! তোমার গ্রন্থগুলো সংরক্ষণ করেছি । হৃদয়ে ছন্দ নিয়ে কাব্য ডিঙিয়ে গল্প থেকে চলে গেলে উপন্যাসে…
— চক্রটা তোমার-আমার বেলায় যে প্রথম এমনটি তো নয় । কালে কালে এভাবেই চলছে, চলবে । কিন্তু…
— তোমার গল্প হলো, উপন্যাস হলো, আমারো গল্প হলো, হলো উপন্যাস অনেক ! কিন্তু গল্পে গল্পে আমাদের উপন্যাস হয়ে ওঠেনি ! তাই না ? অথচ সফল একটা উপন্যাস হতে পারতো !
— কে বললো হয়নি ? এই যে একটা অসমাপ্ত উপন্যাস । তাছাড়া সফল ঔপন্যাসিক হিসেবে এওয়ার্ড কম পেয়েছো !! আজকের উৎসবমুখর সন্ধ্যেটা উপন্যাসের একটা অধ্যায় । এভাবেই অধ্যায় বাড়ছে, এগোচ্ছে জীবনের উপন্যাস ।
— হয়তো আবারো কোনো এক অধ্যায়ে দেখা হবে, কথা হবে, কিন্তু নতুন করে জানা হবে না আরকিছু…
— প্রয়োজন কী !! অসমাপ্ত থাকুক ।
— জীবন ফুরোলে সমাপ্তি টানা হবে…
— মোটেও না । সেখানেও কিছু গল্প যোগ হবে । গল্প কখনো বিয়োগ হয় না ।
— স্বাধীন পাখি তুমি । পালিয়েও আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে আছি তোমার আঁচলে । ইচ্ছে করলে হ্যাপি এন্ডিং দিয়ে আমরা একটা পরিপূর্ণ সফল উপন্যাসের স্রষ্টা হতে পারি । চলো — আবার ছন্দে ছন্দে অন্ত্যমিল জুড়ে শুরু করি নতুন করে, সেই তুমি সেই আমি. ..
— জোর করে আনা ছন্দে অন্ত্যমিল জুড়তে পারাটা কঠিন কিছু নয় । কিন্তু, সেখানে প্রাণ খুঁজে পাবে না । হৃদয়ের তাজা রক্তকে মলাটবন্দী করার বিদ্যায় সিদ্ধহস্ত হলেও মমির সাথে ঘরবসতির বিদ্যা তোমার জানা নেই । হ্যাপি এন্ডিং এর পরের অধ্যায় কেউ না জানলেও একজনের চোখে অনুতাপ, গ্লানি, প্রায়শ্চিত্তের জ্বালা, আর অন্যজনের চোখে ভালোবাসার চেয়ে করুণার ছায়াটাই পরস্পরের নজরে পড়বে কদর্যভাবে ।
— তাহলে.! !
— হুম, অসমাপ্ত থাকুক ।
— জেদী রূপটা অজানা ছিলো !
— অভিনন্দন । মঞ্চে ডাক পড়েছে । এবারো সাহিত্যে সেরা এওয়ার্ড তোমার দখলে ।
— এসো, তোমার হাত থেকে নেবো । নীরবে এ যাবত সবগুলো উৎসর্গ করেছি শুধু তোমাকে । আজ হোক প্রকাশ্যে । অর্ঘ্য গ্রহনে রাজী হও দেবী । মিনতি তোমায়. ..
— হলুদ সংবাদের ভাগীদার করতে চাও ? নাকি একফ্রেমে বাঁধিয়ে ড্রইংরুমের শোভা বাড়াবে ?
— হলুদ সংবাদ সবুজ করার পদ্ধতি আয়ত্ত করে নেবো । কিন্তু একফ্রেমে থেকে সারাজীবন কাটিয়ে দেয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাই না । প্রতিটা উৎসবে, সম্মেলনে চোখদুটো কেবল তোমাকে খুঁজেছে । যদিও গ্রন্থের পরিচিতিতে ছবি না পেয়ে বুঝে নিয়েছিলাম তুমি নিভৃতচারী । আজ আগল খুলে প্রকাশ্যে এলেই যখন. ..
— জীবন্ত মানুষটাকে ফেলে পালিয়ে গিয়ে বেলাশেষে এসে একটুকরো কাগজে কাঁচবন্দী করতে ব্যাকুল ? অদ্ভুত !!
— এসো, প্লিজ —
— একাকিত্বে অভ্যস্ত হয়ে গেছি । ফ্রেমে থাকার ইচ্ছে নেই । যাও, ডাকছে. …