» অ প্রেম

প্রকাশিত: ১৩. জুলাই. ২০১৯ | শনিবার


নাসরিন সিমি

নড়বড়ে খাটে শুয়ে আছে আমিন।মাথার উপর ফ্যান একটা ঘটাং ঘটাং শব্দ করে ঘুরছে ঠিকই কিন্তু ভ্যাপসা গরম কাটছে না। আজ ওর সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সকাল বেলা থেকেই তাই খাটের উপর এপাশ ওপাশ করছে। পাশের রুমটা এই ফ্ল্যাটের রান্নাঘর। সেখান থেকে হাড়ি পাতিলের ঠোকাঠুকির মাত্রাতিরিক্ত শব্দ ভেসে আসছে। মনে মনে বিরক্ত হলেও সহ্য করতে হবে এই শব্দ। অনেক কষ্টে মোটামুটি ভালো রান্না করে এরকম একজন পাচিকা পাওয়া গেছে। চুরি চামারি করছে সে প্রমাণ এখনো মেলেনি। এতোগুলো ভালো গুণের পাশাপাশি বাহুল্য শব্দকারিনী পাচিকা কে তাই আমিন মুখে কিছু বলেনা।
আমিনের হাতে একটা মোবাইল। ফেসবুকে এসে সার্চ করে একটি নির্দিষ্ট আইডি তে ক্লিক করে। আইডি র নাম ফারহা আলম। আমিন একটা ছবির দিকে চোখ রাখে। কি সুন্দর হাসি! কি সুন্দর ভঙ্গিমা! আমিন তাকিয়ে থাকে। পলক পরে না বুকের ভেতর ধুকপুক ধুকপুক শব্দ হয় যেন। আমিনের একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বুকের ভেতর থেকে। মোবাইল ফোনটা ছুড়ে ফেলে খাটের উপর আমিন চোখ বন্ধ করে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে।
আমিন পড়াশোনার পাশাপাশি একটা চেইন শপে কাজ করে। টিউশনির থেকে এই কাজটি করতে ওর বেশি ভালো লাগে। বিভিন্ন ধরণের মানুষের দেখা পাওয়া যায়। কত বিচিত্র মানুষ তার চেয়েও বেশি বিচিত্র তাদের আচার আচরণ ব্যবহার রঙ ঢং কথা বার্তা এসব। আমিন সারাদিন মানুষ দেখে মানুষ। এতো মানুষের মধ্যে তার কাঙ্খিত মানুষ হচ্ছে ফারহা আলম।
ভদ্রমহিলা সপ্তাহে দুই তিনদিন শপে আসে। কখনো কখনো বেশি আবার কখনো এক সপ্তাহ কিংবা দশ দিন পর আসে। আমিন সকালে শপে ঢুকেই মনে মনে কামনা করে আজ যেন ফারহা আলম আসে। যেন অপেক্ষা করে আমিন তার জন্য। কিন্তু কেন এই অপেক্ষা?
ভদ্রমহিলা আমিনের চেয়ে দশ বছরের বড়। শপিং এর মেম্বারশিপ এর ডাটা চেক করে আমিন তার জন্মদিন ফোন নম্বর বিশেষ দিন সব মুখস্থ করে রেখেছে। আমিন তো তার আচরণ সদা সংযত রেখেছে কোনদিন অসৌজন্য কথা তো দূরের কথা শপিং করার সময় আশে পাশেও ঘুরঘুর করেনি।
ফারহা আলম এর কথাবার্তা হাটার ভঙ্গি তার হৃদয়ের মাঝে এক ছন্দময় গতি তুলছে যেন। প্রতিটি পা ফেলার ছন্দ তার নিঃশ্বাস তার চাহনি প্রতিটি মুহুর্তে আমিনের বুকের ভেতর শুধু ঢিপ ঢিপ শব্দ করেছে। আমিন বারবার নিজেকে সতর্ক করেছে। কিন্তু তারপরও কী সে পেরেছে মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে? পারেনি। আমিন এর বুকের মধ্যে কী যেন একটা খচখচ করে। একি দশা! এতো কাউকে বোঝাতে পারার মতো নয় শুধু কারো কাছে প্রকাশ করার ও কোন উপায় নেই । আমিন নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করে কিন্তু পারেনা। আমিন নিজেকে শোধরানোর চেষ্টা করে কিন্তু তাও পারেনা।
আমিন একটা বালিশ টেনে বুকের মধ্যে শক্ত করে চেপে ধরে। চোখ বন্ধ করে ভাবে সে এখন কী করবে?
তার এই আবেগ কী কোন প্রেম? নাকি সর্বনাশ? আমিন ঝট করে খাট থেকে উঠে পরে। গায়ে একটা শার্ট চাপিয়ে বের হয়ে যায় রুম থেকে।
রুম থেকে বের হয়ে হেঁটে হেঁটে সোজাসুজি শপে চলে আসে আমিন।আজ আমিনের সাপ্তাহিক ছুটির দিন। কলিগরা অবাক হয়ে তাকে দেখে।
আমিন, কিরে আজ না তোর ছুটি? সহকর্মী আবিদ জিজ্ঞেস করে।
না এমনি এলাম। একা একা রুমে ভালো লাগছিল না। তোদের সাথে গল্প করতে আসছি।
গল্প করার টাইম নাই। চেয়ারম্যান আসতেছে ভিজিটে। তুই তাড়াতাড়ি ভাগ বলে আবিদ শপের কসমেটিক্স সেকশনে চলে যায়।
আমিন মনে মনে অস্বস্তি বোধ করে। আমিন কিছু না বুঝেই রুম থেকে চলে আসে শপে। মনের মধ্যে ক্ষীণ আশা যদি ফারহা আলম আসে! এক সপ্তাহ আগে এসেছিল সে। গ্রোচারি সেকশনে কেনাকাটা করে চলে গেছিল সেদিন। একা একাই আসে। শুধু ব্যাগ গুলো নেবার সময় ড্রাইভার সাহায্য করে।
একদিন এসেছিল ছেলেকে নিয়ে। হাড় বজ্জাত টাইপের ছেলে একটা। মাম্মি মাম্মি করে একগাদা চিপস চকলেট ট্রলির মধ্যে ভরছিলো। ফারহা কপট রাগ করেও বিরত রাখতে পারছিল না। অবস্থা বুঝে আমিন এগিয়ে গিয়ে বুঝিয়ে সুজিয়ে ঠান্ডা করছিল ছেলেটাকে। সেদিন ফারহা চুপিচুপি আমিনের কাছে এসে ধন্যবাদ জানায়।
আমিনের নাকে তখন জুঁই ফুলের সুবাস ।ফারহাকে সেদিন কোন নারী নয় এক ঝুড়ি জুঁই ফুল মনে হয়েছিল তার।
আমিন আস্তে আস্তে খবর নিয়ে জানতে পারে ফারহা একা ছেলে নিয়ে থাকে। হাজবেন্ড বিদেশে অথবা তাঁর কাছে থেকে আলাদা হয়ে গেছে। আমিন মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু কেন? ফারহা আলম বিবাহিত অবিবাহিত ডিভোর্সি বিধবা যাই হোক না কেন তাতে তাঁর কিছু যায় আসে না। আমিন শুধু ভাবে ফারহা আলম তার স্বপ্নমানষী, তার কল্পনার রানি, তার একমাত্র প্রেম। কিন্তু সে তো এক তরফা। ফারহা আলম ঘূর্ণাক্ষরেও কিছু টের পায়না ,কিছুই জানেনা এমনকি সে বোঝেওনা আমিনের মনের আকূতি। প্রবল বাসনা।
আমিন আস্তে আস্তে দরজার দিকে এগুতে থাকে।
দরজার বাইরে আসতেই মেরুন রঙের একটা নতুন টয়োটা এক্সিও গাড়ি এসে থামে। গাড়িটা দেখে চোখ আটকে যায় আমিনের। মনে মনে আফসোস অথবা আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে এমনি একটা গাড়ি র জন্য। কল্পনায় ভাবে ফারহা তার পাশে বসে আছে গাড়ির ভেতর। আমিন একহাতে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতে ফারহা র হাত ছুঁয়ে দিচ্ছে সযতনে।
ঢিপ করে শব্দ হয় গাড়ির দরজা বন্ধ করার। আমিন সম্বিত ফিরে পেয়ে দেখে ফারহা আলম ও এক ভদ্রলোক গাড়ি থেকে বের হয়ে হেঁটে শপের দিকে আসছে । আমিন হতবিহ্বল হয়ে যায়। ফারহা র পিছু পিছু শপিং মলে ঢোকে। ফারহা আলম ভদ্রলোকের হাত ধরে হাঁটছে। নিচু গলায় ঘনিষ্ঠ হয়ে কি যেন বলছে। দুজনে হাটছে। হাসছে। একজন অন্যজন কে আলতো স্পর্শ করছে। শপের ভেতরের দিকে কিছুটা জনশূন্য। ওরা তো ওদিকটায় যাচ্ছে। আমিনের মনে প্রশ্ন জাগে ফারহা আলম ওদিকটায় কেন যাচ্ছে । ওখানে তো কেনাকাটা করার কিছু নেই। ওখানে কিছু মালামাল জমা করে রাখা শুধু ।ফারহা ওই সুন্দর মতো নীল শার্ট চকচকে জুতা পরা লোকটাকে নিয়ে আড়ালে কেন যাচ্ছে? আমিন হতভম্ব হয়ে যায়। নিজের অজান্তেই চলে যায় ওদের কাছাকাছি।
সেকি ওই যে তাঁরা ঘনিষ্ঠ হয়ে কথা বলছে!
ফারহা তার হাত রেখে আছে ভদ্রলোকের হাত জড়িয়ে!
ভদ্রলোকের গালে হঠাৎ একটা চুমু দিলো ফারহা।
আমিন হতভম্ব হয়ে গেছে দৃশ্যটা দেখে। মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে তাঁর। আস্তে আস্তে মরা মানুষের মতো শপ থেকে বের হয়ে রাস্তায় নেমে আসে আমিন । উদ্দেশ্যহীন ভাবে হেটে চলে রাস্তায়। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় থামে আমিন।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১০১ বার

Share Button

Calendar

July 2019
S M T W T F S
« Jun    
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031