শিরোনামঃ-


» আক্রান্তের সংখ্যা অজানাঃ কার্যকর প্রতিরোধে করণীয় কি?

প্রকাশিত: ২৭. জুন. ২০২০ | শনিবার

খছরু চৌধুরী

বর্তমান সময়ে বৈশ্বক মহামারী কভিড-১৯ প্রতিরোধের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ও কার্যক্রমে সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং ডিজিএইচএসকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় যুক্ত হননি এমন মানুষ দেশে নেই বললে চলে। নানারূপ বিশ্লেষণ সহকারে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিদিনের প্রেস ব্রিফিং-এ ২৪ ঘন্টার মৃত্যু, আক্রান্ত ও সুস্থতার একটা পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসচেতন উদ্বিঘ্ন মানুষেরা প্রতিদিনে করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃতের বেসরকারি পরিসংখ্যানের দিকেও নজর রাখছেন।

জনসাধারণের জন্য স্বাস্থ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা আধুনিক রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ – স্বাস্থ্যসেবা হলো মানুষের মৌলিক মানবাধিকারের একটি। তাই যার যার দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় স্ব-স্ব দেশের সকারের নীতি, আদর্শ ও কর্মকৌশলের ভিত্তিতে স্বাস্থ্যসেবার বাধ্যতামূলক আয়োজন থাকে। আমাদের রাস্ট্র ও সরকারের এই আয়োজনটা কেমন ছিল বা অাছে তা’ এই সময়ে বিচার বিশ্লেষণ করার দাবি রাখে।

দেশে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার সরকারি কার্যক্রম, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যজনবল, সাংগঠনিক কাঠামো, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গবেষণাগার ইত্যাদি সবকিছু কমবেশী থাকার পরেও দেশের জনগণের কি পরিমাণ অংশ ইতিমধ্যে কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়েছেন এবং ভবিষ্যতে কি পরিমাণ আক্রান্ত হতে পারেন, মহামারীর আক্রমনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কি হতে পারে, মহামারীর কোন ষ্টেজ অতিক্রম করছে দেশ – এর সম্ভাব্য কোন ধারণাই সরকার তার জনসাধারণকে অবহিত করতে পারছে না। এটা স্পষ্টত সরকার ও সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতা। এখন কথা হলো, এই ব্যর্থতার কারণ কি? কিছু দিন আগেও দেশের অনেক রতি-মহারতিরা যে ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিকে পৃথিবীর রোল মডেল ব’লে ক’য়ে প্রশংসার ফানুস উড়িয়েছেন, তারাই বা এখন কি বলছেন?

সরকারের উপর মহলের অনেক কথায় কেউ কেউ বিশ্বাস না রাখলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের হেন্ডুল সরকারের হাতে থাকায় এর একটা প্রভাব আমজনতার উপর বর্তাবেই। চীনে কভিড-১৯ যখন ধরা পড়ে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সবাইকে সতর্ক করে। ইউরোপে করোনাভাইরাসের প্রাণঘাতি আক্রমণে সেখানকার সরকারগুলো যখন দিশেহারা তখনও আমাদের দেশের দায়িত্বশীলরা জনগণকে আশ্বস্ত করেছেন। কভিড-১৯ মোকাবেলার পর্যাপ্ত প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। আবার করোনাভাইরাসের গতিপ্রকৃতি না বুঝেই কোন কোনো বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, এই ভাইরাস বাংলাদেশের আবহাওয়ায় সার্ভাইভাল নয়। এসব আশ্বাসের বাণী, আম্বরি হম্বিতম্বি, ভবিষ্যত প্রেডিকশন মিথ্যা প্রমাণ করে আজকের বাংলাদেশে করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতি জনসমক্ষে উন্মোচিত হয়ছে। জন-আতংকের প্রধান বিষয় এখন মহামারী কভিড-১৯!

দক্ষ ও দেশপ্রেমিক আমলাতন্ত্র না থাকলে যে কোন দেশের উন্নয়, জননিরাপত্তা বাধাগ্রস্ত হয়। উন্নয়নের গতি শ্লথ থাকে। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের উপনিবেশিক চরিত্র এখনও বদলায়নি। শোষণের বা জনগণকে বঞ্চিতকরণের মানসিকতা বরং পাকাপোক্ত হয়েছে। ইহার সাথে বণিকি মানসিকতার রাজনৈতিক দূর্বৃত্তরা যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও জঠিল করে তুলেছেন। কভিড-১৯ এর আক্রমণ মোকাবেলায় চোখের সামনে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দিন-রাতের ক্লান্তিহীন পরিশ্রমও আমলাতন্ত্রের মানসিকতায় বিন্দুমাত্র পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ-ই দেখা যাচ্ছে না। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগ এসে প্রমাণ করে দিল, স্বাস্থ্য সেবা বিষয়ে আমলাদের উপস্থাপিত তথ্য উপাত্তে যথেষ্ট গড়মিল। এই গড়মিল দিয়ে তৈরীকৃত উন্নয়নের নানা পরিসংখ্যান যে কোনো সময় সরকারের সুনাম হানির বড় কারণ হতে পারে।

দেশের সংখ্যাগরিষ্ট জনগণের অল্প প্রাপ্তিতে সন্তোষ্ট থাকার স্বভাবের সুযোগ নেয় আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক দূর্বৃত্তের প্রশ্রয়ে থাকা চিকিৎসা বণিকেরা। স্বাস্থ্য প্রশাসনের কার্য-পরিচালন পদ্ধতি চিকিৎসা বাণিজ্যের স্বার্থ রক্ষার কৌশল নিয়েই পথ চলছে। জনস্বাস্থ্যের ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা বিজ্ঞান নির্দেশিত কাজের পদ্ধতি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র পরামর্শ ও জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি – ২০১১ তে উল্লেখ থাকা রোগপ্রতিরোধী স্বাস্থ্য কর্মসূচি গ্রহণে ও রোগপ্রতিরোধের জনবল নিয়োগে অনীহার পরিচয় দিচ্ছেন। শুধু করোনাভাইরাস সৃষ্ট মহামারী নয়, যে কোন রোগের বিস্তৃতি ঠেকাতে হলে প্রথমেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে ইহার প্রতিরোধ কার্যক্রমের উপর। এতবড় একটা দুর্যোগ মোকাবেলার সময়েও মহামারী রোগপ্রতিরোধের উপর সরকারের টাকায় প্রশিক্ষিত ২২০০ মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট (স্যানিটারী ইন্সপেক্টর) কে কাজে না-লাগানোর কারণ কি? এই অব্যবস্থাপনার খবর কি কোনদিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কান পর্যন্ত পৌঁছবে?

একদিকে অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনের তুলনায় রোগী সনাক্ত করণের হার অপ্রতুল, রয়েছে নানাবিধ সীমাবদ্ধতা; অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে জনগোষ্ঠীর মধ্যে সার্বক্ষণিক অবস্থান করা স্বাস্থ্যজনবলের অভাব, মানুষ হাসপাতালে যাওয়ার পথে রাস্তায় মরে যাচ্ছে। তারমানে, আক্রান্তের কোন ষ্ট্যাজে হাসপাতালে যাবে এই স্বাস্থ্যাবস্থার নিয়মটুকুও তাদের জানা নেই। কোয়ারেন্টাইন, আইশোলেশন নামের স্বাস্থ্যবিধিও তারা বুঝতেছে না – এরকম দূর্বিসহ অবস্থায় পতিত হয়েছে দেশ ও জাতি! এর থেকে দ্রুততম সময়ে পরিত্রাণের স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার একমাত্র জরুরী কর্মপদ্ধতি হলো – রোগপ্রতিরোধের কার্যক্রমের উপর প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ২২০০ মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট (স্যানিটারী ইন্সপেক্টর) একসাথে পদায়ন এবং তাদের নেতৃত্বে রোগপ্রতিরোধী কাজের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে প্রয়োজনীয় সংখ্যক লক্ষাধিক স্বেচ্ছাসেবী। (২৭.০৬.২০২০)।

লেখকঃ স্বাধীনতা সেনিটারিয়ান পরিষদের উপদেষ্টা, জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কলামিস্ট।
mkmchowdhury@gmail

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩৮২ বার

Share Button