» মিত্র বাহিনীর সেই মানুষটিকে দিতে পারতাম যদি

প্রকাশিত: ০৩. জুলাই. ২০২০ | শুক্রবার

রোকসানা লেইস

বাংলা মাসের হিসাব অনুযায়ী আজ আমার জন্মদিন। কখনো বাংলা তারিখে জন্মদিন পালন করা হয়নি। যখন জন্মেছিলাম বাংলা, ইংরেজি, আরবী তারিখ এক সাথে ছিল। তারপর এক সাথে খুব পাওয়া যায়নি তাদের। এবার কাছাকাছি এসেছে বাংলা ইংরেজি তারিখ।
একটি মানুষের জন্মদিন নিয়ে আমরা কত হৈ চৈ করি কিন্ত জন্ম দান যে মানুষটি করেন সেই জন্ম দিনে মায়ের কথা কত মনে করি। নিজেকে নিয়ে মানুষ এত ব্যস্ত হয়ে পরে যে জন্মদিন কেবল নিজ কেন্দ্রিক হয়ে যায়। আষাঢ় মাসে বাংলাদেশে জন্ম নেয়া বাচ্চার দেখাশোনা করা কত ঝক্কি ঝামেলার, চিন্তা করে এখন বুঝতে পারি মা এবং নানী কত কষ্ট করেছেন ভেজা ভেজা বৃষ্টির দিনে, সদ্য জন্ম নেয়া এই আমাকে যত্ন করতে।
আজ আমি আমার মাকে খুব বেশি মিস করছি। মা ঠিক মনে রাখতেন প্রতি বছর আমার জন্মদিন। ঠিক রাত বারোটায় মায়ের ফোন পেয়ে মন আনন্দে ভরে উঠত। মা জন্মদিনের উইস করতেন। সেই ভালোবাসা সেই প্রার্থনা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়ে গেলাম দুবছর ধরে। বাবাও ছিলেন খুব আনন্দে জন্মদিন পালন করায়। বাবার খাতায় যত্ন করে লেখা ছিল বাংলা, ইংরেজি, আরবী মাস সন দিন জন্ম সময়গুলো। যখন হলে হোস্টেলে থাকতাম। বাড়ির বাইরে সে সময় বাবা চিঠি লিখেও উইস করতেন। বাবা জানিয়ে দিতেন তোমার জন্মদিন উপলক্ষে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি ব্যাংকে তোমার একাউণ্টে। ভালো করে খাওয়া দাওয়া করো। পোশাক আশাক জিনিসপত্র কিনে টাকা নষ্ট করো না।
ভালো খাবার খেয়ে স্বাস্থ্য যেন ভালো থাকে সে দিকে বাবার খুব মনোযোগ ছিল।
খুব জাকজমক নয় কিন্তু খুব আন্তরিকতায় ঘরোয়া ভাবে সব সময় আমাদের সবার জন্মদিন পালন হতো। খুব ছোটবেলায়, মায়ের কাছে সব সময় জন্মদিন উপলক্ষে আমার আব্দার ,ছিল আমাকে একটা রঙের বাক্স কিনে দিবে?
মা জন্মদিন উপলক্ষে ওয়াটার কালার বক্স কিনে দিতেন আমাকে। আমাদের সেই সময়ে এত কালার পেন্সিল, আর্ট পেপার, স্কেচ খাতা ইত্যাদি ছিল না। চিনতামও না খুব বেশি।
ড্রইং খাতার পাতায় পানির সাথে রঙ মিশিয়ে ছবি আঁকতাম। এক এক সময় বেশি পানি দিয়ে ফেলতাম, তুলির ঘষায় পাতলা কাগজ ছিঁড়ে যেত।
বাবার কাছে সে সময় ওষুধ কোম্পানির সুন্দর সুন্দর ম্যাগাজিন, ক্যালেন্ডার আসত। সেই ম্যাগাজিনের প্রথম এবং শেষের সাদা পাতা আর ক্যালেন্ডারের উল্টা দিকের ভাড়ি ভাড়ি সুন্দর অফসেট পাতাগুলো আমি দখল করতে থাকতাম। সেই ভাড়ি কাগজে ছবি এঁকে শক্ত কার্ড বোর্ড পিছনে আঁঠা দিয়ে সেঁটে ছবিটি চুলের ক্লিপ দিয়ে দেয়ালে ঝুলিয়ে দিতাম। আবার অনেক ছবি বাবার ওষুদের কাঁচের আলমারীর কাঁচের পিছনে লাগিয়ে দিতাম। এখন যেমন ডি আই ওয়াই মানে ডু ইট ইউরসেলফ দেখে অনেক কিছু শিখা যায় আমাদের সময় সেসব কিছু ছিল না। কিন্তু আমার নিজের ভিতর ভাবনাগুলো এসে যেত। এমন উদ্ভাবনি বিষয়গুলো কাজ করত। ডু ইট ইউরসেলফ আমার মনে আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। সেই ভাবনার হাত ধরে সেগুলো নিয়ে যা খুশি তাই করতাম। কখনো বাঁশের কঞ্চি কেটে পুতুল বানাতাম সেলাই করে। কখনো বাঁশ দুই ভাগ করে কেটে রঙ করে তার মধ্যে গাছ ঝুলিয়ে দিতাম। প্রজাপতি ধরে বোর্ডে সাজিয়ে রাখতাম। বিদেশে আসার আগে প্রজাপতি ফ্রেমে বন্দি করে এত দামে বিক্রি হয় আমার জানা ছিল না। অথচ করে ফেলেছিলাম সে কাজ কোন ছোট বেলায় আপন মনে। ফ্রেমে বাঁধালে এখনো সেই সুন্দর সুন্দর প্রজাপতিগুলো থেকে যেত। যা নষ্ট হয়ে গেছে।
একবার একটা ছবি আঁকলাম মা সেই ছবিটি খুব পছন্দ করে ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখলেন। অতি সাধারন আর্ট পেপারের ছবিটা দেশের অতি বৃষ্টির ভ্যাপসা আবহাওয়ায় অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে। তাও ঝুলে আছে এখনো আমাদের বাড়ির দেয়ালে।
বাড়িতে আমার আঁকা ছবি, এবং বড় বড় প্রজাপতি ধরে পিন দিয়ে বোর্ডে সেঁটে দিয়ে সাজিয়ে রাখায় কেউ কোন দিন বাঁধা দেননি। খুলে ফেলে দেননি। এখন মাঝে মাঝে ভাবি বাড়ির কেউ কেন, আমার এই সব কাজের দিকে মনোযোগ দিয়ে তখন আমাকে আর্ট কলেজে ভর্তি করে দিলেন না, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর কথা না ভেবে।
আজকালকার বাচ্চারা অনেকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়। এবং অভিভাবক যখন সে সিদ্ধান্ত মেনে নেন তাতে ভালো ছাড়া মন্দ হয় না। কারণ একটা মানুষ তার নিজের সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানে। তবে অনেক অভিভাবক এখনো বাচ্চাদের কথার মূল্য দেন না। ওরা বাচ্চা কি জানে। ওদের আমাদের কথা শুনতে হবে। এই অভিভাবক সুলভ চিন্তায় অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়ে যায়।
জোড় করে কিছু পড়াতে দিয়ে বাচ্চাদের আগ্রহ নষ্ট হয়ে যায়। আমাদের সময়ে আমরা নিজেদের মতামত কখনো দিতাম না বাবা মার উপরে। ভালো না লাগলেও ইচ্ছা না হলেও মেনে নিতাম। তারা ভালো করছেন ভেবে। আমাদের ভাবনার খেইও খুব সীমিত ছিল সেই সময়। এখনকার মতন অনেক কিছু জানার সুযোগ আমাদের ছিল না। আর্ট শিখার জন্য আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়া যায় বিষয়টা মনে হয় স্কুল পাশ করা সময়ে আমার জানা ছিল না। আবার মনে হয় আর্ট কলেজে ভর্তি না হওয়াটাও ভালো হয়েছে। সে অন্য গল্প আরেকদিন হবে।
সেই যে কিছু বানানোর ইচ্ছা, আঁকার ইচছা মনের মধ্যে ছিল এখনো তেমনই আছে। সুযোগ হলেই ভাঙ্গা ফেলে দেয়া এটা সেটা জোড়া দিয়ে নতুন কিছু করতে আমার খুবই ভালোলাগে। এখনও ছবি আঁকি।
নিজের মতন কিছু করায় ব্যাস্ত থাকি সব সময়। একটা ছবি আঁকলাম একটা ঝুড়ি বানালাম আজ।
বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হলো ইণ্ডিয়ান আর্মি শহরে। একদিন তাদের বাসায় দাওয়াত করা হলো। একজন শিখ মেজর ঘুরে ঘুরে ঘরে সাজানো আমার ছবি গুলো দেখছিলেন। তারপর বললেন, তুমি আমাকে এমন একটা ছবি এঁকে দিতে পারবে খুকি।
যে ছবিটা তিনি পছন্দ করেছিলেন, সেটা নিয়ে যেতে বলেছিলাম। কিন্তু তিনি নতুন এঁকে দিতে বলেছিলেন। যুদ্ধের সেই মাসগুলো পেরিয়ে শেষে সে সময় আমার কাছে রঙ ছিল না।
এখনো ইচ্ছা করে একটা ছবি এঁকে মিত্র বাহিনীর সেই মানুষটিকে দিতে পারতাম যদি।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৮১ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031