আবার পরাজিত হলো ফতোয়াবাজেরা

প্রকাশিত: ১:৩১ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৫, ২০১৯

আবার পরাজিত হলো ফতোয়াবাজেরা

আবার পরাজিত হলো ফতোয়াবাজেরা ।বিভিন্ন ওয়াজে ধর্মসভায় এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেও তারা ব্যবহার করেছিল পহেলা বৈশাখ পালন ও বর্ষবরণের বিরুদ্ধে । বলেছিল , পহেলা বৈশাখ পালন “ইসলাম বিরোধী ” ।বর্ষবরণের শোভাযাত্রা “জানোয়ারের মিছিল “। “মঙ্গল শোভাযাত্রা” নামকরণ করা হয়েছে হিন্দুদের লক্ষী দেবীর কাছ থেকে । তাই শোভাযাত্রায় লক্ষী দেবীর বাহন পেঁচার ছবি দেখা যায় । কিন্তু এ সব উদ্ভট যুক্তিতে কাজ হয় নি । এ দেশের আশি ভাগ সংখ্যাগুরু ও বিশ ভাগ সংখ্যালঘুর সমন্বয়ে শতভাগ বাঙালির অংশ গ্রহণে জাঁকজমকের সঙ্গে সারা দেশে পালিত হয়েছে বর্ষবরণ উৎসব । প্রমাণ হয়েছে , দেশের বেশির ভাগ মানুষ এই ফতোয়াবাজদের কথা সমর্থন করেন না । অবশ্যই এ সব ফতোয়াবাজদের বক্তব্য দেশের সকল আলেম ওলামাদের বক্তব্য নয় । যদি তাই হতো, তাহলে “মঙ্গল শোভাযাত্রা” এতো দীর্ঘ হতো না । এই ফতোয়াবাজদের কথা শুনলে এ দেশে ভাষা আন্দোলন হতো না । রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ হতেন । মুক্তিযুদ্ধ বলে কিছু হতোনা । একুশে ফেব্রুয়ারীর প্রভাত ফেরীকে তারা একই ভাবে “হিন্দু সংস্কৃতি ” বলে আখ্যায়িত করেছিল । মানবতা বিরোধী হিসেবে অভিযুক্ত সাঈদী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে “অপরাজেয় বাংলা ” নামে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যকে নিয়ে একবার এক ওয়াজে বলেছিল “শয়তানের মূর্তি “। কিন্তু আমরা জানি, প্রভাত ফেরি শোকের র‍্যালি । সেটা ধর্মীয় কোন ব্যাপার নয় । ভাস্কর্য আর মূর্তির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে । “মঙ্গল শোভাযাত্রা” নিছক বিনোদন ।এর সঙ্গে লক্ষী পুজার কোন সম্পর্ক নেই । নেই যে, সেটা তারাও জানেন । শুধু ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চান । দু দিন আগে ফতোয়াবাজদের সমর্থনে ফেসবুকে দীর্ঘ লেখা লিখেছিলেন মুনিম সিদ্দিকী । রেডটাইমসে বিনয়ের সঙ্গে তার লেখার কিছু জবাব দেয়া হয়েছিল । বর্ষবরণ উৎসব দেখে নিজেই এবার কলম ধরেছেন ফতোয়াবাজদের বিরুদ্ধে । রেডটাইমসের পাঠকদের জন্য তার ফেসবুকের লেখাটি এখানে প্রকাশ করা হলো । তিনি লিখেছেন,
“বাঙালি মুসলিমদের যারা পহেলা বৈশাখ পালন করাকে হারাম দাবি করছেন, তাদের দাবির পক্ষে তারা নিচের উল্লেখিত দলিল/যুক্তিগুলো প্রধানত উপস্থাপন করেন।

“যে ব্যক্তি অন্য ধর্মের সাথে সাদৃশ্য রাখে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।”

আল্লাহ দুই ঈদ মুসলিমদেরকে দিয়েছেন, এর বাইরে কোন উৎসব করা যাবেনা,

জীবন যাপনের জন্য ইসলামের বাইরে যাবার দরকার নেই।

আমার বিশ্বাস যারা উপরের যুক্তি আর নির্দেশনা দেখিয়ে পহেলা বৈশাখকে হারাম ঘোষণা করছেন, তারা মূলত ইসলামের মুল স্প্রিট অনুধাবন করতে সক্ষম হচ্ছেনা। তারা আল কোরান আর হাদিসের এই নির্দেশনাকে সঠিকভাবে তাদের হৃদয়ে অনুধাবন করতে পারছেননা, এরা রব শুনেই চিলে নিলো চিলে নিলো বলে দৌড়াছেন।

ইসলাম আরব দেশে, আরবী ভাষায়, আরবী ভাষাভাষী মানুষের মাঝে শুরু হলেও ইসলামকে এমন একটি জীবন ব্যবস্থা হিসাবে সমগ্র মানব জাতির উপযোগী করে আল্লাহ পাঠিয়েছেন । ইসলামের চরিত্র বিশ্বজনীন, আন্তর্জাতিকতাময় রাখার জন্য ইসলামের বিধানগুলো কোনটাই কোনো ভৌগোলিক সীমার দ্বারা আবদ্ধ করে রাখা হয়নি।

আল্লাহই পৃথিবীকে নানা ভাগে, নানা ভৌগলিক, নানা আবহাওয়া, নানা বর্ণে সৃষ্টি করেছেন।

প্রতিটি জনপদের বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক মানুষের একটি নিজস্ব সংস্কৃতি থাকে । যা তাদের ভৌগোলিক আবহাওয়া এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এই সংস্কৃতি একদিনে গড়ে উঠেনি, বরং হাজার বছরের ক্রমবিবর্তনে গড়ে উঠেছে।

এখানেই ইসলামের বিশেষত্ব, সে অন্যান্য ধর্মের মতো বিশেষ অঞ্চলের সংস্কৃতি অন্য অঞ্চলের ওপর চাপিয়ে দেয় নি।

তেমনি কোন আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে নিষিদ্ধ করে নি।

ইসলাম বিভিন্ন জাতির আঞ্চলিক উৎসবকে হারাম ঘোষণা করেনি , ইসলাম হারাম ঘোষণা করেছে কেবল অশ্লীলতা, অন্যায়, অপচয় ও আল্লাহর নাফারমানিকে।

সে দৃষ্টিকোণ থেকে যখন থেকে চালু হোকনা কেন? ‘নবান্ন উৎসব বা পহেলা বৈশাখ’ এর উৎসব শরিয়ত পরিপন্থি হবার কথা নয়।

কেন শরিয়ত পরিপন্থী নয় বলে মনে করি? কারণ আমরা ইতিহাস থেকে জেনেছি এটা কোন বিধর্মীয় উৎস থেকে উৎপত্তি হয় নি।

হ্যা অন্যদের মতো এটাকে সরাসরি হারাম মেনে নিতাম যদি কোন অমুসলিম বা কাফেরদের ধর্মের উৎসব হত।

রাসূল (সা.) যে বলেছেন- “যে ব্যক্তি অন্য ধর্মের সাথে সাদৃশ্য রাখে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।”

এই নির্দেশ তখন কার্যকরী হতো যদি কাফেরদের ধর্ম থেকে এই উৎসব গ্রহণ করা হতো।

কিন্তু ইতিহাস আমাদেরকে তা বলেনা, এই নববর্ষ ভারতে পালন করা মোগলরা শুরু করেছিল। এই নববর্ষ পালন নিছক জাতিগত প্রথা ছাড়া আর কিছু নয় ।

তবে উৎসবের মধ্যে অশ্লীলতা, অন্যায়, অপচয় ও আল্লাহর নাফারমানি হয় সেসবকে অবশ্যই মুসলিমদের জন্য হারাম হিসাবে গণ্য হবে।

কেননা কোন মুসলিম এমন কাজ সমর্থন করতে পারেনা যা দ্বারা মানব সমাজে অশান্তি ডেকে আনবে।

যারা বাংলা নববর্ষ উদযাপনকে হারাম বলছেন, তাদেরকে এই বাস্তবতা বুঝতে হবে যে,
একজন বাংলাদেশী মানুষ বাংলায় কথা বলবে, বাঙ্গালি খাবার খাবে এবং দেশীয় বাঙ্গালি পোশাক পরিধান করবে, বাংলার উৎসব পালন করবে এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। এইটি তাদের জীবন যাপনের আনুসাঙ্গিক বিষয়, এইসবকে সে উপেক্ষা করতে পারবেনা।

যেমন করে রাসুল সাঃ ও সাহাবীগণ আরব দেশে জন্মগ্রহণ করেছেন বলেই তারা ‘আরবী ভাষায় কথা বলা, আচার-আচরণ, রুচি-অভিরুচি, খদ্যাভ্যাস এবং আরবীয় লম্বা (জুব্বা) পোশাক’ পরিধান করতেন। তাদের এসব কালচারের সঙ্গে ইসলামের আকিদাহগত কোন সম্পর্ক নেই।

শরিয়তের মানদণ্ডে পহেলা বৈশাখকে : বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি বুঝতে হবে “কৃষি সংস্কৃতি” হিসাবে বুঝতে হবে । পালন করলে গুণাহ হবেনা, না পালন করলেও ফায়দা হাসিল হবেনা।

এদেশ কৃষি প্রধান দেশ। ৮০ ভাগ মানুষ কৃষির সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। কৃষকরা ধর্মে কেউ মুসলিম, কেউ হিন্দু, কেউ উপজাতি বা অন্য ধর্মের অনুসারী বা নাস্তিক, তাদের যার ধর্ম বিশ্বাস যা থেকে না কেন, তাদের সকলের জীবনের আনন্দ, বেদনা, উৎসব, আশা-নিরাশার সঙ্গে “ফসল ও ফসলী ” বছরের একসুত্রে গাঁথা থাকবে এটা স্বাভাবিক, যারা পহেলা বৈশাখকে হারাম দাবি করেন, তাদেরকে বাংলাদেশের মানুষের পরস্পর সামাজিক বন্ধনের এই বাস্তবতা বুঝতে হবে।

চৈত্রসংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ, নবান্ন উৎসব ইত্যাদি কৃষি নির্ভর বাঙালির জীবনযাত্রার মানদণ্ড। এইসবকে ইসলাম যদি হারাম বলে, তাহলে ইসলামের বিশ্বজনীন, আন্তর্জাতিক গুণাবলী যে দাবি করা হয়, সে দাবি সঠিক হবেনা।।

এরজন্য আমি সব সময় দাবি করে আসছি বর্তমান পহেলা বৈশাখ পালনের যে আয়োজন করা হচ্ছে, সেসবের মধ্যে ইসলাম বিরোধী অপচয়, অশ্লীলতা, আর অংশিবাদীতা মুলক যে সব উপাদান আছে সেগুলোকে পরিহার করে, এই অনুষ্ঠান উৎসবকে এমন ভাবে সাজাতে হবে যাতে করে এদেশের বৃহত্তম সংখ্যাগুরু মানুষ নিঃসন্দেহে অংশ নিতে পারে।

এদেশ শুধু মুসলিমদের নয়, এদেশ শুধু বাঙলাভাষাভাষীদের নয়। এদেশ শুধু ধনীদের নয়, এদেশ শুধু সুশীলদের নয়, কাজেই এদেশের প্রত্যেকটি মানুষের যেন মিলনমেলা হয় এই বৈশাখী উদযাপন সেদিকে দেশ পরিচালকদের দৃষ্টি রাখতে হবে।

Calendar

December 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

http://jugapath.com