শিরোনামঃ-


» আমাকে আমার মতো থাকতে দাও

প্রকাশিত: ১৬. আগস্ট. ২০২০ | রবিবার

সৌমিত্র দেব

রাজধানী ঢাকা শহরে আমার কিছু পরিচিতি হয়েছে । কবি , সাংবাদিক , চলচ্চিত্র অভিনেতা, ব্যবসায়ী নানা পরিচয়ে মানুষ আমাকে চেনেন । কিন্তু আমার এলাকায় এবং আপনজনদের কাছে আমি অস্বাভাবিক একজন মানুষ । অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ।
আমি বেড়ে উঠেছি মৌলভীবাজার শহরে । সেখানকার সরকারি স্কুল ও কলেজে আমি লেখাপড়া করেছি ।কিন্তু জ্ঞান তৃষ্ণা ও বাইরের বই পড়ার আগ্রহ আমাকে সবসময় পাঠ্য বইয়ের বাইরে নিয়ে গেছে । তাই সহপাঠীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকলেও চলাফেরা ছিল একটু সিনিয়রদের সঙ্গে ।
১৯৯৩ সালে আমি সেখানে একটা বইয়ের দোকান করি । শুধুমাত্র সৃজনশীল বই নিয়ে এ রকম অভিনব দোকান এই শহরের মানুষ এর আগে দেখে নি । আহমদ ম্যানসনে উৎসর্গ নামের সেই বইয়ের দোকানের জন্য জনতা ব্যাংক থেকে একটা ঋণ ও নিয়েছিলাম । অস্বাভাবিক মানুষ বলেই হয় তো সময় শেষ হবার আগেই সেই ঋণ পরিশোধ করি । অনাড়ম্বর সেই দোকানে শুধু বই বিক্রি হতো না, শিল্প, সাহিত্য , রাজনীতি নিয়ে আড্ডাও হতো । সেই উৎসর্গ এখন ইতিহাস । জীবিকার সন্ধানে রাজধানিতে চলে আসতে গিয়ে আমার সেই দোকান আমার এক আপন জনের কাছে হস্তান্তর করি । তিনি খুব স্বাভাবিক মানুষ । প্রথমেই বইয়ের দোকানকে কাপড়ের দোকান বানান । ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা আর ফেরত না দেবার কথা ভাবেন । এক পর্যায়ে তিনি ঋণখেলাপি হন এবং দোকানের নাম ও নিশানা মুছে দেন ।

২০০৩ সালে আমি পাকাপাকি ঢাকা চলে আসি । প্রথাগত কোন চাকরি বা ব্যবসা নয় , সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেই । সাংবাদিকতা ও মিডিয়া স্টাডিজে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়েও আমি জেনেছি আমার বিদ্যা বুদ্ধিতে অনেক ঘাটতি আছে । আর সে কারণেই আমার পড়াশোনা এখনো শেষ হয় নি । প্রতিনিয়ত মিডিয়ার নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করি । আমার সঙ্গে কাজ করে কতজন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছে । কিন্তু সাংবাদিকতা করতে গিয়ে আমি কখনোই আমার অস্বাভাবিক নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হই নি ।

২০০৫ সালে একটি সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিতে আমেরিকায় যাই । সবাই ভাবেন , এবার বোধ হয় আমি স্বাভাবিক মানুষ হবো । রয়ে যাবো আমেরিকায় । কিন্তু তাদের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে আমি ফিরে আসি যথাসময়ে । আমার ব্যক্তিগত লাভের জন্য আমি নিজের দেশকে অন্যদেশের দূতাবাসের কাছে ছোট করতে চাই নি । আমার একটা ভুলের মাশুল যেন পরবর্তী কালে এদেশের কোন কবিকে দিতে না হয় সে ব্যাপারে আমি সচেতন ছিলাম ।

২০১৫ সালে আমি মৌলভীবাজার পৌরসভায় মেয়র পদে নির্বাচন করি । আমার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা বড় দলের মনোনয়ন নেন । কোটি টাকা খরচ করেন । আর আমি একটি বামপন্থী দলের মনোনয়ন নিয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াই । মৌলভীবাজার শহর উন্নয়নের রূপরেখা সহ ইশতেহার প্রকাশ করি । নিজে শতভাগ নিয়ম মেনে চলেছি ।বড়দলের প্রার্থীদের অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি । নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছি লিখিতভাবে । আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি টাকা বা দল দেখে নয়, মানুষ আমার ইশতেহার দেখে ও বক্তব্য শুনে আমাকে ভোট দিয়েছে । হঠাত নির্বাচনে দাড়িয়ে অনেক ভোট পেয়ে যাবো, এমন নির্বোধ স্বপ্ন আমার ছিল না । তাই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছি । আমার উদ্দেশ্য মৌলভীবাজারের উন্নয়ন । সেই লক্ষ্যে বিজয়ী মেয়রকে সহযোগিতা করেছি । শহরে রাস্তা প্রশস্ত করার জন্য নিজের বাড়ির দেয়াল ভেঙ্গে পৌরসভাকে ভূমি দান করেছি ।

২০১৯ সালে নিজের বাসাতেই সৈয়দ মুজতবা আলীর নামে পাঠাগার ও গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলি । অর্থের অভাবে এখনো সেই পাঠাগারকে আমার স্বপ্নের মডেলে রূপান্তর করতে পারি নি । কিছুদিন আগে ঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমার বাসাটি আরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । করোনা কালের কারণে আমি এখনো সেটা নিজের চোখে দেখতে পারি নি । সময় আবার অনুকুলে এলে অবশ্যই পাঠাগারকে তার আপন চেহারায় উদ্ভাসিত করবো । আপাতত ওই ভগ্নস্তুপটিই বাস্তবতা ।এর উদ্যোক্তা হিসেবে আমাকে কেউ অস্বাভাবিক মানুষ ভাবলে আমার তো কিছুই করার নেই ।

নিজে যথেষ্ট বিত্তবান না হয়েও এলাকার অসহায় গরিব দু;;খীর পাশে দাঁড়াই । শীত কালে শীত বস্ত্র নিয়ে যাই । পবিত্র রমজান মাসে ইফতার সামগ্রী তুলে দেই নিরন্নের হাতে । গরিব শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেই শিক্ষা উপকরণ । এই দেশ ও দেশের মানুষ আমাকে কখনো শুন্য হাতে ফিরিয়ে দেয় নি । আমিও তাই কাউকে ফেরাতে চাই না। আমার সঙ্গে কেউ অপরাধ করলে আমি তাকে বারবার সংশোধনের সুযোগ দেই । এ জন্য কেউ কেউ আমাকে পাগল ভাবেন । তাতে কি আসে যায় । আমি তো যুক্তির বাইরে কিছু করি না ।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৩৯ বার

Share Button