» আমাদের সেই শারমিন

প্রকাশিত: ০৯. ফেব্রুয়ারি. ২০১৯ | শনিবার

জাহান রিমা
সুন্দর করে কথা বলাও যে একটা প্রফেশন হতে পারে সেই প্রথম ধারনাটি পাই। চাকরীটা পায় শারমিন আক্তার। ছবির এই মেয়েটা। চাকরীর ক্ষেত্রটা তৈরী করে দেয় আম্মু। আম্মুর তখন নতুন চেম্বার। নতুন সব মানুষের আসা যাওয়া। এদিকে চেম্বার নতুন হওয়াতে অল্প মানুষের আনাগোনা। তাও আবার মফস্বলের আরেক শহরে। তাই বিষয়টা হয় আম্মুকে সঙ্গ দেয়াও।

শারমিন স্কুলের শেষে বিকেলের সময়টা আম্মুর সাথে থাকে এসিসটেন্ট হয়ে। শারমিনকে ওদের বাড়ি থেকে আম্মু নিয়ে যেতো। আবার দিয়েও আসতো। মানুষ আসলে তাদের সাথে সুন্দর করে কথা বলতে হবে। সুন্দর করে বসতে বলতে হবে। অপেক্ষা করতে হলে কেন অপেক্ষা করতে হচ্ছে গুছিয়ে বলতে হবে। এই হলো তার কাজ। প্রতি শুক্রবার। এমন করেই শারমিন নামের মেয়েটার সাথে আমাদের পরিচয়।

শারমিন যে বয়স থেকে চাকরী জীবন শুরু করেছে সেই সময়টাতে আমরা, মানে আমি আর রীপা গরমের দিনে চুপিচুপি পানিতে ডুব দিয়ে বসে থাকা পাবলিক। ৯৪ সালে জন্ম নেয়া শারমিন আমাদের ৪বছরের ছোট। তবুও কেমন করে যেন শারমিন আসার পরের সময় গুলো মিলে যেতো খেলাধুলাতে। অতিরিক্ত হাইপার হলে নাচও করতাম আমরা। শারমিন গাইতো। আম্মু সেবার রাস্তা দিয়ে আসার সময় চলন্ত রিকশা থেকে ক্যাসেটের কী একটা গান শুনলেন ভাসা ভাসা করে। রিকশা থামিয়ে সেই ক্যাসেট নিয়ে আসলেন বাসায়। শারমিনের সব গান মুখস্থ সেই ক্যাসেটের!

কিন্তু শারমিনের পথচলা সহজ ছিল না, আমাদের মতো। শারমিন যেখানে থাকতো, সেই জায়গাতে পড়ালেখা করে নষ্ট হয় মানুষে- সেই মনোভাবের। শারমিনের আত্মীয় স্বজনরা অনেককিছু, কিন্তু বাবার কর্মবিমুখতার কারনে শারমিনদের তেমন কিছুই নেই সেটাই যেন শারমিনের অপরাধ। এমন অপরাধ নিয়ে শারমিন কেন স্কুল কলেজে পড়বে, এমন অপরাধ নিয়ে শারমিন কেন স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান গুলোতে এটেন্ড করে পুরষ্কার জিতবে, এমন অপরাধ নিয়ে শারমিন কেন পোশাক পরিচ্ছেদে শতভাগ কেয়ারফুল হবে, সর্বোপরি এমন অপরাধ নিয়ে শারমিন কেন ‘শারমিন’ হবে, যাকে তার নামেই সবাই চিনবে। এই ছিল শারমিনের বসবাস করা সেই ছোট্ট পৃথিবীর অবস্থান।

কিন্তু এটা তো শারমিন। আমাদের শারমিন! সন্দ্বীপ নামের ছোট্ট এক দ্বীপের ছোট্ট পরিসরে জন্মগ্রহণ করা পদ্মফুল। থাকার জায়গাটা হয়তো বা সুবিধার না বড়, কিন্তু তাই বলে কি সুবাস ছড়াবে না সে? দিনশেষে সে’ ফুলই তো…তাই বলে সব ফুল কি আর ফ্লাওয়ার ভ্যাসের আদর পায়? পায় না। আমার ধারনা পৃথিবীর আরো অনেক রকমের সুন্দর ফুলেরা এখনো অনাবিষ্কৃত।

আবিষ্কারক খুঁজে পাওয়ার ততোদিনে আমরা একটু একটু করে ভ্রু প্লাক করার মতো বড়। শারমিনও বড় হয়েছে। প্রতিদিন দূরের স্কুলে হেঁটে হেঁটে গিয়ে পড়ালেখাও শেষ করেছে। যোগাযোগ বলতে মাঝে মাঝে ফোন করে বলে; মনিআপু আপনাদের জন্য মাঝে মাঝে কইল্লা জ্বলে। সন্দ্বীপ আসবেন না?

আমরাও ততোদিনে আর সন্দ্বীপ থাকিনা। তবু বছরে একবার তো সন্দ্বীপ যাই। তেমনই একবার। সমস্ত সন্দ্বীপ সন্দ্বীপ বিউটি পার্লার হয়ে গেছে। কী কৌতূহল সবার! গ্রামের জন্য এটা একটা বিরাট ব্যাপার। কারন এই দ্বীপে তখনো কোন পার্লার নেই। ক্লাব নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ও নেই।

দুই একজন থেকে তথ্য নিই। তারপর ব্যাপক আনন্দ নিয়ে আমি সেই পার্লারে যাই। কাজ কী! ভ্রু প্লাক। সামনের একজন বললো, বসুন চেয়ারটাতে। বসলাম। চারদিকে একটু চোখও বুলিয়ে নিলাম। চারদিকে আয়না রাখা আছে। শহরের পার্লার গুলোর আদলে সাজাবার চেষ্টা করা হয়েছে। হুবহু করতে গিয়ে আনাড়ি বিষয়টা স্পষ্ট হওয়াতে একটু হাসিও পেয়েছে। তবুও তো সন্দ্বীপের একমাত্র পার্লার! আমাদের তো আর রহস্যের শেষ নাই। হঠাৎ দেখলাম কিছুই চোখে দেখছি না আমি। চারদিকে শুধুই অন্ধকার। শুধুই অন্ধকার। পেছন থেকে কে যেন দুইহাত দিয়ে আমার দুই চোখ চেপে ধরে আছে জোরে। আর উচ্চস্বরে বলছে; চোখ খুলবো না। চোখ খুলবো না। চোখ খুলবো না! বলেন তো আমি কে!!? বিস্মিত আমি সেই কন্ঠস্বরের সাথে, উত্তেজনায় কাঁপা হাতটা খপ করে ধরে বলছি: চোখ খোল শারমিন!!!

শারমিন। আমাদের শারমিন। যে সাহস আমরা করতে পারিনি। সেই সাহস নিয়ে সে সন্দ্বীপের প্রথম পার্লারে। তারপর? তারপর কেমন করে, কি করে করলো সব বললো শারমিন। বললো মনিআপু, মানুষে নানান কথা বলে। পার্লার হওয়াতে নাকি সন্দ্বীপের মেয়েরা নষ্ট হয়ে যাবে! আমি সেইসব মানুষদের জন্য মুখভর্তি বদ কথা আর ভ্রু ভর্তি সৌন্দর্য সচেতনতা নিয়ে গল্প শেষ করি। ফেরার সময়ে বিল দিব। নাহ, তিনি তা নিবেন না। কোনভাবেই না! সেই ছোট্টবেলার মতো একটু শাসন করে বললাম। ঢং কম কর। এটা বিজনেস। তোর সাথে আরো মানুষও আছে। এখানে স্বজনপ্রীতি সুন্দর দেখায় না।

এই হলো শারমিন। আমাদের শারমিন। পৃথিবীর যে প্রান্ত থেকেই ‘শারমিন’ নাম উচ্চারিত হয়, আমরা বলি-কোন শারমিন? আমাদের শারমিন? মন ওর সবসময়ই এমন তুলতুলে। অনেক বড় মনের মেয়ে সে। তাই আমাদের সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ, তার কিছুই কিন্তু সুন্দর বলা যাবেনা। সোজা দিয়ে দিবে সে! আর্থিক অসঙ্গতি নিয়ে বড় মনের মানুষ হওয়াটা বিপদের কথা বড়। এই মেয়ে সেরকম। বড় বিপদের! আমরা বলি; শারমিন তোর মন এতো নরম কেন? এমন বললেও অস্থির আর আবেগপ্রবণ হয়ে বলবে; কিছুই তো নাই মনিআপু। কলিজাটা আছে। দোঁপেয়াজা করে দিই!

এই মেয়ে এমন। শারমিন। আমাদের সেই শারমিন…এক ক্যাসেটের সব গান ঠোঁটস্থ মুখস্থ করে ফেলা শারমিন। যে সমাজ পার্লার হয়ে যাওয়াকে ‘শেষ শেষ সব শেষ’ রব তুলে ফেলে সেখান থেকে উঠে এসে গায়িকা হয়েছে। হ্যাঁ! ঠিকই শুনছেন গান করে সে। চট্টগ্রাম শহরের অভিজাত সব অনুষ্ঠানে গানের মানুষ হিসেবে বিশেষ সম্মান পায় সে। সম্মানি পায় সে। স্বরের রানী সে। এই স্বরের রানী..মাঝে মাঝে মাঝরাতে আমাকে কল দেয়। কথা বলেনা। শুধু ভিডিওটা অন করা থাকে। আমি দেখি। আমাদের শারমিন গান করছে। সামনে থাকা অসংখ্য মানুষ ওয়ান মোর..ওয়ান মোর বলে চিল্লাচ্ছে। আমি এই দৃশ্য দেখে শৈশবের সেই দৃশ্যের মতো টুপ করে ডুব দিই পানিতে। কী যে শান্তির সেই পানি! কী যে শান্তির এই গরমের দিনে গোসল। কী যে গর্বের। কী যে সংগ্রামের শারমিনের এই একার পথ চলা। ডুবুরী ছাড়া কেইবা আর বুঝবে আত্মবিশ্বাসী পদ্মফুলের কেমন করে এমন আত্মনির্ভরশীলতার স্বকীয় সৌন্দর্যে ফুটে থাকা..

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৭৩ বার

Share Button

Calendar

February 2019
S M T W T F S
« Jan    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
2425262728