» আমার চোখে দেখা হাবিবুর রহমান আবু

প্রকাশিত: ১০. অক্টোবর. ২০২০ | শনিবার

 

জাহিদ ইমতিয়াজ

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবু ভাই সম্পর্কে অনেক স্মৃতি আজ একে একে মনে পড়ছে। কোনটা লিখবো তাই ভাবছি। উনাকে নিয়ে লিখার সক্ষমতাও আমার নেই।
তিনি ছিলেন মানুষ গড়ার কারিগর একজন কথাশিল্পী । বাংলা অথবা ইংরেজি দুটি ভাষাতেই তাঁর ছিল সমান সক্ষমতা ও পারদর্শিতা । সে যেনো এক অন্য রকম মুন্সিয়ানা। তিনি ছিলেন প্রত্যুৎপন্নমতিতে সব্যসাচী, শৃঙ্খলার আঁধার। তিনি ছিলেন ধারাভাষ্যকার একজন আম্পায়ার।
ধৈর্যশীল ও অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে অনেক বাঁধা-বিপত্তিতে এগিয়ে গেছেন। মৌলভীবাজারের তখনকার দিনে সাহিত্য- সংস্কৃতি ও ক্রীড়াঙ্গনকে করেছেন সমৃদ্ধ। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন অনেক ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে, আর আমিও ছিলাম তার মধ্যে একজন। আজ সামান্য হলেও বাংলা অথবা ইংরেজি শিখতে পেরেছি সেটা শুধুই তার জন্য। কোনো ধরণের উপঢৌকন নেননি, কোন কিছুই দিতে পারিনি। বড় বেশি কৃতজ্ঞতার জালে আমাদেরকে জড়িয়ে তিনি চলে গেলেন। আমার মনে আছে তিনি আমার ছোট্ট বেলায় রসিকতা ও গল্পের ছলে ইংরেজিতে ‘E’ অক্ষর সপ্তাহে দুইবার আসে কিন্তু বছর এ একবার আসে সেটা মনে রাখতে বলতেন, তখন বুঝিনি যেমন সপ্তাহ বা Week এ E দুইবার আর বছর বা Year এ E একবার ইউজ হতো।
তিনি ছিলেন উপস্থাপক, একটা অনুষ্ঠান কিভাবে সঞ্চালন করতে হয় তিনি জানতেন। অনুষ্ঠান ইনডোর হোক আর আউটডোর হোক, তিনি ছিলেন একজন সফল আয়োজক। অনেক সংস্থার সাথে তিনি জড়িত ছিলেন। ‘পারস্পরিক’ নামের একটি শিক্ষামূলক সৃজনশীল প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। দুইযুগ আগেই তিনি এই রকম প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়েছেন অথবা বীজ বপন করেছিলেন তা আজো বহমান । তিনি ছিলেন সাংবাদিক।
সাহিত্য-সংষ্কৃতিতে তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম। মৌলভীবাজারে তখনকার সময়ের ‘মুক্তকথা’ নামের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার জন্ম দিয়েছিলেন, যা তখনকার সময় সত্য প্রকাশে ছিলো অকুতোভয় । কবিতা আবৃত্তি ও নাট্য আন্দোলনের পথিকৃৎ ছিলেন তিনি।
খেলোয়াড় ছিলেন না কিন্তু খেলোয়াড়দের করেছেন উদ্বুদ্ধ, দিয়েছেন বাড়তি শক্তি এগিয়ে চলার। তিনি ছিলেন একজন ক্রীড়ামোদী। অতন্ত্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকতেন খেলার মাঠে। দায়িত্ব পালন করেছেন একজন দক্ষ আম্পায়ার হিসেবে। আর মাইক্রোফোন যখনই তার হাতে আসতো তখন কথার ফুলঝুরি যেন ফুটতো ক্ষিপ্রগতিতে। ভাষা প্রয়োগ আর শব্দ চয়নে তিনি ছিলেন সব্যসাচী। তিনি যখন কথা বলতেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে ইচ্ছে হতো। তিনি যখন ক্লাস নিতেন তখন ক্লাস জুড়ে থাকতো পিনপতন নীরবতা। জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি বিলিয়ে দিয়েছেন উজাড় করে। সত্যি এমন একজন মানুষ আমি দেখিনি আমার জীবনে।
তিনি ছিলেন একজন সুন্দর ও সাদা মনের চমৎকার মানুষ। ক্রিয়েটিভ ঐতিহ্যবাহিক এক শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও তিনি ছিলেন নিভৃতচারী মানুষ। সমাজসেবামূলক কাজ করাটাই ছিলো তার ব্রত। মৌলভীবাজার পৌরসভা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে রাজনগর মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি যখন খেলার ধারাভাষ্যকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন তখন সারা মাঠে যেন সমুদ্রের মতো প্লাবিত হতো, প্লেয়াররা মেতে উঠতো উন্মাদনায় ; সে যেন এক অন্য রকম সুর ঝংকার।
মনে পড়ে, তাঁর কোন রকম বিশেষ খাবারের চাহিদা ছিল না, শুধু এককাপ চা আর কয়েকটি পান। কথায় ছিল কারুকাজ, কথার ফাঁকে ফাঁকে তিনি এককাপ চা অনেকক্ষন ধরে পান করতেন।
তিনি ছিলেন স্বমহিমায় উজ্জ্বল একজন নিরহংকার মানুষ। তাই তো গর্ব করে বলি মৌলভীবাজারের কৃতি সন্তান ছিলেন হাবিবুর রহমান আবু।
এই প্রজন্ম হয়তো জানতেই পারবে না আবু স্যার ছিলেন একাধারে একজন শিক্ষক, কবি, সাংবাদিক, আবৃতিকার, নাট্যকার, নাট্য নির্দেশক,লেখক, কলামিস্ট, ক্রীড়া আয়োজক, ক্রীড়া সমালোচক। যেই দায়িত্ব দেওয়া হতো সব তিনি সুচারুভাবে সামলে নিয়ে যেতেন। আমার স্বল্প জ্ঞানে যতটুকু দেখেছি তা তুলে ধরার চেষ্টা করলাম হয়তো তিনি এর থেকেও আরও গুনীজন ছিলেন।
পরিশেষে বলব এতো দিন পরে হলেও এই লেখাটি তুলে ধরতে আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে আমার বন্ধু মনজুর মোর্শেদ, তথ্য এবং ছবি দিয়ে সাহায্য করেছেন এহসানা চৌধুরী চায়না আর বন্ধু মুমিন উল মামুন যার জন্য এই লেখায় সাহস অর্জন করেছি।
আরেকটা উদ্দেশ্য , এই ডিজিটাল যুগে হয়তো নতুন প্রজন্মের কাছে হাবিবুর রহমান আবু ভাইয়ের অসামান্য অবদানের কথা মনে থাকবে না, সেটাকে মনে রাখার জন্য এই ক্ষুদ্র প্রয়াস নেওয়া, যাতে ফিউচার জেনারেশন তাঁকে জানতে পারবে মৌলভীবাজার সাহিত্যে সংস্কৃতিতে ক্রীড়া ক্ষেত্রে একজন ছিলেন হাবিবুর রহমান আবু।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৬৩ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031