» আমার লেখক হয়ে উঠবার ইতিবৃত্ত

প্রকাশিত: ১১. জুলাই. ২০২০ | শনিবার

রোদেলা নীলা

ক্লাশের শেষ ঘন্টা বেজে গিয়েছিলো সেদিন , আমার হুঁশ ছিলোনা । কাঠের পেন্সিল দিয়েই হাবিজাবি লিখছিলাম বান্ধবীর খাতায় , ক্লাশ টিচার কখোন পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন খেয়াল করিনি।আমার খাতাটা মুখের সামনে ধরে কিছুক্ষন পড়লেন, তারপর বললেন- তুমি একদিন খুব ভালো লেখক হবে।
না,আমার আর তেমন ভালো লেখক হওয়া হয়ে ওঠেনি। গেল পঁচিশ বছর পেরিয়ে আজ আমি বুঝতে পারি – পাঠক আসলে কী চায় । নব্বইয়ের দশকের পাঠক আর এই সময়ের পাঠকের মধ্যে ব্যাপক ফাঁরাক । আগে আমাদের মতো পাঠকের গণিতের বইয়ের ভেতর থাকতো হুমায়ূন আহমেদ অথবা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় আর ধর্ম বইয়ের ভাঁজ খুললেই উঁকি দিত সেবা প্রকাশনি । আগে একজন বাকের ভাইকে ফাঁসির হাত থেকে বাঁচাবার জন্য মিছিল হতো আর এখন ; কবে কখোন কী নাটক বা সিনেমা চলছে টিভিতে কেও খুঁজতেও যায় না ।
তাই বলে যে ভালো কিছু লেখা হচ্ছে না বা নাটক বানানো হচ্ছে না তা কিন্তু নয় । অধিকাংশ মানুষ এখন ব্যস্ততার দোয়াই দিয়ে অনলাইনে সস্তা বিনোদন খোঁজে ,বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে থাকে কেবল আঁতেল শ্রেণির যারা তারাই । আমার পাঠক যারা তারা ভ্রমণ বিষয়ক লেখা খুব পড়তে পছন্দ করেন ,গল্পের মধ্যে দিয়ে আমি তাদের ঘোরাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি ।
আমাদের দুপুরগুলো কাটতো – বুদ্ধদেব গুহ অথবা সমরেশ বুকের মধ্যে চেপে , স্বপ্নে আসতেন মাসুদ রানা । কখোন শুরু করা গল্পটা পড়ে শেষ করবো এই নিয়ে থাকতো তীব্র আকাংখা । বিতর্কিত লেখার প্রতি আমার ছিল দারূন আগ্রহ। সে জন্যই হয়তো তসলিমা নাসরিন ও হুমাহূন আজাদের লেখাই আমাকে বেশি প্রভাবিত করেছে । শুরুটা কবিতা দিয়ে হলেও ,ইদানিং সময়ে গল্প আর ফিচার লিখতেই বেশি ভালো লাগছে । এই লক ডাউন সময়ে কতো রকম চিন্তাইনা মাথায় আসছে , আর কেও জানুক আর না জানুক আমিতো বুঝে গেছি একজন পাঠক পড়লেও আমি অত্যন্ত খুশি ।


খবরের কাগজে আমি লিখতে আরম্ভ করি ১৯৯৭ সাল থেকে। নীল শাড়ি – নামে প্রথম ছোট গল্প ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয় বেতার বাংলা পত্রিকায় , সম্পাদক ছিলেন কবি কাজী সালাহউদ্দিন , তাঁর কাছ থেকেই লেখার ধরণ সম্পর্কে প্রথম অবগত হই । এরপর দৈনিক প্রথম -আলো ,কালের কন্ঠ , নয়া দিগন্ত ,জনকন্ঠ ,অনন্যা পাক্ষিক ম্যাগাজিন ,ক্লাসিক ফ্যাশন ম্যাগাজিন ,পর্যটন বিচিত্রাসহ আরো অনেক বহুল আলোচিত পত্রিকায় লেখা শুরু করি । লিখতাম,কিন্তু পাঠকের সাথে কোন সরাসরি যোগাযোগ ছিলো না। কারন তখন প্রযুক্তি মানুষের হাতের মুঠোয় ছিলো না। প্রকাশকদের ছাপানোর আগ্রহর উপর সারাক্ষণ নির্ভর করতে হতো, একটা লেখা দিয়ে এসে অপেক্ষা করতে হতো সপ্তাহের পর সপ্তাহ ।
২০০৫ সালের দিকে দেখলাম ; দৈনিক প্রথম-আলোতে বিজ্ঞাপন – ব্লগ খোলা হচ্ছে। বিষয়টা আমাদের কাছে একদম নতুন ছিল।
তখনো ফেসবুক এই দেশে সেভাবে প্রচলিত না । অফিসে কাজের এক ফাঁকেই আট লাইনের একটা কবিতা লিখে পোস্ট করে দিলাম ব্লগে । পাশে দেখলাম ছবি আপলোড করার একটা অপশনও আছে। বাহ,কী দারুন ব্যাপার ! কয়েক মিনিটের মধ্যে ৭-৮ টা মন্তব্যে ভরে গেলো আমার খেড়োখাতা। কোন কলম লাগেনি,খাতাও লাগেনি , শুধু ইন্টারনেট দিয়ে আমি পৌঁছে গেলাম শত শত পাঠকের মস্তিষ্কে। আর কী সেই নেশা ছাড়া যায় ! সেই থেকেই চলছে ব্লগিং আজো ,কতো রাত ভোর করেছি এই অনলাইন প্লাটফর্মে তার সঠিক পরিসংখ্যান আমি দিতে পারব না ।
সামহোয়ার ইন ব্লগ, লেখক ফোরাম, বন্ধু ব্লগ,নক্ষত্র-ব্লগ , শব্দনীর ব্লগ ,বিডিনিউজ২৪ ব্লগ এভাবে করতে করতে আজ পনেরটা বছর ! সবচেয়ে আনন্দদায়ক ব্যাপার হলো- বেশির ভাগ ব্লগার দেশের বাইরে থাকেন। তারা নিখুঁত ভাবে আমার ভুল বানান ধরিয়ে দিচ্ছে্ন। তাদের সাথে আমার কোন কালেও দেখা হয়নি ,ভবিষতে হবে কীনা সেটা এক মাত্র বিধাতা জানেন ।এখানে একটু বলে রাখা দরকার- আমি অংকের ছাত্রী ; বাংলা বানান সম্পর্কে একেবারেই জ্ঞান নেই বললেই চলে। তাই এক গল্পে বেশ কিছু বানান ভুল থাকে ,বই ছাপার সময় প্রত্যেকবারই সম্পাদক বিরক্ত হন প্রুফ দেখতে গিয়ে ।
ব্লগ যখন এমন জমজমাট তখন সবাই উৎসাহিত করলো- এবার একটা বই বের করো । আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম ; আমার লেখা কে ছাপবে ; কেইবা পড়বে। খালি খালি টাকা নষ্ট , বিনে পয়সায় বই ছেপে দেবে ২০১০ সালে এমন পরিচিত মুখ আমার নয় ।কিন্তু স্বপ্ন দেখে ফেললে কোন একটা কিনারা বুঝি হয়েই যায়. সেই বছরি প্রথম কবিতার বই ‘ ফাগুনঝরা রোদ্দুর প্রকাশিত হলো ভাষাচিত্র প্রকাশনী থেকে। খুবি আনাড়ি ছিলো বেশির ভাগ কবিতা ; নিজেই এখন হাসি পায় ওই গুলো পড়লে। তবু প্রথম সন্তান হবার মুগ্ধতার মতো আমিও মুগ্ধ হয়ে রইলাম। এরপর টাকা পয়সার হিসেব কষতে হয়নি, একটা একটা করে বই প্রকাশিত হয়েছে। পাঠকের সংখ্যাও বেড়েছে আগের চাইতে বেশি । মনে আছে , ব্লগার আনন্দময়ী আমার কবিতার বইয়ের চমৎকার রিভিউ করেছিলো । আজো তাকে দেখার ইচ্ছে আমার মনের ভেতর আঁকুপাঁকু করে ।
মূলত আমার লেখার বিষয়- নারী জীবনের নিঃসঙ্গতা ,প্রণয় – প্রকৃতি , আর ঘুরোঘুরির গল্প । আমি নারীবাদী নই, তবে পুরুষ শাষিত সমাজে নারীকে কিভাবে অব্যবহার করা হচ্ছে তাই আমার লেখনীতে তুলে আনার চেষ্টা করেছি। ছোট গল্পগুচ্ছ খুব চলে বইমেলায় ; নারী চরিত্রের মধ্যে নিজেকে বসিয়ে পাঠ উপযোগী করবার চেষ্টা করেছি বার বার । পাঠক বিভ্রান্ত হয়েছে -‘ এটা কি আপনার জীবন থেকে নেওয়া গুল্প?’ মধ্যবিত্ত নারীদের গল্পগুলো আলাদা কিছুতো নয় । উত্তরে সব সময়ি নিরব থেকেছি । পাঠক আগ্রহে থাকবে , এটাই মজার !
আমার জানা মতে পাঠক লেখককে খুঁজে, কিন্তু আমি সব সময়ি পাঠকদের খুঁজে বেড়াই- কে আমার বই পড়লো এই নিয়ে আমার তীব্র আগ্রহ। বইটা পড়ে যদি কমেন্টস দেবার কোন জায়গা চালু করা যেত তবে বেশ হতো। সে দুঃখও দূর হলো যখন থেকে ফেসবুক চালু হলো , এখন ভালো মন্দ যা রিভিউ সব পত্রিকার পাশসাপাশি সরাসরি সোস্যাল মিডিয়ায় পাচ্ছি । সাথে বোনাস পাচ্ছি সেলফি ,পাঠক পাচ্ছেন অটোগ্রাফ ।
কাগজ পত্তর গুছিয়ে রাখবো মতো এতো বড় গুণি আমি নই ,তাই প্রকাশিত এগারোটি বইয়ের মধ্যে মাত্র দু’টি বই আমার সংগ্রহে আছে । একটি ভ্রমণ গল্প-‘মেঘ বালিকার দেশে ‘ আর অন্যটি কবিতার বই-‘ নিমগ্ন গোধূলি । বই শেষ হয়ে যাবার পর প্রকাশকের কাছে নতুন করে বই চাইলে তাঁরা টাকা লগ্নি করতে বলেন । কিন্তু , পয়সা দিয়ে বই ছাপানোর বিপক্ষে আমি । যদি আমার বই পাঠক পড়েন তাহলেই বই ছাপা হবে ,নয়তো কোন দিন হবে না । এইতো বেশ আছি ,কোন খরচ ছাড়াই আমি যা ইচ্ছে লিখছি আর আপনারা সময় নষ্ট করে সেইগুলো পড়ছেন 😂😂😂 আর কী চাই এক জীবনে ;এইতো বেশ ভালো আছি ।।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৭১ বার

Share Button

Calendar

August 2020
S M T W T F S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031