শিরোনামঃ-


» আমি ও নজরুল

প্রকাশিত: ২৮. আগস্ট. ২০২০ | শুক্রবার


সালেহা চৌধুরী

একা একা আবৃত্তি করছি . মসজিদে কাল শির্ণি আছিল অঢেল গোস্ত রুটি কিম্বা আম্মা লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া। আবৃত্তি করতে করতে আবেগে উদ্বেল। নিজের গলার স্বর নিজের কাছে অচেনা মনে হয়। তারো আগে? সেটা যে কত বয়স জানি না। একদিন দেখলাম আমার বড় ভাইএর কাঁধে চড়ে আমি নওগাঁর টাউনহলে। আমার আব্বা তখন চাকরির কারণে নওগাঁতে। আমার মাথার ঝুঁটিতে লাল ফুল। সুন্দর ফ্রক। স্টেজে আমাকে দেখা যায় না বলে পেছন থেকে চেঁচামেচি। তখন একটা চেয়ার এনে আমাকে তার উপর দাঁড় করানো হলো। আমি হাত পা নেড়ে আবৃত্তি করছি Ñ কাঠ বেড়ালে কাঠ বেড়ালি পেয়ারা তুমি খাও? সকলে বলে তখন আমার বয়স ছিল সারে তিন থেকে চার। তাহলে ব্যাপার এই তিন বছর বয়স থেকেই কাজী নজরুল আমার জীবনে। তখন থেকেই তাকে নিয়ে আমার কন্ঠস্বর বার বার নানা খেলা খেলেছে। একা একা আমি শুনছি আমার নিজের আবৃত্তি। কবিতা ঝংকারে মুগ্ধ। এরপর আরো বড় হয়ে জানলাম তাঁর আরো নানা কবিতা। অসামান্য নানা গান। একদিন জেনেছিলাম Ñ তিনি এখন আর লিখতে পারেন না। তাঁর মাথা আগের মত কাজ করে না। কোন একজন বললো Ñ জানিস না হিন্দুরা এমন করেছে। বিষ খাইয়ে মাথা খারাপ করে দিয়েছে। অনেকদিন সেই বেদনা আমাকে কষ্ট দেয়। পরে বুঝতে পারি এটা হিন্দুদের কাজ নয়। কোন এক অসুখে এমন। তাঁকে শুনেছি প্রচুর কষ্ট দিয়েছিল ডি, এম লাইব্রেরী , ৪২ বিধান সরনী কোলকাতা। ঠিকমত রয়ালটি দেয়নি। আরো নানা কিছু। তবে তাঁরা হিন্দু ছিলেন না। ছিলেন মুসলমান। যাকগে সত্যি কথা এত বড় প্রতিভা এমন করে নিশ্চুপ হয়ে যাবেন? কিন্তু পৃথিবীর অনেক কিছুর উপর কারো হাত থাকে না। স্ত্রীর অসুখ সেরে যায় যেন এই কারণে সারারাত পচুপুকুরে ডুবে থাকা এটাইও তো কারণ হতে পারে। প্রচুর পান জর্দা, বেপরোয়া জীবন এসবও কারণ হতে পারে।
’৭২ সালে কোলকাতা গিয়ে তাঁকে দেখব বলে তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলাম। সব্যসাচী তখন বেঁচে। সন্দেশ নিয়ে গেছি তাঁকে নিজের হাতে খাওয়াব বলে। আমি সন্দেশ খাওয়াতে খাওয়াতে আকুল হয়ে কাঁদছি। তিনি সন্দেশ খেতে খেতে আমাকে দেখছেন। মনে হয় বুঝতে পারছেন কান্না। কিন্তু কিছু বলতে পারছেন না। একসময় গভীর বেদনা বুকে করে ফিরে আসতে হলো। পরে যখন তিনি ঢাকাতে আর একবার তাঁকে দেখেছিলাম। তখনও কষ্ট পেয়েছিলাম। তেমন কোন ঘটনা হয়নি সেখানে।
যখন ‘বিদ্রোহী ’ পড়ি খুব অবাক হয়ে যাই। এত কিছু তিনি জানলেন কি করে? দেশের নানা মিথ এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল বিশ্বের নানা মিথ। অর্ফিয়াসের বাঁশরী। এই অর্ফিয়াস তো গ্রীক মাইথোলজির একজন। জীবন মৃত্যুর ভেতর দিয়ে যে নদী প্রবাহিত সেখানে তিনি নৌকা পারাপার করতেন। বাঁশি বাজাতেন। দুর্বসা, বিশ্বমিত্রার সঙ্গে চেঙ্গিস আর ব্যোমকেশের সঙ্গে অর্ফিয়াসকেও বাদ দেন না। সেই জীবন ও মরণের নদী যেখানে এই অর্ফিয়াস বাঁশি বাজান, তেমনি বাঁশি তিনিও বাজাতেন।। সে খবরও তাঁর জানা।এমন কত কিছু যে তাঁর জানা যতবার তাঁর কবিতা পাঠ করেছি, জেনেছি। জেনেছি তাঁর গানের তান। সকলে বলে যদি তিনি শেষ পর্যন্ত মাথাকে ঠিকমত কাজে লাগাতে পারতেন আরো অনেক কিছু লিখতেন। তা হয়তো লিখতেন কিন্তু যা রেখে গেছেন তাই বা কম কি? তিনিই তো বলেন দারিদ্র্য তাঁকে খ্রিস্টের সন্মান দিয়েছেন। সাম্যবাদীতে বলেছেন মানুষের হ্রদয়ের কথা। – এই হ্রদয়ই সেই নীলাচল কাশী মথুরা বৃন্দাবন/ বুদ্ধ-গয়া এ জেরুজালেম এ মদিনা কাবা ভবন, মসজিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হ্রদয়/ এইখানে বসে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়। বলেছেন আরো ওই সব পুঁথি কংকালে সব প্রশ্নের উত্তর নেই। তিনি কোথায়?Ñ হাসিছেন তিনি অমৃত হিয়ার নিভৃত অন্তরালে। হিন্দু মোসলমান এই সব তর্কের অনেক উর্দ্ধে তিনি। তাই তো তিনি বার বার সাম্যের গান করেন। তারপর? তাঁর কলম বলেছিল Ñ সেদিন সুদূর নয় / যে দিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীর জয়। এই ভাবে সব কবিতা নিয়ে অনেক কিছু খুঁজে আনা যায়। আমি জানি অনেকেই এ কাজ করেছেন। নজরুল জ্ঞান আমার চাইতে তাঁদের অনেক বেশি। আমি তো তিন বছর বয়স থেকে তাঁকে ভালোবেসেছি কেবল তাঁর মুক্তোর মত শব্দের কারণে। তাঁর ‘পদ্মগোখরো’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। ছন্দের কারণে নিজের কানকে খুশী করেছি চিৎকার করে কবিতা আবৃত্তিতে। । পরে বিস্মত হয়েছি তাঁর শব্দসম্ভারে। তিনি আর জেগে ওঠেন নি। গন্ধ বিধূর ধূপ হয়ে চির বিদায় নিয়েছেন।
প্রতিভা বসু তাঁর ‘আয়না’ গল্পে নজরুলকে স্মরণ করেছেন। একদিন নজরুল এই ভালোবাসার কিশোরীকে ফেলে চলে যান কারণ কখনো যদি সংযম হারাণ তাহলে অঘটন ঘটতে পারে। এই নজরুলকে গভীর শ্রদ্ধা জানাই। প্রেম ও বিদ্রোহ এই দুই সত্তায় অর্নিবান তিনি।
তিনি চলে গেছেন ২৯ সে অগাস্ট ১৯৭৬ সনে। দীর্ঘদিন বাকহীন। তারপর বিদায়। একটা ইচ্ছা তাঁর পূরণ হয়েছে মসজিদের কাছে তাঁকে কবর দেওয়া হয়েছে। যেখানে আজানের শব্দ শুনবেন বলে তাঁর প্রত্যাশা ছিল।
তিনি যদি শেষ পয়ন্ত সক্রিয় থাকতেন আরো কত কিছু দিয়ে যেতেন বলে খেদ করবার দরকার নেই। যা দিয়ে গিয়েছেন সেও বা কমকি? শেলি, কিটস তাঁরা কি খুব বেশি কিছু দিয়ে গেছেন? অকাল মৃত্যুর কারণে। কিম্বা সুকান্ত? যতটুকু আমরা পেয়েছি সেকি এক গোলাঘর পুরপূর্ন শস্য নয়?

চলে যাবার দিন স্মরণ করে তাঁকে নিয়ে একটি কবিতায় আমার শ্রদ্ধা জানাই।

অর্ফিয়াসের বাঁশরী
আমার তখন সাড়ে তিন
স্টেজের উপর চেয়ার তার উপর আমি
আবৃত্তি করছি কাঠবেড়ালি।
মুখস্ত কথা আর তুমি।
বড় ভাইএর কাঁধে চেপে
ঝুঁটিতে লাল ফিতে
আমি এসেছি কোন এক সাহিত্য সভায়।
তুমি এসে গেছো আমার জীবনে।
লিচু চোর আর ঝিঙ্গেফুলে
বাতাবি লেবু আর কাঠবেড়ালিতে।
তারপর কত কবিতা কত গান।
নানা কবিতায় নিশীথিনি যায় দূর বনছায়
পড়ছি গভীর আনন্দে।
কবিতার সুমন্দ বাতাসে
আমি পালতোলা নৌকার মত।
কখন যে হয়ে গেলে তুমি
গন্ধ বিধূর ধূপ নিশ্চল নিশ্চুপ।
কথা হারানোর জগতে একা।
কোনদিন যদি বলতে
চলে এসো দেব খোঁপায় তারার ফুল।
কি যে হতো কে জানে।

আমি তো মশগুল তোমার নিবিড় গানে।
তুমি আছো মননে স্বপনে
সুললিত সুরে ঘুমে জাগরণে।
অর্ফিয়াসের বাঁশরীর সুললিত তানে।
নদী স্তব্ধ হয় যে সুরে
গাছেরা ঝুঁকে পড়ে তোমার ছায়ায়
জীবন ও মৃত্যুর মাঝে এ কোন মহিমা।
তোমার বাঁশি টেনে নেয় আমাদের
খুব ভালো করে জানা তুমি অবিনশ্বর
তুমিই হরিনী মায়া।
সবাই তো চলে যায় একদিন
আর এক জগত! কোন সেই ঘরকন্না?
কয়জন রেখে যেতে পারে বল
এক আকাশ শস্যকণা।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৭৭ বার

Share Button