» আমি তোমার নাম লইয়া কান্দি…

প্রকাশিত: ২৮. জুন. ২০২০ | রবিবার


লুৎফর রহমান রিটন

‘সোনা বন্ধুরে,
আমি তোমার নাম লইয়া কান্দি।
গগণেতে ডাকে দেয়া
আসমান হইল আন্ধিরে বন্ধু
আমি তোমার নাম লইয়া কান্দি…

উইড়া যায় রে ছকুয়ার পঙ্খী
পইড়া রইলো ছায়া
কোন পরাণে বিদেশ রইলা
ভুলি দ্যাশের মায়া রে বন্ধু
আমি তোমার নাম লইয়া কান্দি…।’

২০০২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, সদ্য দেশান্তরি আমি বহু আগে শোনা এই গানটা ফের শুনেছিলাম নিউইয়র্কে বন্ধু তাজুল ইমামের বাড়ির বেসমেন্টে মধ্যরাতের পান আর গানের আসরে। আরো বহু অতিথি ছিলেন রাতের সেই আয়োজনে। বেসমেন্টের আয়োজন হলেও সেখানে মাইক্রোফোন-সাউন্ডবক্সের ব্যবস্থা ছিলো। সেই রাতে দুলাল ভৌমিক-তাজুল ইমাম জুটি ডুয়েট গেয়েছিলেন গানটা–আমি তোমার নাম লইয়া কান্দি। আহা কী দরদই না ঝরে পড়ছিলো দু’জনের কণ্ঠে। গানটা শুনতে শুনতে গোপনে অশ্রু মুছছিলাম আমি। আমার কেবলই মনে হচ্ছিলো আমি আর ফিরতে পারবো না দেশে। আমার কেবলই মনে হচ্ছিলো এই গানের সেই ছকুয়ার পঙ্খীটা আমি।

এমনিতেই আমি বরাবর একটা অলটারনেটিভ রিয়েলিটিতে বসবাস করা মানুষ। যে বাস্তবতা আমার পছন্দ নয়, যে বাস্তবতায় আমি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারি না আবার পরিবর্তনও করতে পারি না যে রিয়েলিটিকে, সেই রিয়েলিটিকে উপেক্ষা করে একটা অলটারনেটিভ রিয়েলিটি আমি তৈরি করে নিই। দূর প্রবাসে কানাডায় এসেও আমি আসলে বাস করি একটা অলটারনেটিভ রিয়েলিটিতেই। এবং এটার শুরু কানাডায় আমার শুরুর কাল থেকেই।

খুব সুন্দর একটা দেশ, কানাডা। অসম্ভব সবুজ। অসংখ্য বৃক্ষ-পাহাড়-নদী-পাখি আর বিস্তীর্ণ প্রান্তর নিয়ে,অসাধারণ সহনশীল গুচ্ছ গুচ্ছ সুন্দর আর মানবিক মানুষ নিয়ে চমৎকার একটা মানবিক দেশ মানবিক রাষ্ট্র, কানাডা। ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনের দেশ কানাডা। ২০০২ সালে আমার দুঃখের দিনে, আশ্রয়হীন বিপন্ন ও বিষণ্ন আমাকে কানাডা তার অবারিত বুকে টেনে নিয়েছিলো পরম মমতায়। আমাকে ভরসা দিয়েছিলো। সাহস দিয়েছিলো। আর দিয়েছিলো স্বাধীনতা। চিন্তার স্বাধীনতা। বলার স্বাধীনতা। ধর্মের স্বাধীনতা। কর্মের স্বাধীনতা।
কানাডার প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই আমার। কানাডা আমার সেকেন্ড হোম। দ্বিতীয় দেশ। কানাডাকে আমি ভালোবাসি।

অগুন্তি পার্ক আর বাগানের জন্যে বিখ্যাত এই দেশটা। যে শহরে আমি থাকি, সেই অটোয়াতেই আছে কম করে হলেও আড়াইশো পার্ক। অটোয়ায় আমার বাড়ির খুব কাছেই, হাঁটার দূরত্বেই দুই দুইটা দুর্দান্ত পার্ক আছে। কাছেরটার নাম এন্ড্রু হেইডেন। খানিকটা দূরেই ব্রিটানিয়া। পার্কের সবুজ নরম ঘাস, সারি সারি গাছ, গাছের পাতা, হাঁস, গিজ, সীগাল,কাঠবেড়ালি আর নদীর জলের সঙ্গে আমার মিতালি। এদের সঙ্গেই কেটে যায় আমার বিকেলগুলো, সন্ধ্যাগুলো। সূর্যান্ত দেখতে হলে আমি চলে যাই ব্রিটানিয়ায়। পতেঙ্গার মতো ব্রিটানিয়া হচ্ছে নদী আর পাথরের অপরূপ সঙ্গমস্থল। সেই পাথরে বসে অটোয়া রিভারের জলে পা ডুবিয়ে আমি সূর্যাস্ত দেখি। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে আসে। পার্কের পার্কিং লটের গাড়িগুলো সংখ্যায় কমতে থাকে। আশপাশের সবাই একে একে চলে যায় বাড়ি।
কখনো কখনো আমি বসে থাকি একলা একা। নিরাপত্তা কর্মীরা একদিন, এগিয়ে আসেন আমার দিকে–আর ইউ ওকে জেন্টেলম্যান?

পার্কে মদ্যপানরতসন্দেহে আমার দিকে ফেলা টর্চের আলোয় আমার চোখে জল দেখে ওরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে–হাউ মে উই হেল্প ইউ?

ওদেরকে বলি–আমি ঠিক আছি। আমার শুধুই নিজের দেশের কথা মনে পড়ছে।

ওদের একজন বলে–অতিশয় দুঃখিত আমরা তোমার এইরূপ বেদনার জন্যে। এতোক্ষণ পার্কে থাকিবার নিয়ম নাই। তুমি ঘরে ফিরিয়া যাও। পারিলে ফিরিয়া যাও নিজের দেশে।

আমি ঘরে ফিরি।
কিন্তু দেশে আর ফেরা হয় না আমার।


তখন আমি নতুন এসেছি কানাডা নামের এই দেশটায়।
এক বিকেলে বসে আছি এন্ড্রু হেইডেন পার্কের বেঞ্চিতে।
আমাকে দেখে পায়ে পায়ে এগিয়ে এসেছে একটা কাঠবেড়ালি। ঠিক কাঠবেড়ালি নয়, ওটা চিপমাঙ্ক। কাঠবেড়ালি পরিবারেরই একটি প্রজাতি। দেখতে খুবই ছোট্ট, এইটুকুন। এই কাঠবেড়ালিটার সঙ্গে আমার খুব সখ্য। আমি ওকে বাদাম খাওয়াই। আমার পকেটে ওর জন্যে কিছু বাদাম নিয়ে আসতে হয়। খুব বিশ্বাস ক’রে আমার হাত থেকেই নিজের মুখে বাদাম নিতে একটুও ভয় পায় না সে। বেঞ্চিতে বা পাথরে বসে ঘাসের দিকে ঝুঁকে পড়ে ওর মুখে বাদাম তুলে দিই। চিড়িক পিড়িক ছোট্ট লেজটা নাড়াতে নাড়াতে সে চলে যায়।
প্রসন্ন সেই বিকেলটা আরো প্রসন্ন হয়ে ওঠে ছোট্ট এইটুকুন কাঠবেড়ালিটার নৃত্যময় আনন্দ দেখে।

কিন্তু হঠাৎ একদিন কী যে হয় আমার! সহসা মনে হয়–এই বেঞ্চিটা তো আমার নয়। এই বেঞ্চিটা বিলং করি না আমি।
আমার বেঞ্চিটা আমি রেখে এসেছি বাংলাদেশে,রমনার সবুজ চত্বরে।
এই বেঞ্চিটা আমাকে চেনে না।
এই বেঞ্চিটা আমার নয়।

ঢাকার রমনার সবুজ চত্বরটার জন্যে আমার মনটা বিষণ্ণ হয়ে যায়।
দেশের ছোট্ট একটা ঘাসফুলের জন্যে আমার মনটা বিষণ্ণ হয়ে যায়।
পুরোন ঢাকার রাস্তার ধারের টং দোকানের ডালপুরি আর চায়ের জন্যে মনটা বিষণ্ণ হয়ে যায়।
সদরঘাট গুলিস্তানের ভিড়ের জন্যে মনটা বিষণ্ণ হয়ে যায়।
কক্সবাজারের ঝিনুক আর ঝাউবনের জন্যে মনটা বিষণ্ণ হয়ে যায়।
র‍্যাংকিন স্ট্রিটের জন্যে মনটা বিষণ্ণ হয়ে যায়।
ছোট্ট একটা প্রজাপতি এবং ফড়িং-এর জন্যে মনটা বিষণ্ণ হয়ে যায়।
শিমফুল আর কচুরি ফুলের জন্যে মনটা বিষণ্ণ হয়ে যায়।

এই বেঞ্চিটা আমার নয়।
এই গাছ ঘাস বৃক্ষ অটোয়া রিভার আমার নয়।
আমার কোনো রিভার ছিলো না।
আমার ছিলো নদী।
আমার ছিলো শীতলক্ষ্যা। আমার ছিলো পদ্মা,মেঘনা। আমার ছিলো ময়ূরাক্ষী। আমার ছিলো চিত্রা। আমার ছিলো বুড়িগঙ্গা।

এই ম্যাপল ট্রি,ওক,বার্চ,পাইন ট্রি এগুলো আমার নয়।
আমার কোনো ট্রি-ই ছিলো না।
আমার ছিলো গাছ।
আমার ছিলো বৃক্ষ–বট,পাকুড়,অশথ।
আমার ছিলো জারুল,কৃষ্ণচূড়া,কামিনী,ছাতিম আর নিম।

এই বেঞ্চিটা আমার নয়।
এই প্রচণ্ড শীত এই ভয়ংকর ঠান্ডা এই অবিশ্বাস্য বরফপ্লাবিত দেশটা আমার নয়,আমার ছিলো না।
এমনকি এই ঝকঝকে নীল আকাশটাও আমার না।
আমি একজন অচেনা। আমি একজন আউটসাইডার।
এই বেঞ্চিটা এই কাঠবেড়ালিটা এই ম্যাপল ট্রি-টা হয়তো চেনে আমাকে, কিন্তু ওরাও জানে–আমি এসেছি অন্য একটা দেশ থেকে। এই দেশটা আমার নয়। আমি এই দেশের কেউ না। আমি একজন আউটসাইডার।
আমার প্রতিদিনের পরিচিত বেঞ্চিটা কাঠবেড়ালিটা ম্যাপল ট্রি-টা কী রকম ঝাপসা হয়ে যায়!

সোনা বন্ধুরে,আমি তোমার নাম লইয়া কান্দি………
অটোয়া ২৭ জুন ২০২০

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১০১ বার

Share Button

Calendar

July 2020
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031