আশুলিয়া সাব রেজিস্টার অফিসের নিজস্ব কোন ভবন নাই

প্রকাশিত: ৯:২৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৮, ২০১৮

আশুলিয়া সাব রেজিস্টার অফিসের নিজস্ব কোন ভবন নাই

 

কামরুজ্জামান হিমু :
কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় করেও সাভার উপজেলার ব্যস্ততম শিল্প এলাকা আশুলিয়া সাব রেজিস্টার অফিসের নিজস্ব কোন ভবন নেই। প্রতিদিন শত শত লোকজন এখানে জমি বেচা-কেনা করতে আসেন। স্বল্প পরিসরের ভাড়া বিল্ডিংয়ে গাদাগাদি করে অফিস করেন সাব রেজিস্টার ও তাদের সহকারীরা। বর্তমানে জরাজীর্ন একটি ভবনে মাসিক ২৩ হাজার টাকা ভাড়ায় আশুলিয়া সাব-রেজিস্টার অফিস পরিচালিত হলেও এখানে কোন নিরাপত্তা ব্যাবস্থা নেই।
যোগাযোগ ব্যবস্থার আমুল পরিবর্তনের কারণে প্রতিবছর এখানে বেড়ে চলছে জমি বেচা-কেনা। প্রতিযোগিতামূলক জমি বেচা-কেনার কারণে বর্তমানে প্রায় প্রত্যেক মৌজায় জমির মূল্য বেড়েছে আকাশচুম্বি। রাজস্ব আদায়ের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত খাতটিকে অধিদফতর হিসেবে ঘোষণা করে এর জনবল ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন স্কেল প্রদান এবং রাজস্ব আহরণের উৎসাহ প্রদানের স্বার্থে তাদের রাষ্ট্রের অতি প্রয়াজনীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ঘোষণা করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
দলিল রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে সম্পত্তির অধিকার সুনিশ্চিত হলেও রেজিস্ট্রেশন কর্মকর্তারা শুধু রাজস্ব আহরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন। কিন্তু এই বিভাগের সাংগঠনিক কাঠামোকে মজবুত করতে কেউ উদ্যোগী হননি। বাংলাদেশে বর্তমানে দলিল রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের অধীন নিবন্ধন পরিদফতরের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া রেজিস্ট্রেশন আইন (সংশোধিত ২০০৪)-এর ৫২ (এ) ধারা সংযোজনের ফলে সাব-রেজিস্ট্রারদের দায়-দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেছে। এখন একজন কর্মকর্তা ইচ্ছে করলেই মালিকানা স্বত্বের প্রমাণাদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া দলিল দাখিল গ্রহণ ও রেজিস্ট্রেশন কার্য সম্পন্ন করতে পারেন না। তাছাড়া ৬৩ (এ) ধারা সংযোজনের ফলে বাজার মূল্য নির্ধারণ কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত সর্বনিম্ন বাজার মূল্যের নিম্নে তার দলিল রেজিস্ট্রি করার কোন সুযোগ নেই।
রেজিস্ট্রেশন বিভাগ এ উপমহাদেশে প্রাচীনতম একটি প্রতিষ্ঠান। ১৯০৮ সালে রেজিস্ট্রি আইন চালু হয়। তখন রাষ্ট্র চালাতে জমি রেজিস্ট্রি আয়ের প্রধান উৎস ছিল। দেশের আপামর জনগণের সাথে সম্পৃক্ত বিভাগটি মাটি ও মানুষকে ঘিরে পরিচালিত হয়। বিভাগের সেবা প্রদানের সাথে সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার এবং জনসাধারণকে উন্নততর সেবা প্রদানের অঙ্গীকারের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।
একজন সাব- রেজিস্ট্রারকে দলিল রেজিস্ট্রি করতে হলে রেজিস্ট্রেশন আইন, স্ট্যাম্প আইন, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, সাক্ষ্য আইন, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ভূমি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, সাবালকত্ব আইন, আয়কর আইনসহ সংশ্লিষ্ট আইন সম্বন্ধে ধারণা থাকতে হয়।
বর্তমানে রেজিস্ট্রেশন বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তাগণকে অনেক দায়-দায়িত্ব গ্রহণ ও বহুবিধ কার্যাদি সম্পাদন করে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি সত্ত্বেও রেজিস্ট্রেশন বিভাগটিকে আধুনিকায়ন করা হয়নি। তাই শত বছরের পুরানো সাংগঠনিক কাঠামো দ্বারা এ বিভাগ জনসাধারণকে কাঙ্খিত সেবা প্রদানে ব্যর্থ হওয়ায় অস্তিত্ব সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে।
এব্যাপারে আশুলিয়া সাব-রেজিস্টার মোঃ সামসুল আলম বলেন, আশুলিয়া সাব রেজিষ্টার অফিসের নিজস্ব ভবন প্রয়োজন। এখানে নিজস্ব ভবন তৈরী করা হলে তা বাংলাদেশে রেজিষ্ট্রেশন সার্ভিসকে আরও অনেক দুর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। তখন আমরা মানুষকে আরও বেশী করে সেবা দিতে পাারবো। কারন এখানে যদি দলিল নষ্ট হয়ে যায় কিংবা রেকর্ড নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে মানুষের যাওয়ার জায়গা কোথায়। কেন তাদের রেকর্ডটা নষ্ট হবে। এখনও বাংলাদেশের বিভিন্ন যায়গায় সরকারী অফিস-আদালতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন অফিস জরাজীর্ন এবং ভাংগা বিল্ডিং এ অফিস করতে হচ্ছে। আমরা আইন মন্ত্রনালয়ের অধীনে কাজ করে থাকি। আমাদেরকে একটি জমি দেয়া হলে আইজিআর ফান্ড থেকে বিল্ডিং করে নিতে পারি।
দেশের প্রত্যেকটি সাব-রেজিস্টার অফিস নিজস্ব জায়গায় এবং ভবনে করা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজকে দেখেন ব্যাংকে টাকা রাখা এবং সেই টাকার নিরাপত্তার জন্য ভোল্ট লাগে। তাহলে আমাদের কেন ভোল্ট লাগবেনা। আমার দলিলটাওতো নিরাপদে রাখতে হবে। কারন আমি দলিলটা না দিলেতো ব্যাংক আমাকে টাকা দিবেনা।
এজন্য প্রথমে আমাকে দলিলটা রক্ষা করতে হবে। তা না হলে দলিলগুলো খুয়ে যায়, নষ্ট হয়ে যায়, তেলাপেকায় খায়, পানি পড়ে নষ্ট হয়ে যাবে কেন? এজন্য তিনি নিজস্ব ভবন তৈরী করে দেয়ার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান।
এদিকে গত ২০১৬ সালের ১৪ নভেম্বর তারিখে আশুলিয়া সাব রেজিস্টার অফিসে যোগদান করেন শামসুল আলম। এরপর থেকে এ খাতে সরকারের রাজস্ব আদায় বেড়ে চলেছে। সে মাসে ১৬১৮ টি দলিল থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে আট কোটি বাইশ লাখ আটান্ন হাজার দুইশত চার টাকা। এরপর ডিসেম্বরে ১৬৫৫ টি দলিলে ৯ কোটি বিরাশি লক্ষ ৪৭ হাজার পাঁচশত উনত্রিশ টাকা, জানুয়ারী-২০১৭তে ১৫১৪ টি দলিলে ৯ কোটি ১৪ লক্ষ ১৫ হাজার ৭ শত সাইত্রিশ টাকা, ফেব্রুয়ারীতে ১৬৭০টি দলিলে ৯ কোটি ৭৪ লক্ষ ৬৮ হাজার ৭ শত উনপঞ্চাশ টাকা, মার্চ মাসে ১৮২৭ টি দলিলে ১০ কোটি ৪৯ লক্ষ ৯৮ হাজার ৫৩১ টাকা, এপ্রিলে ১৮৬৯ টি দলিলে ১০ কোটি ৩৬ লক্ষ ৬২ হাজার ৭৯৭ টাকা, মে মাসে ১৮১৫টি দলিল ১৩ কোটি ৫৩ লক্ষ ৮২ হাজার ২৫৯ টাকা, জুন মাসে ১২০৩ দলিলে ১৪ কোটি ৯৮ লক্ষ ৭৬ হাজার ৪৫২ টাকা, জুলাই মাসে ১৮১৯ টি দলিলে ১০ কোটি ৭ লক্ষ ৪০ হাজার ৯৯৫ টাকা, আগষ্ট মাসে ২০৫১ দলিলে ১২ কোটি ৩৪ লক্ষ ৬১ হাজার ৮৪৩ টাকা, সেপ্টেম্বর মাসে ১১৩৫ টি দলিলে ৪ কোটি ৭৭ লক্ষ ৬১ হাজার ৩১৪ টাকা, অক্টোবর মাসে ৮ কোটি ৫২ লক্ষ ৭৬ হাজার ৫৫২ টাকা, নভেম্বর মাসে ১২ কোটি ৮০ লক্ষ চারশত ৮৭ টাকা। যার মোট রাজস্ব আয় ১৩৪ কোটি ৮৫ লক্ষ ৪৯ হাজার ৪৯৪ টাকা।
সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য আশুলিয়া সাব রেজিস্ট্রি অফিসে বিক্রিত জমির কোন শ্রেনী পরিবর্তন হচ্ছেনা। আমার এখানে প্রতিদিনের সম্পাদিত দলিলের কোন ই ফাইলিং হচ্ছেনা বা কোথাও রেকর্ডও হচ্ছেনা। আমি যেটা করে যাচ্ছি সেটাই একমাত্র ডিজিটাল এছাড়া ডিজিটাল পদ্ধতিতে এখানে দলিল সংরক্ষনের ব্যবস্থা নাই।
কেউ যেন জাল দলিল না করতে পারে সেজন্য আমি প্রতিটি দলিল রেজিস্ট্রেশনের সময় দলিল দাতা এবং গ্রহিতার চেহারার সাথে তার জাতীয় পরিচয়পত্র এবং ছবি মিলিয়ে দেখি। আমার এখানে ২০১৪ সালে সম্পাদিত মূল দলিলগুলো ইতিমধ্যে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং ২০১৫ সালের দলিলগুলো হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ রেজিস্ট্রেশন (আইজিআর) খান মো. আব্দুল মান্নান বলেন, আমাদের এখন অনলাইনে পেমেন্ট হচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়াটাকে অটোমেশনে আনার চেষ্টা চলছে। ৪৯৭ টি সাব রেজিস্ট্রি অফিস রয়েছে সারা বাংলাদেশে। জমির দাম ভালো হওয়ায় এ ক্ষেত্রে ভালো রেভিনিও আসছে। আগের চেয়ে বর্তমানে দলিল সংখ্যা কমে গেলেও রেভিনিও বাড়ছে। প্রতিটি অফিসে হেল্প ডেস্ক রয়েছে। টাকা পয়সার লেনদন ছাড়া ব্যাংক ও পে অর্ডারের মাধ্যমে ফিস, ট্যাক্সহ যাবতীয় খরচ আদায় করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কমপ্লেক্সের ভিতরে যাতায়াতের সুবিধা, নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সুবিধা মতো যায়গায় অফিস করতে হবে। নিজস্ব ভবনের ব্যাপারে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সাব-রেজিস্টার অফিস ভবন নির্মান প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকার ধামরাই উপজেলার কালামপুর সাব-রেজিস্টার অফিসটির নতুন ভবন নির্মানের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। খুব শীঘ্রই নির্মান কাজ শুরু হবে।

Calendar

December 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

http://jugapath.com