» আসাদ আর নাই রে…

প্রকাশিত: ২৭. জুন. ২০২০ | শনিবার

বিনেন্দু ভৌমিক


তপেশ ‘দা যখন ফোন করে বললেন: ‘আসাদ আর নাই রে!’— তখন ধক করে উঠেছিল বুকটা। গা-টা মোচড় দিয়ে উঠলো যেন। একটা চাপা আর্তনাদ কী বুকের গহন থেকে বের হয়ে ঠোঁটের কোনায় তখন প্রতিধ্বনি তুলেছিল? কী জানি! চেম্বারে তখন আমি রোগী দেখায় ব্যস্ত। রোগিণী বলে উঠলেন—’কী হয়েছে স্যার?’ আমি বললাম, ‘করোনায় আমার এক মনের মানুষ এই মুহূর্তে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল গো।’ এরপর আরো কজন রোগী দেখলাম, দেখতে হলো; কিন্তু প্রতিদিনকার মতো ওরকম আর মনোযোগী হতে পারলাম কই?

মানুষ যখন যথার্থ পারিবারিক শিক্ষায় বড় হয়ে ওঠে, যখন তার গ্রুমিংটা ভালো হয়ে যায় শৈশবেই, তখন তার আচার-আচরণ এক ভিন্নমাত্রা পায়, তার কথোপকথন ও চলনবলনে সেই শিক্ষার ডৌল ও সৌষ্ঠব ফুটে ওঠে অবলীলায়। এরকমই এক অতি ভদ্র, বিনয়ী, স্মিতহাস্য, সদালাপী মানুষ ছিল ডা. আসাদ, মানে আমাদের বন্ধু ‘রিঠু’।

বন্ধুদের আড্ডায় কতকিছুই তো ঘটে প্রতিনিয়ত। কতরকম শ্লীল -অশ্লীল আলাপচারিতায় মুখর থাকে সেইসব সভ্যদের সভা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আমি কোনো সরগরম ও অনুকূল মুহূর্তেও তাকে কোনো ‘স্ল্যাং ওয়ার্ড’ বলতে শুনিনি কখনো। কোনোদিন বেয়াদবের মতো রাগে নি, উচ্চবাচ্য করে নি। কারো সম্পর্কেই তার কোনো অনুযোগ বা অভিযোগ ছিল না। কোনদিন পরনিন্দা বা পরচর্চায় তাকে সময়ক্ষেপণ করতে দেখিনি।

মেডিকেলে পড়বার সময় সে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’-এর আদর্শে বিশ্বাসী ছিল। কিন্তু এ নিয়ে তার কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না। কারুর সাথে আদর্শ নিয়ে কোনো মতদ্বৈততায় সে জড়ায় নি কোনোদিন। এজন্য অন্যান্য দলের কারুরই সে বিরাগভাজন হয়নি। আমার সঙ্গে তার ছিল মিহি সখ্য। এমবিবিএস পাশ করার পর সেই সখ্যে চিড় ধরলো দূরত্ব ও চোখের অদেখার জন্য।

অনেকদিন বাদে ঢাকা গিয়েছিলাম উচ্চশিক্ষা লাভের আশায়। সেইসময় পিজিতে যেতাম নিয়মিত। ফাঁকে হাত খরচের জন্য শ্যামলীর আল-বিরুণী হাসপাতালে আমি আর ডাক্তার স্বপন কুমার সিংহ মিলে একটা ডিউটি করতাম। মানে সপ্তাহে ছটা ডিউটির তিনটি আমি করতাম, আর স্বপন করতো বাকি তিনটি। একদিনেই সেরে ফেলতাম ডিউটিটা। দুজনে মিলে বেতন পেতাম সাড়ে চার হাজার টাকা। মানে আমার ভাগে ২২২৫/-। আমি তখন বিবাহিত। কিছুদিন চলার পর বুঝলাম এভাবে পুরুষদের বিয়ের পর চলে না। একটা ভালো চাকরি খুঁজতে হবে। ঢাকায় তখন চাকরির বেশ ক্রাইসিস। ওখানে ডাক্তাররা সবাই ভিড় করে পড়াশোনার জন্য। তাই সকলেই ছোটখাটো একটা ডিউটি নিয়ে নেয় বা নিতে চায় শুধু পড়ার সময় হাতখরচটা চালিয়ে নেবার জন্য।

একদিন মহাখালীতে বিসিপিএস ভবনে এফসিপিএস পরীক্ষার ফর্ম তুলতে গেছি। গিয়ে আচমকাই দেখি আমার লাইনে ‘রিঠু’-ও দাঁড়িয়ে। বুকে জড়িয়ে ধরে কুশল বিনিময় করে জানতে চাইলাম— ‘কী করিস, কেমন চলছে দিনকাল?’ বললো— মিরপুরে ডেলটা ক্যান্সার হসপিটালে চাকরি করে। বেতন পনেরোর উপরে। আরো আনুষঙ্গিক মিলে বিশ-বাইশ হয়ে যায়। বললাম, আমাকেও ওখানে ঢুকিয়ে দাও বন্ধু। তখন সেখানে কোনো ভ্যাকেন্সি ছিল না। সে বললো সুযোগ হলে আমাকে জানাবে। সুযোগ হলো। একসাথে কাজ শুরু করলাম দুজনে। ডেলটাতে আমরা ছিলাম মানিকজোড়। পি এ বানু ম্যাডাম, নাহিদআপা, বকুল আপা, লাভলুভাই, রেজা ডাক্তার শরিফ’ভাই, তপেসদাদের মতো গুণী অগ্রজদের স্নেহ ও মমতায় বেশ কাটছিল আমাদের দুই বন্ধুর দ্বৈরথ। ওখানে কাজ করার সুবাদে জানলাম, ডাক্তারি করাটা একটা আর্ট, আর এরজন্য যে একনিষ্ঠতা দরকার, তা সর্বাংশেই সে আত্মস্থ করে ফেলেছে নিপুণ মুন্সিয়ানায়। ক্যান্সার রোগীদের কেমোথেরাপির অর্ডারশিট একটা বিষদ রচনার মতো। তা কী অবলীলায় সে মুখস্থ লিখে যায়! কত কত প্রোটকল! সব তার নখদর্পণে। তার কাছ থেকে এসব আমি শিখতে লাগলাম শিক্ষানবিশের মতো।

আমার সেই দুর্দিনের বন্ধু, আমার শিক্ষাগুরু, আমার দীক্ষাগুরু—সেই আসাদ, আমাদের রিঠু— আজ আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। দেশ একজন শিশু বিশেষজ্ঞকে হারালো, আর আমি হারালাম আমার এক পরম সুহৃদকে।

যা রে মুখপোড়া, যা। ঋণ শোধ করার কোনো সুযোগ তো আমার ছিলই না, রইলোও না। পরপারে যখন আবার বিসিপিএস-এর মতো আচমকা তোর সাথে আমার দেখা হবে, তখন পাশে বসে একটু কৃতজ্ঞতা জানানোর সুযোগ দিস ভাই।

বিনেন্দু ভৌমিককবি ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৬৯ বার

Share Button