আসুন আমরা স্বপ্ন দেখি

প্রকাশিত: ৮:৫০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০২০

আসুন আমরা স্বপ্ন দেখি

সুহেলী সায়লা আহমদ
পৃথিবীতে প্রতিটি শিশু জন্ম গ্রহণ করে অপার সম্ভাবনা নিয়ে। একটি শিশুর নিষ্পাপ হাসি ভুলিয়ে দেয় আমাদের সকল দুঃখ, কষ্ট,
ভেদাভেদ। এই শিশুকে নিয়েই আমরা স্বপ্ন দেখি। তাকে অবলম্বন করে বাবা-মা ভবিষ্যতের জন্য বেঁচে থাকেন। এই শিশু বড় হয়ে
প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, গবেষক বা অন্য কিছু হবে। রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পাশাপাশি সমাজ ও  সংস্কৃতির
ধারক ও বাহক হবে। তারাই গাইবে মানবতার জয়গান। শিশুদের নিয়ে এমন স্বপ্নতো দেখি আমরা। আমরা স্বপ্ন দেখি সুস্থ ও সুন্দর
আগামীর। একটি শিশুকে দিয়ে আমাদের এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে তাকে সত্য ও সুন্দরের পথ দেখাতে হবে। তাকেও স্বপ্ন
দেখাতে হবে। এই স্বপ্ন দেখানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে শৈশবে । এই স্বপ্ন তাকে নিয়ে যাবে সাহসী আগামী অভিযাত্রার পানে। এই স্বপ্নে
বিজ্ঞান থাকবে, চলচ্চিত্র, নাটক, থিয়েটার, গল্প, গান, নাচ, উপন্যাস, কবিতা, ছড়া, রূপকথা, চিত্রকলা, মূল্যবোধ শিক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষা
সবই থাকবে। স্বপ্নের এই উপাদানগুলো তাকে সুস্থ ও সুন্দর পারিবারিক কাঠামো এবং সুসংবদ্ধ সমাজ জীবনের চিত্র কল্প আঁকতে
সাহায্য করবে। এই চিত্রকল্পে থাকবেনা নারী পুরুষের ভেদাভেদ, থাকবেনা নারী ও শিশু নির্যাতন, থাকবেনা মাদকাসক্ত তরুন সমাজ,
থাকবেনা মূল্যবোধের অবক্ষয়। থাকবেনা ধর্ষণ কিংবা শিশু সন্তানের সামনে বাবা-মাকে খুন করার মত নৃশংষ ঘটনা।

আমরা যেন   একটু কষ্ট করে এগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে পারি ।
শিশুদের নিয়ে আমরা স্বপ্ন দেখবো এটাই স্বাভাবিক। এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে সবার আগে তাদের সুস্থ সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া
নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ ছোটবেলা বা  শৈশবেই তাকে তার ভবিষ্যৎ অবস্থান, পেশা ও সামাজিক সম্পর্কের সঠিক মোকাবেলা
করার জন্য মহড়া দিতে হবে। সমাজবিজ্ঞানীরা যাকে বলেছেন অহঃরপরঢ়ধঃড়ৎু ঝড়পরধষরুধঃরড়হ। এই মহড়া আনুষ্ঠানিক কোন
বিষয় নয়। আমাদের পরিবার ও সমাজে আমরা যে মূল্যবোধ, আচরণ ও ব্যবহার অনুশীলন করি তার মধ্য দিয়েই বড় হতে হতে
শিশুর এই মহাড়া হয়ে যায়। সিগমুন্ড ফ্রয়েড বলেছেন ব্যক্তি সবসময়ই সমাজের সাথে দ্বন্দের মাধমে টিকে থাকে।

তাই সামজিকীকরণ প্রক্রিয়া হচ্ছে আমাদের  সাংস্কৃতিক  মূল্যবোধ ও শরীরবৃত্তীয় ব্যাপারগুলোকে পোষমানানোর একটি প্রক্রিয়া।

ফ্রয়েড ব্যক্তির অহংকে  ব্যাখা করেছেন তিনভাবে। মানুষ জন্মসূত্রে যে সকল সহজাত প্রবৃত্তি লাভ
করে সেগুলোকে বলেছেন “ওফ”, তারপর তিনি বলেছেন  ব্যক্তির স্বাতন্ত্রবোধ, অহংবোধ, আত্মমর্যাদা কথা।
আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। বর্তমান পৃথিবীর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে তাকে অবশ্যই বিজ্ঞানমনস্ক‥ করে গড়ে
তুলতে হবে। কিন্তু পাশাপাশি তাকে মানবিকবোধে উদ্ধুদ্ধ হতে সাহায্য করতে হবে। তাকে রূপকথার বই পড়তে দিতে হবে।
সন্তানকে পাশে নিয়ে দেখা যায় এমন সুস্থ চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে। আপনার শিশুসন্তান যদি জিজ্ঞাসা করে ধর্ষণ মানে কি?
ইভটিজিং মানে কি? আপনি এর উত্তর কি দেবেন? তাই সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে হলে শুধু বাবা শিক্ষিত ও ক্সনতিকবোধে
উদ্ধুদ্ধ হলে চলবে না, মাকেও শিক্ষিত হতে হবে। নারী শিক্ষার পথ অগ্রসর করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখাতে হলে তার
ক্সশশব থেকেই তাকে সৃজনশীল কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত করতে হবে। সৃজনশীল কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের চিন্তার জগত
বিকশিত হবে এবং মানসিক বিকাশ সুস্থ ও যথাযথ হবে। চলচ্চিত্রকে বলা হয় সমাজের নান্দনিক দর্পন। এই চলচ্চিত্রে সেক্স ও
ভায়োলেন্সকে প্রাধান্য না দেয়াই ভালো। চলচ্চিত্র যদি সুস্থ পারিবারিক কাঠামো, সুস্থ শিক্ষাঙ্গন, সুস্থ সমাজ, সুস্থ সংস্কৃতি  ও জীবন
যাপন পদ্ধতি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক কাহিনী প্রাধান্য দিয়ে তার চরিত্রগুলো উপস্থাপন করে তবে তা অবশ্যই আমাদের স্বপ্ন দেখাতে
সাহায্য করবে।
তরুণরাইতো দেশের মূল চালিকা শক্তি। আমরা তারুণ্যের জয়গান গাইতে চাই। তরুণরাই আনবে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন।
শিক্ষা, রুচি আর  সংস্কৃতিতে     তারুণ্য হবে উজ্জ্বল আর অনবদ্য। তাই তারুণ্য তথা যুবশক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হলে আমাদের
ক্সশশবের দিকে ফিরে তাকাতেই হবে। নতুবা আমরা মাদকাসক্তি, ইভটিজিং, যে․ন হয়রানি এর মত আগ্রাসন থেকে বেড়িয়ে আসতে
পারবো না। আমাদের শ্লোগান হওয়া উচিত আমরা আনন্দঘন ক্সশশব চাই। আমরা পুতুল খেলার ক্সশশব, রঙিন  ঘুড়ি উড়ানোর ‣শশব,
বৃষ্টি ভেজা মাঠে হুটোপুটি লুটোপুটি খাওয়া  শৈশব  চাই। অর্থাৎ আমাদের সূতিকাগার আগাছা মুক্ত করতে হবে। অহেতুক মানসম্মত
সিলেবাসের নামে একগাদা বইয়ের বোঝা সন্তানের কাঁধে চাপিয়ে দেবার অধিকার কিন্তু আমাদের নেই। টিভি চ্যানেলগুলোতে
শিশুদের জন্য যেসকল প্রতিযোগীতামূলক অনুষ্ঠান হচ্ছে তাতে আমরা কেন শিশুতোষ নাচ, গান, ছড়া, কবিতার অনুশীলন করাচ্ছিনা?
শিশুরা কেন ক্সশশবেই বড়দের মত নাচ গানের অনুশীলন করবে? এ বিষয়ে আমাদের অনুসন্ধানী হতে হবে। তাই আমাদের
চ্যানেলগুলো হওয়া উচিত জীবনমুখী। তারাই শিশুতোষ  সংস্কৃতির  বিকাশ ও প্রচারের মাধ্যমে পারবে শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ
ঘটাতে। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জগদীশ চন্দ্র বসু, সত্যেন বোসদের ভুলে গেলেতো আমাদের চলবে না । তারাইত আমাদের
পাথেয়।
প্রমথ চৌধুরী  বলেছিলেন  যৌবনে   দাও রাজটীকা। প্রমথ চৌধুরীর এই কথার সূত্র ধরেই আমরা বলতে পারি এই রাজটীকা দেবার,
গ্রহণ করার ও বহন করার মত পরিবেশ তরুণদের দিতে হবে। অশ্লীলতা, খুনাখুনি, মাদকাসক্তি, অসুস্থ রাজনীতি, মূল্যবোধহীন
সমাজব্যবস্থা, প্রযু্িক্তর অপব্যবহার, ইন্টারনেট আর মেইলের মাধ্যমে যে․নতার ভয়ংকর ছড়াছড়ির জন্য কি শুধুমাত্র যুবক, তরুণ বা
কিশোর দায়ী? নাকি আমরা অভিভাবকেরা সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিচ্ছিনা? নাকি তার বয়সন্ধিকালীন সময়ে তার প্রকৃত বন্ধু হতে
পারছিনা? আসলে আমাদের সন্তান যখন তার শৈশবে তখন তাকে রূপকথার দেশে হারিয়ে যেতে সাহায্য করছিনা যেমনটা আমাদের
বাবা-মা, দাদা-দাদু আমাদের করেছেন। একক পরিবার, শিল্পায়ণ আর নগরায়ণের যুগ যন্ত্রনা প্রবীণ আর নবীনের মাঝে প্রকৃত
সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে সহায়ক নয়। বয়স্কদের  সংবেদনশীল সাহচর্য অবশ্যই তরুণদের অনেক বেশী   ধৈর্যশীল  ও সহনশীল হতে
সাহায্য করবে।বয়স্ক দের এই সহায়ক ভূমিকায় তরুণরা অবশ্যই সঠিক পথ চিনে নিতে পারবে। সুস্থ সুন্দর সাহচর্য ছাড়া আমরা
তরুণ, কিশোর, যুবকের কাছ থেকে সঠিক আচরণ আশা করতে পারিনা। তা ভেবে দেখার বিষয়।
শৈশবেই আমাদের সামাজিক শিক্ষাগুলোর উপর গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু আমাদের বর্তমান সামাজিক শিক্ষার ধরণ কেমন তা প্রশ্নের
সম্মুখীন। যে বয়সে আমার মাঠে বল খেলার কথা, রঙ্গীন ঘুড়ি উড়ানোর কথা, বাবার হাত ধরে মেলায় যাবার কথা, পুতুল খেলার
কথা সেই সময়টা যদি শুধুমাত্র ফেইসবুক, টুইটার বা কম্পিউটারে গেইম খেলেই কাটাই তাহলে কিছুতো আমাদের হারাতেই হবে।
তাহলে বলতেই হবে বিজ্ঞান আমাকে বেগ দিয়েছে, দিয়েছে যান্ত্রিক আবেগ আর কেড়ে নিয়েছে প্রকৃত আবেগ। কারন আমি “অসুস্থ
বোধ করছি” বা “আমার মন খারাপ” এই স্ট্যাটাস মুহুর্তেই আমার ভার্চ্যুয়াল বন্ধুদের কাছে  পৌঁছে  যাচ্ছে। অথচ এই বাসায় থাকা
স্বত্তেও আমার  ধৈর্শীযল বাবা, মা, ভাই-বোন সহজেই আমার শারীরিক বা মানসিক অবস্থার কথা জানতে পারছেনা। কারন তাঁরা
ইতিমধ্যেই জেনে গিয়েছে আমি ফেইসবুকে বসে থাকতেই বা কম্পিউটারে গেইম খেলতেই বা চ্যাট করতেই বেশী পছন্দ করি। এই
সময়ে আমার রুমে আসলে আমি বিরক্তবোধ করি।
সমাজ পরিবর্তন হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সমাজের পরিবর্তনের গতিকে আরো অনেক বেশী ত্বরান্বিত করবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই
বিকাশকে ইতিবাচকভাবে সমাজে কাজে লাগাতে হবে। আমাদের সামাজিক শিক্ষা ও সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া যদি সুস্থ সুন্দর ও
গঠনমূলক হয় তবেই সমাজে নারী পুরুষ সমান তালে এগিয়ে যেতে পারবে। সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়াতে যদি ছেলে আর মেয়ের
মাঝে তফাৎ ‣তরী করার মানসিকতা থাকে তাহলে আমরা ইভটিজিং, ধর্ষণ, অশ্লীল চলচ্চিত্র, মাদকাসক্তি ইন্টারনেটে অশ্লীল ছবি
ছড়িয়ে দেবার মত জটিল পরিস্থিতি থেকে বের হতে পারবো না।
আসুন আমরা তরুণদের স্বপ্ন দেখাই। মানুষকে ভালোবাসতে শেখাই। মানবিকতাবোধ উদ্ধুদ্ধ হতে সাহায্য করি। জীবনের প্রতিটি
পর্যায়ে অর্থাৎ ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত নীতি ক্সনতিকতা, আদর্শ ও মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেই। মূল্যবোধ
চেতনাগত বিষয় হলেও তা অর্জন করা সম্ভব। এটিইত আমাদের পরিচালনা করে। সাধুতা, ভালোবাসা, শান্তি, সুখ, ক্ষমা, দয়াশীলতা
ইত্যাদি মূল্যবোধগুলো আমরা জন্মসূত্রে পেয়ে থাকি। পাশাপাশি কিছু গুনাবলী যেমন শ্রদ্ধা, নম্রতা , দায়িত্বশীলতা,
সহযোগিতা, ন্যায়পরায়নতা, সারল্য এগুলোও তরুণদের যত্ন  করে অর্জন ও ধারণ করতে হবে যেন এগুলো অভ্যাস ও চর্চায় পরিণত
হয় এবং আচরণে প্রকাশ পায়।
 সহকারী অধ্যাপক (সমাজবিজ্ঞান), মানবিক বিভাগ, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়