শিরোনামঃ-


» ইন্দিরা গান্ধী কেন আমাদের কাছে স্মরণীয়

প্রকাশিত: ০৯. ডিসেম্বর. ২০১৯ | সোমবার

অধ্যাপক ডাঃ মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

ইন্দিরা গান্ধীকে ভুলে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয় ।

বাঙালির জাতীয় জীবনে সবচেয়ে গৌরবের মাসটি নিঃসন্দেহে ডিসেম্বর। কারণ ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টিয়ে নভেম্বর যখন পা দেয় ডিসেম্বরে, তখনই গোটা ক্যালেন্ডারটা শুধুই যেন লাল-সবুজ। এই ডিসেম্বরেই আজ থেকে ৪৮ বছর আগে হাজার বছরের পরাধীনতার শিকল ভেঙ্গে পৃথিবীর বুকে অভ্যুদয় ঘটেছিল একটি নতুন জাতি রাষ্ট্রের। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাঙালীরা পেয়েছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র- বাংলাদেশ। ডিসেম্বরের এক থেকে ষোলো পর্যন্ত প্রতিটি তারিখ বাঙালী আর বাংলাদেশের জন্য একেক কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশে পথচলায় প্রথমে ভুটান এবং পরবর্তীতে ভারত দ্বিতীয় রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে কোন্ কবে বায়ান্ন সাল থেকে বঙ্গবন্ধুর যে পথ চলা শুরু সেই বন্ধুর যাত্রায় তার অন্যতম মিত্র ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী সেই ষাটের দশক থেকেই। আর একাত্তরের ২৫ মার্চ ‘অপারেশন সার্চলাইটের’ নামে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী আর তার এদেশীয় দালাল-দোসররা ন’টি মাস ধরে যে বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল সেই কঠিন সময় প্রথম দিন থেকেই আমাদের পাশে ছিল প্রতিবেশী ভারত আর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী।

একাত্তরের ন’টি মাসে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার ভারতের সীমান্ত উন্মুক্ত করে দিয়েছিল বাংলাদেশের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মুসলমান-হিন্দু সব উদ্বাস্তুর জন্য। প্রতিবেশী ত্রিপুরার জনসংখ্যা সে সময় ছাপিয়ে গিয়েছিল আজকের বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শরণার্থীদের জন্য। বর্তমানে আট থেকে নয় হাজার জনসংখ্যার ত্রিপুরার যে সাব্রুম শহরে খাবার পানি সরবরাহ করা নিয়ে এত কথা, সেই সাব্রুমে বাংলাদেশী শরণার্থীর সংখ্যা সেদিন ছাড়িয়েছিল বিশ হাজার। ত্রিপুরার রাজ পরিবার তাদের প্রাসাদ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল আমাদের শরণার্থীদের জন্য। আর রাজ্যের তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের মুখ্যমন্ত্রী রাজ্য পুলিশের অস্ত্রাগার তুলে দিয়েছিলেন আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা আর মেঘালয়ে গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশী শরণার্থীদের অসংখ্য শিবির আর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একের পর এক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। একদিকে যেমন মেঘালয়ের সীমন্তবর্তী গ্রামগুলোর অধিবাসীরা ঘরবাড়ি রেখে চলে গিয়েছিলেন, যাতে বাংলাদেশের শরণার্থীরা তাদের ভিটাগুলোকে নিজেদের করে নিতে পারেন, তেমনি অন্যদিকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এবং বিএসএফের পোশাকে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রথম দিন থেকেই আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সীমান্তের ওপার থেকে গোলাবারুদ সরবরাহ করে আর প্রয়োজনে ভারি গোলাবর্ষণের মাধ্যমে সমর্থন যুগিয়ে গেছে। তারপর যখন নির্দেশ এসেছে তখন তারা আমাদের বাংলাদেশে লাল-সবুজ পতাকা ওড়ানোর তাগিদে অকাতরে রক্ত দিয়েছেন এদেশের মাঠে-প্রান্তরে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়ে শহীদ হয়েছেন সতের হাজারেরও বেশি ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা ও জওয়ান, যা একাত্তরে দেশমাতৃকার জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সংখ্যার চেয়েও বেশি।

একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সমর্থনে প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের যে ভূমিকা পৃথিবীর ইতিহাস তা অদ্বিতীয়। আর কোন প্রতিবেশী রাষ্ট্রই তার প্রতিবেশীর মুক্তির জন্য এমন সমর্থন দেয়নি, এত ত্যাগও স্বীকার করেনি। পাশাপাশি একাত্তরে ভারতজুড়ে সৃষ্টি হয়েছিল এক অদ্ভুত জাতীয় ঐক্য। বাংলাদেশের পাশে এক কাতারে দাঁড়িয়েছিলেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন আর সেইসঙ্গে বিরোধীরাও। আর এসবই সম্ভব হয়েছিল শ্রীমতী গান্ধীর প্রজ্ঞা আর আন্তরিকতায়। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও পরবর্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী ভারতীয় লোকসভায় বাংলাদেশকে সমর্থন দেয়ার পক্ষে জোরালো বক্তব্য রেখেছিলেন। অন্যদিকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত চষে বেড়িয়েছিলেন বাংলাদেশের জন্য সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে। এমনকি ভারত সরকার এজন্য তার পররাষ্ট্রনীতিতেও আমূল পরিবর্তন এনেছিল। যে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তি ছিলেন শ্রীমতী গান্ধীর প্রয়াত পিতা ও ভারতের এক সময়ের প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জহর লাল নেহরু, সেই পণ্ডিত নেহরুর দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সরকারই নেহরুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও শ্রীমতী গান্ধীর সরকার প্রথম দিনটি থেকেই সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের পাশে ছিল। বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের বিমানে চড়ে লন্ডন থেকে নয়াদিল্লী হয়ে দেশে ফিরেছিলেন ঠিকই, কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সেদিন লন্ডনের হিথ্রো বিমান বন্দরে একটি ভারতীয় বিমানও তৈরি ছিল। বঙ্গবন্ধু ভারতীয় কূটনীতিককে বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, আপনারা তো আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছেনই। আমি যদি এখন ওদের বিমানে দেশে ফিরি তাহলে ওদের স্বীকৃতিরও আর কিছু বাকি থাকে না। বঙ্গবন্ধুর এই বিচক্ষণতায় এতটুকু বিচলিত হননি মিসেস গান্ধী। নয়াদিল্লীতে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির সময় বঙ্গবন্ধুকে দেয়া হয়েছিল বীরোচিত সংবর্ধনা। আবার স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরে বঙ্গবন্ধু যখন আবারও ভারতে যান তখন বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে তার জন্মদিনের উপহার হিসেবে দ্রুততম সময়ে এদেশ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেন শ্রীমতী গান্ধী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেই যে কবে মার্কিনীরা ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল জার্মানি আর জাপানে, আজও তারা সেখানে বর্তমান। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে একটি বছরও সময় নেয়নি ইন্দিরা গান্ধীর সরকার।

অনেকে অর্বাচীনের মতো বলেন, এদেশ থেকে যাওয়ার সময় ভারতীয় সেনাবাহিনী নাকি সমস্ত ভারি অস্ত্রশস্ত্র, এমনকি কল-কারখানার মেশিনপত্রও খুলে নিয়ে গিয়েছিল। এই অর্বাচীনরা জানে না স্বাধীনতার পর প্রথম দু’বছর নিজে তেল আমদানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বে¡ও ভারত বাংলাদেশকে বিনামূল্যে জ্বালানি তেল সরবরাহ করেছিল। আর স্বাধীনতার প্রথম তিন বছরে ভারত থেকে বাংলাদেশ অনুদান হিসেবে পেয়েছিল পঁয়ত্রিশ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। পঁচাত্তরে বাংলাদেশে ফসলের বাম্পার ফলন হয়েছিল, যার সুফল বাঙালী পেয়েছিল ছিয়াত্তরে। অথচ চুয়াত্তরেই কিছু মানুষ মারা গিয়েছিলেন দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট তৈরিতে চুয়াত্তরের এই মানবসৃষ্ট মন্বন্তরের একটা ভূমিকা ছিল। আর মানবসৃষ্ট এই দুর্ভিক্ষটা সৃষ্টির পেছনে বড় ভূমিকা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। কিউবায় পাটের বস্তা রফতানির অপরাধে পিএল-৪৮০ স্কীমের আওতায় বাংলাদেশে পাঠানো চাল বোঝাই জাহাজ তারা ফিরিয়ে নিয়েছিল মাঝপথেই। পাশ্চাত্য যখন খেলছিল অন্ধকারের খেলা, একজন ইন্দিরা গান্ধী আর একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সামর্থ্যরে সবটুকুই তখন ছিল বাংলাদেশ ও বাঙালীদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার শ্রীমতী গান্ধীকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান করেছে। তার উত্তরসূরিদের হাতে বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরিরা তুলে দিয়েছেন চার কেজি নিখাদ সোনায় তৈরি সম্মাননা পদকÑ সোনার মানুষের জন্য সোনার মানুষের সোনায় মোড়ানো ভালবাসার স্মারক হিসেবে। কিন্তু একটি বাংলাদেশের জন্য একজন ইন্দিরা গান্ধীর যে অবদান তাকে শুধু চার কেজি সোনায় মাপা সম্ভব নয়। সত্যি বলতে কি, সম্ভব নয় কোনভাবেই। কোন কিছুতেই ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি আমাদের ঋণ শোধ হবার নয়। তারপরও ভারতের নয়াদিল্লী আর কলকাতার বুকে প্রধান দুটি সড়কের নাম যখন বঙ্গবন্ধুর নামে। বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী আর সেইসঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সুবর্ণজয়ন্তীকে সামনে রেখে আমরা কি পারি না ঢাকা শহরের বুকে একটি প্রধান সড়কের নামের সঙ্গে মহীয়সী এই নারীর নামটা জুড়ে দিতে?

প্রতিবছর ৬ ডিসেম্বর একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উদ্যোগে ভারতের বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের দিনটি উদ্যাপন করা হয়। গত পনেরোটি বছর ধরে এমনটি হয়ে আসছে। বরাবরই বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই অনুষ্ঠানটির প্রধান অতিথির আসনটি অলঙ্কৃত করে আসছেন আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ বছরের অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক-সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির প্রস্তাব করেছেন জাতীয় শূটিং কমপ্লেক্স থেকে পাকিস্তান হাইকমিশন পর্যন্ত গুলশান এ্যাভিনিউর নাম ‘ইন্দিরা গান্ধী এ্যাভিনিউ’ করার। গুলশান এ্যাভিনিউর ওপর যে স্থাপনাগুলো রয়েছে তার কোন্ কোনটির প্রেক্ষাপটে এবং পাশাপাশি ঢাকার বুকে এর গুরুত্ব বিবেচনায় এর চেয়ে ভাল প্রস্তাব অন্তত আমাদের বিবেচনায় আর দ্বিতীয়টি নেই।

লেখক : অধ্যাপক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও উপদেষ্টা রেডটাইমস ডটকমডটবিডি

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৪৬৪ বার

Share Button