শিরোনামঃ-


» এই ব্যাখ্যাকে এত সহজভাবে হেসে উড়িয়ে দিতে পারি না

প্রকাশিত: ০৭. মে. ২০১৯ | মঙ্গলবার

মীরা মেহেরুন

কোনো বাস থামছে না। সিদ্ধান্ত নিলাম, যে বাসটি থামবে উঠে পড়বো তাতেই। নরসিংদী থেকে ঢাকাগামী লোকাল গোছের একটি বাসে উঠলাম। সামনের দিকের সীট খালি না পেয়ে শেষের আগের দু’টি সীটে আমি আর আমার কন্যা বসে পড়লাম। আমাদের সঙ্গে আরো ৫ জন যাত্রী শেষের ৪ সীটে ঠাসাঠাসি করে বসলো। কথপোকথনে বোঝা গেল তারা পরস্পর পরিচিত। কোলাহল কমে গেল । বাস চলা শুরু হলে তাদের গল্প শুরু হলো। পেছনের একজন ভৈরব- ব্রাম্মণবাড়িয়ার ভাষায় গল্প বলছে যার সারবস্তু এরকম–

রাজাসাহেব তাঁর উজিরকে প্রশ্ন করলো, গতকাল তুমি আমার নিকট থেকে যে দশটাকা নিয়েছো তা কিভাবে খরচ করলে? উজির বললো, হুজুর পাঁচটাকা রেখেছি ব্যাংকে, আড়াই টাকা দিয়েছি পরকে, আর আড়াই টাকা দিয়েছি শত্রুকে। রাজাসাহেব খুব অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, ব্যাংকে রেখেছো বুঝলাম- পরকে আর শত্রুকে কেন দিলে? উজির সাহেব বললো, না হুজুর কোনোটাই বোঝেন নাই, ব্যাংকে অর্থাৎ ছেলের জন্যে পাঁচ টাকা, পরকে অর্থাৎ মেয়ের জন্যে আড়াই টাকা, শত্রুকে অর্থাৎ স্ত্রীর জন্যে আড়াই টাকা খরচ করেছি। রাজাসাহেব উজিরের ব্যাখ্যা শুনে স্বভাবসুলভ হাসলেন।
কিন্তু আমরা গল্পের এই ব্যাখ্যাকে এত সহজভাবে হেসে উড়িয়ে দিতে পারি না। এখানে ছেলেকে ব্যাংক অর্থাৎ লাভজনক বিনিয়োগ, মেয়ে অন্যের ঘরে চলে যাবে তাই মেয়ে হলো পর এবং স্ত্রীকে শত্রু বলা হচ্ছে কারণ এ দুটি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ অফেরৎ যোগ্য। এসব মানুষগুলো একবারের জন্য ভাবে না কন্যাসন্তান পুত্রসন্তানের তুলনায় ভালো কিছু করতে পারে , আর যে স্ত্রীকে সে পর বলছে সে-ই তাকে, তার গোটা সংসারকে গুছিয়ে ধরে রেখেছে যুগ যুগ ধরে এমনকি এই শত্রুই তার বংশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ধারক ও বাহক। লোকটি যে আপাদমস্তক অশিক্ষা আর কুসংস্কারে আবৃত এবং দারিদ্র্য তার সঙ্গে একই পদযাত্রায় সামিল তা তার চেহারা-পোশাক-আশাকে বোঝা গেলো। সে আরো পাঁচজন, দশজন এবং সমাজের বহুর মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে এই তথ্য।অশিক্ষিত মানুষের মাঝে এভাবে রোপিত হচ্ছে কুসংস্কারের মিথ। অনেক উচ্চশিক্ষিত পি এইচ ডি ডিগ্রীধারীরাও উজির সাহেবের মানসিকতা পোষণ করেন যার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত রয়েছে আমাদের এই সমাজে। সমাজবদলের জন্য বহুনিয়ামকের মধ্যে প্রথমে প্রয়োজন প্রকৃত ও জীবনমূখী- মানবিক মূল্যবোধনির্ভর শিক্ষা। গ্রামের এই অশিক্ষিত শ্রেণি ব্যাপকভাবে মাদ্রাসামূখী যেখান থেকে মাথায় করে তারা বয়ে নিয়ে আসছে কুসংস্কারের পাহাড় যা জগদ্দল পাথর হয়ে চেপে বসেছে গোটা সমাজের ঘাড়ে। এই পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহতার দিকে ধাবিত। যারা গ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ত তারা জানেন প্রায় প্রতিটি বাড়ির সঙ্গে একটি করে মসজিদ আর মাদ্রাসা গড়ে উঠছে।এসব মাদ্রাসাগুলোতে প্রধান বিষয়বস্তু হলো রাজনৈতিক বিদ্বেষ, ভিন্ন ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ, নারী বিদ্বেষ এবং কুসংস্কারের বিষ। বাংলাদেশের প্রায় নব্বই হাজার গ্রামের চিত্র একই। গ্রামবিচ্ছিন্ন হয়ে এ পরিস্থিতি উপলব্ধি করা কখনোই সম্ভব নয়। প্রয়োজনে পর্যবেক্ষক দল পাঠিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হোক এবং গতানুগতিক শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করে জীবনমূখী- বাস্তবভিত্তিক- মূল্যবোধনির্ভর পাঠ্যক্রম চালু করা হোক।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৪৮৬ বার

Share Button