শিরোনামঃ-


» একজন ব্যার্থ অভিনেতার কথা

প্রকাশিত: ১৪. ডিসেম্বর. ২০১৯ | শনিবার

মৃগাঙ্ক সিংহ

আমি একজন হদ্দ বোকা। এই কমপ্লিমেন্টটি অর্জন করেছি আমার বউয়ের কাছ থেকে। অনেক ভেবেচিন্তে দেখলাম কথাটার যথার্থতা আছে। হেলাফেলার নয়।
ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে আমার স্টাটাসের ছাত্ররা যেদিকে যায় আমি সেদিকটা পরিহার করি। গ্রাম থেকে আমার কৃষক বাবার অতি কষ্টে পাঠানো টাকায় চলি আমি। আমার উচিৎ ছিলো ক্লাস শেষে টিউশনি-টনি করে ইনকাম করা। যাতে বাবার কষ্ট খানিকটা কমে। সে বোধ আমার হয়নি। তাই আমি নিজের মনকে খুশী করবার জন্য অভিনেতা হবার জন্য চেষ্টা শুরু করি। এই প্রচেষ্টাকে আরো উস্কে দেয় আমার মজা লুটা কিছু বন্ধুরা। তারা বলে, তুমি তো দেখতে শুনতে মাশাল্লা- ইচ্ছা করলে তুমি নায়ক হতে পারবা। সত্যি বলতে কি আমি ওদের কথায় পটে যাই। এবং অভিনেতা হবার জন্য খাটা খাটনি জোরদার করি।
কিছুদিন পর : তখন আমি থাকতাম গ্রেট মীনা চৌধুরীর বনানীর বিশাল এক বাড়িতে। ওখান থেকে নিজে ড্রাইভ করে ইউনিভার্সিটিতে আসতাম। গাড়ী জগন্নাথ হলের ভিতর পার্কিং করে ক্লাসে যেতাম। ক্লাস শেষে কোন মতে মুখে কিছু দিয়েই অভিনয় মহড়ায় চলে যেতাম। তখন ঢাকা ‘উদীচী’ সত্যেন সেনের ‘অভিশপ্ত নগরী’ উপন্যাসের নাট্যরূপ দিয়ে মঞ্চায়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। আমি আর আশিসদা ( আশিস রায় ‘নদীর নাম মধুমতি’ সহ আরো অনেক সিনেমার অভিনেতা) অই নাটকের সাথে যুক্ত হয়ে যাই। নাটকের নির্দেশক বিখ্যাত বাচিক শিল্পী এবং অভিনেতা ভাস্বর বন্দোপাধ্যায়। ভাস্বরদা চেহারানুযায়ী অই নাটকের ‘কাদমিয়েল’ এর চরিত্রটি আমাকে দিলেন।
আমি আগে কখনো নাটক করিনি। বুঝুন ব্যাপারটা! তোপখানার উদীচী অফিসে মহাড়া শেষে আমি আর আশিসদা জগন্নাথ হলে ফিরে আসতাম। এসেই উত্তর বাড়ির ছাদে উঠতাম। অই ছাদে উঠা বেশ কঠিন কাজ ছিলো। ছোট্ট লোহার মই বেয়ে দুই ফুট বাই দুই ফুট সরু জরুরী নির্গমনের পথটি দিয়ে ছাদে উঠতে হোত- শরীরটিকে অর্ধেক করে। এই ঝুকি নেবার কারণ হোল এখানে অভিনয় প্রাকটিসের সময় কেউ ডিস্টার্ব করতে আসে না। আশিসদা আর আমি ছাদের এই নিরাপদ জায়গায় মন খুলে অভিনয় প্রাকটিস করতাম। ওখান থেকেই আমরা শুনতে পেতাম জগন্নাথ হলের উপসনালয়ের গেস্ট হাউস থেকে সঞ্জয়দার গানের রেওয়াজ। ( বিখ্যাত শিল্পী সঞ্জয় রায়)। দিনের পর দিন আমি আর আশিসদা ওখানে প্রাকটিস করে যেতে থাকি। কিন্তু এ্যাতো কিছুর পরেও আমার অভিনয় ভাস্বরদার মনপুত হয় না। আমার উচ্চরণ ত্রুটির জন্য মহড়ায় নাটকের নির্দেশক ভাস্বরদার কাছ থেকে ঝাড়ি খাই প্রতিদিন। আমি খুলনা অঞ্চলের মানুষ হবায় আমার “চ” এবং “স” উচ্চারনে গোলমাল দেখা দেয়। এদিকে ভাস্বরদা আমার চেহারা দেখে চরিত্র নির্বাচন করেছেন- এখন উচ্চরনে এই ঝামেলা! বিপদ ঠ্যাকাতে ভাস্বরদা আমার সংলাপ বদলিয়ে চ এবং স মুক্ত করেন। তার পরেও আমার আড়ষ্ট সমস্যা দূর হয় না। খেসারত হিসেবে আমার “অভিশপ্ত নগরী” থেকে সরে যেতে হোল। পরে আর মঞ্চ নাটকে অভিনয়মুখো হতে সাহস পাইনি।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩৭৩ বার

Share Button