» একজন সুফিয়ার গল্প

প্রকাশিত: ২৬. নভেম্বর. ২০১৭ | রবিবার

 

শিরীন ওসমান 

সুফিয়া আমাদের গ্রামবাংলার দরিদ্র মৎস্যজীবির কন্যা।

ওরা ছয় বোন তিন ভাই। নরসিংদী বাড়ী। ছোট বেলা স্কুলে যেতো অন্যদের সাথে দলবেধে ।উচ্ছল কৌতুহলি স্বভাব সুফিয়ার। তার বাবার সাথে মাছ ধরায় সাহায্য করতো। হাটে গিয়ে মাছ বিক্রি করতো। বাবার বিশেষ আদরের মেয়ে।বছর বারো বয়স যখন সুফিয়ার,ওর বাবা তাদের এলাকার এম পির বাসায় কাজে দিয়ে দেয়। সুফিয়া ঢাকা চলে আসে।ওর বড় দুই বোন,ওরাও ঢাকায় বাসা বাড়ীর কাজই করে।

যথাসময়ে বড় বোন মেজো বোনের বিয়ে দিয়ে দেন তাদের বাবা। সুফিয়ার বয়স যখন পনেরো বছর, তখন শোনা গেলো সুফিয়া একটি ছেলেকে ভালবেসে নিজে নিজে বিয়ে করে ফেলে। ওর বাবা এতে বেশ আহত হন।বিয়ের পর সুফিয়া ঢাকাতেই শ্বাশুরীকে নিয়ে স্বামীর সংসার শুরু করে। কিছুদিনের মাঝেই তার পেটে সন্তান আসে। পোয়াতি সুফিয়ার কষ্টের জীবন শুরু হয়। স্বামী ও শ্বাশুরীর অবহেলা সইতে না পেরে ভরা পেট নিয়ে সে বাপের বাড়ীতে রওনা দেয়।

বাবা মা সুফিয়ার হাল দেখে তাদের রাগ,কষ্টে পরিনত হয়। যথা সময়ে ছেলের জন্ম হয়। ছেলের বয়স এক বছর। সুফিয়া সিদ্ধান্ত নেয় সে কাজ করবে। নরসিংদী তে অনেক গার্মেন্টস ফেক্টরী গড়ে উঠেছে। সেখানের একটি সোয়েটার ফেক্টরীতে কাজ নেয়।পরিশ্রমে সুফিয়ার শরীর ভেঙে পড়ে। সে আবার বাসায় কাজ করবে মনোস্থির তরে। ওর এক আত্মীয় আমার বাসায় কাজ করতো। সেই সুফিযাকে আমার বাসায় এনে দেয়।

আমার বাসায় থেকে সে আমার একজন ভাল সাহায্যকারী হয়ে উঠে। চট করে সব বুঝে নেয়।ওর বাবা আমাকে আপা ডাকতো। ডায়বেটিক রোগী। পায়ের আঙ্গুল গ্যাংগ্রিন হওয়া থেকে রক্ষা পায়। আমরা চিকিৎসা করিয়েছি বলে শুকরিয়া জানাতো সবসবসময়।

সুফিয়র স্বামী মাঝে মাঝে ফোনে এটা সেটা বলে ভয় দেখাতো। সুফিয়া শেষ পর্যন্ত স্বামীকে তালাক দেয়। ওর স্বামী তালাকের আগেই বিয়ে করে ছিলো। সুফিয়া একসময় জানায় সে জর্ডানে যাবে। সেখানের গার্মেন্টস ফেক্টরীতে চাকরী করবে। বেতন ভালো। সুফিয়া চলে যায় জর্ডান। মাঝে মাঝে ফোন করতো। জর্ডানে গিয়ে সে তার বাবার পুরো সংসারের দায়িত্ব নেয়। ছোট ভাই বোন এবং নিজের ছেলের পড়াশোনার খরচ চালায়। ভাইয়ের বিয়ে বোনের বিয়েতে বড় ধরনের সাহায্য করে। বাবার চিকিৎসার কোন ত্রুটি রাখে না।

ওর সবচেয়ে বড় যে গুন সেটি হলো ,সব পরিবেশে সে মানিয়ে নিতো এবং হাসি খুশী থাকতো। তার কর্ম স্পৃহা দুর্দান্ত। তার বাস্তব বোধ বেশ শানিত। বিয়ের কথা বললে বলতো আবার বিয়ে হলে একি অবস্থা হবে। তার নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস ছিলো।ছোটবেলা থেকে কাজকে ভালবাসতো।

জর্ডানে তার চারবোন নিয়ে যায়। তারা সবাই বিবাহিত। সুফিয়াকে দেখে তাদের স্বামী এবং শ্বশুর বাড়ী উৎসাহ সহো সুফিয়ার বোনদের জর্ডানে পাঠায়। স্বামী শ্বাশুরী তাদের বাচ্চা সংসার সামলায়। পাঁচ বছর কাজ করলে তাদের সংসার সমৃদ্ধ হবে।এভাবেই বহু প্রান্তিক পর্যায়ের নারী তাদের নিজের সংসার এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

সুফিয়ার পিতার ইন্তেকাল হয়। কিন্তু সে আসতে পারে নাই। ভীষন কান্না করেছিলো আমাকে ফোন করে। আমাকে বলে, খালম্মা, আমার হজ্জ্ব করার ইচ্ছা আছে।সে তার মাকেও হজ্জ্ব করাবে বলেছে। পাঁচ বছর পর একসপ্তাহ আগে দেশে এসেছে। চার সপ্তাহের ছুটিতে। আমার বাসায় এসেছিলো। মোরগ পোলাও পায়েস রান্না করে খাওয়ানো। আমার মেয়ে ও আমাকে গীফট দিলো। বললো, খালাম্মা, আপনার কাছে আমি অনেক কিছু শিখেছি। আপনি যেভাবে জীবন যাপন করেন, সেগুলো থেকেই শিখেছি। আমি বললাম, আমি তো তোকে অনেক বকেছি। আসলে তোর নিজের গুনে তুই নিজেকে এ পর্যায়ে এনেছিস।

সুফিয়ার বয়স এখন তিরিশ।তার প্ল্যান আরো পাঁচ বছর কাজ করবে। নিজের জমিতে ঘর বানাবে।ব্যাবসার জন্য দোকান নিবে। ছেলের বয়স বারো। আঠারো বছর হলে তার ছেলেকেও জর্ডানে পাঠিয়ে দেবে। সুফিয়া যেখানে কাজ করে, সেখানে তার সুখ্যাতি আছে। ওর রেফারেন্সে লোক নিতে তাদের আপত্তি নেই।

জর্ডানের জীবন কেমন জানতে চাইলাম। সে রানি রানিয়ার অনেক তারিফ করলো। তিনি অনেক সামাজিক কাজে জড়িত । জর্ডানে কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের উত্তক্ত করলে কঠোর শাস্তি।এগুলো রানির কারনে সম্ভব হয়েছে।তারপরেও অনেক অঘটন হয়। বাসার কাজে যারা আছে তাদের জীবন দুর্বিসহ। সুফিয়া জানালো, আরব জীবন খুব বোরিং। টাকা পয়সা খরচ করা হয় কেনা- কাটা, খাওয়া- দাওয়ায়। বাড়ীঘর রাজকীয়। কিন্তু জীবন উপভোগের জন্য অন্য আর কিছু নাই।সিনেমা থিয়েটার কিংবা অন্য কিছু , যেগুলোতে মন প্রফুল্ল থাকে সেগুলোর চর্চা নাই। বলে,আমাদের দেশ গরীব হলেও মানুষ স্বাধীন।আরব নারী পুরুষের কাছে দৈহিক সম্পর্কই হলো তাদের উপভোগের একমাত্র বিষয়। আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। বললাম, তুই সুখী তো সেখানে। সে জানালো, “তার কাজ আছে, ঘরে ফিরে বান্ধবীদের সাথে আড্ডা দেই। টিভি দেখি, দেশে কথা বলি। মাঝে মাঝে ঘুরতে যাই।” সুফিয়া তার মনের মত জীবন গড়ে নিয়েছে তার নিজ গুনে। ওর বাকী জীবন ভালভাবে কাটুক, এই প্রার্থনা করি।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩৮৩ বার

Share Button