» একটি অফিস ও চাওয়া পাওয়ার হিসেব…

প্রকাশিত: ২২. আগস্ট. ২০২০ | শনিবার

সদেরা সুজন

আহামরি কখনোই চাইনি। সামান্য ভালো কিছুতেই আমার আনন্দ। সবকিছুতেই শখ আছে কিন্তু করার মত দক্ষতা, যোগ্যতা কিংবা ক্ষমতাও নেই। প্রকাশনা, ডিজাইন, ফটোগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফি, ভ্রমণ সবই আমার নেশা, আর নেশা থেকেই পথচলা। মাস নয়, বছর নয়, যুগের পর যুগ যুক্ত হচ্ছে এসব নেশায় পিছনে দৌঁড়ানোর পরিধি। নাম কিংবা খ্যাতির জন্য নয়। এখানে আমার চাওয়া-পাওয়া, লাভ-লোকসানের হিসেব করিনি ( সারা জীবনতো লোকাসানই দিয়ে গেলাম)। একটা জীবন কতইবা দীর্ঘ? মানুষের যে শখ তা সম্ভব হলে পূরন করা উচিৎ বলে আমি মনে করি, বিশ্বাস করি। ছাত্রজীবন থেকেই এসব নিয়ে চলতে শুরু করলেও এখন বাংলাদেশে থাকলে হয়তো তা সম্ভব হতো না, ফলে কানাডার এই প্রবাস জীবনে কষ্টকঠিন সময়ের মাঝেও করে যাচ্ছি শুধু পরিবারের মানুষের সমর্থন আর সহযোগিতা আছে বলেই নয়তো কি সম্ভব হতো? শখের কাজে আনন্দটাই আলাদা! এসব কাজ করতে প্রতিদিন অনেক অবিশ্বাস্য সময় (একটি ভিডিও সম্পাদনা করতে কয়েক ঘন্টা চলে যায়, বিশ-ত্রিশ মাইল ড্রাইভ করে ছবি তোলা, সম্পাদনা, ফেসবুকে দেওয়া মাঝে মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে পাঠানোর কাজ করতে হয়) সময় ব্যায় করতে হয়, পরিবার-পরিজনকে সময় দেওয়া সম্ভব হয়না, তারপরেও সবাই আমাকে উৎসাহ দিচ্ছে, প্রেরণা-সাহস এবং সহযোগিতার হাত প্রসারিত করছে, তা কি কম কথা?
নিজের পরিবারের সদস্যরা যা করছে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাবোধ জানাতেই হয়। আমার অগোছালো জীবন জেনেই আমার জীবনের সহযাত্রি হয়ে রুবী এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের সংসার। জীবনের দুর্গম পথ অতিক্রম করে দেখি আমার সন্তানরাও তাদের মা’র মতো হয়েছে। প্রতিটি দিন, প্রতিটি ক্ষণ আমাকে উৎসাহ, প্রেরণা এবং সহযোগিতা করছে। তাহলে কার মন খারাপ থাকে বলুন?
আমার এ লেখায় প্লিজ আমাকে কেউ ‘সেল্ফ-প্রমোটার’ বা ‘আত্ম-প্রচারকারী’ ভাববেন না, কোভিড-১৯ এর কারনে কোথাও যেতে পারছিনা বলে মনের সান্ত্বনা দিতে গিয়েই কিছু শব্দ সংযোজন।
দেশের কথা নাহয় বাদই দিলাম, সেই কবে, ১৯৯৬ সালে মন্ট্রিয়ল থেকে প্রকাশিত দেশদিগন্ত নামে প্রবাস থেকে প্রকাশনার পথ চলা যা এখনো চলছে…। সিবিএনএ২৪ডটকমের প্রতিদিনের অনেক কাজ। বাংলাদেশে যারা কাজ করছেন তাদের পাশাপাশি সম্পাদক হিসেবে প্রতিটি সংবাদ দেখার কাজ করতে হয়। ফলে কাজ শেষে ঘরে ফিরেই কম্পিউটারে বসে থাকতে হয়। নিউজগুলো দেখা, সম্পাদনা করা নতুন নতুন প্রবাসীদের সংবাদ দেওয়া, ডিজাইন ও ভিডিওগ্রাফি করা কত কি? এসবই কিন্ত করতে হয় আমার আসল কাজ (যা জীবন নির্বাহের জন্য প্রতি সপ্তাহে প্রায় সাতদিনই কর্মক্ষেত্রে যেতে হয় এবং একটি বিশাল বহরকে পরিচালনা করতে হয়) করার পর বাসায় ফিরে!
বাড়িতে ফিরে এসব কাজ করতে হতো আমার ঘরের লিভিংরুমের একপাশে বসে সঙ্গে টিভি দেখে দেখে। আমার সন্তানরা ভাবলো, আমি হয়তো মন দিয়ে আমার প্রিয় কাজ করতে পারছি না। আমার মেয়ে মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করে ফলে আমার অজান্তেই তারা সিদ্ধান্ত নিলো আমার জন্য একক একটি অফিস করবে যেখানে বিশাল ডেস্ক থাকবে প্রয়োজনে আরও দু’তিনজন কাজ করতে পারবে।
সত্যি সত্যি, অবাক হওয়ার মতো! একটি রুমে বিশাল ডেস্ক বানিয়েছে, সঙ্গে বহু জিনিস দিয়ে একটি বড় অফিস করে দিয়েছে। কি নেই সেখানে? ডেস্কটপ, লেপটপ, আইপেড, তৈলচিত্র, কাঠের ডিজাইন করা আর্ট কত কি? যা বলা যায় পুরোপুরি প্রফেশনাল অফিস। গর্ব করি আমাদের সন্তানদেরকে নিয়ে। ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতাতো থাকছেই। যেকোন বাবা-মা এর চেয়ে বেশি কি কিছু চায়? অন্তত আমি চাই না। সারা জীবন যদি এমন ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাবোধে অটুট থাকে তবেই জীবন আমার স্বার্থক।
সামারের শুরুতেই আমার ব্যস্ততা স্বাভাবিক জীবনের চেয়ে বেশী অতিক্রম করে। কানাডার ২৯ বছরের মধ্যে প্রায় দেড়যুগ ধরে মূলধারার সব ফেস্টিভ্যাল, অনুষ্ঠান কাভারেজ করছি শুধু এবছরই কোভিড-১৯ এর জন্য সম্ভব হচ্ছে না। সেদিনের সে কি আনন্দ ছিলো? সারাদিন কাজ করে এসে ক্লান্ত হলেও সন্ধ্যায় ফেস্টিভ্যালে গিয়ে ছবি তোলা সংবাদ সংগ্রহ করা, প্রেসরুমে আড্ডামারা, বিভিন্ন দেশের সাংবাদিক কলাকুশলীদের সঙ্গে পরিচয় হওয়া আনন্দ ভাষায় ব্যক্ত করার মতো নয়।
ঘরের ভিতরে কয়েক শ’ ইনভাইটেশন কার্ড জমেছে যা চোখ পড়লেই মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে কারণ পেন্ডামিকের জন্য এবছর কোথাও কোন অনুষ্ঠান হচ্ছেনা। কোন ফেস্টিভ্যাল নেই, নেই বড় কোন অনুষ্ঠানমালা ফলে কিছুটা হলে মন খারাপ হবারই কথা।
প্রতি সেপ্টেম্বরেই আমরা দু’চার দিনের জন্য হলেও কোথাও যাওয়া হতো, দু’বছর ধরে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের অনুষ্ঠানে যাওয়াতো আমাদের দু’জনের একান্তে কিছুটা সময় কাটানোর পর্বই বলতে হবে। নিউ ইয়র্ক শহরটা যতই দেখেছি ততোই দেখতে ইচ্ছে করে। বাঙালি পাঁড়ায় খাওয়া, আড্ডামারা আর পরিচিতি বন্ধুদেরকে নিয়ে সময় কাটানো সেটি একটি ভিন্ন ধরনের আনন্দ আমার কাছে। তাই ইচ্ছে করেই ‘রথ দেখা কলাও বেচার মতো’ জাতিসংঘের অনুষ্ঠানে যাওয়া। এবার আর তা হচ্ছেনা। করোনা নিয়ে গেলো সব। নিউইয়র্ক গেলে বাপ্পাদা আর বৌদির আদর যত্ন ছিলো না ভোলার মতো, কিন্তু বৌদিও চলে গেলেন কোভিড-১৯ এর সঙ্গে সংগ্রাম করে! এ কষ্ট কি সহজে ভুলতে পারবো!
সবাই ভালো থাকবেন। অনেক শুভ কামনা সবার জন্য।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৩১ বার

Share Button