» একটি কাঠগোলাপ এবং আমার আম্মা

প্রকাশিত: ০১. অক্টোবর. ২০১৮ | সোমবার

 

তামান্না জেসমিন

দশঘন্টা জার্নি শেষে রিলিফ পেলেন আমার আম্মা , পৌঁছে গেলেন তার নিজস্ব গন্তব্যে l গত ২৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা থেকে এপোলোর আই সি ইউ র সামনে আমাদের সবার অপেক্ষা l
আমার এই হৃদয়টা দুমড়ে মুচড়ে একাকার হয়ে যাচ্ছিলো .. শুধু অনুরোধ করছিলাম – মাগো একবার ফিরে আসো l আমি তোমারে আদর করে খুব কাছে কাছে রাখবো , কোথাও যাইতে দেবোনা মা l তোমার ঐ শান্ত নির্মল গভীর চোখের ভাষা আমি বুঝতে পারিনাই মা l তুমি কি আগেই জানতা যে তোমার যাবার সময় হইছে? আমিতো একবার ছোট্ট শিশু হইতে চাইছিলাম, চাইছিলাম তোমার বুকে মাথা রেখে চক্ষু বন্ধ কইরা থাকতে? না বলে আপনি কেনো গেলেন আম্মা ? আমাকে না বলেতো কোথাও যান না! কিসের অভিমান ছিলো? এটা শাস্তির মতন মনে হইতেছে আমার! এমন কঠিনতর শোক কতকাল আমি বয়ে চলবো মা , বলো আমারে! আপনি তো সুস্থ ছিলেন , সাহসী ছিলেন আম্মা!
চোলে যাবার জন্য দশ ঘন্টার নোটিশ? হাসিখুশি , সহজসরল মানুষটি কে বিদায় নিতেই হলো?
ইসিজি , পাচটি ব্লক , এনজিও গ্রাম , লাইফ সাপোর্ট , অতপর অন্যত্র যাত্রা … ! আপনার হৃদয়ের অন্তরায় এই পাচটি ব্লকের খবর তো আমরা ঘূনাক্ষরেও জানতে পারিনি , আপনিও কি তা জানতেন?

২৪ তারিখে তাকে সাজানো হলো শেষকৃত্যের জন্যে l ঢাকার সমস্ত আত্মীয়স্বজনের ঢল , আজাদ মসজিদ , জানাজা তারপর আমাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে ছোটা l বাড়ির নির্দিষ্ট স্থানে তাকে রেখে আসতে হবে l আমাদের গাড়ির সামনে ছুটে চলছিলো ফ্রিজারে শুয়ে আমার আম্মা l এই দৃশ্য সহ্য করার মতন অক্ষমতা , গাড়ির অবস্থান পরিবর্তন হলো l সাথে আমাদের কাকুর গাড়ি ,এডভোকেট আমিনুল ইসলাম মিলন, তিনি আমাদের শক্তি জোগাবার চেষ্টা করছেন l ওদিকে ফ্রান্সে অবস্থান রত আমার ছোট বোন ও তার পরিবার বেদনায় মুহ্যমান l ছোট বোন মিতুকে জানাতে পারেনি তার জীবনসাথী উদ্দিন হেলাল , মিতুর ধারনা , আম্মা একবার ওকে দেখতে পেলে সুস্থ হয়ে উঠবেন l একদিনেই টিকেট করে চলে আসা , ঢাকা এয়ারপোর্ট হয়ে কানেকটিং ফ্লাইটে যশোর বাকিটা পথ ওর শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়ের সাথে বাড়িতে আসা , কিন্তু হায়! আম্মার সাথে দেখা হলো কিন্তু কথা হলোনা আর …
আম্মা , আমার প্রিয়তম মানুষ আমার পাপার সাথে , আপনার বড় মেয়ে রুবির সাথে ওপারে দেখা হয়েছে কি? আমাদের জানার কোনো ক্ষমতা নেই …

২৫ তারিখ বিকেলে আমাদের আম্মাকে মাটির ঘরে রাখার সময় হঠাৎ একমিনিটের এক পশলা হালকা বৃষ্টি l এর মানে কি ? একি তবে কান্না? কই আমার চোখ বেয়ে আর জল পড়ছেনাতো ! আমার চোখ থেকে সব জল শুষে নিছে ঐ আকাশ! আমাদের আম্মা এখন দৃষ্টির আড়ালে l আমার শরীর বকের সাদা ছেড়া পালক হয়ে আকাশ ময় উড়ছে , খুব দ্রুত উড়ছে …
আম্মা , আমিও আপনার মতন নির্বাণ চাই , নির্বাণ চাই , নির্বাণ চাই …

আম্মা , আপনাকে আমি ভালবাসি , ভালবাসি , খুব ভালবাসি l কিন্তু একথা কখনো মুখে উচ্চারন করা হয়নি l এ অক্ষমতা আমায় যন্ত্রণা দেয় , নিজেকে অপরাধী , ঘৃন্য মনে হয় l আম্মা আমিতো আপনার শরীরের একটি পার্ট তেমনি আপনিও অথচ কি দুর্ভাগা এই আমি! ভালবাসলেও কেনো মুখে বলা হয় নি সেকথা? কেনো মানুষকে ভালবাসলে সেকথা মুখে উচ্চারন করতে পারিনা? এই গভীরতর বেদনায় দেখেছি আত্মীয়স্বজন , পাড়াপ্রতিবেশী , দেশের শত শত , হাজারো মানুষের থেকে পাওয়া সমবেদনা , সাপোর্ট , ভালবাসা l সবার বাড়ি থেকে আজো ননস্টপ পাঠানো খাবার যত্ন করে মুখে তুলে খাইয়ে দেওয়া বাড়িয়ে দেওয়া হাত – এই সীমাহীন কৃতজ্ঞতার মূল্য যে অসীম , অনেক অনেক অনেক ধন্যবাদ সবাইকে , অনেক অনেক ভালবাসি সকল কে! হে মানব , তোমার আর আমার মধ্যে কিসের পার্থক্য? তোমাদের কষ্টার্জিত পরিশ্রমের খাদ্য আমার শরীরে এনার্জি হয়ে মিশে গেছে , অর্থাৎ এখন তুমিও যে আমার দেহের একটি অংশ l

আম্মা , গত ২১তারিখ শুক্রবার সকাল বেলা আপনি ৫ দিনের জন্য বসুন্ধরায় বোন লাকির বাসায় যারার দিন বলেছিলেন ” আমি যাই … ” আপনাকে যেতে দেবার জন্য আমার মন টা কেনো যেনো সায় দিচ্ছিলো না l তাই বিছানায় বসে আমি আমার বারান্দার বাগানের কাঠগোলাপ গাছটির দিকে তাকিয়ে ছিলাম , আপনার দিকে ফিরে তাকাতে কেনো ভয় পাচ্ছিলাম জানিনা , কেনোবা যেতে মানা করতে পারছিলাম না l ধীরপায়ে আপনি চলে গেলেন আর আমি শীতল চোখে তাকিয়ে রইলাম এপর্যন্ত ফুল না দেওয়া বিশাল কাঠগোলাপ গাছটির দিকে l
যার শুরু আছে তার শেষ আছে , আর শেষ গিয়ে শুরুর জন্ম দেয় l এই চলমান প্রকৃয়ায় ভাঙ্গাগড়া অব্যাহত , অব্যাহত আমাদের আসা যাওয়া l দশ ঘন্টা জার্নি শেষে আপনি এখন কোন নব সৃষ্টির মাঝে নতুন পৃথিবীর আলো দেখতে চোখ মেলে তাকাচ্ছেন তাতো জানিনা মাগো ! গত পরশু দিন ঢাকায় ফিরে এলাম , ভাই বোনরা এখনো বাড়িতে l আমার ঘরের বারান্দায় হঠাৎ তাকাতেই দেখি একটি মাত্র কাঠগোলাপ ফুটে আছে l কাঠগোলাপরা তো ফোটে থোকায় থোকায় , একাধিক ফোটে কিন্তু আমি আরো একবার চিতকার করে কাদলাম একটিমাত্র ফোটা কাঠগোলাপের দিকে তাকিয়ে ; বল্লাম ,আম্মা , আপনাকে ভিসন ভালবাসি …
আমাদের আম্মার প্রিয় রং গোলাপী হলুদ মিশ্রিত একমাত্র ফুলটি পাতার আড়াল থেকে আমার দিকে তখন হাসি হাসি মুখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে …

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩১১ বার

Share Button

Calendar

December 2018
S M T W T F S
« Nov    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031