» একাকীত্বে পুংসাধন

প্রকাশিত: ২৮. জুন. ২০২০ | রবিবার


শেলী সেনগুপ্তা
আমার শোবার ঘরের জানালা থেকে বাড়ির সামনের বিশাল দিঘিটা দেখা যায়। সকালবেলার রোদ এসে পড়ে জলে, তির তির করে কাঁপা জলে রোদের ঝিলিক, তীব্র আলো গলানো রুপোর মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কখনো কখনো চোখের তারায় তুলির পরশ বুলিয়ে দেয়। আমি প্রতিদিন সকালে এখানে এসে বসি। আমি মনে মনে এ পর্যবেক্ষণের নাম দিয়েছি আলোর বন্দনা। জলের বুকে ছড়িয়ে পড়া আলোর প্রতিবিম্ব দেখতে খুব ভালো লাগে। কিন্তু আশেপাশে থাকলে কেউ আমার মুগ্ধতা বুঝতে পারবে না।
সবসময় আমি আমার ভালোলাগাগুলো সযত্নে লুকিয়ে রাখি। আজকাল আমার ভালোলাগার জগতও অনেক ছোট। তাও আমি লুকিয়ে রাখি গর্ভস্থ ভ্রূণের মতো ভালোবাসার কোমল চামড়ার ভেতরে । যখন মন চায় বের করে দেখি। আবার লুকিয়ে রাখি।
শুধু সকালে নয় সন্ধ্যার সময়ও আমি এখানে বসি। পুকুরের জলে অস্তরাগ দেখতে ভালো লাগে। মনে হয় ছবি আঁকা শেষ হবার আগে কেউ যেন ভুলে রঙ ফেলে চলে গেছে। নিজের মনের ভাবি রঙ ফেলার সময় যদি তাকে দেখতাম তাহলে সবটুকু নিংড়ে নিতাম।
আমার গ্রামের বাড়ি যশোরে। পৈত্রিক প্রচুর জায়গাজমি পেয়েছিলাম। বিক্রি করে দিলাম। তাই বলে দূরের কাউকে দেই নি। আত্মীয় পরিজনের মধ্যে নামমাত্র মূল্যে জমিগুলো দিয়েই আমি চলে এসেছি। ঢাকার কাছেই নতুন তৈরি হওয়া ফ্ল্যাটটা বেশ কম দামেই কিনে নিলাম। নিরিবিলিতে থাকার জন্য আমি একদম টপ ফ্লোরে ফ্ল্যাট নিলাম, যার অর্ধেক ছাদ। এ ফ্ল্যাটের সামনের বারান্দা থেকে চমৎকার দিঘি দেখা যায় আর পেছনে সবুজের সমারোহ। যতদূর দৃষ্টি যায় বৃক্ষরাজি। আর ছাদে আমার পছন্দের গাছ। আমি পাতাবাহার পছন্দ করি। আজকাল নিজেকে ফুল থেকে দূরে রাখি।

একাকীত্বকে আপন করে নিয়েছি আমি। দীর্ঘদিন মানুষ থেকে দূরে থাকি আবার বলা যায় আমি মানুষকে আমার কাছ থেকে দূরে রাখি।
একজন বিশ্বস্ত কর্মচারী আছে, রান্না থেকে শুরু করে ব্যাংকের টাকাও তুলে আনে। কয়েক ঘন্টার মধ্যে ওর কাজ শেষ করে চলে যায়। একজন ড্রাইভার আছে, যার কোন কাজই নেই। সারা মাসে আমি দু’বারও বাড়ির বাইরে যায় না।
আমি ছবি আঁকি, বেশ কয়েক বছর ধরে এটাই আমার একমাত্র কাজ। এঁকে এঁকে আমার স্টুডিও ভরে ফেলছি। মানুষ থেকে দূরে থাকি কিন্তু আমার আঁকার বিষয় মানুষ। মানুষ নয়, পুরুষ মানুষ।
ভাবছি আর কিছুদিন পর একটা প্রদর্শনী করবো।
তবে জানি এজন্য আমাকে অনেক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
এজন্য মডেল ভাড়া করে আনি।
একটু অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার।

প্রদর্শনী হচ্ছে আঁলিয়স ফ্রঁসেজে। তিন দিনের প্রদর্শনী। প্রচুর লোক সমাগম হচ্ছে। আমি যাই নি, ঘরে বসে টিভিতে দেখছি। বেশ প্রশংসিত হচ্ছে। ছবি বোদ্ধা, ক্রিটিকদের ভীড়, সবাই শিল্পীকে খুঁজছে। আমি বসে আছি টিভির সামনে, টিভিতেই দেখছি সব। হাতে বোন চায়নার গ্লাসে ভোদকা, ওপরে বরফ ভাসছে।

সকাল থেকে ফোন আসছে, বেশ কয়েকটি পত্রিকা থেকে আমার সাক্ষাৎকার নিতে চাইছে। টিভি থেকেও ফোন করেছে। আমি কাউকেই সময় দিচ্ছি না। ভালো লাগছে না। আমার এতোদিনের একাকীত্বের দেয়ালে আঁচড় ফেলতে ইচ্ছে করছে না। বেশ তো আছি নিজের মতো। শেষে ফোন রিসিভ করা বন্ধ করে দিলাম।
সন্ধ্যায় অস্তরাগের প্রতিবিম্ব দেখতে বসলাম। আজ যেন সূর্যটা আমাকে হাসিমুখে বিদায়ী সম্ভাষণ জানাচ্ছে। আমারও মনে একই সাথে আনন্দ এবং বেদনার ফল্গুধারা বয়ে যাচ্ছে। কাঁদছি আমি, খুব নিরবে, অশ্রুহীন কান্নায় ভেসে যাচ্ছি।

বেশ সকালে পাখির কলকাকলিতে ঘুম ভাঙল, ঘাড় ব্যথা করছে, আরে আমি যে বারান্দার সোফাতেই ঘুমিয়েছিলাম। ঘরের ভেতরে এসে চায়ের জল চাপালাম। গিজার চালু করলাম। বেশ বড় এক মগ কফি নিয়ে বাথরুমে চলে গেলাম।
স্নান করতে করতে কফির মগে চুমুক দিচ্ছি।
শাওয়ারের উষ্ণ জল আমাকে ক্রমশ ক্লান্তিমুক্ত করছে। শোয়ার ঘরে মৃদুস্বরে গান বাজছে। খুব ভালো লাগছে।
স্নান করে বের হয়ে আজ আমি একটা সাদা শাড়ি পরলাম। কপালে বড় টিপ দিয়ে আবার এসে দাঁড়ালাম বারান্দায়। মনটা উড়ু উড়ু হয়ে যাচ্ছে। খুব ইচ্ছে করছে এই একাকীত্বের দেয়াল ভেদ করতে। আমি তা করবো না। অনেক দূরে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিলাম। সবুজ পেরিয়ে কে যেন আসছে। ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটছে। ক্রমশ এগিয়ে আসছে। আমি চিনেছি, ওকে আমি চিনি। আরো কাছে চলে এলো। এপার্টমেন্টের গেইটে কথা বলছে। জানি এখন আমার ইন্টারকমে রিং হবে। আমি বলবো,

  • ইয়েস, লেট হিম কাম.

আমার সামনে বসে আছে সে, ক্যামেরা রেডি, ক্যামেরা ওপাশে একজোড়া অনুসন্ধিৎসু চোখ আমাকে দেখছে।
আমি তো নিজেকে আড়াল করতে পারি। পাথরের মূর্তির মতো মুখ করে বসে আছি আমি। আমার হাতে শ্যাম্পেনের গ্লাস। মাঝে মাঝে দুলিয়ে নিয়ে চুমুক দিচ্ছি।

  • বলুন, কি জানতে চান?
  • কেমন আছেন?
  • কাম টু দ্য পয়েন্ট। যে জন্য এসেছেন তা বলুন।
  • এতো কিছু থাকতে আপনি এমন একটা সাবজেক্টে মন দিলেন কেন?
  • কেমন সাবজেক্ট?
  • মেইল ফিগার।
  • নিষেধ আছে নাকি?
  • না, তা হবে কেন? এর পেছনের কারণ জানতে চাইছি।
  • জেনে কি করবেন?
  • আমাদের টিভির শিল্প-সাহিত্যের অনুষ্ঠানে প্রচার করবো।
  • কি লাভ?
  • লাভ বলতে প্রচার, সবাই চায়, আপনি চান না?
  • প্রচারে আমার আগ্রহ নেই, তবুও বলছি, শুনুন, আমি দেখতে চেয়েছি পুরুষের দেহে এমন কি আছে যে নারী দেখলেই ধর্ষকামী হয়ে ওঠে। ছবি আঁকার সময় আমি মডেল নিয়েছি, শুধু ছবি আঁকি নি, আমি তাদের দেহের আনাচেকানাচে খুঁজে দেখেছি কি এমন উপাচার রয়েছে যা তাকে মায়ের বয়সী নারীকেও জোর পূর্বক ভোগ করতে উদ্বুদ্ধ করে।
  • পেয়েছেন?
  • বলবো না তো পেয়েছি কিনা।
    তবে আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আমাকে আরো একটি দেহ ব্যবচ্ছেদ করতে হবে।

সে হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
মোক্ষম অস্ত্রটা ছুঁড়ে দিলাম,আপনি আমার মডেল হবেন? ব্ল্যাংক চেক সই করে দেবো।

আমার সামনে বসা লোকটাকে একা করে দিয়ে আমিও প্রবেশ করলাম আমার একাকীত্বের চার দেয়ালে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৬৭ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031