শিরোনামঃ-


» এক যুবকের গল্প

প্রকাশিত: ১৩. সেপ্টেম্বর. ২০১৯ | শুক্রবার


হাসানআল আব্দুল্লাহ

কিছু দিন ধরে আপনাদের আমি এক যুবকের কথা বলে আসছি, যা কারো কারো ভালোও লেগেছে। কোনো কোনো অনলাইন সম্পাদক-বন্ধু স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ছেপেও দিয়েছেন। আপনাদের হয়তো মনে আছে মাত্র তেইশ বছর বয়সে সেই যুবক নিউইয়র্কের ক্যানেডি বিমান বন্দরে একটি সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশে অবতরণ করেছিলেন নব্বইয়ের ১২ সেপ্টেম্বর। পুরোপুরি ২৯ বছর আগে। শুরু করেছিলেন নতুন জীবন, যার কিছু কিছু আপনারা সকলেই জানেন। এখন তিনি পঞ্চাশ পেরিয়ে সামনের দিকে হাঁটছেন। একাত্তরে পিতা হারানো সেই যুবক গ্রামের একটি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে ভর্তির হয়েছিলেন রাজেন্দ্র কলেজে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তিনি কলেজের প্রফেসরদের প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। অন্তত প্রথম বর্ষ ফাইনাল পরীক্ষায় ইংরেজী প্রথম পত্রে তার প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতেই ব্যাপারটি রাতারাতি এমন হয়ে গিয়েছিলো। তিনি নাকি কলেজের সেই ব্যাচের পাঁচশ’ ছাত্রছাত্রীর ভেতরে ওই পত্রে সবচে’ বেশি নম্বর পান। এবং প্রতিটি ক্লাসেই শিক্ষক ঢুকে জিজ্ঞেস করতে থাকেন, তোমাদের মধ্যে এই নামটি কার, বাবা তুমি একটু উঠে দাঁড়াও তো! তোমাকে দেখি! যুবকের তখন এক ধরনের প্রাপ্তির তৃপ্তি হলেও, বার বার ওইভাবে বন্ধুদের সামনে উঠে দাঁড়াতে খারাপই লাগছিলো। কিন্তু জিদকে শক্তিতে পরিণত করার আনন্দও যে একেবারে ছিলো না তাতো নয়। কিসের সেই জিদ! হ্যাঁ, এই যুবকই বছরখানেক আগে ম্যাট্রিকের জন্যে নির্ধারিত ‘টেস্টে’ ইংরেজী দ্বিতীয় পত্রে অকৃতকার্য হয়েছিলেন, যা ছিলো চরম অপমানের। তিনি মনে মনে এটাকে অন্যায় ধরে নিলেও কারো কাছে প্রকাশ করেননি। সে বছর হঠাৎ করেই একজন ধনাট্য ব্যক্তি ঘোষণা করে বসেন যে ‘টেস্টে’ প্রথম তিনজনকে পাঁচশ’ টাকা করে দেয়া হবে। কিন্তু বিধি বাম! প্রথম ও দ্বিতীয় ঠিক থাকলেও তৃতীয় হলেন দু’জন। যুবকের ধারণা তাকে ইংরেজী ওই বিষয়ে তখন ইচ্ছাকৃত ভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক অকৃতকার্য করে তারই বন্ধুকে (একই নম্বর থাকা সত্ত্বেও—যেহেতু এক বিষয়ে অকৃতকার্য) পুরস্কারটি দেন। ম্যাট্রিক যদিও চার লেটার নিয়ে প্রথম শ্রেণিতে পাশ করেছিলেন, ইংরেজীতে যদিও প্রতিপত্রে ৬০-এর উপরে নম্বর পেয়েছিলেন, তথাপি যুবকের জিদ চেপে যায় যে ইংরেজীটা তিনি শিখবেন। কিন্তু আজও যে তিনি কিছুই শিখতে পারেননি তার নমুনা অনেক আছে। সেটাও আপনারা জানেন। তবে নিউইয়র্কের হান্টার কলেজে এজুকেশনে স্নাতকোত্তর পড়া কালে চাইল্ড সাইকোলজি বিষয়ের টার্ম পেপারে যখন প্রফেসর তাকে তিনশ’ নম্বরে তিনশ’ই দিয়েছিলেন, তখন তিনি প্রতিবাদের হাসি দিয়ে বলেছিলেন, “আপনি যে আমাকে ইংরেজীতে লেখালেখি করতে উদ্বুদ্ধ করে দিলেন।” প্রফেসর তখন বলেছিলেন, “ইউ আর ফুললি কেপবল, যাস্ট গো এহেড।” তবে তৃতীয়বার যে ঘটনা ঘটেছিলো যুবক আজও বুঝতে পারেননি তা কি করে সম্ভব। হাইস্কুলে শিক্ষকতার জন্যে পরীক্ষা দিয়ে লাইসেন্স করতে হয় সেটা হয়তো আপনারা অনেকেই জানেন। পরপর দু’টি চার ও চার আট ঘণ্টার পরীক্ষা দিয়ে এসে যুবক দেখলেন তাঁর মাথার ভেতরে কিছুই নেই। সব ফাঁকা। মনে হলো, তার আর শিক্ষক হওয়া হবে না। এইসব পরীক্ষায় বিভিন্ন বিষয় ভাগ করা থাকে, যেমন গণিত, ইংরেজি, বিজ্ঞান, সমাজ ও ইতিহাস ইত্যাদি। প্রতি বিষয়ে থাকে দুশ’ নম্বর। পরীক্ষার ফলাফল দেখে গণিতের শিক্ষক এই যুবক যে ভড়কে গিয়েছিলেন, তা এই জন্যে নয় যে তিনি অকৃতকার্য হয়েছেন, এই জন্য যে তিনি গণিতে নয়, ইংরেজি রচনায় দুশ’র মধ্যে দুশ’ই পেয়ে গেছেন। তবে, এইসব চমকপ্রদ ঘটনা দু’এবারই ঘটে। মাঝে মাঝে যা কিনা চোখের জলও নিয়ে আসতে ছাড়ে না। অথচ এই যুবক নিজে বাংলাটাই ভালো করে শিখতে পারেননি, আর ইংরেজী তো অন্যের ভাষা। ক্লাস সেভেনে তো শিক্ষককে বলেই ফেলেছিলেন, “স্যার আমরা কেনো ইংরেজী শিখবো, ইংরেজরা কি বাংলা শেখে?” শিক্ষক অনেকক্ষণ ধরে তার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলেছিলেন, “ছোটো মুখে তো বেশ বড়ো কথা বলতে শিখে গেছিস!”…আজ ১২ সেপ্টেম্বর! যুবকের বন্ধু কবি স্ট্যানলি এইচ বারকান সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, “এই দিনটি নিয়ে কিছু লিখো না; এটি এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনার পরের দিন যে লোকে তোমাকে ভুল বুঝতে পারে।” আহা! সত্যিই তো নাইনিলেভেন কি ভয়াবহ দিন। এই যুবক তো অনেকটা কাছ থেকেই দেখেছিলেন। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা আর পরিকল্পনাকারীদের প্রতি ঘৃণা বর্ষণ ছাড়া যুবকের কিইবা করার ছিলো!

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৭৭ বার

Share Button

Calendar

February 2020
S M T W T F S
« Jan    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829