শিরোনামঃ-


» এক শরতের গল্প

প্রকাশিত: ২৬. ডিসেম্বর. ২০১৫ | শনিবার

এসবিএন ডেস্ক, সংগৃহীত গল্প:
গৃহস্থলি ফেলে এলাম দেখব তোমায় বলে
দুচোখ ভরে দেখতে দিলে কই
সূর্য পাটে সাধ অধরা ফিরছি আপন কুলে
আমি তোমার এমন তো কেউ নই

( ১ )
অবিশ্বাস্য! যেটা ভাবছি, সেটাই ফলে যাচ্ছে। ভাবছেন আলাদীনের চেরাগ বা জলদেবতার বর পেয়েছি কিনা? না পাইনি, তবে বলতে পারেন ইচ্ছা পূরণের মাহেন্দ্রক্ষনে পৌঁছে গেছি। ঘোর নাস্তিক হয়েও তাই ঘটনা প্রবাহে বেশ অবিভুত আমি। দু’সপ্তাহ আগের সকাল থেকেই শুরু করি। অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছিল। মুশলধারা যাকে বলে। এগারোটা নাগাদ বাড়ীর সামনের রাস্তায় হাঁটু পানি জমে গেল। বিকেলে দলের কাজে বাইরে যাবার কথা আছে। আশায় রইলাম, এখনি বৃষ্টি থেমে গেলে হয়তো প্রোগ্রামটা করে ফেলা যাবে । শেষতক দুপুরটা কাকভেজা ভিজে জেলখানার ম্যাড়মেড়ে বাসি রুটির মত হয়ে গেলে আর বুঝতে বাকী রইলনা আজকের প্রোগ্রাম অটো-ক্যান্সেলেশানের স্ট্যাটাসে পৌঁছে গেছে। মধ্যাহ্ন ভোজের পাঠ শেষ হতেই ভেতর থেকে একটা সিয়েস্তার আবেদন এলো। পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড শেষে বর্ষণের এই দুপুরে শরীর আর মন একটু বেশী স্বাধীনতার দাবী তো করতেই পারে। চারটার টিউশানিতে আজ আর নাইবা গেলাম, ভাবতে ভাবতে প্রায় ভেঙে পড়া খাটটির দিকে এগিয়ে চলেছি, হঠাৎ নাদেরের কথা মনে পড়লো। আহ! কতদিন দেখিনা। দু’জনা ঠিক ভাই ছিলাম, না বন্ধু, আজো তা জানা হয়নি। এই খাটে দিনের পর দিন এক বালিশে শুয়ে রাত কেটেছে আমাদের, ছেলেবেলা থেকে একটানা সতেরো বছর। এ ঘর আজো দিনে দারিদ্র্য আর রাতে স্বপ্নের দখলে। শুনেছি সিয়াটলে ডাক্তার হিসেবে নিজেকে বেশ গুছিয়ে নিয়েছে নাদের। বছর সাতেক হলো আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছে। প্রথম বছর যোগাযোগ ভালই ছিল। তারপরই হলো নারী যোগ আর বন্ধু বিয়োগ। দু’জনার মাঝে দাঁড়িয়ে গেছে আমাদেরই আরেক সহপাঠী, সেঁজুতি।
অন্য গোলার্ধে পুরো এক বছর পার করে নাদের হঠাৎ উপলব্ধি করলো সেঁজুতিই তার জন্য সবচেয়ে পারফেক্ট ম্যাচ। ওর হাত পেতে চেয়েছিল নাদের। কিন্তু সেঁজুতি সে হাত আগেই বাড়িয়ে বসেছিল আমার দিকে। নিজের কথা না হয় পরে বললাম, মুল ঘটনায় যাওয়া যাক। শেষের দিকে ফোন করাই বন্ধ করে দিয়েছিল নাদের। আমি কল করলে হু হা টাইপের উত্তর দিতো, কুশলের শব্দগুলোও ভারী ভারী ঠেকতো। জেলে যাবার আগে শেষবার কথা হয়েছিল । বলেছিলাম কিভাবে নির্দোষ হয়েও পরিস্থিতির কারনে ফেঁসে যাচ্ছি। সত্যি বলতে কি, আটলান্টিকের ওপার থেকে ভেসে আসা সেদিনের শীতল কণ্ঠস্বরটি যে আমার পরম ভাই কিংবা বন্ধুর, বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। এই ক’বছরে নিজ থেকে একবারও আমার বা মায়ের খোঁজ নিল না। মায়ের মৃত্যুতে ছয় ঘণ্টার প্যারলে মুক্তি পেলাম। বাড়ীটা খাঁ খাঁ করছিল। মাদ্রাসার কয়েকটি এতিম ছেলে শুকনো মুখে ঘোরা ফেরা করছিল। আমার আবেগহীন জীবনে কখনো অশ্রুপাতের ঘটনা ঘটেছে, মনে পড়ে না। মায়ের লাশের পাশে দাঁড়িয়েও তেমন ভাবান্তর হলো না। প্রহরী পরিবেষ্টিত হয়ে ফিরে চলেছি। মনে পড়লো, মা নাদেরকে আমার সমানই স্নেহ করতেন। হঠাৎ আমার দু’চোখ ভরে উঠলো। পাশে বসা গম্ভীর প্রকৃতির জেল দারোগা পকেট থেকে রুমালটি বাড়িয়ে দিয়ে অন্য দিকে চেয়ে রইলেন।
বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। ভাঙ্গা জানালা গলে হু হু করে ঢুকছে ভেজা হাওয়া। একই সাথে অন্য একটি ঘুলঘুলি দিয়ে আমার বত্রিশ বসন্তের একটি উপেক্ষিত সুর আচমকা ঢুকে পড়ে লঙ্কাকাণ্ড শুরু করেছে। অতি ব্যবহারে থেবড়ে যাওয়া বালিশটাকে দু’পাশে দুঘা বসিয়ে দিতেই পেটটা মসৃণ, রমনীয় হয়ে গেল। শুনেছি এক বিদেশিনীকে বিয়ে করে সংসার পেতেছে নাদের। শ্বেতাঙ্গ বঁধুরাও কি বাদামি স্বামীকে কোলে মাথা রেখে ঘুম পাড়িয়ে দেয়? অশিষ্ট ভাবনাগুলো সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মত আছড়ে পড়ছে মনের তটভূমিতে। এমন বেসামাল সময় জীবনে কমই এসেছে । সন্ত্রস্ত কণ্ঠে আমি আত্মসম্মোহনের শব্দগুচ্ছ উচ্চারণ করলাম, ছবি, তোমার হৃদয়ে দেশ মাতৃকা ছাড়া আর কারো স্থান নেই। মেহেনতি জনতা ছাড়া তোমার কোন আপন জন নেই, কেউ ছিল না কোন কালে ………….. ।
আমাদের দেশে কখনো বিকেলে ডাক আসে না। আজকে এলো। পোষ্টম্যান একটি চিঠি ধরিয়ে দিয়ে গর্বিত হেসে বলল, ‘ভাবছিলাম কালকে দিবানি, পরে আপনার কথা ভাইবে চইলে আলাম । বেকারদের সাথে ডাক পিয়নদের একটা গভীর সম্পর্ক থাকে, এক সময়ে আমারও ছিল। কিন্তু এই লোকটিকে পাঁচ বছর আগে কেন সারা জীবনেও দেখিনি, হলফ করে বলতে পারি। পকেটে মাত্র বিশটি টাকা আছে কয়েকটি সিগারেটের দাম। রাতে প্রলেটারিয়েটদের নিয়ে একটা কবিতা লিখবো ভেবেছিলাম। লোকটির হাতে নোটটি গুজে দিয়ে আমি চিঠিতে মন দিলাম। ঢাকা থেকে প্রফেসর খোদা বক্স নামে একজন পাঠিয়েছেন। কি অসম্ভব ব্যাপার, এ নামে কাউকে আমি চিনি না! অথচ প্রাপকের স্থানে স্পষ্ট লেখা –
সাবিউর রহমান (ছবি)
৩৬/৬ , আর কে রোড
খুলনা।
বাইরের মোড়কটি খুলতেই বেরিয়ে এলো আরেকটি চওড়া খাম। নাদেরের চিঠি!
প্রিয় ছবি,
অনেক শুভেচ্ছা। ব্যস্ততার কারনে যোগাযোগ রাখতে পারিনি অনেক দিন। পারবি কিনা জানিনা, ক্ষমা করতে চেষ্টা করিস। সাথে একটা চেক পাঠালাম। ঘুষ নয়, আমার প্রথম বেতন। অনেক দিন ধরে আগলে রেখেছি, তোর জেলের মেয়াদ শেষ হবার অপেক্ষায়। পুরনো সেই প্রতিজ্ঞার কথা মনে আছে তো? সামান্থাকে বিয়ে করে ফেলেছি, সেও দু’বছর। সেঁজুতিকে নিয়ে আমার আর কিছুই ভাববার রইল না।
খালাম্মার মৃত্যুর সময় আসতে পারিনি, শর্ট নোটিশে টিকেট পাওয়া সম্ভব হলো না। ছেড়ে যাওয়া কাছের মানুষদের জন্য দোয়া করাটা যদি সবচেয়ে বড় ব্যাপার হয় তবে সেটা করে চলেছি, প্রতি ওয়াক্তে। তবু মন কাঁদে, শেষ দেখাটা দেখতে পেলাম না। সেদিন স্বপ্নে দেখা হলো। আমরা পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি, খাল্লামা দরোজায় দাঁড়িয়ে দোয়া পড়ে আমাদের বুকে ফুঁ দিচ্ছেন। সারা রাত আর ঘুম এলো না, এপাশ ওপাশ করতে করতে সকাল হয়ে গেল। দুপুরে মেইল এলো বিখ্যাত রেক্সন হাসপাতাল থেকে, আমাকে ডেকে পাঠিয়েছে। স্যালারীসহ খুবই দারুণ প্যাকেজ। চোখে জল এসে গেল। সারা জীবন এই এতিম ছেলেটিকে পুত্র স্নেহে বেঁধে রেখেছেন। আজ মৃত্যুর পরেও দোয়া করতে ভুলেন না। তোদের কথা সামান্থাকে বলেছি। ও আমার কাছের মানুষদের দেখতে চায়। বেশ শান্ত স্বভাবের মেয়ে। আয় না একবার উড়াল দিয়ে, আমার ছোট্ট সংসার দেখে যাবি। ভিসা টিকেটের ব্যবস্থা আমার, তুই শুধু ঠিক কর কবে আসবি।
যোগাযোগ রাখিস । ভাল থাকিস ।
ইতি
তোর নাদের ।
দ্র. এখান থেকে এক প্রবাসী দেশে ফিরছিল। কোথায় আছিস, সে ব্যাপারে নিশ্চিত নই বলে এখানকার এক বন্ধুর বড় ভাইয়ের ঠিকানায় চিঠিটা পাঠালাম।

নীচে দুটি মোবাইল নম্বর একটি নাদেরের অন্যটি প্রফেসর খোদা বক্সের।
মনে পড়ে ক্লাস এইটে দু’জন একসাথে বৃত্তি পেয়েছিলাম। প্রথম ছয় মাসের টাকা একবারে হাতে পেয়ে সে কি আনন্দ! বাবা তখনো বেঁচে আছেন। ভয়ে ভয়ে দু’জনে সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, সিনেমা দেখার অনুমতি চাই। রাশভারী বাবা নিউজ পেপারটা সামনে মেলে ধরতে ধরতে বললেন, সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার মধ্যে বাসায় ফেরা চাই। তিন সপ্তাহ ধরে পিকচার প্যালেসে একটা মারদাঙ্গা ছবি চলছিল। উপচে পড়া ভিড়। নায়ক নায়িকার অভিসারে কাবাব মে হাড্ডি ভিলেনের উপস্থিতি। কি ভীষণ মারপিট। কেউ হারতে চায় না। হঠাৎ হলের ভেতর নারী কণ্ঠের কান্নায় ঘোর কাটল। ড্রপ সিন। অবিশ্বাস্য ব্যাপার। গর্ভবতী এক মহিলা ছবি দেখতে এসেছিলেন। হলের ভেতরেই বাচ্চা ডেলিভারি হয়ে গেছে। কয়েকজন মহিলা দর্শক চারিপাশে শাড়ী টাঙ্গিয়ে নবজাতক আর মাকে আলাদা করে দিয়েছেন। হাজারো চোখে বিস্ময় আর উৎকণ্ঠা। এ্যাম্বুলেন্স আসতে আসতে ঘণ্টা খানেক পেরিয়ে গেল। শো বন্ধ করে ম্যানেজার ঘোষণা দিলেন, আগামী কাল পুরো ছবিটি এই টিকিটে আবার দেখানো হবে। ছবিটি আর দেখা হয়ে ওঠেনি আমাদের। বাসায় ফিরে আবিষ্কার করলাম ভিড়ের ভেতর দুজনেরই পকেটমার হয়ে গেছে। ক্লাস নাইনের একটি ছেলের প্রথম উপার্জন খোয়ানোর ব্যথা পুত্র শোকের চেয়ে কম কিনা জানি না, তিনরাত ঘুমুতে পারলাম না। লজ্জা আর ভয়ে কাউকে কিছুই বলিনি। নাদেরতো স্কুলে যাওয়াই ছেড়ে দিয়েছে। চতুর্থ দিন স্কুল থেকে ফিরে দেখলাম, কেঁদে ও দুচোখ লাল করে ফেলেছে। ঠিকানাবিহীন এই পড়ুয়া ভাইটির কষ্ট মনটাকে ছুঁয়ে গেল। জোর করে নিয়ে গেলাম বড় রেস্টুরেন্টে। ওর পছন্দের খাবার পরিবেশন করা হোল। বারবার খোঁচাচ্ছিল, এত টাকা কোথায় পেলাম। রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছি, শুনে ভোলাভালা নাদের গভীর আগ্রহে খাবারটা শেষ করলো। ভোজন সেরে গেলাম পোশাকের দোকানে, প্রিয় পোশাকে ওকে দারুন দেখাচ্ছিল। শিক্ষিকা মায়ের সঞ্চয়ে সেই প্রথম আর সেই শেষ হাত রাখা আমার। অভিভূত নাদের সেদিন বলেছিল, যদি কোন দিন বড় কিছু হতে পারি, আমার প্রথম উপার্জন হবে তোর। আমিও বোধ হয় ওর কথার পিঠে এভাবেই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। বিষয়টা এতোই হাল্কা ছিল যে আর কখনো আমরা এসব মনে করিনি। আমরা নই, আমি। নাদের ঠিকই মনে রেখেছে। সাতটি বছর আগে ছেড়ে যাওয়া বন্ধুর অভাবিত প্রত্যাবর্তনে জড়ের মত স্থির বসে রইলাম আমি।

( ২ )
বিত্তে বাড়ে বাসনা – বলে কিনা জানি না, পরের দুদিনে অর্থ আর প্রভাব-প্রতিপত্তির পিপাসায় আমার বুকটা বারবার শুকিয়ে উঠেছে। কেউ দামী গাড়ীতে চড়ে ঘুরছে দেখলে নিজেকে কল্পনা করছি চালকের সিটে। গাড়ীর নির্মাণে শোষিত শ্রমিকের কথা ভেবে বুক ভারী হচ্ছে না। ব্রিফকেস হাতে দশটা-পাঁচটার কেতা দুরস্ত কর্পোরেট কর্মকর্তাকে দেখলে মুহূর্তে নিজেকে ভেবে নিচ্ছি তার জায়গায়। অফিসের দারোয়ানের অপুষ্ট শরীর বা তারও পেছনে দারিদ্র্য পীড়িত একটি পরিবারের ভাবনা এসে মনকে পীড়া দিচ্ছে না। সম্মোহনের মন্ত্রগুলোও ভোঁতা হয়ে গেছে। বিবেকের চালুনিতে বোধ করি তৈরি হয়েছে বড়সড় কিছু ছিদ্র, বুঝতে পারলাম কাল সন্ধ্যায়। দিনান্তে কাজ সেরে ফিরে যাচ্ছিল এক যুবক। পেশীবহুল হাতদুটোয় চোখ আটকে রইল অনেকক্ষণ। নিজের দুর্বল বাহুগুলো কেন বটবৃক্ষের বলিষ্ঠ শাখার মত হলনা, ভাবতে ভাবতে বুকের মধ্যে একটা অচেনা কান্না গুমরে উঠলো। মনে হোল, হায় আমি যদি আরও সুন্দর হতাম, হতে পারতাম একজন সুপুরুষ কবি, একজন নাজিম হিকমাত!
আয়না দেখার অভ্যাস ছেড়েছি ছেলেবেলায়। জেলের পাঁচ বছর তো হাতের আন্দাজে চুল আঁচড়ানোর কাজটি সেরে নিয়েছি। আজ ঘুম থেকে উঠে মুখে পানি ছিটিয়ে দিতেই হঠাৎ দেয়ালের পারা খোয়ানো পুরনো আয়নায় চোখ পড়লো এবং রীতিমত চমকে উঠলাম। আমি কি বদলে গেছি, নাকি আগাগোড়াই এমন ছিলাম! আয়নায় দাঁড়ানো সুপুরুষ লোকটিকে কেউ রমনী-মোহন বললে মোটেই বাড়াবাড়ি হবে না। বিহ্বল চোখের অবিশ্বাসটা ফিকে হবার আগেই দরোজায় কড়া নাড়ার শব্দ এলো। চোখ কপালে তুলে আমি অবলোকন করলাম, অভাজনের দরোজায় দাঁড়িয়ে আছেন প্রকাশনা জগতের প্রবাদ পুরুষ, আরিফ কবীর। কাল পার্টি অফিসে কে যেন বলছিল, ব্যক্তিগত সফরে কবীর সাহেব এসেছেন এ শহরে। নিজেই চেয়ার টেনে বসেতে বসতে প্রশ্ন করলেন, কবিতা লেখেন কতদিন?
-ছেলেবেলা থেকেই, তবে ওগুলো কতটা কবিতা হয় তা নিয়ে আমার নিজেরই সংশয় আছে।
-আপনি জেলে থাকতে একটা কবিতা ছাপা হয়েছিল ‘আলোর সকাল’ প্রত্রিকায়। কবিতাটা আমি পড়েছি। খোঁজ খবর নিয়ে আরও দুয়েকটি লেখা পেয়েছি আপনার। ইন ফ্যাক্ট সেই সুত্রেই আজ আপনার বাসায় আসা। আপনার কাছে কি পাণ্ডুলিপি রেডি আছে?
-দুঃখিত, কখনো এভাবে ভাবিনি। তবে কয়েক ঘণ্টা সময় পেলেই রেডি করে দেয়া যাবে।
-বেশতো, কাল বিকেল চারটায় আমার ফ্লাইট। দুপুরের আগে যে কোন সময়ে আমার বাড়ীতে ওটা পৌঁছে দিলে চলবে। আমি কি বলবো খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হ্যান্ড শেক করে সঙ্গীসহ কবীর সাহেব বিদায় নিলেন। আমি গায়ে চিমটি কেটে নিশ্চিত হলাম, না, এটা কোন স্বপ্ন ছিলনা।
চনমনে ফুর্তিতে রিক্সায় চেপে বসলাম। ভীষণ আগ্রহ জন্মেছে ঘরবাড়ী নিয়ে। বাড়ীটাকে সাজিয়ে বাসযোগ্য করে তুলতে হবে। নিউ মার্কেটের সামনে যেতেই একটা জটলা চোখে পড়লো। নিশ্চয় কোন পকেটমার ধরা পড়েছে। সেদিনও এমন জটলা পাকিয়েছিল। গণধোলাই ছিল অবধারিত। অপরাধতো আর ছোট খাটো না। প্রকাশ্য দিবালোকে জনাকীর্ণ রাজপথে এক যুবতী ঠোঁটে ঠোঁট চেপে জড়িয়ে ধরে আছে সমবয়সী এক যুবককে! জটলার ভেতরে সবচেয়ে উৎসাহী দাড়িওয়ালা এক লোকের কব্জিটি সজোরে চেপে ধরে চড়া গলায় আমি ইংরেজিতে বলতে শুরু করলাম। কি বলেছিলাম মাথা মুণ্ডু কিছুই মনে নেই। শুধু মাথায় রেখেছিলাম এরা ইংরেজি বুঝে না, সমীহ করে। মারমুখী জটলা হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো। একটু ভরসা পেলাম, মেনটাল ডিজিজ, ডাক্তার, অ্যাপয়েন্টমেন্ট শব্দগুলো কাজ করছে। লোকগুলো মুখচাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো। দাড়িওয়ালা নিজেই রিক্সা ডেকে আমাদের ধরাধরি করে উঠিয়ে দিল। পাশে গ্যাঁট হয়ে বসে রইল সেঁজুতি। বাড়াবাড়ির ভয়ঙ্কর পরিনাম তাকে একটুও ভীত করতে পারেনি, মুখাবয়ব জুড়ে সেঁটে আছে বেপরোয়া বাজীর বিজয় পতাকা।

( ৩ )
কয়েক বছর পর ছাদে উঠলাম। পুরনো দালান, সিঁড়িতে শ্যাওলা জমে গেছে। এইতো আর ক’টাদিন। ডেভেলপারের সাথে কনট্রাক্ট করে ফেলেছি। বর্ষা শেষ হলেই কাজ শুরু হবে, গড়ে উঠবে সাততলা ভবন। আমার দাদা তৈরি করেছিলেন বাড়ীটা। দক্ষিণের লোনা জলে বয়সের চেয়ে বেশী বুড়িয়ে গেছে। সিঁড়ির পাশেই আছে একটা চোরা কুঠরি। ব্রিটিশ আমলে বিপ্লবী ভীম রায়কে দাদা এখানে লুকিয়ে রেখেছিলেন দীর্ঘদিন। পরিস্থিতি শান্ত হলে বেরিয়ে এসে ভীম রায় হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘যে অপরাধ করেছি ধরা পড়লে গোরা সাহেবরা বড়জোর একমাসের জেল দিতো। কিন্তু সোলায়মানের হাতে ধরা পড়ে পুরো তিনমাস জেল খাটলাম’। সব স্মৃতিই একসময়ে অনন্তে হারিয়ে যাবে, কোন চিহ্ন রইবেনা।
ছেলেবেলায় আমার আর নাদেরের একটা প্রিয় কাজ ছিল ক্যারাম খেলা। ছাদের উপর নারিকেল গাছের ছায়া পড়তো। শেষ দুপুরে মেতে উঠতাম আমরা। একসময়ে পাশের বাড়ী থেকে গামলা ভর্তি পেঁয়াজ-মরিচে মাখানো মুড়ি নিয়ে হৈ-চৈ করতে করতে সেখানে হাজির হত সেঁজুতি। কথায় বলে, তিনে গোলমাল। সেঁজুতি এলে সেটাই ফলে যেত। হট্টগোল থামাতে একসময়ে মাকে আসতে হতো। তাঁর প্রশ্রয়ে সেঁজুতির হাতে নিয়মিত হেনস্তা হতাম আমরা। যুদ্ধ স্থগিত রেখে আমরা নতুন সুযোগের অপেক্ষায় থাকতাম। এইচ এস সি’র আগেই জড়িয়ে পড়েছিলাম সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম কিভাবে নতুন নতুন হাজারো মানুষের সাথে তৈরি হচ্ছিল অদৃশ্য বাঁধন, একই সাথে পুরনো বাঁধনগুলো ক্রমশ শিথিল আর দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল। বন্ধুদের সাথে খুনসুটির দৃশ্যগুলোর অবতারনা হতো কালেভদ্রে। এরই মধ্যে সেঁজুতি হাতে তুলে নিল চারুকারু। নাদের মেডিক্যাল সায়েন্স। আর আমি, বিশ্ববিদ্যালয়ে নাম থাকলেও পার্টিতে ফুল টাইমার।
মাতৃহীনা সেঁজুতিকে মা একটু বেশীই পছন্দ করতেন। সেই সুযোগে আমাকে উত্তক্ত করতো ও। প্রথম প্রথম হালকা ভাবে নিয়েছিলাম। পরে বুঝেছি, এটা ছেলেমানুষি নয়, ছেলেমানুষির ছলে অন্যকিছু। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিপ্লবী আমি, ওর ডাকে সাড়া দেয়া সম্ভব ছিল না। আমার শীতল ব্যবহারে ওর বোঝার কিছুই বাকী ছিল না। তবু একের পর এক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। এক সন্ধ্যায় ছুটতে ছুটতে এলো,
-এই ছবি, টিপটা আমাকে পরিয়ে দে না।
-পারবো না, তুই আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজে পরে নে।
-আয়নাটা ভেঙে গেছে।
-তাহলে মায়ের কাছে যা।
-খালাম্মা রান্নাঘরে। হাত ব্যস্ত।
আমি হাত বাড়িয়ে টিপটি নিয়ে কয়েনের মত ছুঁড়ে দিলাম ছাদে। বুক ভাঙ্গার কষ্ট যে কতটা তীব্র ওর মুখের দিকে একবার তাকিয়েই তা পড়ে নিলাম। খানিক্ষন গম্ভীর চোখে চেয়ে রইল আমার দিকে। তারপর ছুটে চলে গেল। আমি হাঁপ ছাড়লাম, এ পথ থেকে ওকে ফেরাতেই হবে। একটু পরে মায়ের চিৎকার শুনে ছুটে ভিতরে গেলাম। ভাঙ্গা কাঁচে রক্তাক্ত সেঁজুতির হাতদুটো। মা শক্তি দিয়ে ক্ষতগুলো ধরে রেখেছেন। উদ্ভ্রান্তের মত গোঙাচ্ছে সেঁজুতি।
আরও পরে, অনার্স পরীক্ষা শেষে এক সন্ধ্যায় বাড়াবাড়ির চূড়ান্ত করে ফেললো। এই ছাদে বসেই ধারালো ব্লেডে কব্জি কাটলো নিজের। ভয়ঙ্কর রক্তারক্তি ব্যাপার। ধরাধরি করে সবাই নিয়ে গেলাম হাসপাতালে। ডাক্তার তাকে সারজিক্যাল ওয়ার্ডে এডমিট করতে অস্বীকার করলো। বর্ডার লাইন পারসোনালিটি ডিসওয়ার্ডার। কঠিন মনের অসুখ। মনে পড়লো তিন দিন আগের একটি ঘটনা। গভীর রাতে দরোজায় টোকা পড়লে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। বেরিয়ে দেখি সেঁজুতি। ক্লান্ত আর অচেনা লাগছে ওকে । টেনে টেনে বলল , একটা সিগারেট হবে ? আমি সিগারেট খাই না, স্মরণ করিয়ে দিতেই একটা বিদ্রূপাত্মক হাসি ছুঁড়ে দিল, দিনে দিনে তুই কি মেয়ে হয়ে যাচ্ছিস, ছবি! হঠাৎ আমার সন্দেহ হোল, পাগল হয়ে যাচ্ছে সেঁজুতি।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ আঃ রহমানের ত্বত্তাবধানে দেয়া শুরু হোল হাই ডোজ এনটিসাইকোটিক মেডিসিন। একটু একটু করে স্বাভাবিক হয়ে উঠছিল। সেদিন পার্টি অফিসে কয়েকটি জরুরী কাজ সেরে বাড়ী ফিরতে ফিরতে মাঝ রাত হয়ে গেল। মা অপেক্ষা করছিলেন। প্লেট এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, খোকা, মেয়েটির দিকে একবার ফিরে দেখ। সংসারে বাবা ছাড়া কেউ নেই। সবকিছুর বিনিময়ে তোকে পেতে চায়। একটা মেয়েকে শান্তি দিতে না পারলে গোটা জাতির জন্য কিসের শান্তি আনবি তুই? মায়ের কথা দূরাগত তারার কান্নার মত শোনাচ্ছিল। কিন্তু আমি যে আমার ক্ষুদ্র জীবনের ফয়সালা আগেই করে ফেলেছি । সিদ্ধার্থকে আটকে রাখে সাধ্যকি যশোদার। নীরবে খাবার শেষ করে উঠে এলাম। মা বারান্দার কোনে ঝুলতে থাকা একটুকরো আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

( ৪ )
বাড়ীটা নতুন করে সাজিয়েছি। বসার ঘরে সেট করেছি চওড়া রঙিন টি ভি, নতুন সোফা, দেয়ালে দামী পেইন্টি। মেঝেটা মুড়েছি মোলায়েম নীল কার্পেটে। ইনডোর প্লান্টের পাশে জ্বলছে সুদৃশ্য শেড ল্যাম্প। ঘরটা একেবারে ঝকঝক করছে। মিউজিক সিস্টেমটা চালিয়ে দিতেই ভেসে এলো জগজিৎ সিংয়ের গজল। সে সুরের সাথে মিশে যাচ্ছে ঘরের কোন থেকে ছড়িয়ে পড়া লেমন-গ্রাস এসেন্স। তবু মন বসছেনা, এসবই যেন রাত না পোহাতেই মিইয়ে পড়া রজনীগন্ধা। পায়ে পায়ে চলে গেলাম ছাদে। শরতের জ্যোৎস্না ধোঁয়া রাত। পেঁজা পেঁজা মেঘের ভেলা ভেসে চলেছে নিরুদ্দেশে। সেঁজুতির মুখচ্ছবি ভেসে উঠলো মনে। এক সন্ধ্যায় একটু দূরে বসে আবৃতি করছিল রফিক আজাদের ‘যদি ভালবাসা পাই’-
যদি ভালবাসা পাই আমার আকাশ হবে দ্রুত শরতের নীল
যদি ভালবাসা পাই জীবনে আমিও পাব মধ্য অন্তমিল …………
গদ্যময় জীবনের কথকতায় একটুখানি অন্তমিল খুজেছিল মেয়েটি। প্রত্যাশায় কাঙালের মত বারবার হাত পেতে দাঁড়িয়েছিল আমার দরোজায়। আমার শীতল ব্যাবহারে বার বার ভেঙে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়েছে তার হৃদয়। কেন আমি এতটা নিষ্ঠুর হয়েছিলাম? অকস্মাৎ চোখদুটো অগ্নিগিরির মত জ্বলে উঠলো, লাভার সাগরে দগ্ধ বিদগ্ধ হচ্ছে আমার পাপ। একসময়ে অনুশোচনা ক্লিষ্ট মনে কামনা করলাম, আহ, যদি আরেকবার সুযোগ পেতাম ভালোবাসার ঋণ পরিশোধের! ভাবতে না ভাবতেই নতুন লাগানো ডোর বেলের আওয়াজে চমকে উঠলাম। কিন্তু নীচে নামতে নামতে আমার পাদুটো আড়ষ্ট হয়ে এলো। দুয়ারের ওপারে যদি সত্যি দাঁড়িয়ে থাকে আমার তৃতীয় ইচ্ছে পুরন, নিশ্চিত ফাটল ধরবে নিরীশ্বরবাদিতার ভিতে। আমার ছায়ায় বেড়ে ওঠা অন্য আমি চরণ ধরে ফেরাতে চায় আমাকে।
দরোজায় দাঁড়ানো মহিলা দুটিকে প্রথমে ভিখারি ভেবে ভুল হোল। পরে বুঝলাম পাগল। একজন ফর্সা মত ছোট খাটো। অন্যজন সেঁজুতি সয়ং। আমাকে চিনতে পারেনি। আমার কিন্তু ভুল হয়নি, হাতের কাঁটা দাগগুলো কঙ্কনের মত উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। আর চোখদুটো চির চেনা। দুইজন অপ্রকৃতস্থ রমনীকে আশ্রয় দিতেই সহসা মনে পড়লো আজ সন্ধ্যায় টি ভি’তে ফ্লাস নিউজ দেখাচ্ছিল, কোন এক হাসপাতাল থেকে কয়েকজন মানসিক ভারসাম্যহীন রোগী পালিয়ে গেছে। আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল।
মাথার মধ্যে হাজারো চিন্তা একসাথে জড় হয়েছে। এখানে রেখেই এদের চিকিতসা করা যায়, নামজাদা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ আঃ রাহমানতো আছেনই। কিন্তু আইন আমাকে ছাড়বে না। ইতিমধ্যে দুজনকে আলাদা করে ফেলেছি। ফর্সা মহিলাকে মায়ের ঘরে ঢুকিয়ে তালা মেরে দিয়েছি। এক গ্লাস দুধ খেয়ে বেচারী ঘুমাচ্ছে মায়ের বিছানায় । সেঁজুতির কাঁধে হাত রাখলাম, আমাকে তুই চিনতে পারছিস না পাগলী! নিজের গলার স্বর অচেনা আবেগে বুজে গেছে, গো গো শ্বব্দ ছাড়া নিজেই কিছু শুনতে পেলাম না। সেঁজুতি অনেকক্ষণ আমার মুখের দিকে চেয়ে রইল । মুখ থেকে লালা ঝরে পড়ছে। গভীর আবেগে আমি লালা মুছে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। বুকের সাথে লেপটে রইল সেঁজুতি। বুক থেকে সরিয়ে চোরা কুঠরিতে তালা লাগাতে কষ্ট হচ্ছিল। আমার ভিতরে যে এতটা কোমল একজন মানুষ লুকিয়ে ছিল, জানতাম না।
ফ্লাশ নিউজটা এখনো দেখানো হচ্ছে। আমাকে শক্ত হতে হবে। মন স্থির করে হাতে সেলফোন তুলে নিলাম। ওইতো ওপাশ থেকে রিঙের আওয়াজ আসছে –
-হ্যালো, আমার নাম, ঠিকানা নোট করে নিন………… হ্যাঁ হ্যাঁ, আমার এখানে একজন অপ্রকৃতস্থ মহিলা আশ্রয় নিয়েছেন। হ্যাঁ হ্যালো , শুনতে পাচ্ছেন ফর্সা মত, একটু বেঁটে। ……… মধ্যবয়সী, হালকা গড়ন ……………… ৩৬/৬ আর কে রোড। হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি বাসাতেই আছি ………………

পুনশ্চ- রুঢ় বাস্তবের ভেতরও অনেক ঘটনা জন্মে যা কল্পনাকে হার মানায়। সেগুলোকে সেভাবে দেখা হয়ে ওঠেনা। আমার জীবনের এই তিনটি ঘটনা পর্যায়ক্রমে না ঘটলে হয়তো এভাবে দেখতে পেতাম না। এ গল্পের জন্মও হতো না। কখনো কখনো মনে হয় আকাশের ওপারে যিনি বসে আছেন জগত সংসারের গুঢ় রহস্য রক্ষার্থে তিনি ইচ্ছে করেই দূরে থাকেন। আবার তাকে ভুলে আমরা যখন দূরে যেতে থাকি, খুব দূরে যাবার আগেই কাছে টেনে আনেন, অসীম মমতায় …

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৪০১ বার

Share Button

Calendar

November 2020
S M T W T F S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930