» এখন পর্যন্ত ক্রিকেটের মাঠই কঠিন ঃ মাশরাফি বিন মুর্তজা

প্রকাশিত: ২৯. ডিসেম্বর. ২০১৮ | শনিবার

দেশের স্বার্থে, নড়াইলের স্বার্থে যেন মানুষ ঐক্যবদ্ধ থাকে, সেই মানসিকতা দেখতে চাই।বলেছেন বিখ্যাত ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মুর্তজা । তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারে এখন গোধূলি বেলা । তবে রাজনীতির ক্যারিয়ারে কেবলই দেখা দিয়েছে সূর্যোদয়ের রক্তিম আভা।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নড়াইল-২ আসনে আওয়ামী লীগের এই প্রার্থী ভোটের প্রচারে গত কয়েক দিন চষে বেড়িয়েছেন নির্বাচনী এলাকার অলিগলি। রাজনীতির পাঠশালায় তার হাতেখড়ি হচ্ছে ভোটের মাধ্যমেই।

নির্বাচনী প্রচার শেষ করে বৃহস্পতিবার রাতে মাশরাফি শোনালেন তার নতুন অভিজ্ঞার গল্প। কথা বললেন সমকালীন রাজনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে, জানালেন স্বপ্ন আর বাস্তবতাকে এক সুতোয় গাঁথার কথা।
নির্বাচনি ময়দানের অভিজ্ঞতা্র গল্প শোনাতে গিয়ে মাশরাফি বললেন, এটা তো আমার জন্য নতুন জগত। সব বুঝতে সময় লাগবে। মনে হয়েছে লোকে স্বতস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসছে। অবশ্য নড়াইলে সবাই আমাকে আগে থেকেই পছন্দ করে, ভালোবাসে। খেলোয়াড়ি জীবন থেকেই অনেক সমর্থন পেয়েছি। অনেকে আছে শুধু টিভিতেই দেখেছে, সামনাসামনি দেখেনি। তারা দেখতে ছুটে এসেছে।

আমার ভালো লাগছে সবই। ক্লান্তি এখনও আসেনি। ভালো লাগছে এই কারণে যে অনেক বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছি। লোকের প্রত্যাশা, তাদের স্বতস্ফূর্ততা যতটা দেখছি, আমার মনে হয়েছে তারা আমাকে মন থেকেই মেনে নিয়েছে। তবে ভোটের হিসাব-নিকাশ আলাদা।

আমাকে এত বেশি ভালোবাসে লোকে, ধারণা ছিল না। হ্যাঁ, নড়াইল তো আমার এলাকা, লোকের আবেগের কথা জানতাম। কিন্তু এই পরিমাণ ভালোবাসে, জানতাম না। রান্নাবাড়া বাদ দিয়ে, খাওয়া-দাওয়া বাদ দিয়ে মহিলারা রাস্তার ধারে বসে আছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কোনো পথ দিয়ে ৭টায় গিয়েছি, লোকে ৪টা থেকে বসে আছে। কত বৃদ্ধ লোক, দাঁত নেই একটিও, থুত্থুরে বৃদ্ধা… পথে দাঁড়িয়ে আছেন এক ঝলক দেখার জন্য। এসব তো অকল্পনীয় ছিল।
জানি না, অনেক কিছুই ব্যখ্যা করা কঠিন। অনেক সময়ই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কারণ খুঁজতে যাওয়া উচিত নয়। সেদিন বড়দিয়া ঘাটে একজন মুরুব্বি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেলেন, বাবা, আমি শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া করছি, ৩০ তারিখ পর্যন্ত যেন বাঁচিয়ে রাখে। তারপর আল্লাহ নিয়ে যাক। জীবনের শেষ ভোট তোমাকে দিয়ে মরতে চাই।

এই মানুষটির কাছে কি আমি কারণ জানতে চাইব? কোনো কারণ হয়তো আছে, কিংবা নেই। তিনি তার মতো করেই ভালোবেসেছেন।

এরকম আবেগ-ভালোবাসার আরও অনেক ঘটনা দেখেছি। কয়টার কারণ খুঁজব? সবারই হয়তো নিজের গল্প আছে, কারণ আছে। আমি শুধু তাদের ভালোবাসাটাই দেখেছি।

আমি সবসময়ই বর্তমানে থাকতে চাই। খেলার সময় খেলা, অন্য কাজের সময় অন্য কিছু। এখন এই কদিন ভোটের মাঠে ঘুরলাম। কেবলই মনে হচ্ছে, এই মানুষগুলোর জন্য কিছু করতে পারলে জীবন স্বার্থক।

এখন পর্যন্ত ক্রিকেটের মাঠই কঠিন। ক্রিকেটের অনেক কঠিন সব অধ্যায় পেরিয়ে এসেছি। ভোটের মাঠের সত্যিকার বাস্তবতা হয়তো নির্বাচনের দিন বুঝব। সবাই অবশ্য বলে এটাই কঠিন বেশি। কিন্তু আমি তো এখনও সেই কঠিনের মুখোমুখি হইনি।

তবে, এটা ঠিক, ৫ দিনে ২০টি ইউনিয়নে লোকজনের কাছে যাওয়া, এটা ভীষণ কঠিন ছিল। অনেক সময় এক মাসেও এটা সম্ভব হতো না। আমি মোটামুটি ২০টি ইউনিয়নেই পা রাখার চেষ্টা করেছি। আরও কয়েক জায়গায় ইচ্ছা ছিল, সম্ভব হয়নি সময়ের কারণে। তবে এই মুহূর্তে আমি ঠিক আছি, কোনো সমস্যা হয়নি।

মাশরাফি বলেন, মন জয় করার কথা বললে, যদি আমি জিততে পারি নির্বাচনে, যদি আমার দল সরকার গঠন করে এবং আমি যে মানসিকতা নিয়ে এসেছি, সেই মানসিকতা যদি ধরে রাখতে পারি, তাহলে এর চেয়ে বড় কিছু আর হয় না। ক্রিকেটের তুলনাই হয় না এখানে, কোনো ভাবেই না। জীবনের তুলনায় ক্রিকেট কিছুই না।

আগেই বলেছি, আমি যতটা পারি, নির্বাচনী বিধি নিষেধ মেনে চলব। আমি মনে করি, এটাই আমার প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল। আমিও সেটা চেষ্টা করছি। প্রতিশ্রুতি দিইনি।

আর আঘাত না করা হয়ত খেলোয়াড়ী জীবন থেকেই এসেছে। প্রতিপক্ষকে সম্মান করা। প্রতিপক্ষকে দুর্বল ভাবা মানে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বোকামি। প্রতিপক্ষকে ঘৃণা করলে, তুমি পৃথিবীয় খারাপ মানুষ। স্পোর্টসম্যান হিসেবে খেলার স্পিরিটই আমি সবসময় মনে রাখি। আমি নিজের ভেতরের চিন্তার কথাই বলেছি। এখানে বানানো বা মেকি কিছু নেই।

মাশরাফি বলেন, সেটা সময়ের হাতেই তোলা থাক; সত্যি বলতে, এতটা গভীরভাবে রাজনীতি এখনও শুরুই করিনি। ভবিষ্যতে এরকম পরিস্থিত আসতে পারে, নাও পারে। তবে আপনি কোন লেভেল পর্যন্ত যাবেন, সেটা তো সেই লেভেলে না যাওয়া পর্যন্ত বোঝা যাবে না। আমি এখনও যে লেভেলে আছি, স্বচ্ছতা বজায় রেখেই কাজ করার চেষ্টা করব।

আদর্শ তো আসলে কিছু কথা বা দর্শন। সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে দিন শেষে নিজের মত করে মানুষের উপকার করতে পারলেই হল। এমনিতে আইনসভার সদস্যদের কাজ আইন প্রণয়ন করা। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতায় লোকে তাকিয়ে থাকে কাজের দিকে। আমি কাজ করতে চাই লোকের জন্য।

বলা উচিত হবে কিনা জানি না, তবু বলছি, নিজেকে অসৎ পথ থেকে দূরে রাখার স্বার্থে… মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর আমার সমস্ত সম্পত্তি, টাকা-পয়সার হিসাবের কাগজপত্র আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা রেখে এসেছি। উনাকে বলে এসেছি, যদি নির্বাচিত হই, তাহলে এই হিসাবের সঙ্গে পাঁচ বছর পরে আমার সম্পদের হিসাব মিলিয়ে নেবেন, অবৈধ কিছু থাকতে পারে কিনা।

এটা কোনো বড়াই করা নয়, স্রেফ নিজেকে ধরে রাখতেই। মনে যদি কখনও অসৎ ভাবনা আসেও, আমি জানব যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার হিসাব আছে, অন্যায় পথে পা বাড়ানো যাবে না। আমি সৎ ও সুন্দরভাবে বাঁচতে চাই। লোকে অনেক কিছু বলবে। রাজনীতি করলে হয়ত সুনাম-দুর্নাম দুটোই হবে। তবে আমি নিজের কাছে মাথা উঁচু করে থাকতে চাই। আয়নায় নিজেকে দেখার সাহস নিয়ে বাঁচতে চাই। আমি এভাবেই তৈরি হয়েছি। এভাবেই থাকতে চাই।

প্রতিহিংসা শিখিনি। আমার সঙ্গে যে কখনও অন্যায় হয়নি, তা নয়। কিন্তু কেউ বলতে পারবে না যে আমি জবাব দিয়েছি বা প্রতিশোধ নিয়েছি। আজ আমি বলছি যে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী যেন আঘাত না পায়। অনেকে এটা নিয়েও গালমন্দ করে, লোক দেখানো মনে করে। কিন্তু আমি নিজের কাছে পরিষ্কার, এভাবেই বাঁচতে চাই।

মাশরাফি বলেন, শহরে সবাই আমাকে দেখেছে। আমিও সব দেখেছি। এখানকার সব মাঠে আমি দাপিয়ে বেড়িয়েছি। এখানকার আলো-হাওয়ার স্বাদ পেয়েছি। এখনও যারা আমাকে দেখেনি, তাদের কাছে আগে গিয়েছি।

নির্বাচন করতে গেলে, সম্ভব সব অঞ্চলেই যাওয়া উচিত। তবে সবসময় তো পারা যায় না। এতে যদি অনেকে মন খারাপ করে থাকেন, তাহলে আমাদের কাজ কঠিন হবে। ৫ দিনে যত জায়গায় যাওয়া যায়, সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। যেখানে যেতে পারিনি, ক্ষমা চেয়েছি, বাস্তবতা বুঝিয়েছে। তারপরও কেউ যদি তাদের এলাকায় না যাওয়ার জন্য মাইন্ড করেন আমার ওপর, তাহলে সেটা আমার প্রতি অবিচার হবে।

মাশরাফি বলেন, রাজনীতির কথা আগে ততটা ভাবিনি। তবে ছোটবেলা থেকে সবসময়ই চেয়েছি, মানুষের জন্য কিছু করার। রাজনীতি হয়ত সেই ইচ্ছেরই প্রতিফলন।

মাশরাফি বলেন, আমার বাবা, তার চেয়ে বড় আওয়ামীমনা লোক আমি দেখি না। ছোট চাচা যুবলীগের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, মেজো চাচাও আওয়ামীমনা।

আমার স্ত্রীর পরিবার যদি দেখেন, ওর দাদা মুক্তিযুদ্ধের কমাণ্ডার, বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আমার দাদাও ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। এমনকি ইতিহাসে জড়িয়ে আছেন আমার দাদার বাবাও। ১৯৫৪ সালে বঙ্গবন্ধুর আসার কথা ছিল আমাদের এলাকায়। নানা বাধায় আসতে পারেননি। আমার দাদার বাবা তখন মাইজপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট। তিনি সেই অনুষ্ঠান আয়োজন করেন তুলারামপুরে। সেখানে তিনি নিজে বঙ্গবন্ধুর হাতে নৌকা তুলে দেন।

মাশরাফি বলেন, অতীত ভাবার সুযোগ খুব বেশি ছিল না। অল্প সময় থেকেছি, অনেক লোকের ভিড়। তবে মনে তো পড়েছেই। সব মাঠেই খেলেছি। এই যে আজকেই (বৃহস্পতিবার) একটি মাঠে পথসভা করলাম, এখানে কত খেলেছি! এমনকি মাস দুয়েক আগেও ট্রলারে করে বউ-বাচ্চাসহ ওখানে ঘুরতে গিয়েছিলাম, বটতলায় বসে সময় কাটালাম। আজ সেখানে গেলাম ভিন্ন রূপে। সবই বলে দেয়, জীবন কতটা নাটকীয়।

নির্বাচনী প্রচারের অনেক ধরনের অভিজ্ঞতা হল। অনেককেই দেখা গেছে, আপনাকে ধরে কাঁদতে, আপনাকে ছুঁয়ে হাসতে। আপনার নিজের হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া কিছু অভিজ্ঞতা কি ভাগাভাগি করা যায়?

মাশরাফি: বলেন,বাস্তবতার মুখোমুখি কজন হতে পারে? আমি তো দুনিয়ার সবচেয়ে কমফোর্ট জোনে ছিলাম। ক্রিকেট খেলি, লোকে প্রবল ভালোবাসে। কিন্তু এই ভালোবাসা আমার সমাজ, আমার দেশের কী কাজে লাগে? তাদের ভালেবাসাকে আমি অবমূল্যায়ন করছি না। কিন্তু সেটা ধরে বেঁচে থাকার মত স্বার্থপরও আমি নই।

ওই ভালোবাসা সে জগতে পেয়েছি, সেখানে আমি নিজের সর্বোচ্চটা উজার করে দিয়েছি। সামনেও যে কদিন খেলব, সবটা দিয়ে খেলব। কিন্তু আমার কাছে সত্যিকারের মানসিক তৃপ্তি হবে লোকের জন্য কিছু করতে পারলে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৫৩ বার

Share Button

Calendar

June 2019
S M T W T F S
« May    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30