» এন্ড্রু কিশোরের মৃত্যুতে কাঁদছে সারাদেশ

প্রকাশিত: ০৭. জুলাই. ২০২০ | মঙ্গলবার

রিপন শান

আবহমান বাংলার সকল শ্রেণী পেশার মানুষের ভালোবাসার শিল্পী এন্ড্রু কিশোর । কী বুদ্ধিজীবী কী রাজনীতিবিদ কী আমজনতা – সবধরণের বাঙালির কাছে প্রিয় একটি নাম কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোর । এই বিপুল জনপ্রিয়তার কারণও আছে । রোমান্টিক, দেশাত্মবোধক, চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক, ফোক, মর্ডান ফোক, ক্লাসিক- সবধরণের গানে দরাজ গলার মহিমা লাগিয়েছেন বাঙালির প্রাণের শিল্পী এন্ড্রু কিশোর । পনেরো হাজারেরও বেশি গান এই মহান শিল্পীকে এনে দিয়েছে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা । স্বভাবসুলভ সরলতা আর নিরহংকার ব্যক্তিত্ব তার শিল্পীসত্তাকে গণমানুষের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছে । এন্ড্রু কিশোরের মত মহাজনপ্রিয় এমন একজন শিল্পীর জন্য বাংলা সংগীত কে বহুকাল অপেক্ষা করতে হবে মনে করেন বোদ্ধামহল । মৃত্যুকালে রাজশাহীতে ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌অবস্থানের কারণে এবং করোনা পরিস্থিতির কারণে সারাদেশের মানুষ তাকে সশরীরে শেষ শ্রদ্ধা না জানাতে পারলেও যার যার অবস্থান থেকে চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছে ।

টানা ১০ মাস ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করে অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় কিংবদন্তী সংগীতশিল্পী এন্ড্রু কিশোর। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসারত অবস্থায় তিনি নিজের ইচ্ছায় দেশে ফিরতে চেয়েছেন। বলেছিলেন, ‘আমি আমার দেশে গিয়ে মরতে চাই, এখানে নয়।’ ১১ জুন বিকেলে সিঙ্গাপুর থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে দেশে ফেরেন তাঁরা। ফিরে যান রাজশাহীতে, যেখান থেকে শুরু। নিজের শহর রাজশাহীর মহিষবাথান এলাকায় বোনের বাড়িতে শেষ হলো তাঁর জীবনের গল্প, পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিলেন তিনি। সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ৫৫ মিনিটে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক সম্রাট এন্ড্রু কিশোর। শরীরে নানা ধরনের জটিলতা নিয়ে অসুস্থ অবস্থায় গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে দেশ ছেড়েছিলেন এন্ড্রু কিশোর। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ১৮ সেপ্টেম্বর তাঁর শরীরে নন-হজকিন্স লিম্ফোমা নামের ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়ে। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক লিম সুন থাইয়ের অধীনে তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়। সেখানে কয়েক মাস একনাগাড়ে তাঁর চিকিৎসা চলে। সব চেষ্টার ব্যর্থ করে আজ তিনি চলে গেলেন এমন এক ঠিকানায়, যেখান থেকে আর কেউ কোনোদিন ফিরে আসে না। এ বছরের এপ্রিলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, এখন আর দরকার নেই, শুধু ওষুধ খেতে হবে। দেশে ফিরে যেতে পারবেন এন্ড্রু কিশোর। তাঁর স্ত্রী জানান, মে মাসের ১৩ তারিখ দেশে ফেরার টিকিট কেনা হয়েছিল। কিন্তু এন্ড্রু কিশোর শারীরিকভাবে ভীষণ দুর্বল বোধ করছিলেন। তাই বাতিল করা হলো টিকিট। চিকিৎসক জানিয়েছেন, এই দুর্বলতা কেমোর ধকল। ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে। চিকিৎসক আশ্বস্ত করায় ১০ জুন ফেরার টিকিট কেনা হয়েছিল। কিন্তু ২ জুন হঠাৎ আবার অসুস্থ হয়ে যান শিল্পী। পরদিন রাতে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় ৪ জুন। কোনো ওষুধই আর কাজ করছিল না শরীরে। পিইটি স্ক্যান হয় ৯ জুন। সে রিপোর্টে দেখা গেল লিম্ফোমা ভাইরাস ডান দিকের লিভার ও স্পাইনালে ছড়িয়ে গেছে। শরীরের বিভিন্ন জায়গাতেও অল্প অল্প দেখা যাচ্ছে। সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকেরা জানিয়ে দিলেন, আর কিছুই করার নেই।
বাংলা গানের এই কণ্ঠশিল্পী ‘প্লেব্যাক সম্রাট’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশের আধুনিক ও চলচ্চিত্রের কালজয়ী অনেক গান তাঁর কণ্ঠে সমৃদ্ধ হয়েছে। সুখ-দুঃখ, হাসি-আনন্দ, প্রেম-বিরহ—সব অনুভূতির গানই তিনি গেয়েছেন। ১৯৫৫ সালের ৪ নভেম্বর তিনি রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেন। সেখানেই তিনি বেড়ে উঠেছেন। পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। এন্ড্রু কিশোর প্রাথমিকভাবে আবদুল আজিজ বাচ্চুর অধীনে সংগীতের পাঠ শুরু করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর এন্ড্রু কিশোর নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, আধুনিক, লোক, দেশাত্মবোধকসহ প্রায় সব ধারার গানে রাজশাহী বেতারে তালিকাভুক্ত হন। চলচ্চিত্রে এন্ড্রু কিশোর গান গাওয়া শুরু করেন ১৯৭৭ সালে। ছবির নাম ‘মেইল ট্রেন’। পরিচালক শিবলী সাদিক। এই ছবিতে তিনি গেয়েছিলেন ‘অচিনপুরের রাজকুমারী নেই যে তার কেউ’ গানটি। চলচ্চিত্রে এটাই ছিল তাঁর প্রথম গান। সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন আলম খান। কিন্তু এন্ড্রু কিশোর সবার কাছে পৌঁছে যান দুই বছর পর। তাঁর এই গান ছিল ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’। মনিরুজ্জামান মনিরের লেখা গানটির সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন আলম খান। দীর্ঘদিন পুরোদস্তুর পেশাদার কণ্ঠশিল্পী হিসেবে দুই বাংলায় গান করেছেন এন্ড্রু কিশোর। একের পর এক জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন তিনি। গেল বছরের সেপ্টেম্বর মাসে অসুস্থ হয়ে পড়ার আগপর্যন্ত এন্ড্রু কিশোর প্লেব্যাক ও স্টেজ শো নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করেছেন। আলম খানের সুর-সংগীতে গেয়েছেন প্রয়াত সব্যসাচী লেখক ও কবি সৈয়দ শামসুল হকের লেখা শেষ তিনটি গান। এন্ড্রু কিশোর দেশের প্রখ্যাত সুরকারদের মধ্যে বেশি গান করেছেন আলম খান, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, আলাউদ্দিন আলীর সঙ্গে। এ ছাড়া গান করেছেন শেখ সাদী খান, ইমন সাহা, আলী আকরাম শুভসহ অনেকের সঙ্গে। ভারতের প্রখ্যাত সুরকার আর ডি বর্মনের সুরেও গান গেয়েছেন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে কলকাতাতেও প্লেব্যাকে বেশ কয়েকটি গান করেছেন। মাঝে কিছুদিন ব্যবসাও করেছিলেন। ১৯৮৭ সালে এন্ড্রু কিশোর আহমাদ ইউসুফ, আনোয়ার হোসেন বুলু, ডলি জহুর প্রমুখের সঙ্গে টিভি নাটক, বাণিজ্যিক এবং অন্যান্য প্রযোজনার জন্য ‘প্রবাহ’ নামে একটি বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠান শুরু করেন। এন্ড্রু কিশোরের সবচেয়ে জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’, ‘হায় রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’, ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘আমার বুকের মধ্যিখানে’, ‘তুমি যেখানে আমি সেখানে’, ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’, ‘চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা’, ‘বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে’, ‘তুমি আমার জীবন আমি তোমার জীবন’, ‘ভালো আছি ভালো থেকো’, ‘ভেঙেছে পিঞ্জর মেলেছে ডানা’, ‘ভালোবেসে গেলাম শুধু ভালোবাসা পেলাম না’, ‘তুমি আমার কত চেনা’, ‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা’, ‘তোমায় দেখলে মনে হয়’, ‘এইখানে দুজনে নিরজনে’সহ অনেক গান। জীবনের বেশির ভাগ সময়ে মূলত চলচ্চিত্রে গান করেই কাটিয়েছেন। চলচ্চিত্রের এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে অডিও বাজারে খুব একটা অ্যালবাম করেননি। চলচ্চিত্রের বাইরে এসে প্রথম দিকে তিনি ‘ইত্যাদি’তে গান করেন ‘পদ্মপাতার পানি নয়’, যা বেশ জনপ্রিয়তা পায়। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকবার ‘ইত্যাদি’তে এসেছেন।
এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা এন্ড্রু কিশোর রেখে গেছেন শোকাহত প্রিয়তমা স্ত্রী। তার দুই সন্তানই অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। মেয়ে মিনিম এন্ড্রু সংজ্ঞা সিডনিতে গ্রাফিকস ডিজাইন ও ছেলে জে এন্ড্রু সপ্তক মেলবোর্নে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে পড়াশোনা করছেন।

কিংবদন্তী এই কণ্ঠশিল্পীর মৃত্যুতে দেশের সঙ্গীতাঙ্গনে নেমেছে গভীর শোকের ছায়া । টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রুপসা থেকে পাথুরিয়া এককথায় সারাদেশে অগুনতি ভক্তরা তার জন্য কাঁদছে । হাজারো গানের সুরভীতে যুগ যুগ বেঁচে থাকবেন এন্ড্রু কিশোর ।

বাঙালি সাংস্কৃতিক বন্ধন, অস্ট্রিয়া বাংলাদেশ প্রেসক্লাব, বাংলার মুখ, বাংলাদেশ রোদসী কৃষ্টিসংসার, পদক্ষেপ বাংলাদেশ,লালমোহন উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি, লালমোহন মিডিয়া ক্লাব, দৈনিক ইউরো সমাচার পরিবার, শান ফাউন্ডেশন, নেক্সাস ৯৩ সহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন; দেশীয় সংগীতের প্রবাদপ্রতিম জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোরের মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন করেছে ।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৪২ বার

Share Button

Calendar

August 2020
S M T W T F S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031