করোনাকালে সুকুমার শিল্প চর্চায় ‘চাপহীন’ ছোট্ট সোনামনিরা

প্রকাশিত: ১১:৩৬ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৬, ২০২০

করোনাকালে সুকুমার শিল্প চর্চায় ‘চাপহীন’ ছোট্ট সোনামনিরা

সাদেকুর রহমান

একটি বহুল প্রচলিত বাংলা প্রবাদ আছে, ‘কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ।’ এই প্রবাদের অন্তর্নিহিত অর্থ, একই পরিস্থিতিতে কারও মনে আসে আনন্দ, সুখ ও উল্লাস; আবার অন্য দিকে কারও বা আসে বিষাদ, দুঃখ ও হতাশা। নভেল করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) কবলিত এই সময়ে সর্বত্র শোক, উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার আতংক। প্রাণঘাতি করোনার সংক্রমণ রোধে সরকার সারাদেশে সাধারন ছুটি ঘোষণা করেছে। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইন ক্লাশের ব্যবস্থা করেছে। সরকারিভাবেও টেলিভিশনে বিষয়ভিত্তিক ক্লাশ করানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাশ বন্ধ থাকা, প্রাইভেট টিউটরের পড়াও স্থগিত হওয়ার পাশাপাশি মুক্তভাবে খেলাধুলা করা, বেড়ানোর ওপর অনিবার্য নিষেধাজ্ঞা ‘জারি’ হওয়ায় শিক্ষার্থীরা এখন অনেক ‘অবসর’ সময় পাচ্ছে। করোনা-অবরুদ্ধ এ সময়টাকে ছোট্ট সোনামনিরা কাজে লাগাচ্ছে আপন মনে সুকুমার শিল্প চর্চার মাধ্যমে। কল্পনার ক্যানভাস আর ভাবনার পটভূমিতে নিজের মতো করে চাষবাস করতে পারছে শিশু-কিশোররা।

রাজধানীর ফয়জুর রহমান আ্ইডিয়াল ইনস্টিটিউটের প্রথম শ্রেণির ছাত্র আহমেদ যারার ওয়াহেদ শাবীব। হামজনিত অসুস্থতায় ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকেই সে স্কুলে যেতে পারছিলনা। তারপর তো করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকারই দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। বাসায় সে নিয়মিত লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অবিরাম পাঠ্যবই পড়া কি ভালো লাগে? ছবি আঁকার নেশা যেন একটু বেড়েই গেল! সাথে যোগ হলো সাহিত্য চর্চা। ‘রুষ্টি বিস্কি’ নামে একটি ছড়া লিখে চমকে দেয় বাবা-মাকে। ছড়াটি এমন-“মা খাও রুষ্টি/ খেতে হবে বিস্কি/ বিস্কি খেতে হলে/নাও এবার শাস্তি।” সাত বছর বয়সী শাবীবের লেখা আরেকটি ছড়া এমন-“আয় রে আয় খোকা/ ভাত খাবি বোকা/এসে যাবে খালামনি/করে দেবে রান্ধুনি।”

শাবীরের বড় ভাই মুহাম্মদ সাদমান সাইফান রাজধানীর আরেক প্রসিদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ এর বনশ্রী ক্যাম্পাসে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। সাইফানেরও পাঠবইয়ের বাইরে জ্ঞানার্জনের নেশা প্রবল। গান গাওয়া, ছবি আঁকা, ডায়েরি লেখা তার শখের মধ্যে পড়ে। করোনাজনিত চলমান ছুটিতে সে-ও তার বিপুল অবসর সময়কে কাজে লাগাচ্ছে সুকুমার বৃত্তির চর্চায়। পত্রিকার ছবি দেখে একদিন ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের ছবি এঁকে ফেলে। সৌরজগতের ছবি আঁকা তার অন্যতম নেশা।

সাইফান-শাবীবের মা রুবিনা ইসলাম একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে লজিস্টিক অফিসার হিসেবে কর্মরত। আন্তর্জাতিক নিয়মে তার অফিসের সাপ্তাহিক ছুটি শনি ও রবিবার। সঙ্গত কারনেই তিনি চাইলেও দু’ সন্তানকে ওইভাবে সময় দিতে পারতেন না। করোনা পরিস্থিতিতে তার অফিস কার্যক্রমে এসেছে শিথিলতা। তিনি প্রযুক্তির সহায়তায় বাসা থেকেই অফিসের অর্পিত দায়িত্ব পালন করছেন। এতে যেটা হয়েছে, দু’ আদরের ধনকে এখন সময় দিতে পারছেন বেশি। সপ্তাহের সাতদিনই সন্তানের সংস্পর্শে থাকতে পারছেন। এতে মা ও দু’ ছেলে সবাই বেশ খুশি।

নারী টেবিল টেনিসে জাতীয় পর্যায়ে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন সালেহা সেতুর একমাত্র সন্তান নওলেস সানভী। পড়ছে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘স্কলাস্টিকা’তে, প্রথম শ্রেণিতে। করোনা দুর্যোগে স্কুল বন্ধ। ক্লাস হচ্ছে অনলাইনে। মায়েরও বাইরে যাওয়ার এখন তাড়া নেই। তাই ছেলেকে শতভাগ সময় দিতে পারছেন। ছেলেকে নিজেই সিলেবাস অনুযায়ী বাসায় পড়াচ্ছেন। কিন্তু কতক্ষণ আর পড়তে ভালো লাগে? একঘেঁয়ে কোয়ারেন্টিন জীবন ভিন্নভাবে সুযোগ এনে দিয়েছে সানভীকে। সে এখন মনের বিক্ষিপ্ত ভাবনাগুলোকে ছবিতে রূপ দিচ্ছে, কাগজের বুকে রঙ পেন্সিলের ছোঁয়ায়। সাদা কাগজের ওপর ছোট্ট বাড়ি, ল্যাপটপ, গাজর, শালগম, আপেল, ঘুড়ি, মোমবাতি, বেগুন, বেলুন, নৌকা সহ নানা ধরনের ছবি এঁকেছে সানভী। এসব ছবি মায়ের টাইমলাইনে আপলোড করার পর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করছে সবাই। সানভী দারুন খুশি। তারচেয়েও যেন বেশি খুশি মা সালেহা সেতু। তিনি বললেন, “ওর (সানভী) ছবিগুলো দেখে আমি নিজে যার পর নাই খুশি হয়েছি। বলতে পারেন আশ্চর্যজনক খুশি। ও চারপাশের জিনিসকে তুলে ধরছে। সবাই ওর জন্য দোয়া করবেন।”

সংবাদকর্মী রুকনুজ্জামান অঞ্জন তার স্কুল পড়–য়া ছেলে ধ্রুব নীল সূর্য্য’র আঁকিয়ে গুণ সম্পর্কে বলছিলেন, “একদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর ধ্রুব দাগ টানা প্যাডে আঁকা একটা ছবি বের করতে করে বললো, এই দ্যাখো, ‘বোতলে ভরা শহর’। ছবির শিরোনাম শুনে চমকে ওঠলাম।… গত কয়েকদিন ধরে সে বলছিলো, বাবা আমি আর ফুটবলার হবো না। কার্টুনিস্ট হবো। অ্যানিমেশন মুভি তৈরি করবো।” ধ্রুব’র আঁকা ‘লকডাউন অভিব্যক্তি’ শিরোনামের ছবিটি দেখেও বুঝার জো নেই, এটা কচি হাতের কাজ। যেন কোন পেশাদার চিত্রশিল্পী ছবিটি এঁকেছেন। কার্টুনিস্ট হওয়ার অভিপ্রায়ে এখন সে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি ছবি আঁকায়ও মনোযোগী হওয়েছে বলে জানান অঞ্জন। ধ্রুব’র স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ১৬ মার্চ, এরপর আর খোলেনি।

সাইফান, শাবীব, সানভী, ধ্রুবর মতো আরও অনেক ক্ষুদে আঁকিয়ে, ছড়াকার, সঙ্গীতকারের খবর আমরা জানতে পেরেছি। করোনাকালের এই অস্বাভাবিক সময়কে অর্থপূর্ণ ভাবে কাজে লাগাতে নিজ থেকেই তৎপর স্কুল পড়–য়ারা শিশু-কিশোররা। ওরা অস্থির সময়টাতে সুকুমার শিল্প চর্চায় ব্যয় করছে। শহুরে জীবনে শিশুদের মূলত সময় কাটানোর দুটি জায়গা-স্কুল আর বাসা। বাসা মানে কয়েকশ’ বর্গফুটের রড সিমেন্টের খাঁচা। আর স্কুল মানে আরেকটু বড় খাঁচা, বাড়তি হিসেবে আছে চাপ। কোথাও মুক্ত আকাশ নেই, এক নিঃশ্বাসে দৌড়ে ক্লান্ত হওয়ার জায়গা নেই কিংবা নেই ডুব সাঁতার খেলা দুরন্ত দুপুর। নেই ভোরের ঝলমলে রোদে শিশিরে পা ভেজানের কোনও আয়োজন। স্কুল বন্ধ হওয়ায় অনেটাই ‘চাপমুক্ত’ হয়েছে শিক্ষার্থীরা। ‘চাপহীন’ থেকে ওদের অনেকেই এখন শৈশবের দুরন্ত সময়ের আনন্দ উপভোগের চেষ্টা করছে নেচে-গেয়ে, আঁকিবুঁকি করে। প্রযুক্ত-নির্ভর ঘরোয়া বিনোদনের সময়টাও সৃজনশীল চিন্তায়-কর্মে ব্যয় করার চেষ্টা করছে।

করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয় গেল মার্চের মাঝামাঝি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরই মধ্যে বলেছেন, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে স্কুল বন্ধ থাকতে পারে। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগী ও শিক্ষাবিদ-বিশেষজ্ঞদের সাথে আলাপ করে জুন মাসে স্কুল খোলার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছে।

বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে ‘সুকুমার শিল্প’ মানে বুঝানো হয়েছে ‘ সঙ্গীতাদি; চারুশিল্প; ললিতকলা’। বিশেষজ্ঞরা নানা অসঙ্গতিপূর্ণ বর্তমান সময়ে শিশুদের মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধ সম্পন্ন করে গড়ে তুলতে ছেলেমেয়েদর সঙ্গে বাবা-মায়ের সময় কাটানোর পাশাপাশি সুকুমার বৃত্তির চর্চা করার উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। করোনা-সৃষ্ট ঘরবন্দী সময় এর অপূর্ব সুযোগ এনে দিয়েছে। কর্মব্যস্ত মা-বাবারা এখন সন্তানদের যথেষ্ট কাছে থেকে সময় দিতে পারছেন। প্রাতিষ্ঠানিক রুটিনমাফিক পড়াশোনার চাপ না থাকায় সন্তানদের সুকুমার বৃত্তি চর্চার দিকে মনোযোগ সৃষ্টি বা বৃদ্ধি করা অপেক্ষাকৃত সহজ হচ্ছে।

করোনাজনিত ‘লকডাউন’ বা ‘সাধারন ছুটিতে’ শিশু-কিশোরদের সুকুমার চর্চাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক তাজুল ইসলাম বলছিলেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের সময়ে শিশু-কিশোরদের সুকুমার শিল্প চর্চার ব্যাপারটি আশা জাগানিয়া বটে। শিশুমনের এমন চিন্তা থেকে বড়দেরও কিছু ভাববার উপাদান পাওয়া গেল।” তিনি বলেন, “বর্তমানে সমাজের অনেক পরিবর্তন দেখছি আমরা। সাংস্কৃতিক, সামাজিক মূল্যবোধ ও অপরাধ জগতের নানা পরিবর্তন এসেছে। এর প্রধান কারণ, আমাদের ভেতরে সুকুমার বৃত্তির চর্চা কমে গেছে অনেকখানি। একজন মানুষ বিকশিত হয় সামাজিক, আধ্যাত্মিক, শারীরিক ও মানসিকভাবে। কেবল শারীরিক বিকাশ ছাড়া বাকি বিকাশগুলোর জন্য পরিবেশের প্রয়োজন অপরিসীম। শহুরে চাপের কারণে শিশুদের এমন বিকাশ হচ্ছে না। তারা এককেন্দ্রিক ভোগবাদী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। অন্যের প্রতি ভালোবাসা, কারও বিপদে এগিয়ে আসা, সহানুভূতি থাকছে না, সৃষ্টিশীল-সৃজনশীল হচ্ছে না।’