শিরোনামঃ-


» করোনাভাইরাস প্রতিরোধ যুদ্ধে রাজনগর

প্রকাশিত: ২০. জুলাই. ২০২০ | সোমবার

মৌলভীবাজার থেকে নিজস্ব সংবাদদাতাঃ বৈশ্বিক মহামারী কভিড-১৯ এর আক্রমণ চীনে যখন শুরু হয়, ইউরোপের ইতালী-স্পেন-ফ্রান্স, আমেরিকা যখন একের পর এক বিধ্বস্ত হচ্ছে তখনও বাংলাদেশের হাতে কিছুটা সময় ছিল। জরুরি দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতির জন্য সময়টা নেয়াহেত কম ছিল না। “পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগ প্রস্তুত, করোনার চেয়েও আমরা শক্তিশালী” – এই জাতীয় উক্তি যে কতটা ফাঁকা বুলি ছিল এখন তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন দেশের মানুষ। যেদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় জনবলের ভারসাম্য নেই, ডাক্তার আছে তো নার্স নেই, মেশিনারীজ আছে তো মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট নেই, জনগোষ্ঠীতে নিরন্তর অবস্থান করে রোগপ্রতিরোধী বার্তা পৌঁছে দেবার পর্যাপ্ত সংখ্যক স্যানিটারী ইন্সপেক্টর নেই। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জনবলের এই ভারসাম্যহীন অবস্থায়ও যারা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনাকে বিশ্বের রোলমডেল বলে প্রচার করতেন, তাদের মুখে চুনকালি মাখিয়েছে কভিড-১৯। স্বাস্থ্য প্রশাসনের সাথে চিকিৎসা বণিকদের যোগ-সূত্রের নগ্ন প্রকাশ তো জনগণ দেখতে পাচ্ছেন। রোলমডেল একটা ছিল সে হলো সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাকে (অপ)কৌশলে অকার্যকর রেখে বেসরকারি চিকিৎসা বাণিজ্যের হাতে সাধারন মানুষকে তুলে দেবার ভুল কর্মপদ্ধতি। চিকিৎসা বাণিজ্যের প্রতি গভীর মমত্ববোধ। যার ফলশ্রুতিতে এখানে শাহেদ করিমরা জন্ম নিয়েছে, ডাঃ সাবরিনার মতো অমানুষ তৈরী হয়েছে। একটি মহত সেবামূলক পেশাকে কলংকিত করছে। চিকিৎসা বাণিজ্য অমানবিক দৈত্যদের মত আচরণে অভ্যস্ত হয়েছে। কভিড-১৯ এর আতংকে অন্যান্য রোগের চিকিৎসাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সিস্টেমটা যারা ইচ্ছে করে নস্ট করছেন, তাদের সে পাপের বোঝা বহন করছে জাতি। ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হয়। করোনায় দেশে প্রথম মৃত্যু ঘটনা ঘটে ১৮ মার্চ। ৪ এপ্রিল মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার ভাঙ্গার হাট গ্রামে সাঞ্চু মিয়া (৫০) করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যান। তখন রাজনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ল্যাবরেটরিতে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদ থাকলেও মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট পদের কেউ ছিল না। কে করবে মৃতের স্যাম্পুল কালেকশন? এই অবস্থার শূন্যতা পুরণে এগিয়ে আসেন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ইপিআই) প্রবাল চন্দ্র দাশ। রেসিডেন্সিয়াল মেডিকেল তোফাজ্জল হোসেন ভূইয়ার নেতৃত্বে রাজনগর হাসপাতালের মেডিকেল টিম একই দিনে ঐ মৃত সাঞ্চু মিয়া-সহ তার সংস্পর্শে আসা আরও ৯ জনের স্যাম্পুল কালেশন করে ঢাকার ইডিসিসিআরে পরীক্ষার জন্য প্রেরণ করা হয়। অন্য সবার নেগেটিভ রেজাল্ট আসলেও মৃত সাঞ্চু মিয়ার করোনাভাইরাস পজিটিভ ছিল বলে জানা যায়। এরপর উক্ত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ বর্নালী দাশের প্রচেষ্টায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সিভিল সার্জন ডাঃ তৌহিদ আহমদ এর নির্দেশনায় মৌলভীবাজারের বক্ষব্যাধি হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) আশীস দেবকে রাজনগরে সাময়িকভাবে পদায়ন করা হয়। সেই থেকে ডাঃ তন্ময় দত্ত, এমডিসি, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট প্রবাল দাশ ও মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট আশীষ দেব এই তিন জনের মেডিকেল টিম নিরন্তর সন্দেহজনক করোনা রোগীর স্যাম্পুল কালেশন করে চলেছেন। এপর্যন্ত কালেকশনের সংখ্যা ৪৯২ জন। এর মধ্যে সনাক্ত রোগী ৬৩ জন। তবে আশার কথা হলো আক্রান্তদের কেউ আর মারা যায়নি। কভিড-১৯ প্রতিরোধে চলছে তাদের প্রাণপণ প্রচেষ্টা। প্রশাসনের নির্দেশনায় আক্রান্ত রোগীদের, চিকিৎসা, আইশোলেশন, কোয়ারান্টাইন সব করছেন উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা। করোনা নিয়ে নানারূপ বিভ্রান্তিকর গুজবের খবরাখবরও প্রতিরোধ করছেন তারা। যারা বাড়িতে থাকেন তাদের দেখাশুনার দায়িত্ব পালন করেন কমিউনিটিতে অবস্থান করা স্বাস্থ্য সহকারীগণ। ইতিমধ্যে এই কভিড-১৯ প্রতিরোধের কাজে সম্পৃক্ত থেকে আক্রান্ত হয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের বেশ কয়েকজন স্বাস্থ্য কর্মী। সকল কভিড-১৯ প্রতিরোধ যোদ্ধাদের প্রতি একরাশ ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন রাজনগর উপজেলার সাধারণ মানুষ।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩০৪ বার

Share Button