» করোনাভাইরাস মহামারী এবং সাম্রাজ্যবাদের ভু-রাজনৈতিক এজেন্ডা: এডভোকেট রশীদ

প্রকাশিত: ২৬. মার্চ. ২০২০ | বৃহস্পতিবার

অর্থনীতি প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো করোনাভাইরাসে কাবু হয়ে পড়েছে। অর্থগৃধু চীনের অর্থনীতিতে মরুঝড় থেমে গেলেও করোনাভাইরাসে ইউরোপ-আমেরিকায় লক-ডাউনের প্রভাবের কারণে চীনের অর্থনীতি আপাতত আগের অবস্থায় ফিরে আসা সম্ভব হচ্ছে না। তবে গত দশকের শুরুতে পশ্চিমা অর্থনীতিতে যে মন্দা দেখা দিয়েছিল তা থেকে বাঁচতে ট্রিলিয়ন ডলারের বেইল-আউট প্রোগ্রাম হাতে নিতে হয়েছিল।

লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান বাঁচাতে কর্পোরেট কোম্পানির হাতে হাজার হাজার কোটি ডলারের বেইল-আউট তহবিল তুলে দেয়া হলেও তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। উপরন্তু মার্কিন জনগণের উপর বাড়তি করের বোঝা চাপিয়ে দেয়ার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে সঙ্কুচিত করে ফেলা হয়েছে। অতঃপর পুঁজিবাদের মুকুট টিকিয়ে রাখতে নতুন নতুন ওয়ার থিয়েটার সৃষ্টি করে হাজার হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র বাণিজ্যের পথ প্রশ্বস্ত করা হয়।

তথাকথিত নাইন-ইলেভেনের পর সূচিত ওয়ার অন টেররিজমকে শুরুতেই অন্তহীন যুদ্ধ বলে অভিহিত করা হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে হাজার হাজার কোটি পেট্রোডলারের অস্ত্র বাণিজ্য চাপিয়ে দেয়া ছাড়া সেই যুদ্ধে কোনো পক্ষের বিজয় হয়নি। ইরাকে, আফগানিস্তানে, সিরিয়ায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বাহিনীর পরাজিত চেহারাটা এখন আর লুকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। প্রায় দুই দশক ধরে দখলবাজির যুদ্ধে প্রায় নিঃশেষিত হতে হতে মার্কিন সামরিক কমান্ডাররা এখন আফগান তালিবান মুজাহিদদের সাথে সমঝোতা চুক্তি করে পালাতে চাইছে।

ইরানি সামরিক কমান্ডার জেনারেল কাসেম সুলাইমানি ইরাকে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হওয়ার পর ইরাকে মার্কিন সেনাঘাটিগুলো ইরানি রেভ্যুলুশনারি গার্ড বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার পর মার্কিনিরা ইরাক ছেড়ে পালাতে শুরু করেছে। সিরিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের পরাজয় অনেক আগেই নির্ধারিত হয়ে গেছে। ইয়েমেনে সউদি নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা মদদপুষ্ট জোটেরও এখন নাস্তানাবুঁদ অবস্থা। চারদশকের বেশি সময় ধরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিন ইরানে রিজিম চেঞ্জের যে অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে এসে তা অনেকটা প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে। সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান ও ইয়েমেনে মার্কিন সমর্থিত বাহিনীর আপাত পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ইরানের কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বই প্রমাণিত হয়েছে। এহেন বাস্তবতায় ইরানের সাথে ৬ বিশ্বশক্তির পারমাণবিক সমঝোতা চুক্তি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়া এবং নতুন নতুন অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরও যখন ইরানি রিজিমকে শায়েস্তা করা যাচ্ছে না, তখন তারা যদি বায়োলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার শুরু করে তাহলে খুব বেশি আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। আর কিছু হোক বা না হোক, এই করোনাভাইরাসের টারময়েল থেমে গেলে বিশ্বে নতুন করে যে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেবে, তাতে আবারো কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারে বেইল-আউট প্রোগ্রাম হাতে নিতে হবে। পুঁজিবাদের কর্পোরেট ধান্দাবাজরা সেই বিশাল বেইলআউট বাজেট হাতিয়ে নিতে উদগ্রীব হয়ে আছে।

চীনের হুবেই প্রদেশের উহান সিটিতে কভিড-১৯ বা করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর শুধু উহানই নয় পুরো চীনই কার্যত লক্ড-ডাউন হয়ে পড়ে। চীনের তেজি অর্থনীতি ও বাণিজ্য এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের বেকায়দা অবস্থা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ফায়দা হাসিলের সম্ভাবনার কথা উচ্চারণ করেছিলেন। পক্ষান্তরে চীনে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পেছনে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাত থাকার কথা বলেছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপত্র ঝাও লিজিয়েন।

গত বছর অক্টোবরে চীনের উহানে অনুষ্ঠিত ৭ম আন্তর্জাতিক মিলিটারি ওয়ার্ল্ড গেমে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ৩০০ এথলিট অংশগ্রহণ করে। এর একমাসের মধ্যেই উহানে প্রথম করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঘটনা প্রকাশিত হয়। করোনাভাইরাস মার্কিন সামরিক বাহিনীর জীবাণু অস্ত্র কর্মসূচি থেকে উদ্ভুত, আরো অনেকেই এখন এমন অভিযোগ করছেন। মার্কিন রাজনীতিবিদ ২০০৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের একটি সমাজতান্ত্রিক দলের প্রার্থী বিল ভ্যান অকেন তার লেখা একটি নিবন্ধের শিরোনাম দিয়েছেন, ‘ইউএস ইম্পেরিয়ালিজম এক্সপ্লয়েটস করোনাভাইরাস অ্যাজ অ্যা ওয়েপন অব ওয়ার’, অর্থাৎ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা করোনাভাইরাসকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ নিচ্ছে।

তিনি বলেছেন, বিশ্ব যখন করোনাভাইরাস ভীতিতে কম্পমান, বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের লাখ লাখ মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পরিচালক ড. তেদ্রস এধানম গেব্রিয়াসোস যখন বলছেন, সলিডারিটি, সলিডারিটি এবং সলিডারিটিই হচ্ছে মানবতার এই অদৃশ্য শত্রুকে মোকাবিলা করার একমাত্র উপায়। তখন পুঁজিবাদের মহারথিরা করোনাভাইরাসের এই সন্ত্রস্ত সময়কে সামাজিক বৈষম্য বাড়িয়ে তোলার মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদী স্বার্থ, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কৌশলগত সুবিধা ও ফায়দা হাসিলের অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। ভ্যান অকেনের ভাষ্য অনুসারে মানবজাতির অদৃশ্য শত্রু করোনাভাইরাসের বিপরীতে আরেক শত্রু সক্রিয় রয়েছে, আর তা হচ্ছে বিশ্বস্রাজ্যবাদ বা ওয়ার্ল্ড ইম্পেরিয়ালিজম। ইরানে করোনাভাইরাসের মহামারী ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন মার্কিন রাজনীতিবিদ বিল ভ্যান অকেন।

চীনের উহানে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে করোনা সংক্রমণে মৃত্যুর অস্বীকৃত তথ্য জানা যায়। সিডিসি বা মার্কিন সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের পরিচালকের এক স্বীকারোক্তিতে বলা হয়েছে, কিছু সংখ্যক মার্কিন নাগরিক দৃশ্যত ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করার পর তাদের শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে চীনা কূটনীতিক ঝাও লিজেয়ান সে সব করোনাভাইরাস রোগীরা কবে কোথায় মৃত্যুবরণ করেছেন, কোথায় কোন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ইত্যাদি বিষয় পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছিলেন।

তবে সে দিকে না গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার শিষ্যরা কনস্পিরেসি ও স্ববিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।

চীন ও ইতালির পর করোনাভাইরাসে এশিয়ায় সবচেয়ে ভয়াবহ মহামারীর শিকার হয়েছে ইরান। সেখানে প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এই ব্যাপক প্রাণঘাতী মহামারীর মধ্যেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর নতুন কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়েছে। ইরানের তেল বিক্রিতে সহায়তার অভিযোগে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণাও এ সময়ে এসেছে। অন্যদিকে করোনাভাইরাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে শুরু করেছে। গত সোমবার পর্যন্ত সেখানে করোনা সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার এবং চারশতাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। এর মধ্যে একদিকে ইরানের উপর নতুন নিষেধাজ্ঞা চাপানোর পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে প্রোপাগান্ডাযুদ্ধও চালানো হচ্ছে।

ইরানের শাসকরা নিজেদের নাগরিকদের হত্যার মুখে ঠেলে দিচ্ছে বলে দাবি করে করোনাভাইরাসের মহামারী ঠেকাতে ইরানকে সহায়তার প্রস্তাবও দিয়েছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে মার্কিনিদের এই প্রস্তাবকে হাস্যকর বলে অভিহিত করে বলা হয়েছে, তারা যদি সত্যিই আমাদের সহায়তা করতে চাইত, তাহলে নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ওষুধ ও জরুরি মানবিক সহায়তার পথ রুদ্ধ করার পদক্ষেপ নিত না। বরং তারা অর্থনৈতিক নিশেধাজ্ঞা শিথিল করার ঘোষণা দিত।

ইরানি স্বাস্থ্যমন্ত্রী রেজা রাইসি এক বিবৃতিতে বলেছেন, করোনাভাইরাসের মহামারী ঠেকানোর সক্ষমতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার নেই। আর প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি করোনাভাইরাস মহামারীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তায় তার সদিচ্ছার কথা জানিয়েছেন। ইরানি নেতারা এক সপ্তাহের মধ্যে করোনাভাইরাসের মহামারী নিয়ন্ত্রণের প্রত্যয় ব্যক্ত করতেও শোনা গেছে। ইরানের করোনা মহামারীর অবস্থা পরিদর্শনে গিয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা করোনাভাইরাস রোগী পর্যবেক্ষণ, চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণের সার্বিক ব্যবস্থাপনার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

মরোক্কো ভিত্তিক নিউজ এজেন্সির সাংবাদিক-লেখক, জেসপার হ্যামান দাবি করেছেন, ইরানকে পঙ্গু করে দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোভিড-১৯ ভাইরাসকে যুদ্ধাস্ত্রে পরিণত করেছে। আইএইএ বা ইন্টারন্যাশনার অ্যাটোমিক এনার্জি এজেন্সির পরিদর্শকরা যখন বলছেন, পরমাণু প্রকল্প পরিদর্শনে ইরান তাদের পূর্ণ সহযোগিতা করেছে, তার পরও ইরানের উপর সবার্ত্মক অবরোধের মতো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। চীন ও ইরানে করোনাভাইরাসে মহামারী দেখা দেয়ার পরও বাড়তি নিষেধাজ্ঞা ও বেøইম গেমে লিপ্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সা¤্রাজ্যবাদী শাসকদের দেউলিয়াপনা ও অমানবিক চেহারাই ফুটে উঠেছে।

প্রায় চার দশক ধরে পশ্চিমা অবরোধের মুখে ইরানের উন্নয়নশীল অর্থনীতির উপর বার বার কঠোর থেকে কঠোরতর নিষেধাজ্ঞা আরোপ ইরানকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। এবার করোনাভাইরাসের মহামারীতে হাজারো মানুষের মৃত্যুর মিছিল যখন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে চলেছে ঠিক তখন নতুন নিষেধাজ্ঞার ছোবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেই প্লেগের সাথে তুলনা করা চলে। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস কলেজ অব লিবারেল আর্টস এর অধ্যাপক অ্যাডওয়ার্ড কার্টিস সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নিবন্ধের শিরোনাম দিয়েছেন “করোনাভাইরাস ইজ নট ‘দ্য প্লেগ’: ইট ইজ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস।” কার্টিস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে করোনাভাইরাসের চেয়ে মারাত্মক ‘প্লেগ’র সাথে তুলনা করেছেন। ফরাসি-আলজেরিয়ান নোবেল পুরস্কার বিজয়ী উপন্যাসিক আলবেয়ার ক্যামুর লেখা ‘দ্য প্লেগ’ উপন্যাসটি ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসে প্লেগের মহামারীতে একটি ব্যাপক সামাজিক-মানবিক বিপর্যয়কর অবস্থাকে তুলে ধরা হয়েছে। প্লেগের সমাজবাস্তবতা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ও ব্যর্থতার সাথে এখনকার করোনাভাইরাসের মহামারীর সাদৃশ্য শুধু নয়, হুবুহু মিল তুলে ধরেছেন। প্লেগে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর ঘটনা মানব সভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্লেগের সময় প্রথমে রাষ্ট্রশক্তিরগুলোর অবহেলা, অতঃপর বিপুল প্রাণহানির খেসারত, একসময় মহামারী নিয়ন্ত্রণে কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশনসহ জরুরি অবস্থা জারির যে বাস্তবতা ৭ দশক আগে আলবেয়ার কামু তুলে ধরেছেন আজকের বিশ্ব যেন তারই বাস্তব মঞ্চায়ন দেখতে পাচ্ছে। প্লেগে আক্রান্ত সমাজের ভাগ্যবান মানুষরা যেভাবে অগাধ সম্পদের মালিক হয়ে আরাম-আয়েশ, মদ- জুয়ায় আসক্ত ছিলেন, সেখান থেকে তারা কখনো খেয়াল করেননি তাদের অজান্তে বেড়ে ওঠা ইঁদুরগুলো প্লেগের মরক বহন করে আশপাশের পুরো মানব সমাজকে ভয়াবহ মহামারীতে ঠেলে দিয়েছে। যখন হুঁশ হলো তখন, যখন আর কিছুই করার নাই।

বিশ্বের অন্যতম জনবহুল ও দরিদ্র এলাকা দক্ষিণ এশিয়ায় করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে মহামারী আকারে শুরু হলে এখানকার বাস্তবতা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়।

পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যেও গণচীন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার শুরুতেই আইসোলেশন, লকডাউন-শাট ডাউনের পাশাপাশি অকল্পনীয় দ্রæততায় রাতারাতি নতুন নতুন হাসপাতাল নির্মাণসহ শত শত কোটি ডলারের প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে কভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে আড়াই মাসের মধ্যে জয়ী হয়েছে।

পক্ষান্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে চীনের করোনাভাইরাস নিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা, অতঃপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের করোনার সম্ভাব্য বিস্তার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে সময় ক্ষেপণ ও গড়িমসি করেই বসে থাকেন নি, উপরন্তু তিনি একে একটি হোক্স বা ধাপ্পাবাজি বলেও অভিহিত করেছেন। ইতিপূর্বে গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও ক্লাইমেটচেঞ্জ নিয়েও অনুরূপ মনোভাব দেখিয়ে প্যারিসের ক্লাইমেট চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিশ্বসম্প্রদায়ের গৃহীত পদক্ষেপে যে বিশাল তহবিলের প্রয়োজন সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাঁদা পরিশোধে ট্রাম্প প্রশাসনের অনীহা এখন পরিবেশবাদীদের কাছে বড় ধরনের ভাঁওতাবাজি হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

এভাবে বিশ্বের প্রকৃত সমস্যা ও সংকটগুলোকে পাশ কাটিয়ে জায়নবাদী বিশ্ব সা¤্রাজ্যবাদীরা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ফায়দা হাসিল করে কোটি কোটি মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতেও কুণ্ঠিত হচ্ছে না। এ কারণেই অ্যাডওয়ার্ড কার্টিস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নামক রাষ্ট্রটির সাম্রাজ্যবাদী শাসকদেরকে করোনাভাইরাসের চেয়েও বড় বিপদ প্লেগের সাথে তুলনা করেছেন।

এরা কোটি কোটি নিরপরাধ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ফায়দা হাসিলের ধান্দাবাজিতে লিপ্ত রয়েছে। বিশ্বের জনসংখ্যা তিনভাগের একভাগে নামিয়ে আনার জায়নিস্ট ইলিউমিনাতি এজেন্ডা বা গোপন আকাক্সক্ষা ও পরিকল্পনার কথা শোনা গিয়েছিল অনেক আগেই। মহাযুদ্ধে ওয়েপসন অব মাস ডেস্ট্রাকশন বা ব্যাপক গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সে লক্ষ্য অর্জনের প্রস্তুতি তাদের আছে। এখন করোনাভাইরাস হয়তো সেই লক্ষ্য অর্জনেই কাজ করছে। তবে চীন, ইতালি, স্পেন, ইরানের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোও জনবিরল মৃত্যুপুরিতে পরিণত হওয়ার বাস্তবতা দেখে মনে হচ্ছে বিশ্বের কোনো পরাশক্তি এই মহামারী ঠেকাতে সক্ষম নয়।

তবে ইতোমধ্যেই বেশকিছু দেশের কর্পোরেট কোম্পানি করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন ও প্রতিশেধক তৈরির খবর জানাচ্ছে। এই ভ্যাকসিন ও প্রতিশেধক সবার জন্য সহজলভ্য হতে কতদিন সময় লাগে, নাকি মানুষের জীবন-মৃত্যুকে পুঁজি করে কোনো কর্পোরেট কোম্পানি শত বিলিয়ন ডলারের মনোপলি বাণিজ্য করার সুযোগ নেয়, তাই এখন দেখার বিষয়। যারা এতদিন মারণাস্ত্র বিক্রি করে লাখ লাখ মানুষের জীবন নিয়েও হাজার হাজার কোটি ডলারের পুঁজিবাদী ক্ষুধা মিটিয়েছে, তারা যদি এখন কোভিড-১৯ ভাইরাসকে ওয়েপনাইজ্ড করে হাজার হাজার কোটি ডলারের মুনাফাবাজির ফন্দি বের করে তাহলেও বিস্ময়ের কিছু নেই।

ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্টে আশঙ্কা করা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হতে পারে।

লেখকঃ সাংবাদিক, বিশ্লেষক, গবেষক, ইসলামি স্টাডিজ ।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৩৬ বার

Share Button