» করোনা কালের বাজেটঃ স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে

প্রকাশিত: ২১. মে. ২০২০ | বৃহস্পতিবার

আনোয়ার ফারুক তালুকদার

করোনাভাইরাস। কোভিড -১৯ । লক ডাউন । ঘরে থাকুন। এই সব বাস্তবতার মধ্যে থেকে আগামী ১১ জুন ঘোষিত হবে ২০২০-২১ সালের বাজেট। প্রতিবারের মত এবাবের বাজেট ঘোষণা যে ঘটা করে হবে না, তা প্রথম কয়েকটি শব্দ থেকেই বুঝা যাচ্ছে। তারপরও বাজেট নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের তোরজোড়ের শেষ নেই। শোনা যাচ্ছে এবারের বাজেট হবে ৫ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি টাকার মত। বাজেট প্রনয়নে সরকারী বিভিন্ন বিভাগ কাজ করে থাকে। বছরের নভেম্বর মাস থেকেই প্রতিটি বিভাগকে তাঁদের বাজেট প্রস্তাবনা পেশ করার জন্য অর্থমন্ত্রানালয় থেকে চিঠিপত্র দেয়া শুরু হয়। তার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন মন্ত্রানালয় ও তাঁদের সংশ্লিষ্টর বিভাগ সমূহ তাঁদের প্রস্তাবনা প্রেরণ করে। তার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট অনুবিভাগ বাজেটের একটি খসড়া তৈরি করে। তৈরিকৃত খসড়ার উপরে মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে অর্থ মন্ত্রনালয় এবং জাতীয় বাজস্ব বোর্ড বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের সাথে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু এবারের করোনা ভাইরাসের থাবার কারণে সরাসরি কোন আলোচনার বসতে পারেননি অর্থমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ । তাই বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যাক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠি দিয়ে বাজেটের প্রস্তাবনা চেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আবার সাধারণ জনগণ চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে তাঁদের মতামত তুলে ধরতে পারেন। এবারে মূল কথায় আসি। এবারের বাজেটে কি কি প্রাধান্য পাওয়া উচিত। করোনা ভাইরাসের এই যুগে প্রথমেই বলতে হয় দেশ বিদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার হাল-হকিকত । করোনা ভাইরাসের নিষ্ঠুর থাবার বিশ্বের মহাশক্তিধর দেশগুলোর অবস্থা লেজেগোবরে । হাজার কোটি ডলারের দেশ রক্ষার সরঞ্জাম আর পারমাণবিক অস্ত্র কোন কিছুই বাগে আনতে পারছে না এই ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র ভাইরাসটিকে, যার নাম করোনা ভাইরাস বা কোভিড -১৯ । এই লেখার সময় পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ৩ লক্ষ ১৩ হাজার লোকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এই করোনা ভাইরাস। দেশে দেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভঙ্গুর চিত্র ফুটে উঠেছে। গত ডিসেম্বরে চীনের উহান প্রদেশ থেকে শুরু হওয়া এই করোনা মহামারীর আজ পর্যন্ত কোন প্রতিষেধক আবিস্কার করা যায়নি। শত শত বিজ্ঞানী এই নিয়ে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। এদিকে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিদিন সতর্ক করে দিচ্ছে, দিন দিন পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাবে। আবার বিশ্ব খাদ্য সংস্থা বলে যাচ্ছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়তে যাচ্ছে বেশ কিছু দেশ ও অঞ্চল। কর্মহীন মানুষের সংখ্যা দিনকে দিন বেড়েই চলছে। দরিদ্রের পাশাপাশি নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষও এই কাতারে প্রতিনয়ত যোগ হচ্ছে। সাপ্লাই চেইন ভেঙ্গে পড়েছে। উৎপাদনকারীরা তাদের পণ্যের সঠিক দাম পাচ্ছেন না। ফলে বিভিন্ন পচনশীল পণ্য নস্ট হচ্ছে। ফসলের ন্যায্যমূল্য কৃষক পাচ্ছেন না। মানুষের উপর নির্ভরশীল পশু পাখী পড়েছে বিপাকে। মানুষ ঘরবন্দী। কে জোগাবে পশু পাখির খাদ্য যেখানে নিজেদেরই খাদ্যের জোগাড়ে শশব্যস্ত থাকতে হয়। উপরে উল্লেখিত বিষয়সমুহ বিবেচনায় নিয়ে আমাদের এবারের বাজেট প্রনোয়নে মনযোগী হওয়া দরকার। প্রথমতঃ স্বাস্থ্য খাতে বাজেটে ব্যয় বাড়াতে হবে। গত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার মতে আমাদের দেশে স্বাস্থ্যখাতে কমপক্ষে ১৫ শতাংশ করতে বরাদ্দ করতে হবে। জেলা উপজেলা পর্যায়ে মান সম্পন্ন হাসপাতাল গড়ে তুলতে হবে। আইসিইঊ, পর্যাপ্ত ভেণ্টিলেটারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। কারণ করোনা ভাইরাস আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে টাকা থাকলেই বিদেশে যেয়ে স্বাস্থ্য সেবা নেয়া সম্ভব নাও হতে পারে। সবাইকে নিয়েই আমাদের সুস্থ থাকতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়াতে হবে। মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে বেকার ভাতা প্রচলনের ব্যবস্থা এই বাজেট থেকেই নেয়া যেতে পারে। ভারতের আঁধার কার্ডের মত আমাদের জাতীয় পরিচয় পত্র ব্যবহার করে সবার জন্য ‘ফুড কার্ড’ তৈরির ব্যাবস্থা এই বাজেটে রাখতে হবে। সকল মানুষের ব্যাংক হিসাব নিদেনপক্ষে মোবাইল ব্যাংক হিসাবের ব্যাবস্থা করতে হবে। জনগণকে বাঁচার মত ন্যূনতম আর্থিক সহায়তা করতে হবে। মানুষের হাতে টাকা পৌছাতে হবে , ত্রাণ নয়। প্রতিমাসে সুবিধাভোগীর হিসাবে নির্দিষ্ট অংকের টাকা দিতে হবে। এবারের বাজেট প্রকৃত অর্থে জনবান্ধব হতে হবে। এটিই হবে সামাজিক সুরক্ষায় যুগান্তকারী বাজেট। এই বাজেটের মূল প্রতিপাদ্য হবে মানুষ। আগে জীবন পরে অর্থনীতি এটাই হতে হবে বাজেটের স্লোগান। মানুষ বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে। কারণ মানুষের জন্যই অর্থনীতি। আবার জীবন ধারনের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাকে সচল রাখতে হবে, স্বাস্থ্য বিধি মেনেই। কৃষি খাতে এবারের বরাদ্দ বাড়াতে হবে। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষির উপর নির্ভরশীলতা বাড়াতেই হবে। মনে রাখতে হবে খাদ্য দ্রব্য রপ্তানিকারি দেশ নিজেরাও একই বিপদে আছে। তাই বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি খুব সহজ হবে না। কৃষকদের পণ্যের ন্যায্য মূল্য দিতে হবে। ভূমির কোন অংশ অনাবাদি রাখা যাবে না। এজন্য সার্বজনীন কর্মসূচী ঘোষণা করতে হবে। বিদেশ ফেরত, চাকরী হারানো জনশক্তিকে কৃষি খাতে ব্যবহার করার ব্যবস্থা করতে হবে। করোনাকাল চিন্তা করে জীবন বাঁচানো এবং অর্থনীতি সচল রাখার মত দুটি বিষয় যা কিনা এখন একান্তই প্রয়োজন তার উপর আলোচনা করেই এবারের বাজেটের প্রত্যাশার কথা জানলাম। আশা করি কর্তৃপক্ষ এটি বিবেচনায় নিবেন এবং জাতির উৎকণ্ঠা দূরীকরণে বিশেষ পদক্ষেপ নিবেন।

ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
anwarfaruq@yahoo

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩৮৭ বার

Share Button

Calendar

August 2020
S M T W T F S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031