» করোনা যুগের জার্নাল

প্রকাশিত: ২৫. মার্চ. ২০২০ | বুধবার

কামরুল হাসান

হঠাৎ করে আমাদের চেনাশোনা পৃথিবীটা এমন পাল্টে যাবে আমরা কি ঘূর্ণাক্ষরে ভেবেছিলাম? এর আগেও তো ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল, আমরা এভাবে আক্রান্ত হইনি, এমন আতঙ্কগ্রস্ত হইনি। ইবোলা ছিল সুদূর পশ্চিম আফ্রিকায়, সোয়াইন ফ্লু ছিল মুরগির গায়ে, জিকা ভাইরাস বাঁদুরের ঠোঁটে। মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমনও ছিল, কিন্তু করোনার মতো নয়। এমন বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়েনি আর কোনো ভাইরাস, এত প্রাণঘাতিও হয়ে ওঠেনি।

এ কেমন শত্রু, হাত নেই, পা নেই, চোখ মুখ কান কিছু নেই, তার হাতে কোনো অস্ত্র নেই, সে বোমা বা মিসাইল বানাতে শিখেনি, অথচ ঘায়েল করে চলেছে দৈত্য মানুষকে। সে মানুষের হাত থেকে নাকে বা মুখে চলে যায়, বাসা বাঁধে গলায়, অতঃপর চেপে ধরে ফুসফুসকে। এ যেন ট্রয়ের ঘোড়া, পেটের ভেতর লুকিয়ে এনেছে সৈন্যদল। চোখ মুখ হাত পা নেই বলেই এই অদৃশ্য শত্রুর সাথে পারছেনা শক্তিশালী মানুষ, যার বিজ্ঞান অনেক উন্নত। এ যেন ‘ছায়ার সাথে লড়াই করে গাত্রে হলো ব্যাথা।’

এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে মানুষ মানুষকে কেবল এড়িয়ে চলছে না, দেখলে ভয় পাচ্ছে। অতিথিকে স্বাগত জানাচ্ছে না কেউ। অন্য মানুষ শুধু কেন, নিজেই তো নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছে না। নিজের চেনা হাতদুটো কেমন অচেনা হয়ে গেছে। নিজের পোষাক আষাক হয়ে উঠেছে রক্তলাগা শত্রুর পোষাক। লিফটের সুইচ, দরোজার হাতল, গাড়ির স্টিয়ারিং সব সন্দেহের তালিকায়। উপায়? হাত ধোও, মুখ ধোও, কাপড় ধোও, ধোও সবকিছু। ‘ধুতেই থাকো’ কিছুকাল আগে লাইফবয় সাবানের বিজ্ঞাপনে বালকটি বলেছিল। সাবান কোম্পানিগুলো আমাদের হাত ধোয়া কর্মসূচিতে শিক্ষিত করতে চেয়েছিল। আমরা গা করিনি। করোনা ভাইরাস সাবান কোম্পানিগুলোর এজেন্ট নয় তো? তবে অপরিচ্ছন্নতায় রীতিমতো নির্বিকার মানুষগুলো পরিচ্ছন্ন হতে বাধ্য হচ্ছে, শিখছে।

এই ভাইরাসের বড় শত্রু বৃদ্ধ মানুষ। ইতালীতে মারা যাওয়া মানুষদের গড় বয়স ৭৮ বছর। সেই যে পুরাকালে জাপানে নিয়ম ছিল বুড়াদের পাহাড়ে (অর্থাৎ মৃত্যুর ঘরে) পাঠিয়ে দাও, করোনা যেন সে কাজটিই করছে। সরকার ও কোম্পানিগুলোর লক্ষ লক্ষ ডলারের পেনশন ফান্ড বাঁচিয়ে দিচ্ছে। বুড়ো হয়েছ, কাজ করছো না, তোমাদের আর প্রয়োজন নেই পৃথিবীর। নিষ্করুণ সন্তান, মায়াহীন আত্মীয়, আবেগশূন্য সমাজের মতোই তো করোনার আচরণ!

যে হারে এই রোগের বিস্তার ঘটছে আর মৃত্যুহার বাড়ছে তাতে এই বৈশ্বিক মহামারী সহসা থামবে বলে মনে হচ্ছে না। গতকালই ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন এক হাজারের বেশি মানুষ। ভাইরাসটি দ্রুত ছড়াচ্ছে শক্তিধর দেশ আমেরিকায়। ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন চীনাদের দুষছেন তারা পর্যাপ্ত তথ্য সরবরাহ করেনি। তা তিনি দুষতেই পারেন, তবে এও তো বুঝেছেন চীনা মিসাইলের বিরুদ্ধে তার সামরিক প্রতিরক্ষা অটুট হলেও চীনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে তেমন কোন প্রতিরক্ষা তিনি গড়তে পারেননি। বস্তুত পৃথিবীর যুদ্ধবাজ দেশগুলো সমরাস্ত্রের পেছনে যে পরিমাণ অর্থ ঢালে তার একশতাংশ ঢালে না সংক্রামক ব্যাধির গবেষণায়। নতুন ভাইরাসের বিপক্ষে মানবকূল অরক্ষিত।

বাংলাদেশ সরকার ট্রাম্পের মতোই প্রথমে তেমন গুরুত্ব দেয়নি করোনাকে। তারা মুজিবশতবর্ষের অনুষ্ঠান কাটছাট করলেও কোটি কোটি টাকার আতশবাজি ঠিকই পুড়িয়েছে। এই সেদিনও তিনটি উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। করোনার বিষাক্ত ছায়ার তলে আতশবাজি, করোনার ভয়ঙ্কর থাবার নিচে ভোট- এ কেবল বাংলাদেশেই সম্ভব। এখন তারা কোমর বেঁধে নেমেছে। কিন্তু সারারাত নৌকাভ্রমণ রচনা মুখস্ত করে পরীক্ষা হলে গিয়ে দূর্ভিক্ষ রচনা পেলে গবেট ছাত্রের যে অবস্থা হয় সরকারের অবস্থা হয়েছে তদ্রুপ।

দশদিনের ছুটি ঘোষণার পরে যে ভীড় লেগে গেল কমলাপুর রেলস্টেশন, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ও মহাখালি বাস টার্মিনালে তাতে আতঙ্কিত হলো সকলে। লোকদের আচরণ দেখে মনে হলো ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছে তারা। ঈদের সময় যেভাবে লোকের জন্য ট্রেন দেখা যায় না, কালো মাথা ঢেকে রাখে লঞ্চের গোটা শরীর – তেমনি দৃশ্য। একটি ফেরির ছবি দেখে আঁতকে উঠলাম, দেখি জড়োবদ্ধ মানবপাল নয়, দূর থেকে মনে হলো পোষা প্রাণীর পাল। করোনা ভাইরাস এমন এক মাইক্রোস্কোপিক অনুজীব যে একজন থেকে হাজার জনে ছড়াতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়া ও ইতালীতে এটাই ঘটেছে।

বাংলাদেশে এখনো মৃত্যুহার এক দুই, ইতালীতে হাজারের কাছাকাছি, স্পেন, আমেরিকায় শত শত। তবে ঈশ্বর না করুক যদি একবার ছড়িয়ে পড়ে, ভাবুন তো কী ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে? আমরা তো প্রস্তুত নই মহাসমরের জন্য। আমরা তো নৌকাভ্রমণ শিখেছি কেবল।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২০৫ বার

Share Button

Calendar

June 2020
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930