» ‘কহে বীরাঙ্গনা’ ও রাজশাহী সমাচার

প্রকাশিত: ১১. এপ্রিল. ২০১৮ | বুধবার

জ্যোতি সিনহা

৫ই এপ্রিল ঢাকার পদাতিক নাট্য সংসদ দলের আমন্ত্রণে ‘ইঙাল আধার পালা’, ৬ই এপ্রিল ঢাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও ৭ই এপ্রিল রাজশাহীতে রাবি নাট্যকলা বিভাগের আয়োজনে আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসবের আমন্ত্রণ এবং উষ্ণ আতিথেয়তার মাঝে ‘কহে বীরাঙ্গনা’ নাটকের সফল মঞ্চায়নের পর টানা পাঁচদিনের সফর শেষে আজ নিজ বাড়ি ফিরেছি।

প্রাপ্তির ঝুলি আমার আরো বড় হলো। মানুষের এত ভালোবাসা আমায় বড় ঋণী করে তুলছে। এবার মার্চ মাসটা ভীষণ অফিসিয়াল কাজের চাপ ছিল। এক পর্যায়ে অসুস্থ হই, আমার ঠাণ্ডা লেগে কাশতে কাশতে গলা ভেঙে মরিমরি ত্রাহিত্রাহি অবস্থা। ভীষণ টেনশনে অফিসের প্রিয় অভিভাবক ডিসি স্যারের কাছে কোনোমতে ছুটি নিয়ে টানা তিনদিন শুধু ঔষধ আর বিছানা করেছি। তারপর কোনোমতে একদিন রিহার্সালে দাঁড়ালাম। মনে মনে আল্লা, ভগবান, তেত্রিশকোটি দেবতার নাম স্মরণ করছি এ যাত্রা বাঁচিয়ে দেবার জন্য।

বুধবার রাতে ১৯জনের দল ট্রেনে চড়লাম, পরদিন ভোরে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন ঢাকা পদাতিকের মশিউল ভাই এবং সবুজ , সন্ধ্যায় মঞ্চস্থ হলো ‘ইঙাল আধার পালা’ নাটক, মনে পড়ছে সকলের উচ্ছাস ভরা প্রশংসাবাক্য, বাকার বকুল ভাইয়ের অধীনে এসাইনমেন্টপ্রাপ্ত প্রাচ্যনাট স্কুলের একগাদা তরুণ ছাত্র ঘিরে ধরে আমাদের, নানা প্রশ্নে আমাদের মন আর কাজকে যেন গোগ্রাসে বুঝে নিতে চায়। রাতেই বিদায় নিল বিধান , সুরঞ্জিত, দীপু,সুশান্তদের দল। নাটক শেষে দেখা হলো দীপু ভাই, সায়কা আপু ও তাদের সঙ্গীদের সাথে, দীর্ঘ আড্ডা আমাদের দুদলের সম্পর্ককে যেন আরও ঘনীভূত করল।

মজার বিষয়, সুশান্তদের বিদায়ের পর তাহাদেরই মধ্যকার একজনের মোবাইল হইতে সমীরদার মোবাইলে থিয়েটার থেকে তিনমাসের ছুটি চাহিয়া একখানা দরখাস্ত আসিল। হা হা হা… হায়রে থিয়েটার! তোমার বেলাতে গিয়ে… তুমিই যত নষ্টের গোড়া…
—- পরসমাচার
শুক্রবার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে সকাল ১১টায় ‘কহে বীরাঙ্গনা’ নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট প্রবীণ লেখক, সাহিত্যিক অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার। প্রায় ৬০-৭০ জন সাহিত্যপ্রেমী দর্শকের সামনে মঞ্চস্থ হওয়া একঘন্টার এ নাটকটি মুহূর্তেই দর্শকপ্রিয় হয়ে ওঠে। সায়ীদ স্যার মঞ্চে দাঁড়িয়ে কাজটির প্রশংসা করেন। সেখানে দুপুরের নিমন্ত্রণ শেষে এক সুযোগে বাতিঘর ঢু মারি।
আহা!
বইপ্রেমী মানুষের একবার সেখানে গেলেই মনটা ভালো হয়ে বিশাল বইয়ের রাজ্যে ডুবে যেতে ইচ্ছে করবে নিশ্চিত।
সন্ধ্যায় আবার প্রিয় শিল্পকলা!
পদাতিকের নাটক ‘গুণজানবিবির পালা’ নাটক দেখে তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অতঃপর উঠে বসি রাজশাহীর ট্রেনে। ১৬ জনের দল, ঢাকা থেকে সফরে যোগ দেয় পাভেল আর শাহনাজ ।
ভোরে শুভাশিষদাকে স্যার সম্বোধনে নাট্যকলার দুই ছাত্রের উষ্ণ অভ্যর্থনা।
পরের ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ঘটে গেলো অথচ মুহূর্তগুলো কী স্মরণীয়!
যথাক্রমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশ, নাট্যকলা বিভাগের চেয়ারম্যান রহমান রাজু ভাইয়ের সাথে দেখা, কলকাতার দল লোককৃষ্টির সভাপতি ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায় ও তার দলের সাথে সাক্ষাত, আরিফ হায়দার ভাই ও এনামুল স্যারের সাথে দেখা, নাস্তার টেবিলে Ullash (নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক এবং শুভাশিস দা’র প্রিয় বন্ধু, ব্যাচমেট) ভাইয়ের হাসি, শিমু আপুর (অারেকজন শিক্ষক) সুচারু ব্যবস্থাপনা, প্রিয় অনুজ অনিক ও Bappyর সাথে দেখা শেষে বিকেল ৪টায় নাটকের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা।
শো শেষে প্রিয় অনেকের সাথে দেখা হলো। Afzal ভাই, ভাবী, প্রিয় বান্ধবী Nahida, তার বর, অতি আপন আমার সহকর্মী Ashad, মৌসুৃমী ভাবী। আর আশ্চর্য নতুন বন্ধনে দুটি নাম জুড়ল আমার সাথে, তপস্যা ও অরিত্রি। প্রথমজন উল্লাসদার কন্যা, দ্বিতীয়জন নাহিদের। শিশুরা কেমন যেন এক মায়ায় ভরিয়ে দেয় আমার চারিপাশ। এরাও তেমনি আমাকে মায়ায় মায়ায় ভরিয়ে দিলো।

পরদিন অনিক, পার্থ, মৌদের গাইডে রাবি ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়ানো, নাট্যকলা বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের সাথে ভাব-বিনিময় তারপর রাজশাহী শহরে প্রবেশ, প্রথমেই শিল্পকলা একাডেমি দর্শন, আমার সহকর্মী আসাদ সরকারের সৌজন্যে দুপুরের খাবার খাওয়া, মিষ্টি দুই মেয়ে আমাদের গাইড তানিয়া আর নিঝুমের সাথে মজার সময় কাটানো…

তারপর…

তারপর চিরপ্রিয় পদ্মা দর্শন, শুকিয়ে যাওয়া পদ্মার বালুচরে হাঁটা, পানিতে পা ভেজানো, মন ভেজানো, ওপারে দূরে মুর্শিদাবাদের আবছা অবয়ব দেখা, সূর্যাস্তের রঙে রাঙা, বালুচরের ধানের শীষে দোল খাওয়া, নৌকায় চড়ে বসা, বৈঠা ধরে বসে থাকা মাঝিকে বলি, ‘আমারে কি নিবা মাঝি তোমার লগে ঢেউয়ে ঢেউয়ে?’

ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামে, আমরা পদ্মার পাড় ধরে হাঁটতে থাকি, মিষ্টি বাতাস এসে আমাদের মনকে শীতল করে দেয়…

বসি রিভারভিউ সাইটে, আমাদের জন্য অপেক্ষায় রত রাজুভাই, উল্লাসদা, নাট্যকলার ছাত্র আলমগীর, আসাদের সন্ধ্যার পদ্মাকে উপভোগ করতে করতে সান্ধ্যকালীন একচোট আড্ডা শেষ করি।

পথের শেষে কী থাকে কেউ তা জানি না তাই আমার সবসময় এক আকর্ষণ কী ঘটবে! আরো কিছু যে বাকি ছিল আমাদের কপালে।

পদ্মা-প্রকৃতি দর্শনের পর এবার চলল মানবপ্রেমের খেলা… রাজশাহীতে আমার বড়ভাই আফজাল থাকেন, তার বাসায় গেলাম সান্ধ্যকালীন নাস্তা খেতে রাত আটটায়, ভাই ছিলেন না ভাবী আছেন। গিয়ে দেখি এলাহি কাণ্ড!
পিঠা! চটপটি!! ক্ষীর!!! তরমুজ-পেয়ারা!!!!
খেতে খেতে আর জায়গা নেই পেটে তবু ভাবী মুচকি হেসে হেসে একটার পর আরেকটা আনতেই থাকেন। হয়রান হয়ে পরে বিদায় নিয়ে রওয়ানা দিলাম প্রিয় আরেক ভাই উল্লাসদার বাসায় রাতের খাবারের দাওয়াতে। সেখানে গিয়ে আবার হতভম্ব হবার অবস্থা! চোখ আমাদের ছানাবড়া! নানান তরকারী, ভাজি, মিষ্টি, দইয়ে আমাদের আরেকবার নাস্তানাবুদ করলেন মৌসুমী ভাবী, তপস্যার নাচে-গানে-হাসিতে ভরে উঠল চারিপাশ, দেখে মুগ্ধ হলাম উল্লাসদার নিজের হাতে করা ক্যাকটাসের বাগান। রাত বারোটায় তাদের কাছে বিদায় নিলাম।
ফিরতে ফিরতে উপলব্ধি করছি, ‘মানুষ এত ভালো হয়!’

পরদিন রাজশাহী থেকে বিদায়, আবার আমার সেই কমলগঞ্জের জীবনে।

আমি কেমন কাজ করেছি তা দর্শকবৃন্দের কাছে ছেড়ে দিলাম কিন্তু নিজে আমি যে ভালোবাসা পেলাম তা অবর্ণনীয়, প্রেরণাদায়ক, মনুষ্যত্ব/ মানবিকতা শেখার দৃষ্টিকে আরো এক ধাপ খুলে দিল। এত কিছু বিস্তারিত লেখার উদ্দেশ্য ছিল এই।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৩৫ বার

Share Button

Calendar

September 2018
S M T W T F S
« Aug    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30