কাজী ইমদাদুল হক: একটি অন্য পরিচয়ে

প্রকাশিত: ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৪, ২০২০

কাজী ইমদাদুল হক: একটি অন্য পরিচয়ে

কাজী নুসরাত সুলতানা

আমার দাদাজান সুসাহিত্যিক, ‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাসের রচয়িতা কাজী ইমদাদুল হককে আমি চোখে দেখিনি। দেখার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ ১৯২৬ সালে ৪৪ বছর বয়সে যখন তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন তখন তাঁর ছ’সন্তানের প্রথম কাজী আনোয়ারুল হক-এর বয়স ষোল এবং চতুর্থ আমার বাবা, কাজী নুরুল হক-এর বয়স দশ। কিন্তু তাঁর সমসাময়িক সাহিত্যিক ও বন্ধুজনের তাঁর সম্বন্ধে লেখা পড়ে এবং চাচা-বাবা-ফুফুদের কাছ থেকে গল্প শুনে তিনি আমার কাছে চেনা মানুষই হয়ে উঠেছেন। তাঁর জীবনদর্শন সম্পর্কে কিছুটা পরিচয় তাঁর উপন্যাস ‘আবদুল্লাহ’ পড়েও পাওয়া যায়; পাওয়া যায় ‘আবদুল্লাহ্ ’ উপন্যাস নিয়ে লেখা আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে। শিক্ষক কাজী ইমদাদুল হক-এর শিক্ষাদর্শনের পরিচয় খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলাম আমি; যা প্রবন্ধ আকারে বাংলা একাডেমী গবেষণা পত্রিকার মাঘ-চৈত্র, ১৪০৪ সংখায় প্রকাশিত হয়েছে। আজ, চৌঠা নভেম্বর তাঁর ১২৭তম জন্মদিনে তুলে ধরতে চাই অন্য একটি দিকের পরিচয়। সেটি হল বাস্তুকলাবিদের।
১৯২১ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড। কাজী ইমদাদুল হক তার প্রধান কর্মকর্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে কোলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন। তখনই ঢাকার রমনা এলাকার ইস্কাটনে সাড়ে পাঁচ বিঘা জমি কেনেন কাজী ইমদাদুল হক। জমি কিনে বিভিন্নরকম ফলের গাছসমৃদ্ধ বাগান গড়ে তোলেন তিনি। বেশ কিছুটা খালি জমিও রাখেন, যেখানে লাগানো হত মৌসুমী শাকসবজি। কোলকাতার গ্লোব নার্সারি থেকে কেনা ফলের গাছের মধ্যে ছিল হিমসাগর, গোপাল ভোগ, বোম্বাই, ফজলী, সিন্দুরী, কাঁচামিঠা প্রভৃতি আম এবং ফলসা, সপেটা, গোলাপজাম, কালোজাম, জামরুল বেল, কৎবেল, কাঁঠাল, করমচা ইত্যাদি অন্যান্য ফলের গাছ। বাগানের তথা জমির চৌহদ্দি বোঝার জন্য ছিল ডুরেন্টা আর টগরের বেড়া।
তখন ঢাকা শহর দক্ষিণে বুড়িগঙ্গার তীর থেকে উত্তরে ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশন বা রেললাইনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। রেললাইনের উত্তরে রমনা এলাকায় ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভবন (বর্তমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভবন), মিন্টো রোডস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের লাল রঙা আবাসিক ভবন (বর্তমানে মন্ত্রীদের বাসভবন), এবং ঢাকার নবাবদের বাগান ও কিছু ছোট ছোট স্থাপনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বাসায় আসা-যাওয়া করতে গিয়েই কাজী ইমদাদুল হক লক্ষ্য করেন মিন্টো রোডের ঐ বাড়িগুলোর পর উত্তরদিকে বিস্তীর্ণ খালি জায়গা আর তার পর বেশ বড়সর ঝিল বা জলাভূমি। বেশ ভাল লেগে গেল এলাকাটি তাঁর আর তারই ফলে ঐখানে জমি কেনা।
জমি কেনার পর দুই ঘরের ছোট একটি বাড়ি তৈরী করিয়ে এখানে চলে এলেন শহর ছেড়ে। একটি দুইঘোড়ার গাড়িও কিনলেন অপিসে যাতায়াতের সুবিধার জন্য। এরপর ১৯২৪ সালে শুরু করেন আসল বাড়িটি। এক বছর ধরে বহু যতেœ ও পরিশ্রমে যে বাড়িটি গড়ে তোলা হল সেটি একটি মাটির বাড়ি। জমির মাটি কেটেই তৈরী হল বাড়ি; গর্তটি পরিণত হল একটি পুকুরে। মাটির বাড়ি তো ওভাবেই তৈরী হয়; এ আর এমন ফলাও করে বলার বিষয় হয় কি করে?
বলা অন্য কারণে। বাড়িটির বিশিষ্টতা তার গঠন শৈলীতে, যে শৈলীর রচয়িতা ছিলেন কাজী ইমদাদুল হক নিজে। দক্ষিণমুখী তিনফুট উঁচু ভিতের উপর ছিল বাড়িটি। ভিতের ঘেরাটি ছিল পাকা, ভেতরে মাটি, ওপরের মেঝেটি পাকা। বাড়িটিতে ঘর ছিল মোট পাঁচটি, বারান্দা ছিল তিন পাশ ঘিরে আট ফুট প্রস্থের, সিঁড়ি ছিল পাঁচ দিক দিয়ে। ঘরগুলো সব লাগোয়া, একটার ভেতর দিয়ে অন্যটায় যাবার দরজা। জানালাগুলোও দরজার সমান বড় বড়, উত্তর ও দক্ষিণের প্রায় পুরো দেয়াল জুড়ে এবং পুবের ঘরের পুবের দেয়ালে একটি ও পশ্চিমের বড় ঘরের পশ্চিমের দেয়ালে একটি। জানালাগুলোর দুটো করে ভাগ ছিল, মেঝে থেকে তিনফুট পর্যন্ত একভাগ এবং বাকী চার ফুটের আরেক ভাগ। প্রত্যেক ভাগের কপাট আলাদা আলাদা করে বন্ধ করা বা খোলা রাখা যেত। মাটির ঘরে দুইফুট বাদ দিয়ে দিয়ে র্৪ ী র্৭ জানালা আমি আর দেখিনি । সবচেয়ে পুবের ঘরটি চৌকো ধরণের ১র্২ী ১র্২ মাপের, তার পশ্চিমেরটি পুব-পশ্চিমে লম্বা ২র্০ ী ৩র্০ মাপের, উত্তর-দক্ষিণে লম্বা, এটিও ২র্০ ী ৩র্০ মাপের, তার পশ্চিমে পুব-পশ্চিমে লম্বা একটি ছোট ঘর র্৮ ী র্৯ মাপের এবং তার পরেই রান্নাঘর উত্তর-দক্ষিণে লম্বা র্৮ ী ১র্২ মাপের। মাঝের বড় ঘরের সঙ্গে উত্তর দিকে লাগোয়া পাকা গোসলখানা ছিল। পায়খানাটাও পাকা, ছিল একটু দূরে উত্তরের সীমানার কাছাকাছি। ছোট ঘরগুলোর দুটো করে দরজা, মাঝের বড় ঘরটির চারটে, পশ্চিমের বড় ঘরটির পাঁচটি এবং রান্নঘরের তিনটি – একটি ঘরের দিকে অন্য দুটো উত্তরের ও দক্ষিণের উঠোনে যাবার। রান্নঘরের জানালা ছিল পশ্চিমের দেয়ালে, দুটো ছোট ছোট, র্২ ী র্৩ মাপের। রান্নাঘরটির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল। ঘরটির উত্তর-পশ্চিম কোনায় চারফুট মত জায়গার দুইফুট মত বাড়ানো ছিল বাইরের দিকে, অনেকটা মসজিদের মিম্বরের মত। ঐ জায়গার মেঝেতে উত্তর-দক্ষিণে পাশাপাশি দুটো কাঠের চুলো ছিল যার উপরে মাটির ছাদটা একটা টুপির মত নিচু হয়ে এসেছিল, অনেকটা আজকালকার গ্যাস রেঞ্জের উপরের হুডের মত, তার ওপওে ছিল চিমনী। ফলে ঘরের সাথে লাগোয়া হওয়া সত্বেও রান্না ঘরের ধোঁয়া কখনওই সারাবাড়ি হতনা, বেরিয়ে যেত ছাদ দিয়ে।
বাড়ির ছাদটি ছিল টিনের। লাল রঙ করা। ১৯২৪ সালে তৈরী করার পর থেকে নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে ভাঙ্গার আগে পর্যন্ত টিন বদলানোর প্রয়োজন পড়ে নি। টিনগুলো বসানোর ক্ষেত্রেও বিশিষ্টতা ছিল। সাধারণত যেভাবে চালে টিন বসানো হয় তার চেয়েও অনেক বেশী ঢালু করে বসানো হয়ে ছিল। ফলে ১৯৬৬ সালে ঢাকায় যে দারুণ ঝড় হয়েছিল সেই ঝড়েও ঐ চালের কোন ক্ষতি হয়নি।

বাড়ির নকশা ছাড়াও কাজী ইমদাদুল হকের আগ্রহ ছিল অন্যান্য জিনিসপত্রের নকশা করায়। তিনি তাঁর গ্রন্থাগারের জন্য একটি চেয়ার তৈরী করিয়েছিলেন যেটি খুললে একটি সিঁড়ি হয়ে যেত ওপরের তাক থেকে বই নামানোর জন্য; আবার ভাঁজ করলেই চেয়ার হত। তাঁর খাতায় একটি কোশা নৌকার নকশা রয়েছে যা তিনি করেছিলেন অল্প ব্যয়ে মজবুত করে নৌকো তৈরী করার জন্য।
সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সাময়িকী প্রকাশক-সম্পাদক হওয়ার পাশাপাশি কাজী ইমদাদুল হক একজন সফল নকশাবিদও ছিলেন। প্রতিভার বহুমূখিতার তিনি ছিলেন এক অনন্য উদাহরণ।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

December 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

http://jugapath.com