» কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তান, ভারত ও চীন – এই তিন দেশের

প্রকাশিত: ০৫. আগস্ট. ২০১৯ | সোমবার

হীরক রাজা

ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ, যেটা কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেয়, তা বিলোপ করার ঘোষণা দিয়েছে ভারত সরকার। ৩৭০ অনুচ্ছেদের কারণে জম্মু ও কাশ্মীর অন্য যেকোন ভারতীয় রাজ্যের চেয়ে বেশি স্বায়ত্বশাসন ভোগ করতো, বলছে মোদী সরকার। কিন্তু ৩৭০ ধারা তো কাশ্মিরকে আরেকটি ‘পাকিস্তান’ হতে এতদিন রসদ দিয়ে আসছিল, বলছেন সুধীজন।

কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারত পাকিস্তানের দুবার যুদ্ধ (১৯৪৮, ১৯৬৫) হলেও ১৯৭১ রের যুদ্ধ বাংলাদেশ ইশুতে হয়েছে, এটা আমরা বাঙালিরা জানলেও, চীন কিন্তু তিনটি যুদ্ধেই এক বিশেষ ভুমিকায় ছিলো।

১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে চীন কাশ্মীরের আকসাই-চিন অংশটির নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে, আর তার পরের বছর পাকিস্তান – কাশ্মীরের ট্রান্স-কারাকোরাম অঞ্চলটি চীনের হাতে ছেড়ে দেয়।
সেই থেকে কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তান, ভারত ও চীন – এই তিন দেশের মধ্যে ভাগ হয়ে আছে। দ্বিতীয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয় ১৯৬৫ সালে, এর পর আরেকটি যুদ্ধবিরতি চু্ক্তি হয় । এর পর ১৯৭১-এর তৃতীয় ভারত-পাকিস্তান- বাংলাদেশ যুদ্ধ এবং এখানেও চীনের ভুমিকা সবচেয়ে বেশি।

এবার বর্তমান কাস্মীর প্রসঙ্গে আসিঃ ৩৭০ অনুচ্ছেদের কারণে জম্মু ও কাশ্মীর অন্য যেকোন ভারতীয় রাজ্যের চেয়ে বেশি স্বায়ত্বশাসন ভোগ করতো, সাংবিধানিক অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপের ঘোষণা ফলে যা হবে, তা হলো, ভারতীয় রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরকে নিজেদের সংবিধান ও একটি আলাদা পতাকার যে স্বাধীনতা দেয়া ছিলো তা এখন স্বায়ত্বশাসন এর আওতায় চলে যাচ্ছে। নির্দেশনামায় বলা হয়েছে অবিলম্বে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা, যা জম্মু কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে, তা প্রত্যাহার করা হল।

ইতিহাস থেকে কি দেখি, ভারত পাকিস্তান স্বাধীন হবার পর যেমন ভারতের মুসলিমদের শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হবে সেটির সিদ্ধান্ত মুসলিমদের উপর ছেড়ে দেয়ার ফলে মুসলিমরা মাদ্রাসা শিক্ষাকে বেছে নিয়েছিলো, আর হিন্দুরা আধুনিক শিক্ষা। নেহরু ভারতে হিন্দুদের টোল উঠিয়ে শিক্ষাকে একমুখি করে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষকে বেছে নিয়েছিলো, সেখানে মুসলিমদের বিশেষ কিছু ছিলোনা, তাদের নিজস্ব কমিউনিটি ধর্ম ইত্যাদি বিবেচনা করে তাদের নিজেদের শিক্ষা কার্যক্রম বেছে নেয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলো, তার ফলে কেবল মুসলমানদের জন্য নয়, গোটা ভারতের জন্য এটা হয়েছিলো আত্মঘাতি। মাদ্রাসা বা ইসলামি শিক্ষা ভারতীয় মুসলমানদের মূল ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। পিছিয়ে গেছে এই জনগোষ্ঠী চাকরি বাজার থেকে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান নেমে গেছে তলানিতে। একইভাবে কাশ্মিরে ৩৭০ ধারা কাশ্মিরকে ভারতের মাঝে আরেকটি দেশ বানিয়েছিলো। কাশ্মিরে ভারতীয় অন্যান্য রাজ্য প্রদেশের মানুষ সম্পত্তি কিনতে পারত না। ভারতীয় হবার পরও কাশ্মিরিদের অন্য রাজ্যের কেউ বিয়ে করতে পারত না। সরকারী চাকরি সমস্ত ভারতীয়দের জন্য উন্মক্ত হলেও কেবল কাশ্মিরিদের অধিকার ছিলো কাশ্মিরের সরকারি চাকরিতে জয়েন করার। একই কথা খাটে রাজনীতির ক্ষমতায়নের বেলাতেও। এই সুযোগে আবুদুল্লাহ বা মেহবুবা মুফতিদের মত মানুষজনের বাপের তালুক হয়ে উঠেছিলো কাশ্মির। কিন্তু যেটি ছিলো সবচেয়ে মাথাব্যথার কারণ সেটি সন্ত্রাসবাদ। ‘বিচ্ছিন্ন কাশ্মিরের’ পুরো ফয়দা নিয়েছিলো পাকিস্তান। ধর্মীয় পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে স্থানীয়দের দরদী সেজে পাকিস্তান এখানে গোয়েন্দা তৎপরতা চালাতো। ইসলামিক জিহাদী গ্রুপগুলো কাশ্মিরকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে ‘দারুল ইসলাম’ কায়েম করার জন্য তরুণদের মজগ ধোলাই করতে সক্ষম হয়েছিলো।

সোমবার সংসদে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধীদের তুমুল বাধা ও বাগ-বিতণ্ডার মধ্যে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এই মর্মে সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিজ্ঞপ্তিও জারি করা হয়েছে, যাতে রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোভিন্দ স্বাক্ষরও করেছেন।

এখন থেকে কাশ্মিরে বাইরে আলো বাতাস আসবে। ভিন্ন জাতি সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিশতে পারবে। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় কাশ্মিরীদের আনতে পারলে ও প্রতিযোগীতায় পড়ে কাশ্মিরীরা শিক্ষা ও অর্থনীতিতে মনোযোগ দিবে। মুখে রুমাল বেধে ভারতীয় বাহিনীর প্রতি ঢিল ছোড়াই কাশ্মিরীদের একটা জেনারেশন মনে করত এটা করতেই তাদের জন্ম হয়েছে!

এই ৩৭০ অনুচ্ছেদের সুবাদে কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দারাই শুধুমাত্র সেখানে বৈধভাবে জমি কিনতে পারতেন, সরকারি চাকরি করার সুযোগ পেতেন এবং সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। এই অনুচ্ছেদ বিলোপ করার বিষয়টি বিজেপি’র পুরনো রাজনৈতিক এজেন্ডাগুলোর একটি। এই সিদ্ধান্তের ফলে সেখানে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে বলে মনে করে ‘বিবিসি’

বাংলাদেশের মিডিয়া কাশ্মীরী মুসলমানদের পক্ষে, বুঝে বা না বুঝেই সংবাদ পরিবেষণ করছে। কাশ্মির এখন থেকে ভারতের অন্যসব রাজ্যের মত স্বায়ত্বশাসন ভোগ করবে সেটাই হয়তো বাংলাদেশি মিডিয়া বুঝেও বুঝতে পারছে না। কাশ্মির ছিলো ভারতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যগুলোর অন্যতম যেখানে হিন্দুরা সংখ্যালঘু। যেমন জন্মুতে বৌদ্ধরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। সাম্প্রদায়িক চিন্তা থেকেই কাশ্মিরের মুসলিম আইডেন্টি থাকবে কিনা সেই চিন্তায় অস্থির বাংলাদেশের ‘প্রগতিশীল’ সাংবাদিক বুদ্ধিজীবীরা! কাশ্মির থেকে কাশ্মিরী পন্ডিত সম্প্রদায়ের হিন্দুদের উচ্ছেদ নিয়ে তারা কিন্তু কখনই একটি শব্দও খরচ করেনি। কাশ্মির নিরুঙ্কূশ মুসলিম রাজ্য হলো কিনা সেটাই তাদের দেখার বিষয়।

যাই হোক, আমি আশাবাদী এ জন্য যে, এর ফলে কাশ্মিরের নতুন প্রজন্মের মুসলিমরা উগ্রবাদ থেকে ফিরে আসবে। এর জন্য পাকিস্তানের তৎপরতা বন্ধ করতে হবে সবার আগে।

তথ্যসূত্রঃ বিবিসি ও সুসুপ্ত পাঠক

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৭৬ বার

Share Button

Calendar

August 2019
S M T W T F S
« Jul    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031