শিরোনামঃ-


» কীর্তিমান লেখক কাজী ইমদাদুল হক

প্রকাশিত: ৩০. অক্টোবর. ২০১৯ | বুধবার

প্রকাশ ঘোষ বিধান
বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে যেসব বাঙালি মুসলমান মননশীল গদ্য লেখক বিশিষ্টতা অর্জন করেন, কাজী ইমদাদুল হক তার মধ্য অন্যতম। শিক্ষা-দীক্ষায় অনগ্রসর তৎকালীন মুসলমান সমাজে তিনি এক ব্যক্তিক্রমধমী প্রতিভার অধিকারী হয়ে সাহিত্য অঙ্গন আবির্ভূত হন। অল্প সংখ্যক গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য একটি স্থায়ী আসন লাভ করতে সক্ষম হন। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, প্রবন্ধকার, উপন্যাসিক, ছোট গল্পকার ও শিশু সাহিত্যিক। তার অন্য কিছু রচনা থাকলেও একটি মাত্র অসমাপ্ত উপন্যাস আব্দুল্লাহ রচনা করে তিনি যে কৃতিত্বের নিদর্শন রেখে গেছেন তাই তাকে বাংলা সাহিত্য স্মরণীয় করে রেখেছে। তার স্বল্প এ জীবনে বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে যে অতুল কীর্তি রেখে গেছেন তার উপলব্ধি আজও আমদের চিত্তের জাগরণে ও উৎকর্ষের জন্য অপরিসীম।
সুসাহিত্যিক কাজী ইমদাদুল হক ১৮৮২ সালের ৪ নভেম্বর খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার গদাইপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। (বর্তমান মেলেকপুরাইকাটি) কাজী ইমদাদুল হকের পিতামহ ছিলেন কাজী মেহেদী বিল্লাহ ও পিতা আতাউল হক। কাজী আতাউল হক ১৮৪৪ সালে গদাইপুর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রথমে আসামে জরিপ বিভাগে চাকরি করতেন। পরে তিনি মুক্তার পাশ করে খুলনা ফৌজদারি আদালতের আইনজীবী ছিলেন। কাজী ইমদাদুল হক ছিলেন পিতার একমাত্র সন্তান। কাজী আতাউল হক একমাত্র সন্তানের শিক্ষার বিষয়ে তৎপর ছিলেন। কাজী ইমদাদুল হকের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় গ্রামের স্কুলে ও পারিবারিক পরিবেশে। গ্রামে থাকাকালীন সময় কাজী আতাউল হক বই পড়ার আগ্রহ কপোতাক্ষ নদের নদীর উপরে রাড়ুলী গ্রামের রায় পরিবারের সঙ্গে পরিচিত হন এবং বিভিন্ন বই পড়ার সুযোগ লাভ করেন। রায় পরিবারে সদস্য জগৎ বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এ সময় তিনি পুত্রকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার মনস্থ করেন। বন্ধুবর প্রফুল্য চন্দ্র রায়ের উৎসাহ ও পরামর্শে কাজী ইমদাদুল হককে ১৮৯০ সালে খুলনা জেলা স্কুলে ৫ম শ্রেণীতে ভর্তি করেন। ১৮৯৬ সালে খুলনা জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রাস পাস করেন। ১৮৯৮ সালে কলকাতা মাদরাসা থেকে এফএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়কালীন তিনি পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন শাস্ত্রে অনার্স নিয়ে ডিগ্রি ক্লাসে ভর্তি হন। কিন্তু পরীক্ষার আগে অসুস্থতার কারণে অনার্স পরীক্ষা দেয়া সম্ভব হয়নি। এরপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে এমএ ক্লাসে ভর্তি হন। কিন্তু তিনি পরীক্ষার আগেই বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসে নির্বাচিত হয়ে ১৯০৩ সালে কলকাতা মাদরাসার অস্থায়ী শিক্ষক পদে নিয়োগ লাভ করেন। এরপর পূর্ববঙ্গ ও আসান প্রদেশ গঠিত হওয়ায় ১৯০৬ সালে আসামে শিলংয়ে শিক্ষা বিভাগে ডিরেক্টরের অফিসে উচ্চমান সহকারী পদে চাকরি গ্রহণ করেন। আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে সুদর প্রবাসে তিনি নিজেকে খাপ-খাওয়াতে না পেরে এবং স্বাস্থ্যহীনতার কারণে দেশে ফিরে আসেন। এ সময় পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রবেশে শিক্ষা বিভাগে ডিরেক্টর ছিলেন মি. শার্প। কাজী ইমদাদুল হক শার্প সাহেবের স্নেহ দৃষ্টি লাভ করেন এবং ১৯০৭ সালে ঢাকা মাদরাসার শিক্ষক পদে নিযুক্ত হন। তখন তার মাসিক বেতন ছিল ৫০ টাকা। পূর্ববঙ্গ আসাম প্রদেশের শিক্ষা বিভাগের শিক্ষা ব্যবস্থার আমুল সংস্কার সাধনে নতুন শিক্ষা প্রণালী প্রবর্তনে উদ্যোগী হন। শিক্ষার্থীদের কাছে ভুগোল শিক্ষা বিভাগে আকর্ষণীয় করা যায় সে বিষয়ে কাজী ইমদাদুল হক বিশেষ চিন্তাভাবনা করেন। তার ভুগোল শিক্ষার একটি আদর্শ শিক্ষা প্রণালী শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত হয়। সেখানে ভুগোল বিষয়ে শিক্ষাদানে বিশেষ দক্ষতা দেখান এবং ভুগোল বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেন। কিছুকাল পরে এই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ১৯১১ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং সেন্টারে ভুগোলের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। তিনি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যাক্ষ মি. বিসের আগ্রহে বিটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে বিটি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯১৪ সালে তিনি প্রাদেশিক এডুকেশন সার্ভিসে উন্নতি হয়ে ঢাকা বিভাগের মুসলিম শিক্ষার সহকারী স্কুল ইসপ্টেরের পদে ময়মনসিংহে অবস্থিত কার্যালয়ে নিযুক্ত হন। ১৯১৭ সালে কলকাতা টিচার্স ট্রেনিং স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯২১ সালে ঢাকা মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি প্রথম কর্মদক্ষ পদে নিযুক্ত হন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। সাহিত্যিক কাজী ইমদাদুল হকের পূর্বপুরুষ শেষ মোহাম্মদ দায়েস উল্লাহ সপরিবারে ইরাকের বাগদাদ থেকে দিল্লীর কোষ্টরিয়া এসে বসতি স্থাপন করেন। শেখ মোহাম্মদ দায়েস উল্লাহ সুলতানী আমালে প্রথম বিচারপতি নিযুক্ত হন। বিচারকার্যে অসামান্য অবদান রাখার জন্য তৎকালীন সম্রাট তাকে কাজী উল-কুজ্জাত উপাধিতে ভূষিত করেন। সে সময়ে ভারতে তুর্ক আবগান শাসনে দেশবাসীর জাতীয় সমার্থক ছিল না। সমগ্র দেশব্যাপী ছিল না কোনো সর্বভৌম শক্তি। ক্ষমতা লাভের জন্য বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে কলহ-বিবাদে জর্জরিত ছিল। এমন নাজুক অবস্থায় দেশব্যাপী শুরু হয় বিদ্রোহ। মুঘল আমলে বিদ্রোহের সময়ে ভারতের দিল্লী থেকে ৩টি পরিবার দক্ষিণ বাংলার খুলনা জেলার অন্তর্গত সমুদ্র পরগনায় (বর্তমান পাইকগাছায়) চলে আসেন এবং বাঁদা কেটে বসবাস শুরু করেন। পরিবার তিনটি হলেও দেওয়ান মানিকরাই এর পূর্বপুরুষ শেখ মোহাম্মদ দায়েস উল্লাহ বংশধর মুজিবুল্লাহ এবং ঘোষ নবিসের পূর্বপুরুষ এবং জগৎ বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার আশ্চার্য প্রফুল্ল রায়ের পূর্বপুরুষ দেওয়ান মানিক রায়, কাজী ইমদাদুল হকের পূর্বপুরুষ মফিজ উল্লাহ ও ঘোষ নবিসের পূর্বপুরুষ শিক্ষা দীক্ষায় ও প্রগতিশীল চিন্তা ও চেতনায়খ্যাত ছিলেন। তাদের সুচিন্তিত ভাবধারায় দক্ষিণবঙ্গে গড়ে ওঠে নতুন সভ্যতা। ঐ সভ্যতার উর্বর ভূমিতে বংশনুক্রমে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নাসির উল্লাহ তার পুত্র কাজী হামিদুল্লাহ ও কাজী মাহবুল্লাহ। কাজী হামিদুল্লাহর তিন পুত্র কাজী ছরুর আহম্মেদ, কাজী আজিজুল হক ও কাজী হামিদুল ইসলাম। কাজী মাহবুল্লাহর এক পুত্র কাজী বাশারাতুল্লাহ। কাজী সবুর আহম্মেদের পুত্র কাজী সৈয়েদুল ইসলাম, কাজী মেহেদী বিল্লাহের পুত্র কাজী আতাউল হক, প্রগতিশীল চিন্তায় ও চেতনায় ধারক কাজী ইমদাদুল হক। ১৯০৪ সালে খুলনা শহরে মৌলভী আব্দুল মকসুদ সাহেবের জ্যেষ্ঠ কন্যা সামসন্নেসা খাতুনকে বিয়ে করেন। কাজী ইমদাদুল হকের চার পুত্র ও ২ কন্যা- কাজী আনারুল হক, কাজী সামছুল হক, কাজী আলাউল হক, কাজী নুরুল হক এবং কন্যা জেবুন্নেছা ও লতিফুন্নেছা।
কাজী ইমদাদুল হকের পুত্র কাজী আনারুল হক (১৯০৯-২০০১) মন্ত্রী ছিলেন। বিচারপতি সায়েম, জিয়াউর রহমান এবং বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি থাকাকালে তিনি ছয় বছরকাল উপদেষ্টা মন্ত্রী পদে বহাল ছিলেন। কাজী ইমদাদুল হক ছাত্রজীবনে সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। তার সাহিত্য জীবনে সূত্রপাত ঘটে কবিতা রচনার মধ্যে দিয়ে। তার প্রথম সাহিত্যি কর্ম ৯টি কবিতা সংগ্রহ আঁখিজল ১৯০০ সালে প্রকাশিত হয়। ১৯০৩ সালের সূচনালগ্ন থেকে নবনূর প্রবাসী ও ভারতী পত্রিকাসহ প্রভৃতি প্রতিকায় তার কবিতা ও প্রবন্ধ নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। তার প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত বিভিন্ন কবিতা নিয়ে দ্বিতীয় কাব্যে গ্রন্থ লতিকার পান্ডুলিপি রচিত হলেও তা অপ্রকাশিত থেকে যায়। পরে কাজী ইমদাদুল হক রচনাবলীতে কবিতাগুলো স্থান পায়। সরলাদেবী চৌধুরানী, সম্পাদিত ভারতী পত্রিকায় কাজী ইমদাদুল হকের মোসলেম জগতের বিজ্ঞান চর্চা শীর্ষক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। পরে নবনূর সম্পাদক সৈয়দ ইমদাদ আলী পরার্শক্রমে কাজী ইমদাদুল হক নাম রাখেন মোসলেম জগতের বিজ্ঞান চর্চা। ১৯০৪ সালে মোসলেম জগতের বিজ্ঞান চর্চা পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়।
কাজী ইমদাদুল হক যে নিজে সমাজ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হয়ে সাহিত্য সাধনা করেছিলেন সে সম্পর্কে ডা. আনিচুর জামান মন্তব্য করেছেন, মুসলমান সমাজের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং হিন্দু মুসলমান সম্পর্কে তিক্ততা তাকে প্রথম থেকেই চিন্তিত করে তুলেছিল। তবে সে কালের মুসলমান লেখকদের মতো ঐতিহ্য গর্ভ এবং সাহিত্য ক্ষেত্রে হিন্দু মুসলমনের মনোমালিন্যের প্রভাব তাকে স্পর্শ করেছিল। এটা সে যুগের পরিবেশেনর ফল বলতে হবে।
১৯১১ সালে কাজী ইমদাদুল হক ঢাকা ট্রেনিং কলেজের ভুগোল বিষয়ে অধ্যাপক পদে যোগদান করেন। এ সময় তিনি ভুগোল শিক্ষাবিষয়ক গ্রন্থ (দ্বিতীয় ভাগ ১৯১৩ প্রথম ভাগ ১৯১৬) রচনা করেন। ১৯১৭ সালে কাজী ইমদাদুল হক কলকাতা ট্রেনিং স্কুলে প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন। এ সময় তার শিশুপাঠ্য গ্রন্থ নবী কাহিনী প্রকাশিত হয়। ১৯১৮ সালে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি এ সমিতির মুখপত্র বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য প্রত্রিকার প্রকাশনা কমিটির সভাপতি ছিলেন। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় তার চারটি রচনা প্রকাশিত হয়। এ বছরই (১৯১৮) সালে তার প্রথম প্রবন্ধ গ্রন্থ প্রবন্ধ মালার প্রথমভাগ প্রকাশিত হয়। মোসলেম জগতের বিজ্ঞান চর্চাসহ মোট ৬টি প্রবন্ধ এই গ্রন্থে সংকলিত হয়। তার অন্যান্য প্রবন্ধ নিয়ে দ্বিতীয় ভাগ সঙ্কলনে অভিপ্রায় ছিল বলেই এই গ্রন্থের শিরোনাম প্রথম ভাগ সংযুক্ত হয়। পরবর্তী কালে আব্দুল কাদির সম্পাদিত কাজী ইমদাদুল হক রচনাবলী গ্রন্থে অপ্রকাশিত প্রবন্ধবলী সংযোজিত হয়। ১৯১৮ সালে মুত্রাশায় (কিডনি জনিত) পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে তার একটি কঠিন অস্ত্রোপচারের ফলে কাজী ইমদাদুল হককে দীর্ঘ ৬ মাস হাসপাতালে থাকতে হয়। সে সময়ে তিনি আব্দুল্লাহ উপন্যাস রচনা শুরু করেন। এর ২ বছর পর মোজাম্মেল হক ও আফজালুল হক মোসলেম ভারত পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই পত্রিকায় ‘‘আব্দুল্লাহ’’ উপন্যাস ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। প্রায় দেড় বছর কাল মোসলেম ভারত ‘‘আব্দুল্লাহ’’ প্রকাশিত হয়। প্রত্রিকাটি আকস্মিক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপন্যাসটি অসমাপ্ত থেকে যায়। এরপর ইমদাদুল হকের স্বাস্থ্য ক্রমাগত ভেঙে পড়তে থাকায় বইখানি তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। উপন্যাসের ত্রিশটি পরিচ্ছেদ কাজী ইমদাদুল হক রচনা করেন এবং অবশিষ্ট্য ১১টি পর্ব তিনি খসড়া রেখে গিয়েছিলেন। ৩১ থেকে শেষ ৪১ পর্যন্ত অংশের খসড়া ইমদাদুল হক রেখে গিয়েছিলেন তা অবলম্বনে উপন্যাসটি সম্পন্ন করার দায়িত্বপান কাজী আনোয়ারুল কাদির রেখে যাওয়া ১১টি পরিচ্ছেদের খসড়া অবিলম্বন করে কাজী আনোয়ারুল কাদির উপন্যাসটি শেষ করেন। আনারুল কাদিরের রচিত অংশের পরিমার্জনা করেন কাজী শাহাদাৎ হোসেন। কাজী ইমদাদুল হকের মৃত্যুর পর ১৯৩৩ সালে “আব্দুল্লাহ” উপন্যাস প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ১৯৬৮ সালে কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড থেকে আব্দুল কাদিরের সম্পাদনায় কাজী ইমদাদুল হক রচনাবলী প্রকাশিত হয়।
কাজী ইমদাদুল হক “আব্দুল্লাহ” উপন্যাসে যে বিষয়বস্তু উপস্থপনা করেছেন সে সম্পর্কে আব্দুল কাদির মন্তব্য করেছেন বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বাঙালি মুসলমান সমাজে সে অবস্থা ছিল তার একটি নিখুত চিত্র “আব্দুল্লাহ” উপন্যাসে বিধৃত হয়েছে। অধুনা সমাজ তান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন প্রথার পরিবর্তন করে। আগেকার আশরাফ আরাফাত ভেদ, পর্দা প্রথা, পীর ভক্তি, সুদ সমস্যা, ইংরেজি শিক্ষার নিন্দাবাদ এ সবের উৎকর্ষ কালক্রমে হ্রাস পাচ্ছে। কিন্তু সে দিনের সমাজ জীবন ও ব্যক্তি মানুষের এসব সমস্যা যে বিরোধ ও বাধার সৃষ্টি করেছিল “আব্দুল্লাহ” তার এক মনোরম আলোখ্য। কাজী ইমদাদুল হক বৈচিত্রপূর্ণ সাহিত্য সৃষ্টির অধিকারী হলেও তার প্রধান কৃত্বিত্ব “আব্দুল্লাহ” উপন্যাস। তার অপরাপর রচনার গুরুত্ব কালের আবর্তে নিঃশেষ হয়ে গেলেও “আব্দুল্লাহ” উপন্যসটি বাংলা সাহিত্যে স্মরণীয় করে রেখেছেন। ১৯২০ সালে কাজী ইমদাদুল হক শিক্ষক ও শিক্ষাবিষয়ক মাসিক প্রত্রিকা শিক্ষক প্রকাশ করেন। সম্পাদক হিসাবে তিনি এ পত্রিকায় বিভিন্ন ধরনের লেখা প্রকাশ করেন। শিক্ষক পত্রিকাটি ৩ বছরকাল চালু ছিল। এই পত্রিকায় শিক্ষাবিষয়ক কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। কাজী ইমদাদুল হকের কতিপয় পাঠ্যপুস্তক ও রচনাগুলো হলো কবিতা ১। আঁখিজল (১৯৯০) ২। লতিকা (১৯০৩-অপ্রকাশিত), ৩। উপন্যাস আব্দুল্লাহ (১৯৩৩), ৪। প্রবন্ধ-মোসলেম জগতের বিজ্ঞান চর্চা (১৯০৪), ৫। প্রবন্ধমালা প্রথম খন্ড (১৯১৮), ৬। প্রবন্ধমালা দ্বিতীয় খন্ড (১৯১৬) ৭। শিশু সাহিত্য নবী কাহিনী, ৮। কামারের কান্ড (১৯১৯) ৯। পাঠ্যপুস্তক ভূগোল শিক্ষা প্রণালী (প্রথম ও ২য় ভাগ ১৯১০) সরল সাহিত্য। কাজী ইমদাদুল হকের প্রায় সমগ্র কর্ম জীবনই কেটেছে সরকারি চাকরিতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। শিক্ষা বিভাগে বিভিন্ন কাজে অসামান্য দক্ষতা, গভীর দায়ীত্ববোধ ও উদ্ধাবনী শক্তির স্বীকৃতিস্বরূপ তৎকালীন বৃটিশ সরকার তাকে ১৯১৯ সালে খান সাহেব উপাধিতে ভূষিত করেন ও ১৯২৬ সালে তাকে খান বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করে তাকে সম্মানিত করা হয়।
২০ শতকের প্রথম ভাগে বাংলার মুসলিম সমাজে যে সবসমস্যা কুসংস্কার পুঞ্জিভুত দেখা যায় “আব্দুল্লাহ” উপনাস্যাখানী তার দুঃসাহসী প্রতিবাদ। এ সময় বাংলার মুসলিম সমাজে আশরাফ-আতরাফ ভেদ, পীর মুরিদী, কঠোর পর্দা প্রথা, আধুনিক ইংরেজি শিক্ষার বিরোধিতা, অহেতুক দর্মীয় গোঁড়ামি, বিজ্ঞান সম্মত আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধিতির প্রতি বিরূপতা, বংশ গরিমার নামে ব্যয়বহুল অর্থহীন আচার অনুষ্ঠান এবং অন্যান্য কুসংস্কার সমাজকে ধ্বংসের প্রান্ত নিয়ে গিয়েছিল। হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের মধ্যেও তিক্ততা বিরাজ করেছিল। কাজী ইমদাদুল হক ছিলেন একজন প্রগতিশীল চিন্তাবিদ। সমাজের বিরাজমান সমস্যা তাকে ভবিয়ে তুলেছিল। তাই “আব্দুল্লাহ” উপন্যাসে তিনি সামাজিক ব্যাধির একজন নিপুণ চিকিৎসকের মতো সমাজ বিশ্লেষণ করেছেন এবং রোগ নিরাময়ের চেষ্টা করেছেন। তিনি কেবল সমস্যা তুলে ধরেই ক্ষান্ত হননি। সাথে সাথে বিজ্ঞান সম্মত সমাধান দেয়ার চেষ্টা করেছেন। অন্ধ তাই বাংলার মুসলিম সমাজকে গোঁড়া ধর্মান্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও শিক্ষা-দিক্ষায় পশ্চাদমুখী করে রেখেছিল। হিন্দু সমাজ ও এ অভিশাপ থেকে মুক্ত ছিল না। বাঙালি মুসলমান সমাজের কল্যাণ সাধন ছিল ইমদাদুল হকের সাহিত্য সাধন মূল লক্ষ্য। তিনি কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, শিক্ষা ও নীতিমূলক, শিশু সাহিত্য রচনায় খ্যাতি অর্জন করেন। শিক্ষকতাকে তিনি শুধু পেশা নয়, ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেন। সংস্কারমুক্ত ইমদাদুল হক ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাসে নিয়ে প্রচুর লিখিছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর “আব্দুল্লাহ” বইখানি পাঠ করে মন্তব্যে লিখেছিলেন আমি খুশি হয়েছি; বিশেষ কারণ এই বই থেকে মুসলমানদের ঘরের কথা জানা গেল। এ দেশে সামাজিক আবহাওয়া ঘটিত একটি কথা এই বই আমাকে ভাবিয়েছে। দেখলুম যে ঘোরতার বুদ্ধির অজ্ঞতা হিন্দু আচার হিন্দুকে পদে পদে বাধা গ্রন্থ করেছে, সেই অন্ধতার চাদর ত্যাগ করে লুঙ্গি ও ফেজ পরে মুসলমানের ঘরে মোল্লার অন্ন জোগাচ্ছে। একি মাটির গুণ? এই রোগ বিষে ভরা বর্বরতার হওয়া এ দেশে আর কতদিন চলবে? আমরা দুই পক্ষ থেকে কি বিনাষে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পরস্পর পরস্পরকে আঘাতে ও অপমান করে চলব। লেখকের লেখনি উদারতার বইখানিকে বিশেষ মূল্য দিয়েছে।
কাজী ইমদাদুল হক কখনো সুস্বাস্থ্যের অধিকরী ছিলেন না। সারা বছর কোনো না কোনো অসুখ-বিসুখ লেগে থাকত। ১৯১৮ সালে কলকাতার ট্রেনিং স্কুলে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনকালীন কিডনি পিড়ায় অসুস্থ হয়ে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। হাসপাতালে তার কঠিন অস্ত্রোপচারের ফলে দীর্ঘ ৬ মাস হাসপাতালে থাকতে হয়। ১৯২৩ সালে তিনি আবার গুরুত্বর অসুস্থ হয়ে পড়েন। একসময় সকলেই তার জীবনের আশা ছেড়ে দেন। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে সুস্থ হয়ে ওঠেন। ১৯২৬ সালে তিনি কিডনি রোগে আবার আক্রান্ত হন। স্থানীয় চিকিৎসার কোনো প্রতিকার না হওয়ায় হেকিমি চিকিৎসার করার জন্য দিল্লীর উদ্দেশ কলকাতা গমন করেন। কলকাতার অবস্থানকালীন ১৯২৬ সালে ২০ মে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে পরলোগমন করেন। কাজী ইমদাদুল হককে কলকাতার গোবরা কবরস্থানে তার মাতার কবরের পাশে দাফন করা হয়।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩৬৯ বার

Share Button