» জাহানারা ইমাম ঃ কী অসামান্য এক যোদ্ধাই না ছিলেন তিনি!

প্রকাশিত: ২৬. জুন. ২০২০ | শুক্রবার

মিনার মনসুর

কী অসামান্য এক যোদ্ধাই না ছিলেন তিনি! আমৃত্যু লড়ে গেছেন এমন এক লড়াই যা পাষাণহৃদয় যোদ্ধারও বুক কাঁপিয়ে দেবে। আমি সবাইকে–সকল বয়সের অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন সব বঙ্গসন্তানকে– তাঁর ‘একাত্তরের দিনগুলি’ আর ‘ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস’ বইদুটি পড়তে অনুরোধ করি; যদিও যে রক্ত ও অশ্রুর সমুদ্র তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে তার যৎসামান্যই পাওয়া যাবে সেখানে।
প্রাণপ্রিয় সন্তানকে হাসিমুখে কেবল মুক্তিযুদ্ধেই পাঠাননি, কিশোর সন্তানের সেই যুদ্ধে নিজেও সামিল হয়েছেন সহযোদ্ধা হিসেবে। অর্জুনসারথি শ্রীকৃষ্ণের মতো অবতীর্ণ হয়েছেন কিশোর গেরিলার গাড়িচালকের ভূমিকায়। একই সঙ্গে বহন করেছেন স্বামী ও সন্তানের লাশ। তারপর যখন দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন একাত্তরের ঘাতকদের বিরুদ্ধে, তখন গদিনশীন ঘাতকচক্রের মাতাপিতাদের পাশাপাশি তাঁকে লড়তে হয়েছে আরও এক ভয়ঙ্কর অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে–যার নাম ক্যান্সার। যিনি নিজের স্বামী ও সন্তানকে বলি দিয়েছেন দেশমাতৃকার মুক্তির মন্দির সোপানতলে, সেই মহীয়সী নারীকে পৃথিবী ছাড়তে হয়েছৈ ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’র তকমা মাথায় নিয়ে। আর সেটা ছিল সেই ভয়ঙ্কর অবিশ্বাস্য সময় যখন যুদ্ধাপরাধী ঘাতকদের গাড়িতে উড়ছে লাখো শহিদের রক্তস্নাত পতাকা।


আমার সৌভাগ্য হয়েছিল বাঙালির এই শাশ্বত জননীর স্নেহের বিরল সান্নিধ্য পাওয়ার। আমার এ নগণ্য জীবনের যে যৎসামান্য সঞ্চয়কে আমি যক্ষের ধনের মতো পরম যত্নে বুকে আগলে রাখি–তার মধ্যে এটি অন্যতম। সেই নব্বইয়ের দশকের শুরুতে আমরা ‘অধুনা’ নামে শিল্পসাহিত্য বিষয়ক একটি ম্যাগাজিন প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। তাতে দুটি আত্মজীবনীসহ তিনটি ধারাবাহিক রচনা প্রকাশিত হতো। একটি আত্মজীবনীর লেখক ছিলেন শহিদজননী, অপরটির শামসুর রাহমান। আমার পীড়াপীড়িতেই উভয়ে কঠিন সময়ে ততোধিক কঠিন
এ কাজে সম্মত হয়েছিলেন। তৃতীয় রচনাটি ছিল একটি উপন্যাস যার রচয়িতা ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক। আর কাকতালীয়ভাবে তিনজনই জামায়াত-বিএনপি শাসিত সরকারের কাছ থেকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার তকমা পেয়েছিলেন। সেই আক্রোশ থেকে আত্মরক্ষা করতে পারেনি আমাদের এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাটিও। পত্রিকাটি বাধ্য হয়েছিল তাদের লেখা প্রকাশ বন্ধ করে দিতে।


প্রায় প্রতিদিনই প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেওয়া হতো তাঁকে। এটা যে কেবল কথার কথা মাত্র নয়– তা প্রমাণ করার জন্যে অস্ত্র হাতে
রীতিমতো মহড়া দিত ঘাতকদের আণ্ডা-বাচ্চারা। এমন কঠিনতম সময়েও তাঁকে কখনো বিচলিত হতে দেখিনি। আর কথায় কথায় না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস ভারাক্রান্ত এ দেশে আমি অন্তত একবারও তাঁর মুখ থেকে ‘কী পেলাম’-জাতীয় একটি শব্দও বেরোতে শুনিনি। বরং যখনই ক্ষুব্ধ হতাশ হয়ে তাঁর এলিফ্যান্ট রোডের বাসার এক কোণে দলা পাকিয়ে বসে থাকতাম, তখনই সর্ববেদনানাশী এক হাসি দিয়ে তিনি বলতেন, ‘চা খাও। আমি তোমার লেখাটি আরেকবার পড়ে দিই।’

অন্ধকার যখন প্রবলভাবে চোখ রাঙায়–যখন কোথাও কোনো আলো দেখি না–তখন মনে হয়, যে-জাতির এমন একজন মা আছে–সেই জাতিকে পরাজিত করে সাধ্য কার!

আপনার মৃত্যু নেই, হে শাশ্বত জননী আমাদের।

ঢাকা: ২৬ জুন ২০২০

মিনার মনসুর ঃ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২০৩ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031