শিরোনামঃ-


» কেশে ক্লিষ্ট : কফিতে তুষ্ট

প্রকাশিত: ১৮. মে. ২০২০ | সোমবার

পুলক রঞ্জন চৌধুরী

কেশ মানুষের বেশ বাড়ায়। কেশ বা চুল শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ — মাথাকে শীত-গরমসহ অনেক আপদে সদা সুরক্ষা দেয়। এর নানাবিধ উপযোগিতা বলাবাহুল্য। এজন্য সর্বকালে সর্বজন সাধ‍্যমতো চুলের যত্ন করে আসছেন। অল্প ব‍্যতিক্রম হলেন — বিভিন্ন ধর্মের ফকির-সন্ন‍্যাসী, সাধু, ভিক্ষু প্রমুখগণ। তাঁরা কেউ সবসময় মাথা মুণ্ডণ রাখেন; কেউবা হন দীর্ঘকেশী। সে যাই হোক, কোভিভ-১৯ মহামারি রূপে বিশ্বের বুকে বসে, যখন মানুষ সংহার করে চলেছে — তখন, কেশ নিয়ে কম বেশি পীড়ন থেকেই উদ্ভূত এই কেশে ক্লিষ্ট কাহিনী।

লকডাউনের স্বাভাবিক কবলে সেলুনসব। অবস্থার দুমাসের মাথায় চুলের সীমা — সীমাহীন হয়েছে। সাথে আছে গ্রীষ্মের খর কর। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের আমার শ্রদ্ধেয় স‍্যার অতিষ্ঠ হয়ে মেডামের (সহধর্মিণী) শরনাপন্ন হলে — তিনি কাপড় কাটার কাঁচি দিয়ে তাঁর (স‍্যারের) চুল ছোট করে দিলেন; যার দুটো ছবি (কাটার পূর্ব-পর) তিনি পোস্ট দিয়ে (০৯/৪/২০) পরিস্থিতির নাজুকতা বুঝালেন! গৃহবন্দীতে এ বিকল্পটা মন্দ নয়।

কেউ কেউ উপায়ান্তর না পেয়ে নেড়া করেছেন। যে পথে হাঁটতে অনেকেই যারা দ্বিধান্বিত — তারা মাথার বোঝা ভারি করছেন। আমিও সে দলের। দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া পুত্র প্রমিত, যে কোন মাসে দুবার-ও সেলুনে দৌড় দিত — এখন সে-ও বন্দি। বার বার আয়নার সামনে গিয়ে সে চুল আঁচড়িয়ে চলেছে। বুঝি, বেলমাথাতে তারও আপত্তি।

অর্থাৎ ‘নিজেকে সুন্দর দেখানো’-র একটা চিরায়ত বাসনা সকলের। কারো ক্ষীণ, কারো প্রবল। নেড়া করলে পাছে মুখশ্রী মলিন হয় ভেবে, আমরা কেশে ক্লিষ্ট হচ্ছি। লক্ষ-কোটি নরের সাথে অপেক্ষায় আছি , কখন নরসুন্দররা দ্বার খুলেন। একেক বার মনে হচ্ছে — টাক থাকলেই বরং ভালো হতো। বোঝা থেকে বাঁচা যেত। তারা আজ কত নির্ঝঞ্ঝাট! সুদিন-সুযোগ কার কিভাবে আসে, বলা মুশকিল। লকডাউনের সে সুযোগটা কাজে লাগিয়ে, কেউ আবার গোঁফ-দাড়ি বানিয়ে খোশ।

অন্যদিকে মেয়েরা, কিশোরী হতেই কী সহজে দীর্ঘ কেশ নিয়ে জীবনভর চলে! এতে অসুবিধে দূরে থাক, বরং কেশ খসে গেলে আফসোস হতে দেখি। অনেক আছেন, নিজেকে সুন্দর-সজীব দেখাতে, সাদা চুল নিয়মিত কালো করে চলেছেন — কষ্টকর হলেও। সঙ্গত কারণেই তাঁরা মুখ-চুল-ত্বকের পরিচর্যা বেশি করেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে স্নো-পাউডার এবং কেশতেল কারবারিরা প্রচারের ফাঁদ ফেলে, সকলকে ফতুর করে চলেছেন। অভিনব কায়দায় বানানো কৌটায় জল-হাওয়া যা-ই মেশানো থাকুক; নিয়মমাফিক আমাদের কিনতে হয়। নুন‍্যতম উপকারে না এলেও, এ যেন শাশ্বত ধারা।

বলার অপেক্ষা রাখে না, নিজেকে সুন্দর রাখা বাঞ্ছনীয় — এর জন্য প্রচেষ্টাও প্রশংসনীয়। এক্ষেত্রে নারী-পুরুষ অভেদ। যেজন‍্য জেন্টস্ পার্লারের পাশাপাশি লেডিস্ পার্লারের ব‍্যবসা দেশের মফস্বল শহরেও ছড়িয়েছে। মুক্ত গগণ ও মুক্ত বাণিজ্যের অহিত ভাইরাস ক্ষেত্রবিশেষ সংক্রমিত হচ্ছে। আজকাল ছেলেরা ‘উত্তম’ কিংবা ‘দিলীপ’ স্ট‍্যাইলে চুল না কাটালেও , যখন দেখি রোনালদো- নেইমার বেশে তারা স্কুল-কলেজে, তখন বিরক্ত লাগে। এই ছাত্র-যুবরা যদি ভাবতো — ইউরোপ-আমেরিকানরা বাংলাদেশের স্ট‍্যাইল অনুকরণ করে না। তারা চলে তাদের স্ট‍্যাইলে, তাদের পতাকা উড়িয়ে। তাই উচিত, বেশভূষায় দেশি সংস্কৃতির সাবলীল ধারা বাঁচিয়ে রেখেই, বিশ্বায়নের জানালা খুলা। তাছাড়া বাঙালি সংস্কৃতির দাপট বিশ্বে কম নয়। পহেলা বৈশাখের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বিশ্ব সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত হয়েছে।

আমাদের সংস্কৃতির দুই দিকপাল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম শত বছর পূর্বেই চুল-দাড়িতে যত্নশীল ছিলেন। বিশ্বকবির শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখশ্রী এবং বিদ্রোহী কবির বাবরী চুল শুধু সৌন্দর্য পূর্ণ নয় — সৌখিনতারও পরিচায়ক।

আমাদের জাতীয় কবি গেয়েছেন ‘- – – প্রিয়া হবে এসো রানী, দেবো খোঁপায় তারার ফুল’, জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, ‘- – – চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’, ঐদিকে হেনরি রচনায় পাই, জিম তার সবচে মূল্যবান জিনিস বিক্রি করে ডেলার চুলের জন্য দামি চিরুনি কিনেছে। এ সব-ই প্রিয়ার চুলকে ভালোবাসার চিত্র। এক্ষেত্রে ডেলাদের অনুরাগ-ত‍্যাগের চিত্র অদৃশ্যেই রইলো।

দৃশ্যত, লকডাউনের মেয়াদ ক্রমবৃদ্ধিতে এটাই কি ভাগ্যে লেখা রয়েছে যে — গিন্নিকে বলতে হবে, ‘তোমার কাপড় কাটার কাঁচিটা নিয়ে এসো’, পুত্রকে বলবো, ‘গামছা-চিরুনি আনো’ — বারান্দায় বসলাম। তাদের কর্মকাণ্ড শেষে, আমি স্নান করার সময়ই অনুভব করবো — মাথাটা অ-নে-ক হালকা হলো! বাঁচা গেল। আমার ক্ষীণ কিশোরী কণ‍্যা প্রজ্ঞাকে বলবো, কফি দিতে। সে খুশিতে কফি বানিয়ে, লম্বা চুল দুলিয়ে দুলিয়ে কফি নিয়ে হাজির হবে। আমি চুমুক দেয়ার আগে, আয়নায় নিজের চেহারাটি একবার দেখে বুঝবো — এ তো এক নুতন কাটিং! যা পরিচিত মনে হলেও , কোভিড-১৯ থেকে দূরে-ই। প্রজ্ঞা বরাবরের মতো আমাকে আস্তে জিজ্ঞেস করবে, ‘কফি বালা হইছেনি?’ তার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বলবো, ‘ বালা হইছে, খুউব বালা।’

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৫২ বার

Share Button