শিরোনামঃ-


» কৈলাসহর থেকে উনকোটি

প্রকাশিত: ০৯. ফেব্রুয়ারি. ২০২০ | রবিবার

সৌমিত্র দেব

শহরের নাম কৈলাসহর। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ত্রিপুরা রাজ্যের উত্তর ত্রিপুরা জেলার সদর
শহরের এই নাম। কৈলাস আর হর শব্দ দুটো একই অর্থ বহন করে। দুটোই শিব
ঠাকুরের নাম। যে রকম কোনো ছেলের নাম দেখা যায় সূর্যদাস তপন। আবার
কোনো মেয়ের নাম শিবানী চৌধুরী গৌরী। কৈলাসহর শহরের নিকটবর্তী
লক্ষ্মীপুর গ্রামে গত ২৬ জানুয়ারি আয়োজন করা হয়েছিল এক বিশাল অনুষ্ঠানের।
সাধক, কবি ইয়াসিন শাহের ৮০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সেই অনুষ্ঠানে
বাংলাদেশ থেকে মোট পঁচিশজন লেখক ও বুদ্ধিজীবীকে আমন্ত্রণ জানানো
হয়েছিল। আমন্ত্রিতদের তালিকায় আমার নামও ছিল। নতুন কোনো এলাকার সাথে
পরিচিত হবার ব্যাপারে আমার উৎসাহ একটু বেশি। তাই নির্ধারিত দিনের এক
দিন আগেই ২৫ জানুয়ারি ১৯৯৯ সালে সীমান্ত পার হয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি
এলাহী কারবার। আমাদের কাছে ইয়াসিন শাহ কবি হিসেবে পরিচিত হলেও
ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে তিনি অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন পরী হিসেবে
পরিচিত। অনুষ্ঠানে যেমন লেখক, বুদ্ধিজীবীরা আমন্ত্রিত হয়েছেন তেমনি পীরের
৮০তম ওরস উপলক্ষে সেখানে বাংলাদেশ থেকে হাজির হয়েছেন শত শত মুরিদান।
তাদের অনেকেই রাতভর জিকির করবেন। তাদের সাথে কিছুক্ষণ মারফতি তত্ত্ব
আলোচনা করে সময় কাটালাম। তারপর মহব্বত মিয়া নামে এক স্থানীয় লোকের
সাথে খাতির জমিয়ে শহর ঘুরতে বেরুলাম। খুবই ছোট শহর। কাছেই বাংলাদেশের
সীমান্ত। দালান কোঠাগুলো সব পুরনো ধাঁচের। প্রশস্ত রাস্তাগুলোয় তেমন
একটি গাড়ি দেখা যায় না। মহব্বত মিয়ার মাধ্যমে খুঁজে বের করলাম ওখানকার
স্থানীয় সাপ্তাহিক ‘দেশবার্তা’ পত্রিকার সম্পাদক সন্তোষ দেবরায়কে।
সন্তোষের সাথে এক রাত্রি
সন্তোষ দেবরায়ের সাথে পরিচয় পর্বের পর মুহূর্তেই ভেতরের কথাটা পাড়লাম।
কৈলাসহর আসার পেছনে আমার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল উনকোটি মন্দির দর্শন। বই-
পত্রে পড়েছি, উনকোটিতে নাকি পাহাড়ের উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে
অসংখ্য দেবমূর্তি। অজন্তা ইলোরা মতো গা ছম্ধসঢ়;ছম্ধসঢ়; করা নির্জন সব
ভাস্কর্য। সন্তোষ জানালেন, কৈলাসহর থেকে ধর্মনগর যাবার পথেই পড়ে
উনকোটি। কিছুদিন আগে সেখানে পৌষ সংক্রান্তির উৎসব হয়ে গেল।
আবার এপ্রিল নাগাদ সেখানে হবে চৈত্র সংক্রান্তির মেলা। তখন বাংলাদেশ থেকে
প্রচুর লোক আসবে উনকোটি তীর্থ পর্যটনের জন্য। বাসে গেলে খানিকটা
হাঁটতে হয়। আমি সন্তোষকে প্রস্তাব দিলাম তার মোটর সাইকেলে
উনকোটিতে আমাকে লিফট দেবার জন্য। কিন্তু তিনি জানালেন, উনকোটিতে
উগ্রপন্থীদের উৎপাত আছে। ওরা বাঙালি পেলে ধরে নিয়ে জিম্মি করে। তবে
আমাকে একেবারে নিরাশ করলেন না সন্তোষ। তার ভাইয়ের ‘মহাশক্তি’ প্রেসের
এক কর্মচারীকে ঠিক করলেন পরদিন সকালে আমাকে উনকোটিতে নিয়ে যাবার
জন্য। সে রাতটা কাটিয়ে দিলাম সন্তোষ দেবরায়ের বাড়িতে।
উগ্রপন্থী আতঙ্ক
ত্রিপুরার মানুষের কৃপণতা নিয়ে অনেক গল্প শুনেছিলাম। আমার মনে হলো
প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে সমৃদ্ধ হলেও যোগাযোগের অব্যবস্থার জন্য
ভারতের এই রাজ্যটি অর্থনৈতিকভাবে দুরবস্থার শিকার। আর তাই এখানকার

মানুষের হিসেবী হওয়াটাকে মোটেই দোষ দেয়া যায় না। তার উপর সন্তোষ
দেবরায়ের স্ত্রীর আন্তরিক আতিথেয়তায় আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম।
ত্রিপুরাবাসীর কৃপণতা যে এক ধরনের সরলাকৃত প্রচার, এতে আর কোনো
সংশয় রইলো না। সকাল বেলা সন্তোষের বাড়ি থেকে ভরপেট খেয়ে চলে এলাম
মহাশক্তি প্রেসে। কিন্তু গাইড হিসেবে সন্তোষ যাকে ঠিক করে
দিয়েছিলেন সে বেঁকে বসলো। তাকে উগ্রপন্থী আতংকে পেয়ে বসেছে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যে চলছে এই উগ্রপন্থী তৎপরতা। এতে
চাকমাদের পোয়াবারো। শান্তি চুক্তির আগে তারা বাংলাদেশে ঝামেলা বাধিয়ে
চলে যেতো ত্রিপুরায়। আবার ত্রিপুরার উগ্রপন্থীরা একই কায়দায় চলে আসে
বাংলাদেশে। ফলে দুই দেশের সরকারই ওদের হাতে নাস্তানাবুদ। ত্রিপুরার মানুষতো
একেবারেই অসহায়। তাদের এমনকি এক শহর থেকে অন্য শহরে যেতে হলেও
প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিতে হয়। শহরে যাদের সাথেই পরিচয় হলো,
তারাই উগ্রপন্থীদের ভয় দেখিয়ে উনকোটি যেতে নিষেধ করলেন। বাধ্য হয়েই
ফিরে গেলাম অনুষ্ঠানস্থল লক্ষ্মীপুর গ্রামে।
জয় বাবা ইয়াসিন শাহ
লক্ষ্মীপুরে ওরস প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখি লোকে লোকারণ্য। বিশাল প্যান্ডেল বাধা হচ্ছে।
এই অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করছে ত্রিপুরার বামফ্রন্ট সরকার। তাদের উদ্যোগেই
সাধক কবির মাজারের পাশে গড়ে উঠেছে বিশাল অট্টালিকা। বাংলাদেশ থেকে
এসেছেন মৌলভীবাজার জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি
মাহফুজুর রহমান। তিনি জানালেন, অন্যরা অনিবার্য কারণবশত আসতে পারেন
নি। দিনটি ছিল ২৬ জানুয়ারি, ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস। তারপরও সাধক কবির
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রশাসনের প্রায় সকল মহলের
উপস্থিতি উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। অনুষ্ঠান উদ্বোধন করলেন উত্তর ত্রিপুরা জেলা পরিষদের
চেয়ারপার্সন শ্রীমতি অঞ্জলি দেব বর্মা। পঞ্চায়েত সমিতির চেয়ারম্যান বিজয়
রায়ের সভাপতিত্বে উক্ত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন এডিএম মি.
নীতিশ কুলকার্নি। বাংলাদেশ থেকে অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ পাঠিয়েছেন আহমদ
সিরাজ। তার অনুপস্থিতিতে আমিই সেটি পাঠ করলাম। অনুষ্ঠানের পাশাপাশি
চললো পরিচয় পর্ব। পরিচয় হলো কৈলাসহরের একমাত্র কলেজ এবং ত্রিপুরা রাজ্যের
দ্বিতীয় কলেজ রামকৃষ্ণ কলেজের অধ্যক্ষ অজয় কুমার ভট্টাচার্য, ব্লক ডেভেলপমেন্ট
অফিসার মোঃ বশির আলী, উত্তর ত্রিপুরা তথ্য, সংস্কৃতি ও পর্যটন কর্মকর্তা
ফখরুদ্দিন আহমদ, লেখক সুব্রত দেব, বিশ্বরূপ ভট্টাচার্য প্রমুখের সাথে। অনুষ্ঠান
শেষে ত্রিপুরার লেখক, বুদ্ধিজীবীরা জানালেন পরদিন বিকেলে তারা আমাদের সাথে
জেলা সাক্ষরতা অফিসে মতবিনিময় করতে চান। অধ্যক্ষ মহোদয়ও তার কলেজে
আমাদের আমন্ত্রণ জানালেন। এভাবে অতি দ্রুত জেলা সদরের প্রায় সকল মহলের
সাথে আমাদের সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে গেল। মনে মনে বললাম, জয় বাবা ইয়াসিন
শাহ। তোমার উসিলায় আমার মনোবাসনা পূর্ণ হতে চলেছে। সে রাতে
মাহফুজুর রহমান আর আমার থাকার ব্যবস্থা হলো রেস্টহাউজে।
কর্মকর্তা গাইড হলেন
পরদিন সকাল হতেই উত্তর ত্রিপুর জেলার তথ্য, সংস্কৃতি ও পর্যটনের তরুণ
কর্মকর্তা ফখরুদ্দিন আহমদ হাজির। জানালেন, বহুবার তিনি বাংলাদেশে
এসেছেন। কবি সমরেশ দেবনাথের সাথে তার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তিনি
জোর করে রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়ে আমাদের নাস্তা খাওয়ালেন। অল্পদিন হলো
এসেছেন কৈলাসহরে। কিন্তু এরই মধ্যে তার জানাশোনা প্রচুর। তিনি কবিতা

লিখেন, সঙ্গীতচর্চা করেন। ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি তার গভীর টান। এক ধরনের
সবজান্তা ভাবও আছে তার মধ্যে। অল্প সময়েই আমাদের সাথে তার ভাব হয়ে গেল।
সেই মুহূর্ত থেকে তার কর্মকর্তা পরিচয় মুছে গেল। তিনি স্বেচ্ছায়
গ্রহণ করলেন ত্রিপুরায় আমাদের গাইডের দায়িত্ব। তার বস তাকে অত্যন্ত স্নেহ
করেন। আর তাই অফিসে গিয়ে ছুটি নিতে বেশি সময় লাগলো না। সুযোগ
বুঝে তার কাছে উনকোটি যাবার কথা বললাম। তিনি সোৎসাহে রাজি হয়ে
গেলেন। ফখরুদ্দিনের বস একজন মণিপুরী। চমৎকার ভদ্রলোক। শুধু বলে দিলেন
উনকোটি যেতে হলে সরকারি গাড়ি নিয়ে যাও। কিন্তু ডিএম-এর পারমিশন
নিতে ভুলো না।

উনকোটির পথে
তথ্য অফিসের গাড়ি নিয়ে ডিএম-এর কার্যালয়ে এলাম। ডিএম মানে হচ্ছে
ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট। আমাদের ডিসির মতো ক্ষমতা তার। উত্তর ত্রিপুরা জেলার
ডিএম মি. আরসিএম রেড্ডি খুব সদালাপী মানুষ। চমৎকার বাংলা বলেন। আমাদের
পরিচয় পেয়ে আন্তরিক অভ্যর্থনা জানালেন। উনকোটি দেখার কথা শুনে স্বচ্ছন্দে
অনুমতি দিলেন। বললেন, তিনি সেটাকে পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার
জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। পাহাড়ের গায়ে রেলিংওয়ালা সিঁড়ি তৈরি করে
দিয়েছেন। যাবার পথে ফখরু আমাদের জানালেন, শুধুমাত্র আন্তরিকতা আর বন্ধুত্বের
জন্য তিনি আমাদের সঙ্গ দিচ্ছেন না। এটা তার ডিউটির মধ্যে পড়ে।
উনকোটির উপর আমরা যদি লেখালেখি করি তাহলে সেটা তার খুব কাজে লাগবে।
পাহাড়িয়া চড়াই-উৎরাই আর আঁকাবাঁকা পথে আমাদের গাড়ি নিয়মিত
ঝাঁকি নৃত্য দিচ্ছে। অন্যভ্যস্ত শরীরে সেটা সহনীয় নয়। বমি বমি লাগছিল।
কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়ি এসে থামলো উনকোটি।
শৈবতীর্থের দৈবমূর্তি
উনকোটিতে প্রথমেই আমরা বিশাল এক শিবমূর্তির মুখোমুখি হলাম। দূরে
দূরে পাহাড়ের গায়ে এ রকম অসংখ্য মূর্তি খোদাই করা। নির্জন প্রকৃতির
কোলে এ এক পরম বিস্ময়। শত শত ফিট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় আর গায়ে গায়ে
এসব মূর্তি কোনো নিপুণ শিল্পী তৈরি করে গেছে! ফখরুদ্দিন জানালেন, ফ্রন্ট
লাইন পত্রিকায় জয়ন্ত ভট্টাচার্য্য লিখেছেন যে উনকোটি খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীর
শিল্পকর্ম। বঙ্গদেশে পাল রাজাদের বৌদ্ধ ধর্মীয় নীতির কারণে উৎপীড়িত বাঙালি
শাক্তধর্মর প্রতিফলন হিসেবে উনকোটির ভাস্কর্য তৈরি হয়। তবে অধিকাংশ লোক
মনে করেন এটা একাদশ দ্বাদশ শতাব্দীর তৈরি। কথিত আছে, কালু কামার নামে
কোনো এক শিল্পী এক কোটি দেবতার মূর্তি গড়তে চেয়েছিলেন। একটি
মূর্তি বাকি থাকতেই ভোরের কাকের কর্কশ চিৎকারে তিনি নির্মাণ কাজ
বন্ধ করেন। ফলে এটি হয় উনকোটি। ঘটনাটি সত্য হলে মানা যেতো, এই
কালুকামার মাইকেল এঞ্জেলোর চাইতেও বড় শিল্পী। সবার উপরে শিব বলে একে
শৈবতীর্থও বলা হয়। তবে অন্যান্য দেবতার অস্তিত্বও সেখানে রয়েছে। ফখরুদ্দিনের
নিজস্ব মত হচ্ছে- চোল সভ্যতার সাথে এখানকার শিল্পরীতির মিল রয়েছে। নির্মাণ
কৌশলের দিক থেকে সেটা প্রমাণ পাওয়া যায়। অংকুরঘাটের অস্ট্রোমঙ্গোলিয়ান
শিবের সাথে এর সম্পূর্ণ মিল রয়েছে। সময়কালের দিক থেকেও চোলের সাথে এর
মিল। এ বিষয়ে যদিও অনেকেরই দ্বিমত রয়েছে তবুও এ যুক্তিটি আগামীতে
প্রতিষ্ঠা পেতে পারে বলে তিনি মনে করেন। পাহাড় বেয়ে ঝরনা গড়িয়ে এসে
কুণ্ড তৈরি করেছে। সেখানে স্থানীয় মানুষেরা স্নান করেন। প্রতিদিনই

সেখানে পুজো হয়। সিঁড়ির কল্যাণে চট করেই উঁচু উঁচু পাহাড় বেয়ে
উঠছিলাম। একটা খাড়া পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে দেখলাম বেশ কিছু মূর্তি
মাটিতে শুয়ে আছে। পাহাড় আর অরণ্যের মাঝখানে নির্জন এলাকায় এই
মূর্তিগুলো দেখে গা-টা কেমন ছমছম করে উঠলো। হয়তো শিল্পীর জন্য এই
নির্জন নিসর্গই ছিল সবচেয়ে জরুরি।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৪১ বার

Share Button

Calendar

February 2020
S M T W T F S
« Jan    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829