শিরোনামঃ-


» কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা

প্রকাশিত: ২১. জুলাই. ২০২০ | মঙ্গলবার

মোতাহার হোসেন

সবুজের সমারোহের জন্য এদেশের সুখ্যাতি একসময় ছিল। এদেশের মাটি ও জলবায়ু গাছের জন্য অনুকূল বিধায় অসংখ্য জাতের গাছ গাছালি দেখা যেত সর্বত্র। সেই সময়ে মানুষের আর্থসামাজিক জীবনে গাছ গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। গ্রামের হাট বাজার বসতো বড়ো কোনো গাছের তলায়। ক্লান্ত পথচারী বিশ্রাম নিতেন রাস্তার পাশের বড়ো বৃক্ষের ছায়ায়। সময়ের পরিক্রমায় আজ হারিয়ে যেতে বসেছে সমাজের গাছ কেন্দ্রিক উপাদানগুলো।

নানা প্রয়োজনে গাছ কাটা হলেও আমাদের মাঝে গাছ লাগানো ও এর পরিচর্যা করার প্রবণতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। শুধু মানুষের ক্ষতি নয়, গাছ হারিয়ে যাবার কারণে বহু জাতের প্রাণীও ধীরে ধীরে বিলুপ্তির উপক্রম হয়েছে। ঋতু বৈচিত্র্য ও প্রতিটি ঋতুর স্বাতন্ত্র্য ও সমৃদ্ধ বৈশিষ্ট্য আজ প্রচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে মূলত সবুজের অভাবে। এর প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবন জীবিকার উপরও। দেশে সবুজ বনভূমির পরিমাণ বাড়ানোর মাধ্যমে পরিবেশের হারানো সমৃদ্ধি ফেরাতে সরকার সামাজিক বনায়নের একটি শক্তিশালী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য পরিবেশ ও প্রতিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা অপরিহার্য। বিশেষ করে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিবেশের সমৃদ্ধি অক্ষুণ্ন রাখতে পরিবেশ হতে সংগৃহীত সম্পদসমূহ যাতে নিঃশেষ হয়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। এজন্য বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষাকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেছে। বিশেষ করে, পরিবেশ সুরক্ষা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দশটি বিশেষ উদ্যোগের অন্যতম হিসেবে গৃহীত হওয়ায় বৃক্ষরোপণের ব্যাপক কর্মসূচি। পরিবেশ সংরক্ষণসহ গ্রামীণ অঞ্চলের দরিদ্র মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এই উদ্যোগ মূল্যবান ভূমিকা রাখবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচি ও উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বহু সুনাম কুড়িয়েছে।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনও পরিবেশ রক্ষায় অসামান্য অবদানের জন্য জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লিডারশিপ ক্যাটাগরিতে সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ, ২০১৫’ প্রদান করেছে। দেশের সর্বত্র সবুজের সমারোহ বাড়ানোর মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে সরকার নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।সামাজিক বনায়ন এদের অন্যতম।

সামাজিক বনায়ন হলো এমন এক ধরনের বনায়ন যার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকেন স্থানীয় জনগণ। দেখা গেছে, বনায়নকে স্থায়ী করতে হলে তাতে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ থাকা জরুরি। অন্যথায় হলে সেই বনায়ন দীর্ঘসময় টিকে থাকতে পারে না। আমাদের দেশের জনসংখ্যা ও গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় বন বিভাগের পক্ষে একাকী বনজ সম্পদ রক্ষা করা কঠিন। বরং বনায়নে স্থানীয় জনগণকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে তাদের মাঝে বন নিয়ে এক ধরনের মালিকানাবোধ তৈরি হয় যা বন সংরক্ষণে শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। স্থানীয় জনগণের অংশীদারত্বের কারণে বন মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকা রাখতে পারবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাসমূহ অর্জনে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে অবদান রাখবে সামাজিক বনায়ন।

দেশে সবুজ বনভূমির পরিমাণ বাড়াতে বন বিভাগ ১৯৮১-’৮২ সনে সামাজিক বনায়নের কার্যক্রম শুরু করে। এই কার্যক্রমের আওতায় ২০১৮-১৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ৯৯,৩১৩.৭৮ হেক্টর এবং ৭৩,২২৩.৩৬ কি. মি. বাগান সৃজন করা হয়েছে। এছাড়া বিগত ৪ বছরে জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড আওতায়ভুক্ত প্রকল্পের মাধ্যমে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি, স্বল্পমেয়াদি ও নন-ম্যানগ্রোভ ২৯৫৫ হেক্টর ব্লক বনায়ন এবং সড়ক, রেলপথ ও বাঁধ সংযোগ সড়কে ২৬৪১ কি. মি. স্ট্রিপ বনায়ন করা হয়েছে। সৃজিত বাগানে প্রায় ৭ লক্ষ ১ হাজার ৪৮৮ জন উপকারভোগী সম্পৃক্ত রয়েছেন। যাদের মধ্যে মহিলা উপকারভোগীর সংখ্যা ১ লক্ষ ৩৪ হাজার ৫৪২ জন। ২০০২ সাল হতে ২০১৫-১৬ সাল পর্যন্ত সারাদেশে ব্যাপক বনায়নের লক্ষ্যে ১০ কোটি ১৫ লক্ষ ৪০ হাজারটি চারা বিক্রয় ও বিতরণ করা হয়েছে।

সামাজিক বনায়ন সরকারের মালিকানায় থাকা যে কোনো জমিতে করা যেতে পারে। এছাড়া ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকা কোনো জমিতে সামাজিক বনায়ন করতে চাইলে জমির মালিককে স্বেচ্ছায় লিখিত চুক্তির মাধ্যমে সরকারকে এ উদ্দেশ্যে জমি অর্পণ করতে হবে। সরকার সারাদেশে পতিত জমি, রাস্তার দু’পাশ এবং চাষাবাদ অযোগ্য ভূমিতে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

সামাজিক বনায়ন স্থানীয় জনসাধারণের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। এটি দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধিতেও অবদান রাখছে। সামাজিক বনায়নের বনজ সম্পদ বিক্রির অর্থের একটি অংশ বনায়ন ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় জনগণ পেয়ে থাকেন। বন ব্যবস্থাপনায় গ্রামের দুস্থ মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সামাজিক বনায়নের উপকারভোগী নির্বাচনে তাদের অগ্রাধিকার প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া উপকারভোগী নির্বাচনের কমিটিতে ৫০ ভাগ নারী প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়েছে। সামাজিক বনায়নের এক কিলোমিটার এলাকার মধ্যে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী হতে উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়।

পূর্বে উপকারভোগীরা সামাজিক বনায়নের মোট বনজ সম্পদের ৪৫ ভাগ পেত। তবে বর্তমানে উপকারভোগীদের ভাগের পরিমাণ বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে উপকারভোগীদের মাঝে সামাজিক বনায়ন নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। শুরু হতে ২০১৮-১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে সামাজিক বনায়নের আওতায় ৪৩ হাজার ৯৪৩ হেক্টর এবং ১৮ হাজার ৩৬২ কি. মি. বাগান কর্তন করা হয়েছে। উৎপাদিত কাঠ বিক্রয় করে ১২২৭ কোটি ৮২ লক্ষ ১৮ হাজার ৯১০ টাকা পাওয়া গেছে। এ যাবৎ ১ লক্ষ ৯১ হাজার ৮৫৪ জন উপকারভোগীর মাঝে বিতরণকৃত লভ্যাংশের পরিমাণ ৩৮৩ কোটি ২৩ লক্ষ ৫ হাজার ৪৫ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত পুনঃ বনায়নের কাজে বৃক্ষরোপন তহবিলে টিএফএফ (TFF) ১১০ কোটি ২০ লক্ষ ১৭ হাজার ৩শত ৮৫ টাকা জমা রয়েছে। সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে এ পর্যন্ত সরকারি রাজস্ব আয়ের পরিমাণ হয়েছে ৪৩৩ কোটি ৫৮ লক্ষ ৪৫ হাজার ২শত ৩২ টাকা। এছাড়া ভূমি মালিক ও ইউনিয়ন পরিষদসহ অন্যান্যদের মাঝে ২১৮ কোটি ৪৯ লক্ষ ৭৩ হাজার ২১৪ টাকা বিরতণ করা হয়।

পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে একটি দেশের মোট ভূমির ২৫ শতাংশ বন দ্বারা আবৃত থাকা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মোট আয়তনের মাত্র ৭ দশমিক ৭ ভাগ বনাঞ্চল এবং ভূমি এলাকার ১৪ ভাগ বনাঞ্চল। পর্যাপ্ত পরিমাণে বনভূমি না থাকায় পরিবেশের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেই সঙ্গে উন্নত দেশসমূহ প্রকৃতিতে ব্যাপকহারে গ্রিনহাউজ নিঃসরণ করার ক্ষতিকর প্রভাবও আমাদের পরিবেশের ওপর পড়ছে। প্রয়োজনীয় যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও জনবসতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মোট জিডিপি’র ২ শতাংশ এবং ২১০০ সাল নাগাদ ৯ দশমিক ৪ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে।

জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী সমসাময়িক উন্নয়ন ধারণায় পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে।প্রাকৃতিক পরিবেশের সংরক্ষণ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। এই বিবেচনায় সামাজিক বনায়ন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাসমূহের একাধিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রাখবে। তাই দেশে আরও ব্যাপকহারে সামাজিক বনায়নের উদ্যোগ হাতে নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে, ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় উপকূলীয় ও পার্বত্য অঞ্চলে ব্যাপকহারে সামাজিক বনায়ন করা হবে।

এই পরিকল্পনার আওতায় স্থানীয় জনগণের সহায়তায় ২০২০ সালে মধ্যে উপকূলীয় এলাকায় ৩০ হাজার হেক্টর ম্যানগ্রোভ বন ও এক হাজার কিলোমিটার গোলপাতা বন সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রাসমূহ অর্জিত হলে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতে জীবন-সম্পদহানি প্রতিরোধ করা সহজ হবে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৬০ বার

Share Button