» কোমায় থেকেও পদোন্নতি পেয়েছেন লে. কর্নেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা

প্রকাশিত: ১৬. অক্টোবর. ২০২০ | শুক্রবার

আট বছর ধরে কোমায় থেকেও পদোন্নতি পেয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লে. কর্নেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা। গত ১২ অক্টোবর ছিল তার চাকরির মেয়াদের শেষ দিন। সেই দিনটি এক অভাবনীয় আনন্দের ক্ষণ বয়ে আনে তার পরিবারের জন্য। গর্বিত করে সেনাবাহিনীকে। কোমায় থাকা তাছাওয়ারকে কর্নেল হিসেবে পদোন্নতি দেয় সেনা কর্তৃপক্ষ।

সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) ৩১৪ নম্বর কেবিন নন্দকুজায় চিকিৎসাধীন লে. কর্নেল তাছাওয়ারকে কর্নেল ব্যাচ পরিয়ে দেওয়া হয় সেদিন। এ ঘটনা কোনো দেশের সেনাবাহিনীর ইতিহাসে বিরল বলে জানা গেছে। আর সেটি সম্ভব হয়েছে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের মহানুভবতায়।

যখন সুস্থ ছিলেন, তখন বাহিনীতে সুনামের সঙ্গে দায়িত্বপালন ও বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রাখায় তাকে এই সম্মানে ভূষিত করেছে সেনাবাহিনী।

২০১৩ সালের ১১ মে হৃদরোগে আক্রান্ত হন মরমী শিল্পী হাছন রাজার বংশধর দেওয়ান তাছওয়ার। এরপর গভীর কোমায় আচ্ছন্ন হয়ে তিনি আট বছর ধরে সিএমএইচে আছেন। তাকে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনতে চেষ্টার কমতি নেই চিকিৎসকদের। এরই মধ্যে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ‘এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে’ করে তাকে বিদেশেও পাঠিয়েছিল।

কিন্তু স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেননি দেওয়ান তাছাওয়ার। চিকিৎসা ভাষায় তার অসুস্থতাটা হলো ‘হাইপোস্কিক স্মিমিক ইনজুরি টু ব্রেইন ইফেক্টস’। তার হার্টের কার‌্যকারিতা ফিরে এসেছে, কিন্তু ব্রেইনের সব অংশ পুরোপুরি ফিরে আসেনি। তার ব্রেইনের নিচের অংশ ভালো।

 

প্রিয় মানুষটির চেতনা ফিরে আসার দীর্ঘ ক্লান্তিহীন অপেক্ষায় তার স্ত্রী মোসলেহা মুনিরা রাজা, ছেলেমেয়ে ও সহকর্মীরা। এর মধ্যে এমন পদোন্নতির ঘটনা সবার চোখে আনন্দের জল এনে দেয়। কৃতজ্ঞতার বাঁধনে আবদ্ধ করে সবাইকে।

২০১৩ সালের ১২ মে থেকে সিএমএইচের হাসপাতালের বিছানাতে কোমায় আছেন কর্নেল তাছাওয়ার রাজা। এই বিছানাতেই ১২ অক্টোবর সেনা পোশাকে কর্নেল ব্যাচ পরিয়ে দেওয়া হলে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় সেখানে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপ্লুত তার সহকর্মী ও দেশবাসী। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকে চাকরিজীবনের শেষ দিনে তাছাওয়ার রাজাকে পদোন্নতি দিয়ে এক বিরল সম্মানে ভূষিত করেন সেনাবাহিনী-প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ।

আইএসপিআর জানায়, তাছাওয়ারের ৩১ বছর ৩ মাস চাকরিজীবনের সমাপ্তি ঘটল এই পদোন্নতির মধ্য দিয়ে। ‘কিং অব দ্য ব্যাটেল’ বা সাঁজোয়া কোরের এই চৌকস কর্মকর্তার ছিল বর্ণাঢ্য কর্মজীবন। প্রশিক্ষক, অধিনায়ক হিসেবে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তার রয়েছে গবেষক ও লেখক হিসেবে খ্যাতি। সহকর্মীদের মধ্যে ছিলেন সদালাপী, জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য কর্মকর্তা। চাকরিজীবনে দেশ-বিদেশে ‘স্টাফ কোর্স’সহ সম্পন্ন করেছেন বেশ কয়েকটি প্রশিক্ষণ।

 

১৯৮৯ সালে ২০তম লং কোর্সের সঙ্গে সাঁজোয়া কোরে কমিশন লাভ করেন দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা। তিনটি সাঁজোয়া রেজিমেন্টে বিভিন্ন পদে চাকরিসহ ঘাটাইল সেনানিবাসে একটি রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। তার অধীন ইউনিটটি ২০০৮ সালে ডিভিশনে সেরা ইউনিট হওয়ার গৌরব অর্জন করে।

এ ছাড়া ‘আর্মার্ড স্কুল’ ও ‘পদাতিক স্কুলের’ (এসআইএন্ডটি) রণকৌশল প্রশিক্ষক ছিলেন দেওয়ান তাছাওয়ার। প্রশিক্ষক হিসেবেও তার ছিল বিশেষ খ্যাতি।

কর্নেল তাছাওয়ার রাজা ইরাক, কুয়েতে শান্তিরক্ষা মিশনে বিশেষ অবদানের জন্য ‘পিস মেডেলে’ ভূষিত হন। তিনি বাংলাদেশ ও পাকিস্তান স্টাফ কলেজ সম্পন্ন করেন এবং চায়না-আমেরিকা থেকে সাঁজোয়া যানের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। এ ছাড়া তিনি মিরপুর স্টাফ কলেজের একজন গ্র্যাজুয়েট এবং সেখানকার প্রশিক্ষক হন।

 

একজন সাহিত্যমনা মানুষ ছিলেন কর্নেল তাছাওয়ার রাজা। লিখেছেন নানা বিষয়ে । বাউলশিল্পী হাছন রাজার এই বংশধর কর্মজীবনে লিখেছেন একাধিক বই। এর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো ‘হাছন রাজা’, ‘জেনারেল ওসমানি: ও কর্নেল মাই কর্নেল’, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও ইতিহাস’।এছাড়া ২০০৯ সালে তাঁর উদ্যোগে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হয়  প্রথম  জাতীয় হাছন উৎসব । তিনি ছিলেন উদযাপন পরিষদের আহবায়ক, সদস্য সচিব ছিলেন কবি সৌমিত্র দেব ।


সিএমএইচের আইসিইউ-প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাসুদ মজুমদার জানান, কর্নেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজার অসুস্থতাকে চিকিৎসার ভাষায় বলা হয় ‘হাইপোস্কিক স্মিমিক ইনজুরি টু ব্রেইন ইফেক্টস’। ওনার (দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা) হার্টের কার‌্যকারিতা ফিরে এসেছে, কিন্তু ব্রেইনের ফিরে আসেনি। পুরো প্রক্রিয়ার সময় তার ব্রেইনে সার্কুলেশন ৫ মিনিটের অতিরিক্ত ছিল, কিন্তু ১৫ মিনিটের কম ছিল। এ জন্য তার ব্রেইনের নিচের অংশ ভালো।

কিন্তু যে অংশগুলো আমাদের চিন্তা-চেতনার সঙ্গে জড়িত, সেই এরিয়ার সেলগুলো পুনরুজ্জীবিত হয়নি। এ জন্য জীবন চালানোর জন্য বেসিক বডির প্রটেকটিভ সিস্টেম ভালো থাকলেও হাইয়ার সাইকোলজিক্যাল ফাংশনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

তাছাওয়ার রাজার পরিবার সিএমএইচের চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞ। তার স্ত্রী বলেন, ‘সিএমএইচে যখন যে ধরনের সহায়তা চেয়েছি, আল্লাহর রহমতে সব পেয়েছি। প্রায় ৮ বছর ধরে এক কঠিন সংগ্রাম করে চলেছি আমরা।’

অন্যদিকে অসুস্থ সেনা কর্মকর্তা ও মরমী লোকসাধক হাছন রাজার বংশধর লেফট্যানেন্ট কর্ণেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা চৌধুরী ওরফে আছাউর রাজা চৌধুরীর সম্পদ আত্মসাতের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে একটি কুচক্রীমহলের উপর। হার্টএ্যাটাক ও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে ২০১৩ সাল থেকে চেতানাহীন অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন লেফট্যানেন্ট কর্ণেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা চৌধুরী। বিগত ২০১৮ সালে সিএমএইচ হাসপাতালে চেতনাহীন অসুস্থ এই সেনা কর্মকর্তার টিপ সই নিয়ে বিশ্বনাথ রামপাশা মৌজার বিভিন্ন দাগের প্রায় ১ একর ৯৩ শতক জমির দলিল রেজিস্ট্রি করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।

দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা চৌধুরীর বোন আমেরিকা প্রবাসী মোছা. ফাতেমা নাহরীন রাজা চৌধুরী ও মোছা. ফাতেমা নাজরীন চৌধুরী এবং সম্পত্তি দেখভালের দায়িত্বে নিযুক্ত থাকা দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা চৌধুরীর ভাগিনা আবু মোহাম্মদ চৌধুরী জানতে পারলে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আবু মোহাম্মদ চৌধুরী বাদী হয়ে জালিয়াতিতে জড়িত থাকায় বিশ্বনাথের রামপাশার মো. সফিক , পিতা- জহুর উদ্দিন, সুনামগঞ্জ জেলার বাবুল দাস (৬৪) পিতা মৃত- সুরেন্দ্র দাস, বিশ্বনাথ রামপাশা থানার মো. জৈন উদ্দিন(৭০) পিতা মৃত তোয়াহিদ উল্লাহ, শমসের নূর (৫৭), পিতা মৃত মজিদ আলী, মো. নাইমুল ইসলাম (৫১), পিতা রওশান আলী, মো. বদর নূর খান পিতা: মৃত. মো. আজির উদ্দিন, আব্দুল মোতালেব (৬০) পিতা মৃত শুকুর মামুদ সিলেট জল্লারপাড়ের পানসী রেস্টুরেন্টের পরিচালক সালাহ উদ্দিন (৫৫), পিতা মৃত রিয়াছত মিয়ার গংদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। এদিকে মামলার প্রধান আসামী মো. সফিক ২০১৮ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন।

 

এছাড়া, অভিযুক্ত বাবুল দাস(৬৪), মো. জৈন উদ্দিন(৭০), শমসের নূর (৫৭), সালাহ উদ্দিন (৫৫) আসামীকে পুলিশ ধরতে পারেনি এবং বাকী অভিযুক্ত আসামী জেলহাজতে রয়েছেন।

পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে অসুস্থ লেফট্যানেন্ট কর্ণেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা চৌধুরী টিপসই দিতে অক্ষম এবং তার শারীরিক অবস্থা টিপ সই দেয়ার মত নয়। এছাড়া সিএমএইচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও আদালতের অনুমতি না নিয়েই এই টিপসই নেয়া হয়েছে। যা আইনত বৈধ নয়। সিএমএইচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে আদালতকে অবহিত করেছেন। এছাড়া প্রতিবেদনে আরো দলিল রেজিস্ট্রি পূর্বক জালিয়াতির বিষয় উল্লেখ রয়েছে। জালিয়াতির বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এএসআই রিপন কুমার দে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৪২১ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031