» খালেদার পরিবারের কাছে প্যারোলেই মুক্তি বিএনপির আত্মসমর্পণ

প্রকাশিত: ১৩. ফেব্রুয়ারি. ২০২০ | বৃহস্পতিবার

মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার: ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি গৃহিণী থেকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ নিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে তিনিই দলের কান্ডারি।

১৭ বছরের সাজা নিয়ে দুই বছর ধরে কারাবন্দি। সর্বশক্তি নিয়ে লড়াই করছেন রোগমুক্তি আর কারামুক্তি জন্য। আইনি লড়াইয়ে আইনজীবীরা ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছেন। ভরসা ছিল স্বামীর প্রতিষ্ঠিত বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির কাছে। আন্দোলনের মাধ্যমে তাকে মুক্ত করা হবে, কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। রহস্য আর দুর্বল নেতৃত্বের কারণে দুই বছরেও মুক্তির পথ কিঞ্চিৎ খোলাসা করতে পারেনি তারা। ব্যর্থতার দায় সরকারের কাঁধে দিয়ে বিএনপি অঘোষিতভাবে আত্মসমর্পণ করেছে খালেদা জিয়ার পরিবারের কাছে।

গত সোমবার বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন খালেদা জিয়ার ভাই শামীম এস্কান্দার, যাতে বিদেশে চিকিৎসার জন্য সুপারিশ করে বোর্ড। অবশেষে পরিবারের করা আবেদনের মাধ্যমেই মুক্তির দিকে যাচ্ছেন খালেদা জিয়া। অবশ্য বিএনপির নীতিনির্ধারকরা এই প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক কৌশল বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনের পর সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দীন সরকারের আমলে বিশেষ জেলে আটক ছিলেন খালেদা জিয়া। ২০০৮ সালের ১৮ জানুয়ারি তার মা মারা যায়। ওই সময় প্যারোলে মুক্তি পেয়ে মায়ের লাশ দেখেছিলেন তিনি। তবে প্যারোলে মুক্তিপ্রাপ্ত দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। গত মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৩টায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে যান পাঁচ স্বজন। ঘণ্টাখানেক সেখানে অবস্থান করেন তারা। আবেদনের বিষয়ে গত মঙ্গলবারই খালেদা জিয়াকে জানানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থেকে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়া বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা দিতে চায় তার পরিবার। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে তাকে বিদেশ পাঠানোর জন্য মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশ চেয়ে বিএসএমএমইউ (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল) কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছেন তার ভাই শামীম ইস্কান্দার। বেগম খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষে এটাই প্রথম লিখিত আবেদন। এই আবেদন করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে।

শামীম এস্কান্দার তার আবেদনে লিখেছেন, খালেদা জিয়ার দ্রুত অবনতিশীল স্বাস্থ্যের পরিপ্রেক্ষিতে যে কোনো অপূরণীয় ক্ষতি এড়াতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত বিদেশি হাসপাতালে চিকিৎসা প্রয়োজন। খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসা ব্যয় বহন করে এবং তাদের দায়িত্বে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে আবেদনে। এই আবেদন বিবেচনা করা হবে বলে আশা করছেন খালেদা জিয়ার পরিবার।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে এমন আবেদন করার বিষয়ে খালেদা জিয়ার বোন সেলিমা ইসলাম গতকাল বুধবার বলেন, মেডিকেল বোর্ড যেন বিদেশে চিকিৎসার ব্যাপারে সরকারকে সুপারিশ করে সেজন্য এই আবেদন। খালেদা জিয়া বিদেশ যেতে রাজি হবেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে সেলিমা ইসলাম জানান, উনার (খালেদার) সম্মতি থাকবে।

এদিকে খালেদা জিয়ার আবেদনটি মেডিকেল বোর্ডে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কনক কান্তি বডুয়া। তিনি বলেন, ইতঃপূর্বে মেডিকেল বোর্ড খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার কোনো সুপারিশ করেনি। মেডিকেল বোর্ড পরীক্ষা করে কী সাজেশন দেয় সেটা আমরা পরে জানাব। ‘খালেদা জিয়ার পরিবার হতাশ’ দলীয় প্রধান কারাবন্দি হওয়ার দিন ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ দিন আন্দোলন ধরে রাখতে পেরেছিল বিএনপি। এরপর কর্মসূচি ঘোষণা করেছে কিন্তু সফলতার মুখ দেখেনি। ব্যর্থতার জন্য কেন্দ্রীয় নেতারা দোষারোপ করেছেন সরকারকে আর সাধারণ নেতাকর্মীরা দায়ী করেছেন দলীয় নেতাদের। সন্দেহের তির ছুড়েছেন নেতাদের রহস্যজনক ভূমিকার জন্য। দোষের দ্বিতীয় সারিতে রেখেছেন সরকারকে।

খালেদা জিয়ার পরিবার প্রথমে দলের প্রতি আস্থা রেখেছিল যে, আইনি লড়াই অথবা আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলবে। কিন্তু আইনজীবীরা জানিয়েছে আদালত নিয়ন্ত্রিত। তার (খালেদা) মুক্তির বিষয়টি রাজনৈতিক। দলের ওপর ছেড়ে দেয় মুক্তির পথ খোলাসার। বিএনপির দুই বছরের কর্মচিত্র খালেদা পরিবারকে হতাশ করেছে। ‘দলের ভাষ্য-মুক্তির বিষয়টি সরকারে কোটে’ রাজপথ ও আদালত- দুটোতেই ব্যর্থ হয়ে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে পরিবারের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে বিএনপি।

ইতোমধ্যে তৃণমূল থেকে প্রশ্ন উঠেছে দলের নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে। এমনই পরিস্থিতিতে গতকাল বুধবার যৌথ সভা করেছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, আমরা তার (খালেদা জিয়া) মুক্তির জন্য আইনের সবগুলো বিষয়ে চেষ্টা করেছি, এখনো করে যাচ্ছি। আমরা তো সব সময় দাবি জানাচ্ছি, আপনাদের (গণমাধ্যম) মাধ্যমেও জানাচ্ছি, আমরা হোম মিনিস্টারের সঙ্গে কথা বলেছি, পার্লামেন্টেও জানানো হয়েছে। এখন পুরো বিষয়টাই সরকারের হাতে। দ্য বল ইজ ইন দেয়ার কোট।

দলের নীতি নির্ধারণী ও সম্পাদক পর্যায়ের একাধিক নেতা এ প্রতিবেদককে বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য তার পরিবারের তরফ থেকে আবেদন করা হয়েছে। ম্যাডামের (খালেদা) শারীরিক সংকটাপন্ন অবস্থা চলছে দীর্ঘদিন ধরে; কিন্তু আমরা তার জন্য এমন আন্দোলন গড়ে তুলতে পারিনি বা নেতারা জেলে যাওয়ার মতো সাহস দেখাতে পারিনি। রাজনৈতিক সমঝোতাও করতে পারিনি। এটা আমাদের দৈন্য অস্বীকার করা যাবে না। তাদের মতে, খালেদা জিয়ার মুক্তি বিএনপির দ্বারা সম্ভব না, মুক্তি হলে পরিবারের মাধ্যমেই হবে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১২৯ বার

Share Button

Calendar

April 2020
S M T W T F S
« Mar    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930