» গান্ধীজীর শহরে

প্রকাশিত: ২০. জানুয়ারি. ২০১৮ | শনিবার

আনোয়ার চৌধুরী

সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নেমেই যেন হাঁফ   ছেড়ে বাঁচলাম। দিল্লীর হাড় কাঁপানো  শীতের কারণে  গেল কয়েকটি দিন কী কষ্টেই না কাটালাম। এখানকার আবহাওয়া বাংলাদেশের চেয়েও ভালো মনে হলো। প্লেন থেকে নামার সময়ই পাইলট ঘোষনা দিয়েছিল আহমেদাবাদের তাপমাত্রা ২৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস। শুনেই পুলকিত হই আমরা। দিল্লীর তাপমাত্রা ৭ থেকে ৮ ডিগ্রীতে উঠানামা করছিল গত কয়েকদিন যাবৎ। এখানে দিল্লী ও আহমেদাবাদ শহর ভ্রমণের শানে নযুল একটু বলে নেয়া দরকার। ঢাকা শহর ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান যানজট নিরশন ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের উদ্যোগে গাজীপুর থেকে হযরত শাহজালাল(র:) আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইঁং জধঢ়রফ ঞৎধহংরঃ( ইজঞ) নির্মাণের প্রকল্প গ্রহন করা হয়েছে। প্রকল্পের কাজ অনেকটা প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে। ভারতের কয়েকটি শহর ইজঞ ঝুংঃবস চালুকরণে বেশ সফলতা দেখিয়েছে। তন্মধ্যে আহমেদাবাদ বিআরটি শুধু ভারতেই নয়,সমগ্র এশিয়ার মধ্যে একটি সফল উদ্যোগ ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার পথিকৃত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে । ওদের প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা সরজমিনে দেখা এবং অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্যই আমাদের দিল্লী ও আহমেদাবাদে সফর। সফরের শুরু দিল্লী থেকে। ৫ সদস্য বিশিষ্ট টিমের দলপতি হলেন প্রকল্প পরিচালক জনাব আফিল উদ্দিন সাহেব । আমি মন্ত্রনালয়ের প্রতিনিধি। আমরা ৪ দিন দিল্লীতে কাটিয়ে জানুয়ারী মাসের শেষ সপ্তাহে হাজির হই আহমেদাবাদ শহরে। দিল্লীর তীব্র শীতে কাবু হয়ে মেজাজ অনেকটা তিরিক্ষি হয়ে গিয়েছিল সকলের।
ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বেশ ফুরফুরে মেজাজে লাগেজ সংগ্রহের জন্য বেল্টের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ বিপত্তি দেখা দিলো। সহকর্মী কালাম সাহেব অন্য যাত্রীর ট্রলীর সাথে ধাক্কা খেয়ে একেবারে মাটিতে পরে গেলেন। তিনি মাথায় আঘাত পান। ক্ষনিকের জন্য মনটা খারাপ হয়ে গেল। অনেকেই সহানুভ’তি দেখালো, ঠান্ডা পানি ঢালা হলো। কিছুক্ষণ পর তিনি চোট সামলে নিলেন। আসলে কারো দোষ ছিলনা। কিছুটা অন্যমনস্কতা ও কিছুটা ব্যস্ততার কারনে এমনটি হয়েছে। যা হোক এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে হোটেলের পক্ষ থেকে যার আসার কথা ছিল তাকে খুঁজতে গেলাম । কিন্তু তার কোন হদিশ পাওয়া গেলনা। ফিরে আসি এয়ারপোর্টের ভিতর। অগত্যা কালাম সাহেবই ভরসা। তার কাছে ইন্ডিয়ান মোবাইল সীম ছিল। গত কয়েকদিন যাবৎ দেশে পরিবারের সাথে তার সেল ফোন দিয়েই যোগাযোগ রক্ষা করছি সকলে। তিনি ফোন করলে অভ্যর্থনাকারী জানায় সে বেশ খানিকটা দূরে গাড়ী নিয়ে অপেক্ষা করছে। আমরা বের হলেই সে এগিয়ে আসবে। এক পর্যায়ে পাওয়া গেল তাকে। নাম ইমরান শেখ । গুজরাটী মুসলিম। ছিপছিপে লম্বা একহাড়া গড়নের তরুন ইমরান কথা বলে গুজরাটী, হিন্দী, উর্দু ও ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে। নিজের মাতৃভাষা গুজরাটি । পর্যটকদের সাথে হর হামেশা চলাফেরার কারনেই হয়তো চলনসই ইংরেজী ভাষাও জানে। ইতিপূর্বে বাঙ্গাল মুলুকের অনেক পর্যটক তার গাড়ীতে উঠেছে বলে জানালো। শুনালো এয়াারপোর্টের অনেক নিয়ম কানুন ও কড়াকড়ির কথা। গাড়ী নিয়ে কাছে আসতে দেয়না। তবে আমাদের কাছে কড়াকড়িটা ভালো মনে হয়েছে। কড়াকড়ির দরুন এয়ারপোর্টের সামনে গাড়ীর কোন ভিড় নেই। যাত্রীরা স্বাচ্ছন্দে বের হতে পারে।একটি সুশঙ্খল পরিবেশ বিরাজ করছে।
এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ী একটু সামনে যেতেই কালো পথরে নির্মিত একটি বিশালাকৃতির মূর্তি দেখতে পাই ।রাস্তার গোল চত্তরে একটি উঁচু বেদীর উপর পাথুরে মূর্তিটি স্থাপন করা হয়েছে। ভেবেছিলাম গান্ধীজীর ভাস্কর্য হবে। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখলাম গান্ধীজীর নয়, ওটি সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেলের মূর্তি। প্যাটেল ভারতের অন্যতম স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি¿। সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে ভারত ভাগের অন্যতম কুশীলব। শুধু তাই নয় বাঙলা ও পাঞ্জাব ভাগ করারও মূল কারিগর ছিলেন তিনি । গান্ধীজীর ন্যায় তিনিও গুজরাটী। ভারতবাসীর নিকট তিনি নমস্য। ভারতের লৌহমানব। তবে সাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারনে এবং দেশ ভাগের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি থাকালে মুসলিম বিরোধী ভয়াবহ দাঙ্গায় ইন্ধন যোগানো এবং সর্বোপরি গান্ধীজীর হত্যাকান্ডে বিচলিত না হওয়ায় ইতিহাসে নিন্দিত হয়েছেন যথেষ্ট মাত্রায়।
গাড়ী এগিয়ে চলে আহমেদাবাদ শহরের বিভিন্ন রাস্তা ধরে। কী সুন্দর শহর! রাস্তার দুধারে সবুজ গাছপালা। যেন সবুজের মেলা। রাস্তা খুব সুপরিসর না হলেও অত্যন্ত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। কোথাও ময়লা আবর্জনা নেই। ট্রাফিক জ্যাম নেই বললেই চলে। সকলেই আইন মেনে চলে। চালকদের মধ্যে ওভারটেক করার প্রবনতা নেই। নেই তেমন কোলাহল। শান্ত ¯িœগ্ধ শহর। প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে যাওয়ার মতো শহর এটি। কিভাবে এমন সুন্দর শহর তৈরী হলো ? কিভাবে এমন পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা হচ্ছে ? ইমরান জানায় এ কৃতিত্ব মোদীজীর। নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদী । একাধিক্রমে তিন বার গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রি হয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। গুজরাটে অভাবনীয় উন্নতি করে ভারত জুড়ে পরিচিতি পেয়েছেন। উন্নয়নের ‘গুজরাট মডেল’ উপস্থাপন করেছেন। তিনি নিজেও উন্নয়নের ‘রুল মডেল’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন । উন্নয়ন ও সুশাসন উপহার দেয়ায় আজ তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রি থেকে ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রি। বর্তমানে তিনি এশিয়ার সবচেয়ে আলোচিত রাষ্ট্রনায়কদের অন্যতম। এ শহর থেকেই তিনি ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ইলেকশনে লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। তবে নানা কারনে তিনি একই সাথে নন্দিত এবং নিন্দিত। মোদীজী কেমন লোক এ প্রশ্নের জবাবে ইমরান শেখ খানিকটা নীরব খানিকটা দ্বিধাগ্রস্থ। আমরা অভয় দিলে সে যা বললো তার সারমর্ম হলো মোদী গুজরাট রাজ্যের ব্যাপক উন্নতি করেছেন এ কথা সত্য। অফিস আদালতে দুনীর্তি হ্রাস করেছেন ব্যাপকভাবে। মোদী নিজেও দুর্নীতি থেকে মুক্ত। রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা যথেষ্ট ভালো। আহমেদাবাদ শহরে গভীর রাতেও নিরাপদে চলাফেরা করা যায়। চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই রাহাজানী ভারতের অন্য যে কোন শহরের তুলনায় কম । গরিবী হঠাতেও নানা কর্মসূচী গ্রহন করেছেন। গুজরাটের মানুষ তার সুফল ভোগ করছে। তবে সমস্যা হলো সংখ্যালঘু মুসলমানদের প্রতি তার কোন দরদ নেই। ওদের উন্নয়নে তার কোন আগ্রহ নেই। মুসলামনরা এখনো ২০০২ সনে সংঘঠিত ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা ভুলতে পারছেনা। সে দাঙ্গায় কয়েক হাজার মুসলমান প্রান হারিয়েছে। তাদের ঘর বাড়ী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সহায় সম্পদ পুড়িয়ে দিয়েছে নতুবা লুঠপাট করে নিয়ে গিয়েছে। অনেক নারী সম্ভ্রম হারিয়েছে দাঙ্গাবাজদের হাতে। দাঙ্গকারীদের রোধ করতে প্রশাসন কোন ইতিবাচক ভ’মিকা পালন করেনি। ক্ষেত্র বিশেষে দাঙ্গাবাজদের পক্ষ নিয়েছে। রাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায় আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। দাঙ্গা তাদের আর্থিক মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিয়েছে। তাদের অবস্থা দিন দিন কাহিল হচ্ছে। সরকারী-বেসরকারী চাকুরী বাকরীতে তাদের নেয়া হয়না। তাদের ক্ষেত্রে এক অলিখিত বাধা নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এভাবে চললে গুজরাট রাজ্যে মুসলমানদের কোন ভবিষ্যৎ থাকবেনা। দাঙ্গার সময় মোদীজী ছিলেন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রি। দাঙ্গা রোধে তার কোন আন্তরিক প্রচেষ্ঠা ছিল একথা মুসলমান সম্প্রদায় বিশ্বাস করেনা। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রি হিসেবে তিনি এর দায় এড়াতে পারেননা। আমরা বলি আদালত তো তাঁকে নির্দোষ ঘোষনা করেছে। ইমরান উত্তরে বলে সাহেব দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য কোন আদালত নেই, আদালত শুধু ক্ষমতাবানদের জন্য । আমরা বুঝতে পারি সে কিছুটা আবেগ প্রবন হয়ে গিয়েছে। পরে জানতে পারি তার পরিবারের এক সদস্য দাঙ্গায় প্রান হারিয়েছিল।
প্রায় আধা ঘন্টা পর পার্কার লর্ডস হাটেলের লবীতে পৌছে দিল ইমরান শেখ। রিসিপশনে বসতেই এক অনাবিল প্রশান্তি পেলাম। গত কয়েকদিনের দিল্লীবাস আমাদের হাঁপিয়ে তুলেছিল। মার্কিন রাজ ওবামা এবং দিল্লীরাজ ‘নটরিয়াসলী বেড ওয়েদার’ এই দুয়ে মিলে আমাদেরকে অতিষ্ঠ করে তুলে। রিসিপশনের তরুণ কর্মকর্তার নিকট ট্রাভেল ডকুমেন্টস জমা দিয়ে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে রুমের চাবি হাতে নিই। রিসিপশন রুম থেকে বের হওয়ার সময় তরুণটির বুকে সাটানো নেম ব্যজে সত্যজিৎ নামটি দেখে কেন জানি মনে হলো বাঙ্গালী হতে পারে। জিজ্ঞেস করতেই এক গাল হেসে বলল ‘বাঙ্গালী নই তবে কাছাকাছি’। এ আবার কেমন কথা! কোথায়? বললো ‘নিবাস গৌহাটি ,আসাম’। আরে এ যে দেখছি ‘দেশের ভাই শুকুর মোহাম্মদ’। সত্যজিৎ বড়–য়াকে বললাম আমার বাড়ী বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে । তুমি কি সিলেট সম্পর্কে জানো? সে হেসে বললো সে তার বাবার কাছে ‘শিলেট’ এর অনেক গল্প শুনেছে। একসময় সিলেট আসামের অংশ ছিলো সেটাও সে জানে। জিজ্ঞেস করলাম বাঙলা বুঝতে পারে কিনা । বললো বলতেও পারে বুঝতেও পারে। তারপর থেকে দেখা হলেই তার সাথে বাঙলাতেই কথা বলেছি। তার অসমীয়া টানে বাঙলা বলার ধরনটি ছিল বেশ উপভোগ্য। আলাদা একটি খাতির যতেœর সম্পর্ক গড়ে উঠে তার সাথে। সত্যজিৎ বড়–য়া গৌহাটি ইউনিভার্সিটির ট্যুরীজম এন্ড হোটেল ম্যানেজমেন্ট ডির্পাটমেন্টের গ্র্যাজুয়েট। পার্কার লর্ডস হোটেলে চাকুরী নিয়েছে বেশ কয়েক বছর হলো। সারা ভারতের বড় বড় শহরে এ হোটেলের শাখা রয়েছে। সে বেঙ্গালোর শাখায় কাজ করেছে বেশ ক’বছর। বছর দুয়েক হলো এ শাখায় বদলী হয়ে এসেছে। পরবর্তী দুদিন তাঁর সাথে অনেকবার আলাপ হয়েছে। তার আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়েছি। ভালো লেগেছে সত্যজিতের সহকারী হিমাচল প্রদেশের তরুণ মিন্টু ছইলার হাসিমাখা নিস্পাপ মুখ।
হোটেল কক্ষে প্রবেশ করে প্রশান্তির মাত্রা আরেক ডিগ্রী বেড়ে গেলো। সুপরিসর সাজানো ডাবল বেডের কক্ষে বসবাস করবো একাই। আহ কি মজা! দিল্লীর ক্যারল বাগের হোটেলের তুলনায় এর সুযোগ সুবিধা অনেক বেশী। প্রশস্ত ব্যালকনিতে দাঁিড়য়ে গোটা আহমেদাবাদের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। তবে ক্ষনিক পরে কিছুটা কষ্ট এসে জমা হলো আমার ও দলপতি আফিল উদ্দীন সাহেবের মনের কোণে। আমরা দুজনেই নিজেদের গিন্নীকে সঙ্গী করার পায়তারা করেছিলাম। কিন্তু ভারতের ভিসা পাওয়া আর সোনার হরিণ পাওয়া একই কথা । অনেক চেষ্ঠা করেও গিন্নীর ভিসা সংগ্রহ করা যায়নি। দেশ থেকে আসার সময় তার বেদনা বিধুর মুখ দেখে এসেছি। হোটেলে এমন সুবন্দোবস্ত দেখে আগের ব্যথাটা আবারও চিনচিন করে উঠলো। যাকগে ওসব কথা। সবার একই পরামর্শ, একই অভিমত, ভালো শপিং করলে গিন্নীদের মনের ব্যথা এমনিতেই দূর হয়ে যাবে।
সামান্য বিশ্রাম নিয়ে লাঞ্চে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। রিসিপশন থেকে জানানো হলো লাঞ্চ রুমেই পাঠিয়ে দিচ্ছে । আমরা সকলে ভ্রমণের সমন্বয়কারী আনিসের রুমেই একসাথে লাঞ্চ সেরে নিলাম। হোটেলটি সম্পূর্ণরপে ভেজ। এমনকি ডিমেরও কোন ব্যবস্থা নেই। ‘চাউলা’র সাথে নানা রকম সবজী ও ডাল দিলো। দিল্লী এবং আহমদাবাদ দুজাগাতেই ভাতকে ‘চাউলা’ বলে। তবে যে চাউলা দিলো তা আসলে আমাদের দেশের লেটকা খিচুরী ধরনের । অনেক ভেজ আইটেম ছিল। কিন্তু তেমন স্বাদ পাইনি। তবে সাদা টক দই খুব ভালো লাগে। পরে জানা গেলো ওটা মহিষের দুধে তৈরী দই। বাকী দিনগুলিতেও দই খাওয়ার সুযোগ হয়েছিল বার বার । এখানে টক দইয়ের ব্যাপক প্রচলন। রাস্তায় বের হয়ে এর কারন বুঝতে পারি। সারা শহরেই গরু মহিষের অবাধ বিচরণ/ চলাচল। রাস্তার এপার থেকে ওপারে যাচ্ছে নির্বিঘেœ। ওদের কোন ভয় নেই,তাড়া নেই। কোথাও দল বেধে বাচ্চা কাচ্চাসহ রাস্তার পাশে শুয়ে অলসভাবে যাবর কাটছে। অধিকাংশই দুধেল গাভী/মহিষ। অধিক হারে গরু মহিষ পালন করায় দুধ উৎপাদনের পরিমানও অনেক বেশী। জানা গেলো ভারতের সবচেয়ে বেশী দুধ উৎপাদন হয় এ রাজ্যে। গ্রামে নাকি অনেক গিরস্থ দুধ বিক্রি করেনা। বিনে পয়সায় গরীব প্রতিবেশীকে দান করে দেয়। বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গো-হত্যা নিষিদ্ধ। মোদীর শহরে এ বিষয়ে বেশ কড়াকড়ি। গো-মাতাকে দেবতা জ্ঞানে পুজা করা হয়। দেখা হয় অত্যন্ত সন্মানের সাথে। ফলে তারা নিরাপদে বসবাস করছে আহমেদাবাদ শহরে। কেউ তাদের গলায় ছুরি চালাবেনা এ বিষয়ে তারা নিশ্চিত। সকলেই নিরাপদ আশ্রয় প্রত্যাশা করে-সেটা অবুঝ প্রাণীর ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে পশুর জীবন রক্ষায় যারা যতটা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের জীবন বাঁচাতে অনেক ক্ষেত্রেই ওরাই আবার ততটাই নিস্পৃহ !
অফিসিয়েল কর্মসূচি না থাকায় পুরো দিনটি কয়েকটি দর্শণীয় স্থানে এবং বিভিন্ন শপিং মলে ঘুরা ফেরা করে কাটিয়ে দিই। কিছুটা সময় কাটালাম কেনাকাটা করে। বিগবাজার কিংবা বড় শপিং মলে শপিং করা বেশ উপভোগ্য হয়েছে। প্রজাতন্ত্র দিবস উপল্েক্ষ্য বড় বড় শপিং মলে ‘সেল উৎসব’ চলছে সারা ভারত জুড়ে। অনেক পণ্যের দাম এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত হ্রাস করা হয়েছে। ফলে শপিং সেন্টারগুলিতে দেশী-বিদেশী ক্রেতারা অসম্ভব ভিড় জমায়। ভালো লাগে ব্যবসায়ীদের এমন উদার মনোভাব দেখে। অথচ আমাদের দেশে উৎসব/পার্বনে পণ্য সামগ্রীর দাম বাড়ানো হয় প্রতিযোগিতা করে।
রাতে পার্কার হোটেলে ডিনারের স্বাদ ছিল চমৎকার। আমিষের কোন বালাই নেই। আলু,পটল,সীম, চিচিংগা, বরবটি, বেগুন, শসা, টমেটো,ফুলকপি,বাধাঁ কপি,মুলা,গাজর,শালগম ইত্যাদি দিয়ে তৈরী হরেক রকম রেসিপির স্বাদ সত্যিই তৃপ্তিদায়ক। আর সকল খাবারের সাথে দই, রাইতা, মাখন, পনির, ফ্রুটস ও ভেজিটেবল সালাদতো ছিলই। দিল্লীর খাবারের তুলনায় এখানকার খাবার অনেক সুস্বাদু। দিল্লীতে ভেজিটেবল মানে একগাদা মসলার কুন্ডলী। শুধু আলু দিয়েই অনেক পদ তৈরী করেছে এরা। পরের দিন আমরা অফিসিয়াল কর্মসূচি শেষে দুপুরের খাবার খাই বাইরের একটা রেষ্টুরেন্টে। সহকর্মী হেলাল উদ্দিন নাগরী সাহেব গাড়োয়ান- কাম গাইড ইমরান শেখকে বলে রেখেছিল কোন মুসলিম রেস্তোরা পেলে যেন সেখানে নিয়ে যায়। এদিক সেদিক ঘুরিয়ে সে একটি ব্যস্ত জায়গায় গাড়ী থামায় । জায়গাটি আহমেদাবাদ শহরের পুরানো অংশে মুসলিম অধ্য্যুষিত এলাকা। সামনেই রুপালী হোটেল এন্ড রেষ্টুরেন্ট। নাম দেখে বাঙ্গালী রেষ্টুরেন্ট মনে হলো। অনেকটা ঢাকা শহরের গুলিস্তানের রেষ্টুরেন্টের মতো। আকারে তেমন বড় নয়। কিন্তু খুব ভিড় । বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর বসার সুযোগ পাই। একজন ওয়েটারকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি হোটেল মালিকের বাড়ী বিহারের পুর্নিয়া জেলায়। কর্মচারীদের অধিকাংশই সেখানকার । তবে গুজরাটিও আছে। আমরা তৃপ্তিসহকারে ভাত মাছ এমনকি গরুর মাংস দিয়ে খাবার সারি। গরুর মাংস কিভাবে পেলে ওয়েটারকে জিজ্ঞেস করলে জানায় মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় পুলিশকে নজরানা দিয়ে মাঝে মধ্যেই গরু জবাই করা হয়। তবে খুব চুপিসারে করতে হয়। ধরা পড়লে রক্ষা নেই। ১০ বছরের কারাদন্ড এবং এক লক্ষ রুপি জরিমানা। কিন্তু গরুর মাংসের চাহিদা থাকায় এবং লাভজনক হওয়ায় ঝুঁকি নিয়েও অনেকেই একাজটি মাঝে মধ্যেই করেন। আমাদের সাথে লাঞ্চে অংশ নেয়া গাড়োয়ান ইমরান অবশ্য দ্বিমত পোষন করে। সে বলে গরুর মাংস বলে যা খেয়েছেন আসলে তা মহিষের গোশত। এরা সুযোগ পেলেই মহিষের গোশতকে গরুর গোশত বলে চালিয়ে দেয়। জানিনা কোনটা সত্য। বিল দিতে গিয়ে অবাক হই। আমাদের ধারনার চেয়ে অনেক কম! অথচ দিল্লীতে খাবারের দাম আকাশ চুম্বী। তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে হোটেল থেকে বের হই।
আমরা আহমেদাবাদ বিআরটি’র(অযসবফধনধফ ইঁং জধঢ়রফ ঞৎধহংরঃ) সার্বিক অবস্থা জানার জন্য পূর্ব নির্ধারিত সময়ে আহমেদাবাদ মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন অফিসে পৌছাঁই । আহমদাবাদ বিআরটি’র অফিস সেখানেই । বিআরটি’র কর্মকর্তাগন স্বাগত জানায় । কনফারেন্স রুমে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে আহমেদাবাদ বিআরটি’র পুরো বিষয়টি তুলে ধরেন সংস্থার ২য় কর্তা ব্যাক্তি অখিল চন্দ্র ভাট। প্রধান কর্তাটি দেশের বাইরে থাকায় তিনিই উপস্থাপন করেন। তারপর অপারেশন ও কন্ট্রোল রুমে নিয়ে হাতে কলমে দেখিয়েছেন কিভাবে বিআরটি পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রন করা হয়। প্রকল্পের উবঃধরষবফ উবংরমহ করেছে আহমেদাবাদেও ঈঊচঞ ইউনির্ভসিটি। উপস্থাপনা শেষে হালকা আপ্যায়ন। দিল্লীর তুলনায় আহমেদাবাদ বেশী অতিথিপরায়ন বলে মনে হয়েছে।
অযসবফধনধফ ইঁং জধঢ়রফ ঞৎধহংরঃ এর নাম ঔধহগধৎম । ‘জানমাগর্’ অর্থ জনগনের পথ(চবড়ঢ়ষবং ধিু)। নামটি দিয়েছেন স্বয়ং নরেন্দ্র মোদী। ২০০৯ সনে তিনি ‘জানমাগর্’ উদ্বোধন করেন। আহমেদাবাদ বিআরটি পরিচালনার দায়িত্ব আহমেদাবাদ জনমার্গ লিমিটেড(অযসবফধনধফ ঔধহ গধৎম খঃফ.) নামক একটি কোম্পানীর উপর। কোম্পানীটির মালিকানা আহমেদাবাদ মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের । এটি ভারতের সবচেয়ে সফল উদ্যোগ । শুধু ভারতের বিভিন্ন শহরই নয় পৃথিবীর অনেক দেশ জনমার্গের সাফল্য জানার জন্য আহমেদাবাদ সফর করেন। চেন্নাই,বেঙ্গালুর,মোম্বাই এবং ভুবেনশ্বর বিআরটি ঔধহগধৎম কে অনুসরণ করেই নির্মিত ও পরিচালিত হচ্ছে। আমরাও অনুরুপ উদ্দেশ্যেই সেখানে যাই। আমাদের যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের উদ্যোগে গাজীপুর থেকে হযরত শাহজালাল(র:) আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার এলাকায় ইঁং জধঢ়রফ ঞৎধহংরঃ নির্মাণের প্রকল্প গ্রহন করা হয়েছে। অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্যই আমাদেও দিল্লী ও আহমেদাবাদ সফর। ১০৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট সড়কে ১৩টি রুট ও ১৩১টি ষ্টেশন রয়েছে। ইজঞ প্রতিদিন প্রায় ১লক্ষ ৫০ হাজার যাত্রী পরিবহন করে। জনগনের চলাচল স্বাচ্ছন্দময় ও যানজট হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ফলে জাতিসংঘসহ দেশে-বিদেশে অনেক সরকার এবং সংস্থা কর্তৃক পুরুস্কৃত হয়েছে। তবে উদ্যোগটির পেছনে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা কাজ করছে। আহমেদাবাদ শহরটি দ্রুত বর্ধনশীল। আয়তনের সাথে জনসংখ্যাও বৃদ্দি পাচ্ছে পাল্লা দিয়ে ।বর্তমান লোক সংখ্যা ৬০ লক্ষ যা ১ কোটি ১০ লক্ষে দাঁড়াবে ২০৩৫ সনে। এই ক্রমবর্ধমান শহরের অধিবাসীদের স্বাচ্ছন্দে চলাফেরা করার জন্য একটি সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা গ্রহন করে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন গুজরাট সরবকার। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদ প্রফেসর শিবানন্দ স্বামী’র নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ টিমের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ও পরিকল্পনায় পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে । তিনি আহমদাবাদের ঈঊচঞ ইউনির্ভসিটি এর নামকরা শিক্ষক। এখন একই বিশ^বিদ্যালয়ের প্রফেসর চিন্তন দফতরদার কারিগরী উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের পূর্বে এর আর্থ সামাজিক, পরিবেশগত ও কারিগরী দিক নিয়ে ব্যাপক গবেষনা করা হয়েছে। করা হয়েছে ষ্টেকহোল্ডার এনালাইসিস। গ্রহনযোগ্য ও জনপ্রিয় করার জন্য দুই মাস যাত্রীদেরকে বিনে পয়সায় বাসে চড়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে। আর মুখ্যমন্ত্রি মোদীর মত একজন ভিশনারী লিডারের সুনেতৃত্ব তো ছিলই এর পেছনে। ফলে প্রকল্পটি সাফল্য পায় ষোল আনা। একবার মোদীজী প্রটোকল না নিয়ে বিআরটি বাসে চড়ে দীর্ঘ পথ পরিভ্রমণ করেন বাস্তব অবস্থা দেখার জন্য।
বিআরটি অফিসের কাজ শেষ করে ঢুকি আহমেদাবাদ মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন অফিসে। অগঈ একটি শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ইউনিট। বেশ পুরোনো । ১৮৫৮ সনে এর যাত্রা শুরু হয় পৌরসভা হিসেবে । ১৯৫০ সনে সিটি কর্পোরেশনের মর্যাদা পায়। ৬২টি ওয়ার্ডে বিভক্ত কর্পোরেশনে ১৮৬ জন কমিশনার নির্বাচিত হন। তবে এক তৃতীয়াংশ সিট মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকে। নির্বাচিত ওয়ার্ড কমিশনারগন তাদের মধ্য থেকে একজনকে মেয়র নির্বাচিত করেন। আমাদের দেশের মতো ভোটারদের সরাসরি ভোটে মেয়র নির্বাচনের ব্যবস্থা নেই। ৫ বছরের জন্য তারা নির্বাচিত হন। গত ২০১০ সনের নির্বাচনে বিজেপি ১৪৮ আসন পেয়ে বিজয়ী হয় এবং কংগ্রেস ৩৬ আসন পেয়ে বিরোধী দলের আসন গ্রহন করে। এখানকার কর্পোরেশনে আছে সরকার দলীয় নেতা, বিরোধী দলীয় নেতা ও উপনেতার পদ। বলা বাহুল্য পুরো নির্বাচনটি হয় রাজনৈতিক দলের অংশ গ্রহনের ভিত্তিতে। নির্দলীয় কোন ভাবনা নেই। বর্তমান মেয়র একজন মহিলা। নাম মিনাক্ষ্মী বেন প্যাটেল। বিজেপির নেত্রী এবং উচ্চ বর্ণের লোক। ডিপুটী মেয়র বিপিন সিক্ষা। তিনিও বিজেপি’র তবে দলিত সম্প্রদায়ের। বিরোধী দলের নেতা হলেন কংগ্রেসের বদরুদ্দীন শেখ। গুজরাট এলাকায় পুরুষদের নামের সাথে ‘ভাই’ এবং মহিলাদের নামের সাথে ‘বেন’(বোন) যোগ করার প্রথা দীর্ঘদিনের । যেমন সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল । আনন্দি বেন প্যাটেল ইত্যাদি। মিনাক্ষ্মী বিজেপির স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী নেত্রী এবং নরেন্দ্র মোদীর ঘনিষ্টজন। তবে এখানে মেয়রের ক্ষমতা খুব সীমিত। তার পদটি অনেকটা আনুষ্ঠানিক। সংসদীয় সরকারের রাষ্ট্রপতির মতো। সকল ক্ষমতা চর্চার মালিক মোক্তার হলেন মিউনিসিপ্যাল কমিশনার যিনি ইন্ডিয়ান এ্যাডমিনিষ্ট্রেটিভ সার্ভিসের একজন মধ্যম সারির কর্মকর্তা। তিনিই প্রধান নির্বাহী। তিনি রাজ্য সরকার কর্তৃক নিয়োগ পান। বর্তমান মিউনিসিপ্যাল কমিশনার হলেন মিস. ডি. থারা আইএএস। তিনি একজন মহিলা কর্মকর্তা। তার পূর্বে অন্য কোন মহিলা এ পদে আসীন হননি। ৪৩ বছর বয়সী থারা ইন্ডিয়ান এ্যাডমিনিষ্ট্রেটিভ সার্ভিসের একজন চৌকস অফিসার হিসেবে সুপরিচিত। এখনো বিয়ের পিড়িতে বসেননি। মিউনিসিপ্যাল প্রশাসনে তিনি একজন অভিজ্ঞ ও ডাকসাইটে কর্মকর্তা হিসেবে ইতিমধ্যে সুনাম কুড়িয়েছেন। ইতিপূর্বে এখানেই ডিপুটী মিউনিসিপ্যাল কমিশনার হিসেবে কাজ করেছেন দু বছর। কাজ করেছেন রাজকোট মিউনিসিপ্যাল কমিশনার হিসেবে বেশ কয়েক বছর। তবে তিনি কিছুটা জুনিয়র হয়েও মুখ্যমন্ত্রি আনন্দিবেন প্যাটেলের পছন্দে এমন উচ্চ পদ লাভ করেছেন । আনন্দিবেনও গুজরাটের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রি। মোদীর পছন্দে তিনি মোদীর ছেড়ে দেয়া জায়গায় বসেছেন। গুজরাটে সকল গুরুত্বপূর্ণ পদে মহিলাদের জয় জয়কার! তাদের ক্ষমতায়ন হয়েছে যথেষ্ট মাত্রায় একথা নির্র্দ্বিধায় বলা যায়। প্রফেসর চিন্তন হাসতে হাসতে বলেন অনেকটা যেন নারীস্থান! আমি বলি এ ক্ষেত্রে আমরা আপনাদের তুলনায় ঢের এগিয়ে আছি। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রি ও বিরোধী দলীয় নেত্রী মহিলা।
আহমেদাবাদ মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের কাজের পরিধি অনেকটা আমাদের ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মতই। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ওরা আমাদের চেয়ে এগিয়ে আছে। যেমন শহরের প্রাথমিক শিক্ষা এবং গণপরিবহন ব্যবস্থা সম্পূর্ন রুপে মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রনাধীন যা আমাদের এখানে নেই। এগুলির পরিচালনায় সাফল্য দেখিয়েছে এএমসি। কর্পোরেশন অফিসটি ওসমানপুর এলাকায় ডঃ রমনভাই প্যাটেল ভবনে অবস্থিত।
মিউনিসিপ্যাল অফিস থেকে বের হয়ে যাই একটি বিআরটি ষ্টেশনে। সেখানে অযসবফধনধফ ঔধহ গধৎম খঃফ এর কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে বিআরটি বাসে চড়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার ভ্রমণ করি। আসলেই আরামদায়ক ভ্রমণ। প্রতি ৫ মিনিট পর পর বাস এসে থামে। যাত্রীরা স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে টিকেট সংগ্রহ করে লাইন ধরে বাসে উঠে গন্তব্য স্থানে পৌছে যায়। বাসে কোন সুপারভাইজার /কন্ডাক্টারের প্রয়োজন পড়েনা। ষ্টেশনে কিংবা বাসে কোন হৈ চৈ নেই। সবকিছুই স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলছে। তবে বিআরটি সড়কটি ডেডিকেটেড লেন। ইন্টার সেকশনগুলোতে ট্রাফিক পুলিশের সাথে বিআরটি’র নিজস্ব নিরাপত্তা কর্মীরাও কাজ করে। আমাদেরকে বুঝানোর জন্য কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা ছিলো ষোল আনা। তারপর পুরোনো শহরে বিআরটি ডিপোতে বাস মেরামত, সংরক্ষণ ও পরিচ্ছন্নকরণ কার্যক্রম পরিদর্শণ করি। সেখানেও তাদের উন্নত ব্যবস্থাপনা দেখতে পাই।
আহমেদাবাদের রাস্তায় প্রচুর ভেসপা চলতে দেখা যায়। বিভিন্ন পার্কিং প্লেসে শত শত মোটর বাইক দেখতে পাই। আরোহীদের ৮০% নারী বিশেষত তরুনী। তারা শালিন পোষাক এবং মাথায় স্কার্প পরিধান করে বেশ দ্রুত গতিতে ভেসপা চালায়। অনেক সময় দেখা যায় চালকের আসনে মহিলা আর পেছনে সঙ্গী পুরুষ বসে আছে। শালিন পোষাকধারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মুসলিম বলে জানা যায় । তবে অন্য ধর্মের মহিলারাও শালীন পোষাক বিশেষতঃ মাথায় স্কার্ফ পড়ে কারন গরম এবং তীব্র বাতাস। গাড়ী চালনায় মেয়েদের পারদর্শিতা এবং ব্যাপক সংখ্যায় অংশ গ্রহন নারী উন্নয়নের প্রমান বলে মনে হয়।
আহমেদাবাদ শহরটি বেশ পুরানো এবং ঐতিহ্যবাহী। খৃষ্টীয় ১১ শতকে এখানে নগর জীবনের শুরু। তখন এলাকাটি আশাওয়াল বা আশাপল্লী নামে পরিচিত ছিল। সোলাঙ্কি শাসক রাজা ১ম কর্ণদেব আশাওয়ালের ভীল রাজাকে যুদ্ধে পরাজিত করে সবরমতি নদীর তীরে কর্ণাভাতি নামে একটি শহর প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতাপশালী রাজা বাদশাহদের আমলে নিজ নামে শহর বা রাজ্য প্রতিষ্ঠার রেওয়াজ তখন বেশ প্রচলিত ছিল। ত্রয়োদশ শতকে ভেগলা রাজবংশের নিকট সোলাঙ্কি রাজের পতন হয়। তারপর ১৪শ শতকে গুজরাট এলাকা দিল্লী সালতানাতের অধীনে চলে আসে। পঞ্চদশ শতাব্দীর ১ম দিকে গুজরাটের গভর্ণর জাফর খান মোজাফ্ফর দিল্লী শাহীর কর্তৃত্ব অস্বীকার করে মোজাফ্ফর শাহ ১ম নাম ধারন করে নিজেকে গুজরাটের সুলতান হিসেবে ঘোষনা করেন। তিনি মোজাফ্ফরীয় রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। তার পৌত্র সুলতান আহমদ শাহ ১৪১১ খৃষ্টাব্দে কর্ণবতি শহরের সন্নিকটে সবরমতি নদীর তীরে প্রাচীর বেষ্টিত নতুন শহরের গোড়া পত্তন করেন এবং সেটিকে রাজধানী হিসেবে ঘোষনা করেন। তখন সে অঞ্চলে আহমদ নামে একজন কামেল পীর বা ধর্মপ্রচারক বাস করতেন। তিনি ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয়। সুলতান তাঁর নামে শহরের নামকরণ করেন ‘আহমদাবাদ’ যা বর্তমানে আহমেদাবাদ নামে পরিচিত। তবে আমরা লক্ষ্য করছি সেখানকার অনেক সরকারী কর্মকর্তা এবং জনগন উচ্চারণ করেন ‘এমদাবাদ’ হিসেবে। ১৪৮৭ সনে আহমদ শাহ এর নাতি সুলতান মাহমুদ বেগ শহরের চারদিকে ১২ দরওয়াজা বিশিষ্ট ১০ কিলোমিটার ব্যাপী একটি উচুঁ বৃত্তাকার দেওয়াল নির্মাণ করেন। দেওয়াল বা প্রাচীর নির্মাণ করে শত্রুর আক্রমন থেকে শহরকে রক্ষা করার সামরিক কৌশল বেশ মশহুর ছিল তখন। কিন্তু সে কৌশল সব সময় কাজে লাগেনি। সেটি আমরা দেখেছি আগ্রা দুর্গ, চুনার দুর্গ, দিল্লীর লাল কেল্লা কিংবা ঢাকার লালবাগ ফোর্টের ক্ষেত্রে। মোঘল বাদশাহ হুমায়ুন ১৫৩৫ সনে সুলতান মাহমুদ শাহকে পরাজিত করে গুজরাটকে মোগল শাসনাধীনে নেন। মাহমুদ শাহ দিউতে আশ্রয় গ্রহন করেন। শক্তি সঞ্চয় করে কিছুদিন পর তিনি মোঘল বাহিনীকে আক্রমন করে আহমদাবাদ পূর্নদখল করেন এবং ১৫৭২ সন অবধি প্রতাপের সাথে গুজরাট শাসন করেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি । পরাক্রমশালী স¤্রাট জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ আকবর ১৫৭৩ সনে গুজরাট দখল করে মোগল সা¤্রাজ্যের অর্ন্তভ’ক্ত করেন এবং এলাকাটিকে একটি সুবা বা প্রদেশ হিসেবে ঘোষনা করেন। আহমদাবাদ শহরকে সুবা গুজরাটের রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন যা ১৭৫৮ সন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ১৭৫৮ সালের শেষ দিকে মারাঠা বর্গীরা শহরটি দখল করে নেয়। আকবর তনয় শাহজাদা সেলিম (পরবর্তীকালে সম্রাট জাহাঙ্গীর হিসেবে খ্যাত)দীর্ঘ দিন আহমদাবাদের গভর্ণর ছিলেন। সেখানে মোঘল বাদশাহদের অনেক স্মৃতি এখনো অমলিন। সে আমলে নির্মিত অনেক স্থাপনা আজও মোগল গৌরব ঘোষনা করছে।
মোঘল শাসনামলে শহরের ব্যাপক উন্নতি হয়। শহরটি তখন ব্যবসা বানিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রে পরিনত হয়। বস্ত্র শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। উন্নত মানের কাপড় তৈরী হয়। সেখানকার কাপড় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানী হতো। স¤্রাট শাহজাহান তার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় আহমদাবাদ শহরে কাটিয়েছেন। কথিত আছে প্রিয়তমা মমতাজের সাথে বিয়ে হওয়ার অল্প কিছুদিন পরেই আনন্দঘন সময় কাটানোর জন্য দিল্লী থেকে এখানে চলে আসেন এবং বছরাধিককাল অবকাশ যাপন করেন। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি শহরের শাহীবাগ এলাকার বাগানের মধ্যে ‘মতিশাহী মহল’ নামে একটি রাজকীয় প্রাসাদ নির্মাণ করেন । বৃটিশ আমলে শাহজাহান- মমতাজের স্মৃতি বিজড়িত প্রাসাদটি ইংরেজরা দখল করে সরকারী দপ্তর হিসেবে ব্যবহার করে। প্রাসাদটি দীর্ঘদিন আহমদাবাদের কমিশনারের অফিস ও বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্পটি নাকি এ প্রাসাদের পটভ’মিতে রচিত হয়েছিল। শহর পরিভ্রমণের সময় আমরা মুসলিম আমলের অনেক নিদর্শন দেখতে পাই । অনাদর ও অবহেলায় ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো নষ্ট হচ্ছে দেখে খুব খারাপ লাগে।
মারাঠা শাসনামলে আহমদাবাদ নগরী ঝগড়া বিবাদের শহর হিসেবে পরিচিতি পায়। মারাঠাদের দুই অংশ সর্বদাই যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত ছিল। এক অংশে নেতৃত্ব দেয় পুনা’র পেশওয়া আর অপর অংশে বরোদার গাইকোয়ার। মারাঠাদের সাথে বৃটিশদের তিনবার যুদ্ধ হয়। ১৭৮০ সনে প্রথম এ্যাংলো-মারাঠা যুদ্ধে ইংরেজরা জয়ী হয়ে শহর দখল করে নেয় । কিন্তু এক চুক্তি মুলে মারাঠাদেও হাতে শহরের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে দেয়। ১৮১৮ সনে আবার ঈষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী মারাঠাদের পরাজিত করে শহর পুনরায় দখল করে নেয়। ১৮২৪ সনে বৃটিশরাজ শহরে একটি ক্যান্টনমেন্ট স্থাপন করে। তারা শহরের উন্নতি সাধনে মনোনিবেশ করে। ১৮৫৮ সনে মিউনিসিপ্যালিটি স্থাপন করে। গুজরাটকে তখন বোম্বাই প্রেসিডেন্সির অর্ন্তভ’ক্ত করা হয়। আহমদাবাদ সে অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগরীতে পরিনত হয়। ১৮৬৪ সালে আহমেদাবাদ-বোম্বাই রেল লাইন স্থাপিত হলে এ নগরীর গুরুত্ব ও জৌলুস আরো বৃদ্ধি পায়। ক্রমান্বয়ে এটি বস্ত্র শিল্পের কেন্দ্রভ’মিতে পরিনত হয় এবং শহরের অপর নাম হয় ‘প্রাচ্যের মেনচেষ্টার’। বর্তমানে আহমেদাবাদ ভারতের পঞ্চম বৃহৎ শহর এবং বসবাসের জন্য পয়লা নম্বরে এর অবস্থান। যদিও রাজ্যের রাজধানী করা হয়েছে গান্ধীনগরকে । তবু আহমেদাবাদের গুরুত্ব মোটেও হ্রাস পায়নি।
বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন এবং ভারত-পাকিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে গুজরাট তথা আহমদাবাদ এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল এই তিন মহান নেতাই মূলত: গুজরাটের সন্তান। তাঁদের মত ও পথের ভিন্নতা ছিল এ কথা সত্য। কিন্তু বৃটিশ তাড়িয়ে দেশকে স্বাধীন করার প্রশ্নে ছিল ঐকমত্য। তরুণ ব্যারিষ্টার মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধী দক্ষিণ অফ্রিকা থেকে ফিরে আসেন নিজ শহর আহমদাবাদে বিংশ শতাব্দীর ২য় দশকের শুরুতে। জাতীয় কংগ্রেসে যোগদিয়ে যুক্ত হন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে। আহমদাবাদ এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন দুটি আশ্রম। ১৯১৫ সনে ‘কুচরাব আশ্রম’ এবং ১৯১৭ সনে ‘সত্যাগ্রহ আশ্রম’( যা পরবর্তীতে ‘সবরমতি আশ্রম’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করে)। এই ‘সবরমতি আশ্রম’ই পরবর্তীকালে ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের কেন্দ্রস্থলে পরিনত হয়।
আমরা পড়ন্ত বিকেলে ঐতিহাসিক সবরমতি আশ্রমে পৌঁছাই। আশ্রমের সদর দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই এক অনাবিল শিহরণ জাগে! এই সেই স্থান যেখানে বিংশ শতাব্দির কিংবদন্তি ভারতের স্বাধীনতার স্থপতি মহাত্মা গান্ধী দীর্ঘ এক যুগেরও বেশী সময় কাটিয়েছেন স্ত্রী কস্তুরা বাঈ ও অন্যান্য সহকর্মীদের নিয়ে। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন সেবা ,ত্যাগ, মানবতা ও স্বাধীনতার মন্ত্রে। পূর্বেই আশ্রমের জন্ম কথা উল্লেখ করেছি। এখানে একটু বিস্তারিত বলতে চাই। গান্ধীজী প্রথমে ১৯১৫ সনে তাঁর বন্ধু ব্যারিষ্টার জীবনলাল দেশাইয়ের কুচারাব বাঙলোতে আশ্রম স্থাপন করেন। পরবর্তী পর্যায়ে ১৯১৭ সনে সবরমতি নদীর তীরে সত্যাগ্রহ আশ্রম স্থাপন করেন যা পরবর্তীতে ‘সবরমতি আশ্রম’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। আশ্রমের কাছ দিয়েই বয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক সবরমতি নদী। তবে বলা যায় আশ্রমের কারনেই সবরমতি নদী খ্যাতি পেয়েছে। ১০৮ বিঘা জমির উপর আশ্রমটি স্থাপিত হয়েছে। এখানে রয়েছে গান্ধীজী ও তাঁর অনুসারীদের অমূল্য স্মৃতি। আমরা পুরো আশ্রমটি ঘুরে ঘুরে দেখেছি। আশ্রমের মধ্যে যা দেখেছি তার উল্লেখযোগ্য অংশগুলি সম্পর্কে সংক্ষেপে বলছি।
‘গান্ধী স্মৃতি যাদুঘর: আশ্রমের অন্যতম দর্শনীয় স্থান হলো এটি। এর অপর নাম গান্ধী স্মারক সংগ্রহশালা। গান্ধীজীর ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র, চিঠিপত্র ইত্যাদি সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে এখানে।‘গান্ধী স্মৃতি যাদুঘর’ বা গান্ধী স্মারক সংগ্রহশালা’টি প্রথমে ছিল গান্ধীজীর বাসভবন ‘হৃদয়কুঞ্জে’। পরে ১৯৬৩ সনে বিখ্যাত স্থপতি চার্লস কোরেয়া(ঈযধৎষবং কড়ৎবধ) এর ডিজাইনে মিউজিয়ামটি সম্পূর্ণ নতুনভাবে নির্মিত হয় এবং হৃদয় কুঞ্জ থেকে বর্তমান স্থানে ¯œানান্তর করা হয়। মিউজিয়ামটি উদ্বোধন করেন ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রি পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু ১৯৬৩ সনের ১০ মে তারিখে।
‘হৃদয় কুঞ্জ’ : আশ্রমের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষনীয় হলো ‘হৃদয় কুঞ্জ’ যা ছিল গান্ধীজীর বাসভবন। ছোট্ট একটি কুঠির। টালির তৈরী একটি বিল্ডিংয়ের ছোট্ট এক কামরায় স্ত্রী কস্তুরাবাকে নিয়ে গান্ধীজী বসবাস করতেন। প্রায় এক যুগেরও বেশী ছিলেন এখানে । তাঁর শয়ন কক্ষটি দেখলেই বুঝা যায় কত সাধারন জীবন যাপন করতেন এই অসাধারন মানুষটি। ‘ভোগে নয় ত্যাগেই মুক্তি’ এই জীবন দর্শনটি উপলব্ধি করার জন্য আমার মনে হয় সকলেরই জীবনে একবার এখানে আসা দরকার। এখানে গান্ধীজীর অনেক ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্ন/নিদর্শন (ঢ়বৎংড়হধষ ৎবষরপং) ডিসপ্লে করা আছে।
নন্দিনী : ‘হৃদয় কুঞ্জ’ এর ডান পাশেই একটি ছোট্ট কুঠির যার নাম ‘নন্দিনী’ । এটি আসলে অতিথিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। দেশ-বিদেশের অতিথিরা এখানেই থাকতেন।
বিনোভা কুঠির-মীরা কুঠির : এটি হলো গান্ধীজীর অন্যতম শিষ্য আচার্য বিনোবা ভাবেজীর বাসস্থান। তিনি দীর্ঘদিন এখানে থেকেছেন। তিনি চলে যাওয়ার পরে এখানে বাস করতেন গান্ধীজীর অন্যতম শিষ্য মীরাবেন। কুঠিরের নাম হয় তখন ‘মীরা কুঠির’। মীরা ছিলেন জাতে বৃটিশ। অভিজাত পরিবারের সন্তান। আসল নাম গধফবষবরহব ঝষধফব(১৮৯২-১৯৮২)।তার বাবা ঝরৎ ঊফসড়হফ ঝষধফব ছিলেন বৃটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীর রিয়ার এডমিরাল। ঝষধফব শৈশব থেকেই সঙ্গীতের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। পিয়ানো বাজাতে পছন্দ করতেন। জার্মানীর বিখ্যাত শিল্পী খঁফরিম ঠধহ ইববঃযড়াবহ ছিলেন তার খুবই প্রিয় শিল্পী। ১ম বিশ্বযুদ্ধের পর বৃটেনে ইববঃযড়াবহ এর সঙ্গীত নিষিদ্ধ ছিলো। তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় লন্ডনে ইববঃযড়াবহ এর সঙ্গীতের কনসার্ট আয়োজন করা হয়। বৃটেনে জার্মান সঙ্গীত শিল্পীদের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা অপসারনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা পালন করেন। বিথোভেনের প্রতি তিনি এতটাই অনুরক্ত ছিলেন যে, বিথোভেন যে সকল স্থানে বসবাস করতেন এবং যেখানে বসে সঙ্গীত চর্চা করতেন সেগুলো দেখার জন্য তিনি জার্মানী ও ভিয়েনা সফর করেন । বিথোভেন এর উপর লেখা জড়সধরহ জড়ষষধহফ এর বই পড়েন। এক পর্যায়ে তিনি রোলান্ড এর সাথে দেখা করেন। রোলান্ড তার আগ্রহ দেখে বিশ শতকের আরেক বিখ্যাত ব্যাক্তি মহাত্মা গান্ধীর কথা তাকে বলেন। গান্ধীর উপর লেখা তার বই শ্লেইডকে উপহার দেন । শ্লেইড রুদ্ধ শ্বাসে বইটি পড়ে ফেলেন। গান্ধীজীর জীবনী পড়ে তিনি গান্ধীজীর দর্শনে আকৃষ্ট হন। জার্মানী থেকে লন্ডনে ফিরে গান্ধীজীর শিষ্যত্ত গ্রহন করার ইচ্ছে প্রকাশ করে গান্ধীজীকে চিঠি লেখেন। গান্ধীজী তাকে সাদর আমন্ত্রন জানানোর পাশাপাশি আশ্রমের কঠোর নিয়ম শৃঙ্খলার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। বিলাস বহুল জীবন পরিত্যাগ করে আশ্রমের পর্ণকুঠিরে সন্ন্যাসীর জীবনকে আলিঙ্গন করার জন্য তিনি দৃঢ় চিত্তে ১৯২৫ সনের ৭ নভেম্বর আহমেদাবাদে পদার্পণ করেন । এখানে গান্ধীজীর পক্ষে তাকে স্বাগত জানান মহাদেব দেশাই,সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল এবং স্বামী আনন্দ। আশ্রমে তিনি নিরামিষ ভোজন, চরকা ও খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে প্রশিক্ষণ গ্রহন করেন। আশ্রমের কঠোর জীবনে তিনি অভ্যস্থ হন অনায়াসেই। অতি অল্প সময়ে গান্ধী আদর্শে নিজেকে গড়ে তোলেন। গান্ধী আদর্শ ছড়িয়ে দিতে আত্মনিয়োগ করেন। শুধু তাই নয় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামেও জড়িয়ে পড়েন । গান্ধীজী মুগ্ধ হয়ে তার নাম রাখেন ‘মীরা বেন’। হিন্দু ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্যতম সহচরী ছিলেন মিরাবাঈ। গান্ধীজী তাকে সেনাম দিয়ে সন্মানীত করেন। শ্লেইড দীর্ঘ ৩৪ বছর ভারতবর্ষে কাটান। অসহযোগ আন্দোলন ও স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ গ্রহনের জন্য তিনি অনেকবার কারাভোগ করেছেন। ১৯৩২-১৯৩৩ এবং ১৯৪২-১৯৪৪ সময়ে গান্ধীজীর সাথে আগা খান প্যালেসে বন্দী ছিলেন। বিলাতে অনুষ্ঠিত রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে গান্ধীজীর সাথে অংশ গ্রহন করেছেন। ভারতের স্বাধীনতার জন্য তিনি চার্চিল,ডেভিড লয়েড,জেনারেল স্মাটস এবং মিসেস রুজভেল্ট এর সাথে দেখা করেন। তিনি কেবিনেট মিশনের আলোচনায় ভারতের প্রতিনিধি দলে ছিলেন। সেবাগ্রাম আশ্রম প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রনী ভুমিকা পালন করেন। তিনি কিষান আশ্রম, বাপুগ্রাম আশ্রম ও গোপাল আশ্রম ইত্যাদি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ভারত স্বাধীনতার পর ১৯৫৯ সনে তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে যান। ১৯৬০ সনে অষ্ট্রিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। ১৯৮২ সনে সেখানেই সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর জীবনাবসান হয়। তাঁর ত্যাগ আজও আদর্শবাদী তরুন তরুনীদের অনুপ্রেরণা যোগায়। তিনি বেশ কয়েকটি মুল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন । তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ঞযব ঝঢ়রৎরঃ’ং চরষমৎরসধমব,,ইধঢ়ঁ’ং ষবঃঃবৎং ঃড় গরৎধ,ঘবি ধহফ ঙষফ এষবধহরহমং,ঞযব ঝঢ়রৎরঃ ড়ভ ইববঃযড়াবহ.
মগন নিবাস : এ কুটির আশ্রমের ব্যবস্থাপক মগনলাল গান্ধীর বাসস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এটিও একটি সাধারন কুঠির । মগনলাল গান্ধী ছিলেন গান্ধীজীর চাচাতো ভাই । তাঁকে তিনি খুব ¯েœহ করতেন। গান্ধীজী তাকে ‘আশ্রমের আত্মা’ হিসেবে বলতেন। আশ্রম পরিচালনার সার্বিক দায়িত্ব তার উপর ছেড়ে দিয়ে গান্ধীজী নির্ভার ছিলেন। তিনি অসাধারন যোগ্যতা ও দক্ষতার সাথে আশ্রম পরিচালনা করেন।
উপাসনা মন্দির : হৃদয় কুঞ্জ এবং মগন নিবাসের মধ্যে অবস্থিত একটি খোলা চত্তর যা প্রার্থনা স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এই উন্মুক্ত স্থানে গান্ধীজী তাঁর শিষ্যদের নিয়ে প্রতিদিন প্রার্থনায় মিলিত হতেন। প্রার্থনার পর তিনি শিষ্যদের উত্থাাপিত বিভিন্ন প্রশ্নের ব্যখ্যা বিশ্লেষন ও জবাব খোঁজে বের করতেন। জীবন ও জগতের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতেন, অনেক জিজ্ঞাসার উত্তর তালাশ করতেন এবং অনেক প্রশ্নের জবাব দিতেন। এখানে ভজন ও রামধনু সঙ্গীত গাওয়া হতো যা শুনে আশ্রমবাসী সৃষ্টি ও ¯্রষ্ঠার প্রতি আরো বেশী অনুগত হতেন। তাছাড়া এখানে নিয়মিত গীতা, কোরাণ ও বাইবেল পাঠ করা হতো । সর্ব ধর্মের মিলন কেন্দ্র ছিল এ আশ্রম।
উদযোগ মন্দির: এই মন্দির কোন উপাসনালয় নয়। শুরুতে এটি ছিল গান্ধীজীর অর্থনৈতিক বিষয়ের গবেষনাগার। আত্ম নির্ভরশীল হওয়া ও আত্ম মর্যাদার সাথে জীবন পরিচালনার শিক্ষা তিনি এখান থেকেই শুরু করেন। খাদি শিল্পের যাত্রাও এখান থেকেই শুরু হয়। সারা দেশ থেকে স্বেচ্ছাসেবীরা এখানে এসে জড়ো হতো এবং খাদি প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ গ্রহন করে গ্রামের মানুষকে স্বরাজ আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করতো। চরকা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে। ১৯৩৩ সনে গান্ধীজী উদযোগ মন্দিরকে হরিজন সেবক সংঘে রুপান্তরিত করেন। ১৯৩৩ থেকে ১৯৮২ সন পর্যন্ত মন্দিরটি গ্রামীণ এলাকার হতদরিদ্র ও পশ্চাৎপদ হরিজন সম্প্রদায়ের মেয়েদের স্কুল হিসেবে পরিচালিত হয়। নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে এটি মানব সাধনা হোস্টেল হিসেবে রপান্তরিত হয়। এখানে হরিজন সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের বিনামূল্যে থাকা খাওয়া ও পড়াশুনার ব্যবস্থা করা হয়। অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ ও পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করে পরিবেশের উন্নয়নের উপর জোড় দেয়া হয় এখানে। আমরা দেখতে পাই একজন বয়স্ক লোক নিবিষ্ট চিত্তে বসে চরকা কাটছেন।অনেক দর্শণার্থী তার চরকা কাটা দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন। গান্ধীজীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ উত্তরাখন্ড রাজ্যের অধিবাসী সৌম্য মূতির লোকটি দীর্ঘ ৩০ বছর যাবৎ এখানে আছেন। গান্ধীজীর আদর্শ অনুসরণ ছাড়া জীবনে আর কোন চাওয়া পাওয়া নেই এই সর্বত্যাগী লোকটির।
সবরমতি আশ্রমে থাকাকালে বৃটিশ সরকার গান্ধীজীঁকে গ্রেফতার করে পাশেই একটি কারাগারে দীর্ঘ ৬ বছর অন্তরীন রাখে । কারাগারে বসেই গান্ধীজী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘গু ঊীঢ়বৎরসবহঃ রিঃয ঞৎঁঃয’ রচনা করেন যা পরবর্তীকালে খ্যাতি অর্জন করে।
এই সবরমতি আশ্রমই গান্ধীজীর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় । সময়টা ১৯৩০ সনের মার্চ মাস। বৃটিশ সরকার ভারতীয়দের উপর লবন আইন (ংধষঃ ষধ)ি নামক এক নতুন এক উপদ্রব চাপিয়ে দেয় । নতুন আইনে ভারতে উৎপাদিত লবনের উপর অধিক কর আরোপ করে বিলাতী লবনের বাজার দখল করার সুযোগ তৈরী করে দেয়। ভারতীয়রা প্রতিবাদ করলে সরকার অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। গান্ধীজী এ আইনের বিরুদ্ধে এক অভিনব প্রতিবাদ কর্মসূচীর সূচনা করেন যা একদিকে ভারতে বৃটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেয় অন্যদিকে ভারতবাসীকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জ্বীবিত করে। ৭৯ জন শিষ্যকে সঙ্গে নিয়ে ১২ মার্চ তারিখে ২৪০ মাইল পদযাত্রা শুরু করেন যা ইতিহাসে ‘ডান্ডি সল্ট মার্চ’ হিসেবে পরিচিতি পায়। তিনি বিলাতি লবন উৎপাদন, বিক্রি ও ক্রয়ের উপর নিষেধ্জ্ঞাা জারী করেন। বৃটিশ সরকার এই অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহনকারীদের মধ্যে ৬০,০০০ স্বাধীনতা সংগ্রামীকে গ্রেফতার করে জেলে ভরে এবং সবরমতি আশ্রম তালাবদ্ধ করে। গান্ধীজী আশ্রম ফিরিয়ে দেয়ার জন্য বৃটিশ সরকারকে বার বার অনুরোধ করেন। কিন্তু বেনিয়া সরকার তাতে কর্নপাত করেনি। তখন গান্ধীজী ঘোষনা করেন ভারতবর্ষ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত তিনি সবরমতি আশ্রমে ফিরে আসবেননা। কিন্তু দুর্ভাগ্য ভারতবাসীর। ভারত স্বাধীন হয়েছিল ঠিকই কিন্তু নাথুরাম গডসে নামক এক নরাধম গান্ধীজীকে নির্মমভাবে হত্যা করায় তাঁর সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তিনি সবরমতি আশ্রমে ফিরে যেতে পারেননি। তথাপি আশ্রমে তার স্মৃতি আজো অম্লান এবং যতদিন ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ইতিহাস থাকবে ততদিন অঅশ্রমের ইতিহাসও থাকবে।
মিউজিয়ামে অনেকগুলি কক্ষ এবং কক্ষগুলিতে বেশ কয়েকটি গ্যালারী আছে। যেমন:
‘গু খরভব রং গু গবংংধমব”এধষষবৎু: এই গ্যালারীতে অনেকগুলি লাইফ সাইজ তৈলচিত্র ও অসংখ্য ফটোগ্রাফ রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সবগুলি সাদাকালো। গান্ধীজীর জীবনের অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা ছবিগুলির মাধ্যমে মূর্ত হয়ে আছে যা ভারতবর্ষের ইতিহাসকে বদলে দিয়েছিল। গান্ধীজীর সাথে মৌলানা আজাদ, পন্ডিত নেহেরু, সর্দার প্যাটেল,রাজেন্দ্র প্রাসাদ,রাজা গোপাল আচারিয়া প্রমুখ জাতীয় নেতাদের ছবি স্থান পেয়েছে।
দএধহফযর রহ অযসবফধনধফ’ এধষষবৎু: এই গ্যালারীতে মূলত: ১৯১৫ -১৯৩০ সময়কালকে বিভিন্ন আলোকচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। ঋৎড়স গড়যড়হ ঃড় গধযধঃসধ শিরোনামে একটি আলোক চিত্রের মাধ্যমে তার জীবনের বিবর্তন তুলে ধরা হয়েছে। গুজরাটের এক ব্রাহ্মণ পরিবারের ছোট্ট শিশু মোহন দাস কিভাবে মহাত্মায়( গধযধঃঃযধ) রুপান্তরিত হলেন তা অত্যন্ত সুন্দর ভাবে ছবির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
ঊীযরনরঃরড়হ এধষষবৎু : এই গ্যালারীতে গান্ধীজীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি(ছঁড়ঃধঃরড়হং), বিভিন্ন জনের কাছে লেখা গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্র এবং অন্যান্য নিদর্শন ও স্মৃতিচিহ্ন (জবষরপং) সুন্দরভাবে সাজানো আছে।
এধহফযর গবসড়ৎরধষ খরনৎধৎু: আশ্রমের একটি বড় কক্ষে স্থাপন করা হয়েছে গান্ধী মেমোরিয়্যাল লাইব্রেরী। গ্রন্থাগারটিতে গান্ধীজীর জীবন ও কর্ম, গান্ধীজীর দর্শন এবং ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং এ জাতীয় বিষয়ে প্রায় ৩৫০০০ মূল্যবান বই পুস্তক রয়েছে। বইগুলি ইংরেজী, হিন্দি এবং গুজরাটি ভাষায় লেখা। বাঙলা ভাষায় গান্দীজীর উপর লেখা অনেক বই থাকা সত্বেও সেখানে কেন নেই তা বুঝা গেলনা। একজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান আগে ছিল এখন নেই। গ্রন্থাগারে আছে একটি চমৎকার রিডিং রুম। অনেক মনোযোগী পাঠক বই পড়ছে দেখলাম।
এধহফযর অৎপযরাবং: আর্কাইভে গান্ধীজী কর্তৃক বিভিন্নজনকে লেখা এবং গান্ধীজীর নিকট বিভিন্ন জনের লেখা ৩৪১১৭টি চিঠির মূল কপি ও ফটোকপি, হরিজন,হরিজনসেবক ও হরিজন বন্ধু প্রভৃতি পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে গান্ধীজীর লেখা আর্টিক্যালের পান্ডুলিপি এবং গান্ধীজী এবং তাঁর সহকর্মীদের প্রায় ৬০০০ ফটোগ্রাফ রয়েছে।
তাছাড়াও এখানে অনেকগুলি সাদামাটা অথচ দৃষ্টিনন্দন ছোট ছোট কুঠির রয়েছে । এখানে আছে প্রার্থনা কেন্দ্র, গান্ধীজীর আবক্ষ মূর্তি, বিশ্রাম কক্ষ, চরকা কেন্দ্র, বই ও গান্ধীজীর ছবি ও নামাঙ্কিত নানা রকমের স্মারক পণ্যের বিক্রয় কেন্দ্রসহ বিবিধ স্থাপনা। গান্ধীজীর ছবি সম্বলিত কিছু চাবির রিং ও কলম কিনি। দেখলাম প্রচুর বিক্রি হচ্ছে নানান সামগ্রী। তবে এসব পন্য সামগ্রি অ-লাভজনক ভিত্তিতে তৈরী ও বিক্রয় করা হয়। ফলে দাম খুব একটা বেশী না। আমরা ঘুরে ঘুরে পুরো আশ্রম দেখি। সন্ধ্যার কিছু আগে এক অনাবিল শান্তি ও পরিতৃপ্তি নিয়ে আশ্রম থেকে বের হই ।
আহমেদাবাদ বিআরটির কর্মকর্তারা দর্শনীয় স্থান হিসেবে কাঙ্কারিয়া লেক(শধহশধৎরধ ষধশব) দেখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আমরা প্রায় সন্ধ্যার দিকে সেখানে যাই। ১০ রুপির টিকেট কেটে লেক এলাকায় প্রবেশ করি। লেকের সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে সকলেই একমত হই যে, কাঙ্কারিয়া লেক না দেখলে আহমদাবাদ ভ্রমণই বৃথা যেতো। আমরা সময়ের স্বল্পতায় পুরো লেকটি ঘুরে দেখতে পারিনি। কিন্তু যতটুকু দেখেছি তাতেই আমরা অভিভ’ত। একটি কৃত্রিম লেক যে এত সুন্দর হতে পারে এবং এর রক্ষনাবেক্ষণ যে এত উচুঁ মানের হতে পারে তা স্বচক্ষে না দেখলে বুঝানো যাবেনা। লেকের অন্যতম একটি আকর্ষণ হলো লেকের চার পাশ দিয়ে তৈরী বৃত্তাকার ওয়াকওয়ে। এটি দিয়ে প্রাত:কালীন ও সান্ধ্যকালীন ভ্রমণ এক চিত্তাকর্ষক বিষয়। দলে দলে লোক হেটে যাচ্ছে এবং একই সাথে চলছে গল্প। আমরাও বেশ খানিকটা পথ হাটি। আমরা একটি গ্রুপ ছবি তোলার জন্য কাউকে তালাশ করতেছিলাম। এমন সময় পাশ দিয়ে হেটে যাওয়া এক মধ্য বয়সী ভদ্রলোককে অনুরোধ করতেই তিনি সহাস্যে রাজি হয়ে গেলেন। খুব আন্তরিকতার সাথে অনেকগুলো ছবি তুলে দেন। ভদ্রলোকের নাম মির্জা রুস্তমজী। তিনি নিজেই বললেন তিনি ধর্মে জোরাস্ত্রাইন বা অগ্নিউপাসক। আমরা বাংলাদেশী জেনে বললেন ঢাকায় যাওয়া তার সৌভাগ্য হয়নি তবে তার স্ত্রী দু’বার ঢাকা ভ্রমণ করেছেন। আমরা তাকে শুধু ঢাকায় নয় সারা বাংলাদেশ ভ্রমনের আমন্ত্রণ জানাই। তিনি আনন্দের সাথে আমাদের দাওয়াত কবুল করেন। তিনি জানালেন শরীর ঠিক রাখার জন্য সকাল সন্ধ্যায় হাজার হাজার লোক এখানে নিয়মিত জগিং, হাঁটাহাটি ও যোগ ব্যায়াম করে। ‘ইয়োগা’ এর জন্য এটি একটি উৎকৃষ্ট স্থান। কাঙ্কারিয়া লেকে সকল বয়সের মানুষের আনন্দ দানের ব্যবস্থা আছে। আমরা ফেরার সময় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। তখন লেকের সৌন্দর্য্য অন্যরুপ ধারন করে। আমরা বেশ কিছু সময় লেকপাড়ে স্থাপিত পাকা বেঞ্চে বসে লেকের নান্দনিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করি।
লেক সম্পর্কে যতটুকু জানতে পেরেছি তা হলো এটি অহমদাবাদ তথা গুজরাটের সবচেয়ে বড় লেক। শহরের দক্ষিণ পাশে মানিনগর এলাকায় এর অবস্থান। আগেই উল্লেখ করেছি এটি প্রাকৃতিক নয় কৃত্রিম লেক। সুলতান কুতুব উদ্দিন খৃষ্টীয় পঞ্চদশ শতকের তৃতীয় দশকে লেকের নির্মাণ কাজ শুরু করেন এবং ১৪৫১ সনে নির্মাণ কাজ শেষ হয়। এটির নাম রাখা হয় ‘হাউজ-ই-কুতুব’। সুলতানের রাজকীয় গোসলখানা হিসেবেই ব্যবহৃত হতো প্রথম দিকে। লেকের পানি বিশুদ্ধকরনের চমৎকার ব্যবস্থা ছিল। গোলাকৃতির এই লেকের আয়তন প্রায় ৫ বর্গ কিলোমিটার। লেকের ঠিক মধ্যখানে আছে একটি ছোট্ট দ্বীপ। দ্বীপের কেন্দ্রস্থলে একটি সুন্দর ফুলের বাগান রয়েছে যার নাম ‘নাগিনা ওয়াদী’ । দ্বীপের মধ্যে আছে চমৎকার রাজপ্রাসাদ যা গ্রীস্ম নিবাস(ঝঁসসবৎ চধষধপব) হিসেবে ব্যবহৃত হতো সুলতানী ও মোঘল আমলে। কথিত আছে মোগল স¤্রাট জাহাঙ্গীর ও স¤্রাজ্ঞী নুরজাহানের খুব প্রিয় জায়গা ছিল লেকের প্রাসাদটি। গ্রীস্মকালে দিল্লীর গরম আবহাওয়ার কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তাঁরা প্রায়শ:ই এখানে চলে আসতেন এবং বেশ কিছুদিন অবকাশ যাপন করতেন এখানে। এটিকে ‘শান্তির দ্বীপ’ নামে অবহিত করা হয় । একটি পয়েন্ট থেকে দ্বীপ ও বাগানে প্রবেশ করার ব্যবস্থা রয়েছে । দ্বীপ ও লেকপাড়ে আছে নানা রকম সুস্বাদু খাবারের দোকান। আছে সঙ্গীত ঝরনা।
লেকটিকে ঘিরে নানা রকম শিক্ষা ও বিনোদনমূলক আয়োজনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। লেকের চার পাশের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য, হাজার হাজার পাখির কলরব, শিশুদের পদচারনা ও রক্তিম সূর্যাস্ত এর পরিবেশ সত্যিই মোহনীয় করে তুলে। শিশুদের আনন্দ দেবার জন্য আছে সুন্দর শিশু পার্ক যার নাম ‘নেহরু শিশু পার্ক’। খুব ভালো লাগে টয় ট্রেন দেখে । নাম অটল এক্সপ্রেস। ২০০৮ সনের ২৫ শে ডিসেম্বর ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রি অটল বিহারী বাজপেয়ীর জন্ম দিনে তার সন্মানে টয় ট্রেনের নামকরণ করা হয় অটল এক্সপ্রেস । এই চমৎকার ট্রেনটিতে একসাথে ১৫০ জন শিশু আরোহন করতে পারে। ঘন্টায় এর গতি ১০ কিলোমিটার। আমাদের পাশ দিয়ে ট্রেনটি যাওয়ার সময় শিশুরা হাত নেড়ে আনন্দ প্রকাশ করে। ট্রেনটি চালু হওয়ার প্রথম ১১ মাসে নাকি ১০ লক্ষ শিশু গাড়ী চড়ে। কর্তৃপক্ষ উৎসাহী হয়ে আরো একটি ট্রেন চালু করে যার নাম সারনীম জয়ন্তি। বর্তমানে দুটি ট্রয় ট্রেন চালু আছে।
প্রায় সাড়ে চার হাজার বর্গ মিটার জায়গা নিয়ে স্থাপন করা হয়েছে ‘শিশু নগর’(করফং ঈরঃু)যেখানে আছে শিশুদের জন্য শিক্ষা ও বিনোদনমুলক অনেক সেন্টার। সায়েন্স ক্লাব, রেডিও ষ্টেশন,থিয়েটার,হেরিটেজ গ্যালারী,আইটি সেন্টার,নিউজ রুম, আইসক্রীম ফ্যাক্টরী ইত্যাদি। এর পাশেই আছে একটি আকর্ষনীয় বিনোদন পার্ক(অসঁংবসবহঃ চধৎশ)। বিনোদন পার্কে আছে শিশুদের প্রিয় বিভিন্ন ধরনের আধুনিক রাইড। কম্পিউটার গেম খেলার জন্য আইটি যোন। নেদারল্যান্ড ভিত্তিক একটি কোম্পানী এটি পরিচালনা করে।
কধসষধ ঘবযৎঁ তড়ড়ষড়মরপধষ ঢ়ধৎশ: ডেভিড রুবেন( উধারফ জঁবনবহ) নামে এক ভদ্রলোক ১৯৫১ সনে কাঙ্কারিয়া চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠা করেন। পরে এর নামকরণ করা হয় ভারতের প্রধানমন্ত্রি জহরলাল নেহরুর প্রয়াত স্ত্রী শ্রীমতি কমলা নেহরুর নামে। ৪৫০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রানী এবং ২০০০ রকমের পাখি এবং ১৪০ প্রজাতির সরীসৃপ রয়েছে এ চিড়িয়াখানায়। এটিকে পৃথিবীর বিরল প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রানীর ভান্ডার বলা হয়। ১৯৭৪ সনে এশিয়ার শ্রেষ্ঠ চিড়িয়াখানা হিসেবে স্বীকৃতি পায় এটি এবং ডেভিড রুবেন ভারতের রাষ্ট্রীয় পদক পদ্মশ্রী লাভ করার গৌরব অর্জন করেন।
কাঙ্কারিয়া লেক ছাড়াও চেন্ডোল লেক (ঈযধহফড়ষ ষধশব) নামে আরেকটি দৃষ্টিনন্দন লেক আছে আহমদবাদ শহরে। ওটির উপর একটি সুন্দর সেতু আছে। আমরা সেতু অতিক্রম করার সময় লেকের সৌন্দর্য্য উপভোগ করি। হাজার হাজার পাখি বিচরণ করছে লেকের স্বচ্ছ জলে। পাখি শিকার নিষিদ্ধ বলে তারা নির্বিঘেœ সাঁতার কাটছে।
কাঙ্কারিয়া লেক দেখে ফেরার পথে কেনাকাটার জন্য নেমে পড়ি তিন দরওয়াজা(ঞববহ উধৎধিুধ) নামক স্থানে ইমরান শেখের পরামর্শ মোতাবেক। স্থানীয়ভাবে তিন দুয়ারী মার্কেট নামে পরিচিত। এখানে বলে নেই আহমদাবাদ শহরে অনেকগুলি দরওয়াজা ( এধঃব) রয়েছে। জায়গাটি ঐতিহাসিক ভদ্রা ফোর্টের সন্নিকটে। ভদ্রা ফোর্টের নির্মাতা সুলতান আহমদ শাহ। তিনি বেশ কয়েকটি দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। এর মধ্যে ভদ্রা দুর্গ (ইযধফৎধ ঋড়ৎঃ)ছিল অন্যতম। শহরে প্রবেশ এবং বের হওয়ার জন্য তিনি ১২টি দরওয়াজা বা তোড়ণ নির্মান করেন যার মধ্যে তিন দরওয়াজা, লাল দরওয়াজা ইত্যাদি নামে অনেক দরওয়াজা রয়েছে। তিন দুয়ারীতে হরেক রকম পসরা সাজিয়ে বসে আছে দোকানীরা। মহিলা এবং শিশুদের আইটেমই বেশী। আমরা পছন্দ মতো কেনাকাটা করি। ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেখে বেশ ভালো লাগলো।
তিন দরওয়াজার পূর্ব পাশেই ঐতিহাসিক জুম’আ মসজিদ। ১৪২৩ সনে সুলতান আহমদ শাহ এ মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদে ১৫টি গম্বুজ এবং ২৬০টি পিলার রয়েছে। হলুদ বর্ণের বেলে পাথরের দ্বারা তৈরী। মসজিদে প্রবেশ করার জন্য তিনটি দরজা রয়েছে। মসজিদের দরওয়াজার সংখ্যার জন্যই নাকি এলাকার নাম হয়েছে তিন দুয়ারী। এ মসজিদটি ভারতবর্ষের প্রাচীন ও সুন্দর মসজিদের অন্যতম । মসজিদটি শহরের পুরাতন অংশের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এবং এখনো এলাকাটি মুসলিম অধ্যুষিত। মসজিদ প্রাঙ্গনে শায়িত আছেন সুলতান আহমদ শাহ স্বয়ং , তার প্রিয়তমা স্ত্রী, পুত্র এবং পৌত্রগন।
আহমদাবাদ শহরে আরো অনেক দর্শণীয় স্থান আছে যেমন ঝুলতা মিনার,ভদ্রা ফোর্ট,শাঙ্কু ওয়াটার পার্ক,মুধহেরা সূর্য মন্দির,কালিকো টেক্সটাইল মিউজিয়াম,হোসাইন দোশী গুফা,সর্দার প্যাটেল ন্যাশনাল মেমোরিয়্যাল, আহমদ শাহ মসজিদ,অক্ষরধাম মন্দির, হাতী সিং মন্দির, জামে মসজিদ, রানী রুপমতি মসজিদ,সিদ্দি সাঈদ মসজিদ ও স্বামী নারায়ন মন্দির,ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি। কিন্তু সময় স্বল্পতায় বর্ণনা শুনেই সন্তুষ্ঠ থাকতে হয়েছে ।
রাতে হোটেল কক্ষে শুয়ে শুয়ে দিনের পত্রিকাগুলোর পাতা উল্টিয়ে দেখি। পত্রিকা মানে ঞরসবং ড়ভ ওহফরধ,ঞযব ওহফরধহ ঊীঢ়ৎবংং, অযসবফধনধফ ঞরসবং প্রভৃতি । বিশাল ভারতবর্ষের নানা রকম খবর পাঠ করে দশটির বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি জানার সুযোগ পাই। তবে কয়েকটি খবর ছিল বেশ চিত্তাকর্ষক। যেমন ২০১৫ সালের ‘প্রজাতন্ত্র দিবস’ উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় পদক বিতরন। পদক বিতরনে পক্ষপাতিতের¡ অভিযোগ উঠে এবং বুদ্ধিজীবি মহলে বেশ হৈ চৈ হয়। কয়েকজন পদক গ্রহনে অপারগতা প্রকাশ করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হলেন চিত্র নাট্যকার, নির্মাতা ও লেখক সেলিম খান এবং যোগ গুরু রামদেব ও ধর্মগুরু শ্রী শ্রী রবি শঙ্কর। পদক গ্রহনে যোগ ও ধর্মগুরুদের অপারগতার কারন অবশ্য ভিন্ন । সেলিম খান প্রত্যাখ্যান করেন এই বলে যে তাকে যোগ্য পদক দেয়া হয়নি এবং অনেক জুনিয়রকে দেয়ার বহু পরে তাকে নীচের গ্রেডের পদক দেয়া হয়েছে। তার সমসাময়িক জাভেদ আখতার ও অমিতাভ বচ্চনকে বহু পূর্বেই সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক দেয়া হয়েছে। তার বহু জুনিয়রকে যাদের অবদান তার চেয়ে অনেক কম তাদেরকেও অনেক আগে পদক দিয়ে সন্মানিত করা হয়েছে। রাষ্ট্র তাকে দীর্ঘদিন অবহেলা করেছে, তার প্রাপ্য সন্মান দেয়নি। শেষতক যদিওবা দিয়েছে তা পদ্মশ্রী পদক যা তার জন্য বেমানান। সেজন্য তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। আর ধর্মগুরুদের রাষ্ট্রীয় ও জাগতিক পদক গ্রহন নৈতিকতার দিক থেকে গ্রহনযোগ্য কিনা সে প্রশ্ন উঠায় তারা বিনয়ের সাথে ফিরিয়ে দেন। বুঝা গেল রাষ্ট্রীয় পদক বিতরনে অন্যান্য দেশের ন্যায় ভারতের মতো গনতান্ত্রিক দেশেও বিতর্ক রয়েছে। অন্যদিকে একই পরিবারের ৪ জন রাষ্ট্রীয় পদক পাওয়ার বিরল নজীর তৈরী হয়। অযসবফধনধফ ঞরসবং পত্রিকা হেডিং দিয়েছে ‘ ঞযব ঢ়ধফসধ ঋধসরষু (পদ্ম পরিবার) । অবশ্য তারা সকলেই যোগ্য এবং পদক দিয়ে সরকার সঠিক কাজ করছে বলে অভিমত প্রকাশিত হয়। পরিবারটি হলো গোটা ভারতবর্ষের পরিচিত বিখ্যাত ‘বচ্চন পরিবার’। এ পরিবারের কর্ণধার হরিবংশ রাই বচ্চন, অমিতাভ বচ্চন, জয়া বচ্চন এবং ঐশ^রিয়া রাই বচ্চন তাদের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় পদকে ভ’ষিত হয়েছেন। অমিতাভ বচ্চন একাধিকার পদক পেয়েছেন। তিনি ১৯৮৪ সনে পদ্ম শ্রী, ২০০১ সনে পদ্মভুষন আর এ বছর সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক পদ্ম বিভ’ষন পদক লাভ করেন। অমিতাভ বচ্চন তাকে রাষ্ট্রের সবোচ্চ পদকে ভ’ষিত করায় সরকারকে ধন্যবাদ জানান। একটি বিষয় লক্ষ্যনীয় কংগ্রেস এবং বিজেপি উভয় সরকারই এই গুণী মানুষটিকে সন্মানিত করেছে। হাসতে হাসতে আমি এক সহকর্মীকে বলি এ পরিবারের গৌরবের অংশীদার আমরাও। তিনি বলেন কীভাবে? ওনারা তো ভারতের নাগরিক। আমরা বাংলাদেশীরা কিভাবে অংশীদার হই? তখন আমি ঘটনা খুলে বলি। অমিতাভ বচ্চনের স্ত্রী জয়া বচ্চনের পৈত্রিক নিবাস বাংলাদেশের নেত্রকোণা জেলার পূর্বধলা উপজেলার একটি গ্রামে । জয়াদের পরিবার ছিল এলাকায় বেশ প্রভাবশালী। তার পিতামহের আমল থেকেই পরিবারটি কোলকাতায় ব্যবসা বানিজ্যে বেশ তরক্কী হাসিল করে। গ্রামের বাড়ীটি জমিদারী ষ্টাইলে নির্মাণ করে। ছোটখাটো জমিদারীও ছিল। ছিল নায়েব-গোমস্তাদের সরব উপস্থিতিসহ কাছারী ঘর, দেবালয় ও সুরৌম্য বৈঠকখানা। তারা পূজা পার্বনে বাড়ীতে আসতেন । থাকতেন বেশ কিছুদিন। জয়ার জন্ম কোলকাতা শহরে এবং সেখানেই বেড়ে উঠা,পড়াশুনা এবং পরিশেষে বচ্চন পরিবারে বিয়ে। ২০১১ সনে হঠাৎ একদিন ঢাকা থেকে খবর আসে জয়া বচ্চন পূর্বধলায় আসছেন তার পৈত্রিক ভিটা দেখার জন্য। আমি তখন নেত্রকোণা জেলায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত ছিলাম। জেলা প্রশাসক মহোদয় প্রশিক্ষনে থাকায় আমি জেলা প্রশাসকের দায়িত্বও পালন করছিলাম একই সাথে । আমরা তার গ্রামের বাড়ী গিয়ে দেখতে পাই তাদের পুরোনো দালানকোঠা অনেকটা অক্ষত আছে। তবে জ¦রাজ¦ীর্ণ অবস্থায়। অন্য লোকেরা বসবাস করছে। খাজনা আদায়ের কাছারী এখনো আছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে প্রয়োজনীয় প্র¯‘িত গ্রহন করার পরামর্শ দিই। যাহোক পরে কি কারনে জানিনা তিনি আসতে পারেননি। সুতরাং তিনি তো ‘আমাদেরই লোক’ এ কথা বলতে বাধাঁ কোথায়?
পত্রিকায় আরেকটি বিষয় নিয়ে বেশ লেখালেখি হয়। সেটি হলো গুজরাট সরকারের শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের একটি বিতর্কিত সার্কুলার এবং সার্কুলারের বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে। হিন্দু ধর্মে বিদ্যার দেবী হলেন স্বরস্বতী। এজন্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতি বছরই মহা ধুমধামে স্বরস্বতী পূজা উদযাপিত হয়। হিন্দু ছাত্র/ছাত্রীরাই তা উদযাপন করে। আমাদের দেশেও বৃটিশ আমল থেকেই তা উদযাপিত হয়ে আসছে সাড়ম্বরে। এদিন সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারী ছুটি থাকে। কিন্তু এ বছর গুজরাটের শিক্ষা মন্ত্রনালয় এক বিতর্কিত সার্কুলার জারি করে সাফ বলে দিয়েছে রাজ্যের সকল মুসলিম ছাত্র/ছাত্রীকেও বাধ্যতামূলকভাবে স্বরস্বতী পূজায় অংশ গ্রহন করতে হবে। শুধু তাই নয় রাজ্যের উর্দু স্কুল গুলিতেও (যে গুলিতে কেবল মুসলমান ছাত্ররাই পড়াশুনা করে, অনেকটা আমাদের দেশের সরকারী অনুদান প্রাপ্ত এবতেদায়ী মাদ্রাসার মতো)পূজা উদযাপন বাধ্যতামূলক করা হয়। অন্যথা হলে তাদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা গ্রহনের হুমকি দেয়। ফলে বাধ্য হয়ে রাজ্যের ৭৪টি উর্দু স্কুল কর্তৃপক্ষ স্বরস্বতী পূজার আয়োজন করে। সরকারের এহেন আচরণ মুসলিম সমাজে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কিন্তু তারা নিরুপায়। ২০০২ সনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তাদের মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিয়েছে। প্রতিরোধ করার শক্তি এবং সাহস কোনটাই নেই। তবে রাজ্যের কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। কিন্তু কে শুনে কার কথা। গুজরাট রাজ্যে হিন্দুত্ববাদই শেষ কথা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিশাল বিশাল বিল বোর্ডে নানান ধর্ম গুরুর ছবি শোভা পাচ্ছে। বুঝা গেল তাদের প্রভাব এবং অনুসারীদের সংখ্যা কম নয়। গুরুদের জেল্লা আমাদের দেশের এক শ্রেনীর সুফী স¤্রাট কিংবা ‘খাজাবাবা’ নামধারী ভন্ডদের মতোই। তবে পার্থক্য হলো এরা বেশ শিক্ষিত আর আমাদেরগুলো অকাট মূর্খ। এরা হিন্দুত্ববাদ প্রচারে একনিষ্ঠ। আমাদেরগুলো কেবল টাকা কামানোর ধান্দায় লিপ্ত।
২০০২ সনের দাঙ্গায় কয়েক হাজার মুসলমানের মৃত্যুর চেয়ে বেশী ক্ষতি হয়েছে এহসান জাফরীর হত্যাকান্ডে। তিনি ছিলেন গুজরাটের মুসলমান সমাজের অবিসংবাদিত নেতা। ছিলেন লোক সভার সদস্য। কংগ্রেসের নেতা। থাকতেন আহমেদাবাদের অভিজাত গুলবাগ সোসাইটি এলাকায়। এলাকাটি মুসলিম অধ্যূষিত। দাঙ্গা শুরু হওয়ার সাথে সাথে অন্য এলাকার মুসলমানরাও এখানে এসে আশ্রয় গ্রহন করে । ভরসা জাফরী সাহেব। তিনি বড় মাপের নেতা। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করতে পারবেন। রক্ষা পাবে অসহায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠি। কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস যিনি রক্ষা করবেন তাকেই জীবন দিতে হয়েছে অত্যন্ত অসহায় ও করুণভাবে। দাঙ্গাকারীরা তাকে নিজ গৃহে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে। ঘটনার সময় পুলিশ, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা সকলের সাথেই তিনি যোগাযোগ করেন। জীবন বাচাঁতে সনির্বন্ধ অনুরোধ করেন। কিন্তুু কেউ এগিয়ে আসেনি। নিজ গৃহে পরিবারের অনেক সদস্য এবং তার বাড়ীতে আশ্রিত অসহায় মানুষের সাথে অঙ্গারে পরিনত হয়েছেন তিনি। রাজ্য সরকারতো নয়ই এমনকি কেন্দ্রীয় সরকারও তার প্রান রক্ষায় কোন কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। মৃত্যুর পর শুধু ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এখন তার মাপের আর কোন মুসলমান নেতা গুজরাটে নেই। ফলে মুসলমানরা অনেকটা নেতৃত্ব হারা। মুসলমানরা সাম্প্রদায়িক হিন্দুদের করূণার পাত্র। চাকরী-বাকরীতে তাদের অবস্থান প্রায় শুন্যের কোটায়। ব্যবসা বানিজ্যেও নানা প্রতিবন্ধকতা। মহাত্মা গান্ধীর রাজ্যে এমন অবিচার! একজন সহকর্মী বললেন এ রাজ্যে কেবল গান্ধীজী জন্ম গ্রহন করেননি, জন্মেছেন সর্দার প্যাটেলের মতো উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক নেতাও। ক্ষমতাশীন বিজেপি তারই আদর্শের ঝান্ডা বহন করছে। সামগ্রিক পরিস্থিতির একটি খন্ড চিত্রের কথা শুনে মনে হলো সকলের সুমতি ছাড়া এহেন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। মনে মনে বলি বাপুজী আপনি এসে দেখুন আপনার শহরে কি অনাচার। সবরমতির তীরে হিংসার কি আগুন জ্বলছে। মনে পড়লো শান্তি স্থাপন করতে গান্ধীজীর বিখ্যাত উক্তি
রঘুপতি রাঘব রাজারাম
ঈশ্বর আল্লাহ তেরী নাম
সবকো সুমতি দে হে ভগবান
সবকো দে খুশী হে ভগবান।

তিনদিন গান্ধীজীর শহরে কাটিয়ে উড়াল দিই স্বদেশের পথে। সঙ্গে থাকে এক রাশ স্মৃতি যা অনেক দিন জীবন্ত থাকবে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৫৭৯ বার

Share Button

Calendar

November 2018
S M T W T F S
« Oct    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930