» গোবিন্দচরণ পার্কের ঐতিহাসিক ভূমিকা

প্রকাশিত: ১৯. সেপ্টেম্বর. ২০১৯ | বৃহস্পতিবার

কপিল কল্যাণ চৌধুরী

১৮৫৭ সালের বৃটিশবিরোধী সিপাহী বিপ্লবের সময় শ্রীহট্টের এই জায়গাটিতে বৃক্ষপত্র সমৃদ্ধ একটি মাঠ ছিলো । ইংরেজরা শ্রীহট্টের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দেশমাতৃকার অকুতোভয় বিপ্লবী সিপাহীকে ধরে এনে এখানে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করতো । শ্রীহট্টবাসী নীরবে চোখের জল ফেলত ।

১৮৭৫ সালে এখানেই হবিগঞ্জের পৈল গ্রামের বিখ্যাত বাগ্মী বিপিনচন্দ্র পাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘ন্যাশনাল স্কুল’, যে প্রতিষ্ঠান শ্রীহট্টের শিক্ষার আলো বিস্তারে ছিলো বাতিঘর । বিখ্যাত মুরারিচাঁদ কলেজের (M.C. College) যাত্রা শুরু এখানেই । বলছি, শ্রীহট্টের প্রাণকেন্দ্র বন্দরবাজারের ভূতপূর্ব গোবিন্দচরণ পার্কের কথা, অধুনা সিলেটবাসী যেটিকে চেনে ‘হাসান মার্কেট’ নামে । বর্তমান রাজা জিসি স্কুলের ওখানে প্রতিষ্ঠিত হওয়া মুরারিচাঁদ কলেজ ১৮৯৭ সালের ১২ই জুন মেঘালয়ের ডাউকী ফল্ট ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হোলে, ছোট ছোট মাচার মতো ঘর তৈরী করে এখানেই পুনরায়ঃ শুরু হয়েছিল মুরারিচাঁদ কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম । পরবর্তীতে কলেজটি বর্তমান টিলাগড়ে স্থানান্তরিত হয় ।

রাজা গিরিশচন্দ্র এখানে তার পিতার নামানুসারে গড়ে তুলেন “গোবিন্দচরণ পার্ক” । সেকালে শ্রীহট্টবাসীর ঘুরে বেড়ানোর জায়গা বলতে ছিলো এই পার্ক এবং এর পূর্বদিকের বর্তমান মিউনিসিপলটি মার্কেট । অপেক্ষাকৃত তরুন স্কুল-কলেজের ছাত্রদের প্রধান আড্ডাস্থল ছিল মিউনিসিপলটি মার্কেট, আর যারা একটু নিরিবিলি প্রকৃতির সান্নিধ্য চাইতেন তাদের জন্য ছিলো গোবিন্দচরণ পার্ক । পার্কে কিছু বেঞ্চ ও গাছগাছালি ছিলো । মানুষ এখানে বসতেন বা পরিবারের লোকজন নিয়ে হাটাচলা করতেন । এখন সেটা কল্পনারও অতীত । মাঠের পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে ছিলো শ্রীহট্ট গভর্ণমেন্ট স্কুলের (অধুনা, সিলেট সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়) ছাত্রাবাস । আধুনিক সিলেটের কথিত দানবীর ড. রাগীব আলী কর্তৃক দখলকৃত ছাত্রাবাসটি বর্তমানে ‘মধুবন সুপার মার্কেট’, সেটি আরেক ইতিহাস !

১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ই জুলাই অনুষ্ঠিত হওয়া এক গণভোটে সিলেট ভারতের আসাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তি হয় । তখনই গুঞ্জন শুরু হয় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু নিয়ে । বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলনেও আছে এই গোবিন্দচরণ পার্কের ঐতিহাসিক ভূমিকা । ১৯৪৮ সালের ৮ই মার্চ রাষ্ট্রভাষার দাবিতে প্রথম জনসভাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল এই পার্কেই । ১৯৫২ সালের ৫ই মার্চ পর্যন্ত এখানে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে অনেক সভা-সমাবেশ হয়েছে ।

ভাষা আন্দোলনের পর ১৯৫৪ সালের ১০ই মার্চ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের জয়ে আছে এই গোবিন্দচরণ পার্কের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা । শ্রীহট্টে যুক্তফ্রন্ট আয়োজিত সব সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতো এই পার্কে ।

পাকিস্তান আমলে ১৯৫৮-১৯৬০ সালে সিলেটের জেলা প্রশাসক ছিলেন পশ্চিম-পাকিস্তানী টি. এম. আলী হাসান নামের পাকিস্তান সার্ভিস কমিশনের এক সরকারী কর্মকর্তা । তখন সিলেটে বেশ কিছু উর্দুভাষী ব্যবসায়ী ছিলো । ঐ ব্যবসায়ীদের লোভের সুযোগে ও নিজের নামকে অমর করে রাখতে বদ্ধ পরিকর টি. এম. আলী হাসান সোনালী ঐতিহ্যের বুক খুদাই করে তারই নামে গড়ে তুলেন ‘হাসান মার্কেট’। ১৯৫৯ সাল থেকে নির্মান শুরু হয় হাসান মার্কেটের, ১৯৬৫ সালে প্রায় সোয়া ২’শ ব্যবসায়ীকে তাদের দোকানকোঠা বুঝিয়ে দেওয়া হয়, তন্মধ্যে বেশিরভাগই ছিলো উর্দুভাষী ব্যবসায়ী । স্বাধীনতার পরেও হাসান মার্কেট বাহির লাইন অর্থাৎ দুর্গাকুমার পাঠশালার বিপরীত দিকের দোকানগুলো ছিলো উর্দুভাষী বিহারীদের ।

মজার ব্যাপার হলো এই যে, বাংলাদেশের বয়সের অর্ধেক সময় ধরে মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র ব্রান্ড বলে দাবিদার আওয়ামীলীগ রাষ্ট্রক্ষমতায়, তথাপি আজো আমরা ঐতিহ্যবিস্মৃত হয়ে একজন পাকিস্তানির স্মৃতিকে ধরে রেখেছি । দেবপুর মৌজাকে আমরা ইসলামপুর বানাতে পেরেছি, কিন্তু হাসান মার্কেটকে গোবিন্দচরণ মার্কেট নামকরণেই যত আরজ গুজার !

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৯৭ বার

Share Button

Calendar

October 2019
S M T W T F S
« Sep    
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031